মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০

১২ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

অ্যাডভোকেট রোকনুজ্জামান খান

প্রিন্ট সংস্করণ

অক্টোবর ১৫,২০২০, ০৯:২৭

অক্টোবর ১৫,২০২০, ০৯:২৭

নদীর নাম মধুমতি

১। নদীর একূল ভায়ে ও কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা/সকাল বেলা আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যে বেলা। বাংলার ইতিহাসে বিয়োগান্ত ও মর্মাান্তিক এক কালজয়ীগান। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ৩ জুলাই মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা নামক জায়গার গোলাপ নগরের বাঁকে নবাব মুনসুর-উল মুলক সিরাজদ্দৌলা শাহ কুলি খান মীর্জা মোহাম্মদ হায়বৎ জঙ্গ বাহাদুর মীরজাফরের গুপ্তচরদের কূটকৌশলে ইংরেজ সিপাহীদের দ্বারা বফন্দ হয়েছিলেন।

যে নদীতে বাংলার নবাব বন্দি হয়েছিলেন সেই নদীটির নাম ছিলো মহানন্দা। ছৈয়া নৌকার মাঝি মহানন্দা নদী দিয়ে নবাবকে পাটনার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় এই গানটি গাইতেছিলেন।

গানের করুণ সুরলহরি নদী পাড়ের আমজনতাকে কাঁদিয়ে ছিলো। তখনো নবাবের ভাগ্যলিপিতে কী লিখা ছিলো প্রজারা তার কিছুই জানতেন না। তার পরপরই তিনি বন্দি হন। এ গান ছিলো বাঙালিদের হূদয়ে রক্তক্ষরণের এক আত্ম দহন। সেই নদীকে নিয়েই লেখা আমার ১০ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন— মধুমতি নদী।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নদীমাতৃক দেশ এই বাংলাদেশ। এদেশের নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় নেই। উপরন্ত যে সকল নদীর ইতিহাস লেখা হয়েছে তা ভুলে ভরা,  ইতিহাস বিকৃতির এক চরম পরাকাষ্টা। পাহাড়ের ঝর্ণাধারা থেকে বয়ে আসা লক্ষ কোটি জল বিন্দুর অজস্র জলধারা নিরবধি সাগর পানে ছুটে যাওয়া  জলস্রোতই হচ্ছে নদ বা নদী।

বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদ নদীই এ দেশকে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা করে তুলেছে। নাটাবনের চোরাকাঁটা আর বেতস লতার চিরল পাতায় ঘেরা এই সবুজের সমারোহ এ সবই কিন্তু নদীর অবদান। নদী মানুষকে হাসায় নদী মানুষকে কাঁদায়। বছরের পর বছর ধরে কারো ভিটেমাটি নদীর করাল গ্রাসে  পতিত হয়ে অনেকে হয়ে যায় নিঃশ ভিটেছাড়া। আর কেউবা নদীর দ্বারা সৃষ্ট পলল গঠিত মাটিতে খাদ্যশস্য বপন করে হয়ে ওঠে মোটা গেরস্ত।  এটা নদীর খেলা।
 
সর্পিল গতিতে বয়ে যাওয়া এ দেশের নদী গুলোর এপাড় ভাংগে তো ওপার গড়ে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়— ও নদীরে এ কুল ভেঙে ও কুল তুমি গড়ো। যার একুল ও কুল দু’কুল ভাঙো তার লাগি কি করো। নদীর বুকে চলে শত শত নৌকা। কোনটা রঙিন পালে সাঁজ করা ছৈয়া আবার কোনটা আবার ছৈবিহীন।

নদী অববাহিকার মানুষের জীবন বৈত্র্যি ভিন্ন। গাঙেয় উপত্যাকার  মানুষের চাল চলন আচার অনুষ্ঠান এবং সামাজিক কালচার ভিন্ন লক্ষ্যকরা যায়। নদীতে অবগাহনের ফলে তাদের শারীরিক সৌন্দর্যবোধের প্রভাব অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশি। নদীর বিশালতা নদীপাড়ের অধিবাসীদের হূদয়কে অনেক বড় করে।

নদী জনপদকে জিবিকা করে আবার নদীই জনপদকে ধ্বংস করে। চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদী। আর মিসরকে বাঁচিয়ে রেখেছে নীল নদ। সুতরাং নীলই মিসর আর মিসরই নীল। নদীমাতৃক সভ্যতাই আমাদের জীবন জীবিকাকে সতেজ করেছে। নদীপাড়ের এক একটি ঘুমন্ত গ্রাম যেনো একটি নগর সভ্যতায় পরিণত হয়েছে।

সুতরাং মানব জীবনের শুরুতে নদী, অন্তে নদী, মধ্যে নদী, বাস্তবে নদী, কল্পনায় নদী, জীবনের গহীনে নদী, আমাদের হূদয়ে অদৃশ্যমান হয়ে বহমান আরেক অন্তঃসলিলা নদী। আমার গ্রামটি মধুমতি নদীপাড়ে অবস্থিত হওয়ায় নদী নিয়ে গবেষণা আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। আমার গ্রামের নাম শিরগ্রাম।নদীর তীর থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরেই আমার বসতবাটি। নদীর অব্যক্ত মর্মবাণী, কলরব,কুল কুল ধ্বনি, কার হূদয়কে স্পর্শকরে নাই? নদী ছাড়া মানবসভ্যতার জয়রথ এতদূর পর্যন্ত এগুতে পারতো না।

সিন্ধু সভ্যতা, মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, হরপ্পা এ মহেঞ্জোদারো সভ্যতা, চীন সভ্যতা সবই সৃষ্ট হয়েছে নদীকে ঘিরেই। সাহিত্য, কাব্য, গান, সিনেমা, গল্প, নাটক সবই সৃষ্টি হয়েছে নদীকে উপজীব্য করে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস পদ্মানদীর মাঝি, নেসার ওসমানের পদ্মা মেঘনা যমুনা, অদ্বৈতমল্ল বর্মনের তিতাস একটি নদীর নাম, সমরেশ বসুর গঙ্গা, আলাউদ্দিনআল আজাদের কর্ণফুলি, প্রভৃতি উপন্যাস গুলোর চরিত্র যেনো একেকটি জীবন একেকটি নদী।

ঘরছাড়া বাউলদের অধিকাংশের ঠিকানাই নদীপাড়ে। সাঁইজি ফকির লালন শাহ আস্তানা গেড়েছিলেন ছেউড়িয়ায় এই নদীর তীরেই। নদী নিয়ে লেখা গানের কোনো হিসাব নেই। মরমি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমেদের হাল ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে, ছলছলাইয়া চলুক রে নাউ মাঝ নদী দিয়া চলুক মাঝ নদী দিয়া। শালি ধানের শেওলা বনে হলদে পংখী ডাকে, তর তরাইয়া আইলো দেওয়া রোদ তুফান মাপে মাপে।

আরে পিরালি পিরালি বলে ভ্রমর ও ভ্রমরি খেলেরে— বাদল ও উদালি গায় পানিতে জমিতে হেলেরে। আ. আলিমের ‘সর্বনাশা পদ্মা নদীরে তোর কাছে শুধাই, বল আমারে তোর কিরে আর কুল কিনারা নাই। পাড়ের আশায় তাড়াতাড়ি সকাল বেলায় ধরলাম পাড়ি, আমার দিন যে গেল সন্ধ্যে হলো, তবু কুল না পাই ও নদীরকুল কিনারা নাই। কবি নজরুল ইসলামের পদ্মার ঢেউ রে এই পদে ছিল রে যার রাঙা পা আমি হারিয়েছি তারে।

ভুপেন হাজারিকার গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা ও আমার দুই চোখের দুই অশ্রুধারা মেঘনা যমুনা। এপাড় ওপাড় কোন পাড়ে জানি না শংখ চিলের ভাসিয়ে ডানা আমি দুই নদীতেই নাচি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমাকে।

নদীকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি, দুইধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি। চিকচিক করে বালি, কোথা নাই কাদা, এক ধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।’

কবি আহসান হাবিবের মেঘনা পাড়ের ছেলে কবিতায় ‘আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে আমি মেঘনা পাড়ের নেয়ে। মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে তালের নৌকা বেয়ে, আমি বেড়াই হেসে খেলে।আমি মেঘনা পাড়ের নেয়ে। কবি জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা কবিতায় আবার আসিব ফিরে, ধান সিঁড়িটির তীরে-এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়, হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে। কত হূদয় বিদারক ঘটনার সাক্ষী আছে দেশের নদীগুলো তার হিসেব কে রাখে!

কবি হুমায়ুন কবিরের মেঘনার ঢল কবিতায় সন্তানহারা পিতার করুণ কাহিনী কার হূদয়কে স্পর্শ করেনি? শোন মা আমিনা রেখে দেরে কাজ-ত্বরা করি মাঠে চল, এলো মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল। দেখ দেখ দূরে মাঝ দরিয়ায়, কাল চুল যেন ওই দেখা যায়, কাহার শরীর আঁচল আভাসে সহসা উঠিছে ভাসি। আমিনারে মোর নিলো কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী?

নদীতে ঘটে যাওয়া অনুরূপ আরেকটি হূদয়বিদারক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ইংরেজ কবি চার্লস কিংসলের -Tha sands of উবব কবিতায়। Oh Mary go and call the cattle home,and call the cattle home,and call the cattle home,across the sands of Dee. ডি নদীর বালুচরে আজ ও মাঝিমাল্লারা কন্যাহারা সেই হতভাগ্য পিতার করুণ আর্তনাদ শুনতে পায় ‘ও মেরি ডি নদীর বালুচর থেকে গরুবাছুরগুলো বাড়ি নিয়ে আয়, কিন্তু মেরি আর ফিরে আসেনি।  

এই নদীকে উপজীব্য করে কবি জসিমউদদীন ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট এবং কালজয়ী নাটক মধুমালা ও বেদের মেয়ে রচনা করেছেন। এমনকি ধর্মগ্রন্থেও নদীর অবস্থান আছে পাকাপোক্ত। স্বরসতী ও গঙ্গা এই দুই দেবির স্বর্গচ্যুত হওয়া এবং মর্ত্যলোকে পতিত হওয়া সনাতন ধর্মের পূরাণে স্বীকৃত।এ কারনে যমুনা স্বরসতী ও গঙ্গার সঙ্গমস্থল কে ত্রিবেনি বলে এবং নাগা সন্যাসী দের নেতৃত্বে ১২ বছর পর পর সেখানে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়  এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জনবহুল মেলা এটি। গিনেস রেকর্ডে এখানে প্রায় ২০ কোটি লোক পুর্ণাথী হয়ে আসেন।

বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে স্বর্গে ইডেন নদীর কথা উল্লেখ আছে। আর ইসলাম ধর্মে বেহেস্তে নদীকে নহর হিসেবে বর্ননা করা হয়েছে। ফোরাত নদীর পানি নিয়ে ইয়াজিদের সাথে যুদ্ধ এবং নবী বংশের মর্মান্তিক কাহিনী মুসলমানদের বেদনাহত করেছে। তাই নদীর অবস্থা সর্বত্র বিরাজমান। আমাদের আজকের বিষয় মধুমতি নদী। ২। নদীর উৎপত্তিস্থল : হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে নেমে আসা গঙ্গা এবং বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারন করা নদীর শাখা নদীই হচ্ছে এই মধুমতি।কুস্টিয়া জেলার উত্তরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে ১২ মাইল ভাটিতে তালবাড়িয়া ইউনিয়নের তালবাড়িয়া গ্রাম নামক স্থানে উৎপত্তি হয়েছে গড়াই নদীর।

এই গড়াই নদী কুস্টিয়া রাজবাড়ী ঝিনাইদহ মাগুরা ফরিদপুর জেলা অতিক্রান্ত করে  কামার খালী ঘাট থেকে মধুমতি নাম ধারন করে প্রায় ১৭৭ কি. মি. পথ পাড়ি দিয়ে বলেশ্বর নামে সাগরে মিশেছে।মাগুরা অংশে রাজধরপুর আর ফরিদপুরের মসনন্দপুর গ্রাম থেকেই শুরু হয়েছে আমাদের স্বপ্নের মধুমতি নদী। ১৯২০ সালের বেঙ্গল সার্ভের মৌজা ম্যাপে সি এস রেকর্ডে/জেলা যশহর এর অধীনে ১ নং চর সেলামতপুর মৌজার পুর্বাংশে লেখা আছে মধুমতি নদীর জনস্রোতের মধ্যবর্তী সীমানা।ওপাশে লেখা আছে জেলা ফরিদপুর।

এখন মধুমতি নদীর যে অবস্থান দেখা যায় ৫০০ বছর আগে তা ছিলো প্রায় ১০ মাইলের ব্যবধান। বারাশিয়া এবং পুখুরিয়া হয়ে বাবুখালী ইউনিয়নের সোনাদোহা, টেটাদোহা এবং দীঘা ইউনিয়নের বিলঝলমল হয়ে এলাংখালী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আস্তে আস্তে চরপুকুরিয়া অংশে পলিমাটি ও বালু চরের সৃষ্টি হওয়ায় প্রমত্তা মধুমতি গয়াসপুর এবং মাধবপুর এলাকায় ধাবিত হয়ে সেলামতপুর গ্রামকে দুইভাগে বিভাজন করে। যার একটি অংশ যশহর অপরটি ফরিদপুর জেলায়  বিভাজন হয়ে একটি গ্রামের নাম হয় সেলামতপুর অপরটি নাম হয় চরসেলামতপুর।

এই সেলামতপুর গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলার সেই দামাল ছেলে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আ. রউফ। মধুমতি নদী সর্পিল গতিতে মাগুরা, ফরিদপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ এবং সর্বশেষে বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রায় ১৭৭ কি. মি. পথ অতিক্রম করে  সাগরে মিশেছে।যাত্রাপথে অসংখ্য নদী বন্দর আর গ্রামীণ সভ্যতা বিকশিত করার ধারক ও বাহক হচ্ছে এই মধুমতি নদী। মাগুরা ও ফরিদপুর জেলার সীমান্ত দিয়ে বহমান এই নদীর পূর্বপ্রান্তের উপজেলা সমূহ মধুখালী, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, কাশিয়ানি, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর এবং পশ্চিম তীরে অবস্থিত উপজেলা গুলো হচ্ছে মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, লোহাগড়া, কালিয়া, মোড়লগঞ্জ, মোল্লা হাট, চিতলমারি ও কচুয়া উপজেলা।

১৫৬টি মৌজা আর ৪৪২টি গ্রামকে স্পর্শ ও প্লাবিত করেছে এই মধুমতি। ভাঙাগড়াই এ নদীর খেলা। নদী তীরে অসংখ্য গ্রাম আর জনপদ গ্রাস করেছে এই নিষ্ঠুর মধুমতি। আর বিরাণ ভূমিতে পরিণত করেছে অনেক নগর সভ্যতা। আবার সুজলা সুফলা করেছে এই স্বপ্নের মধুমতি।

মধুমতি নদীর দৈর্ঘ্য ১৭৭ কি. মি. আর গড় প্রশস্ততা এক হাজার মিটার। সর্বোচ্চ প্রশস্ততম স্থান হচ্ছে মহমদ্দপুরের শিরগ্রাম ও বোয়ালমারির লংকারচর নামক জায়গা। নদীটি এখানে প্রায় দুই হাজার বর্গ কিলোমিটার প্রশস্ত। সবচেয়ে গভীরতম স্থান হচ্ছে মধুখালি উপজেলার নওপাড়া গ্রামের কালিতলা নামক জায়গা।

এখানে বর্ষা মৌসুমে প্রায় ১৫০ মিটার পানির গভীরতা মাপা হয়েছে। পানি প্রবাহের পরিমাণ শ্রাবন ভাদ্র মাসে প্রতি সেকেন্ডে ২৮ হাজার কিউসেক। নদীটি জোয়ার ভাটা দ্বারা প্রভাবিত এবং ভাঙনকবলিত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকা মতে এই নদীটির আইডি নং ২৪১।

এই নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায়। নদীরপাড়ের বাসিন্দারা বিভিন্ন প্রকার মাছ মারার যন্ত্র দিয়ে মাছ ধরে থাকেন। এ ছাড়া নদীকে ঘিরে বসতি  স্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন জেলেপল্লী। জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।

মুসলমান সমপ্রদায়ের মধ্যে নিকারি নামক একটি সমপ্রদায়ের লোকজন নদী তীরে বাস করে। মাছ ধরা এবং বিক্রি করাই তাদের পেশা। মধুমতি নদীতে মোট ছয়টি সেতু নির্মিত হয়েছে। ভাঙন রোধে নদীর দু’পাড় দিয়ে নদীশাসন করা হয়েছে।

২০ গজ উঁচু করে ভেরিবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে এবং কোথায় ও কোথায় ও নদীর পাড় সিমেন্টের তৈরি ব্লক দিয়ে বেধে দেয়া হয়েছে। কৃষির উন্নয়নের জন্য দেশের বৃহত্তম জিকে প্রজেক্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ভাঙন রোধ ও নদীর স্রোতকে অবদমিত করার জন্য কিছু দূর পরপর পাকা সিঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে।

এমন কি মাঝ নদীতে স্টিলের পিপা এবং তেলের খালি বেরেল শিকল দিয়ে বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রমত্তা মধুমতি যেনো এখন মানুষের কাছে জিম্মি। এখন আর রংবেরঙের পাল তোলা নৌকা নাই। খা বাড়ির ঘাটে এখন আর পানসি নৌকার আনাগোনা নাই। মাড়ুয়াদের বড় বড় পণ্যবাহী বজরা নৌকা দেখে দুষ্ট ছেলেরা বলে না, মাড়োর নৌকার গলাই মোটা, হাল ধরছে কোন চোদনা বেটা। রাস্তাঘাটের উন্নতির কারণে এই নদী দিয়ে এখন আর স্টিমার জাহাজ চলে না।

তবে চর দখলের নেশায় মত্ত আছে নদীপাড়ের লাঠিয়াল সর্দারদের একটি গোষ্ঠী।তারা ভাড়ায় চর দখল দিয়ে বেড়ায়। এ জন্য দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র বল্লম সড়কি রামাদ ছ্যান্দা, চাইনিজ কুড়াল, তলোয়ার প্রভৃতি হাতিয়ার কাইজায় ব্যবহূত হয়। চর নিয়ে খুন খারাবি নিত্যকার ঘটনা।

আবার মিলে মিশে নৌকা বাইচের মেলায় চির প্রতিদ্বন্দ্বী হায়বত খা এবং পাচু মোল্লাকে  : এক নৌকায় উটে উল্লাস করতে দেখা বিচিত্র কিছু নয়। সিন্দাইন গ্রামের দুই কট্রর প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল মেম্বার আর ছিরু মোল্লাকে একই বাইচের নৌকার একজন আগা নাউয়ের গলাইতে আর একজনকে পাছা নাউয়ের গলাই তে নাচতে দেখা যায়।

লেখক : কলামিস্ট, বিশ্লেষক, আইনজীবী, মাগুরা বার।

আমারসংবাদ/এসটিএম