শিরোনাম

৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণ বিচ্ছিন ঘটনা বলা লজ্জার

প্রিন্ট সংস্করণ   |  ১০:৫৬, জুলাই ০৭, ২০১৯

পড়ন্ত বিকালে যখন একটি শিশুর হাতে থাকবে খেলারসামগ্রী, যে সময়টায় সে হাসবে, খেলবে, ঘুরে বেড়াবে, সে সময়টাই নিষ্ঠুরতা ও লালসার শিকার হলো শিশু সামিয়া আক্তার সায়মা (৭)।

শিশু সায়মাতো তার মমতাময়ী মায়ের হূদয়ের ফুল।

শিশুরা আমাদের মানব উদ্যানের হূদয়কাড়া সৌন্দর্য, গোলাপের মতো সুন্দর, হাসনাহেনার মতো সুগন্ধি ছড়ানো, নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ, হূদয়ের বাঁধন, নয়নের পুত্তলি, অতি আদরের সোনামণি সেই শিশু সামিয়া আক্তার সায়মাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হলো!

দেশ আজ বর্বর দেশে পরিণত হয়েছে নাকী? নারী ও শিশুরা আজ নিজ বাড়িতে নিরাপদ নয়, স্কুলে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, মাদ্রাসায়ও নয়, ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতে নয়, গাড়িতে নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেও নয়!

তাহলে কোথায় নিরাপদ নারী ও শিশুরা? সহ্যের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে কতিপয় মানবিকবোধহীন মানুষরূপী পশুর বর্বরতায়।

জাগ্রত বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়ে পারে না— কোথায় আছি আমরা? বর্বরতার জঘন্যতা লালন করা কি কতিপয় পুরুষের নেশা হয়ে উঠেছে?

এর চেয়ে লজ্জার, কষ্টের, বেদনার আর কি হতে পারে। সায়মা ধর্ষণ দুঃসহ বাস্তবতার ও প্রতিনিয়ত বিভৎস অসহনীয় ঘটনার একটি অতি সাধারণ চিত্র মাত্র।

দেশ ছেয়ে গেছে খুন, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও মাদকের সয়লাবে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় এসব খবরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থির অবনতি নির্দেশ করলেও কেউকেটা কেউ কেউ এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উপহাস করারও চেষ্টা নিচ্ছে।

রাজধানীর ওয়ারীর একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা শিশু সামিয়া আক্তার সায়মাকে (৭) ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

গত শুক্রবার মাগরিবের নামাজের সময় নিখোঁজ হয় সিলভারডেল স্কুলের ছাত্রী সায়মা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নির্মাণাধীন ভবনের অষ্টম তলার একটি কক্ষ থেকে ওর লাশ উদ্ধার করা হয়।

সায়মার বাবা আব্দুস সালাম নবাবপুরে ব্যবসা করেন। পুলিশ বলছে, মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

আহ! ৭ বছরের শিশু...! এই রকম একটি মেয়ে অনেকের ঘরেই আছে। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে! বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।

খবরটা পড়ে যেকোনো মানুষ স্বাভাবিক থাকতে পারবে কী? প্রতিক্রিয়া জানানোর কেনো ভাষাই যেনো নেই। পশু হতে আর কত বাকি আমাদের। হায়রে মানবতা! পশুরাও ওদের দেখে লজ্জায় মুখ লুকাবে।

সবাই আজ মূক, নির্বাক, স্বরহীন, কি আর বলার আছে! সব ভাষা যেন আজ থেমে গেছে! কী অপরাধ ছিলো সায়মার? বিকাল বেলায়, খেলা-ধুলার সময়, একটি শিশুর জন্য একই বাড়িতে ভীষণ অনিরাপদ হয়ে গেলো? এতো কাছে বসেও ধর্ষণ করার সাহস রাখে!

অবশ্য ইতোপূর্বে খবর হয়েছে, খেতে বসা ছয় বছর বয়সি শিশুকেও নরপিশাচরা টেনে নিয়ে ধর্ষণ করেছে।

‘শিশু অধিকার সংরক্ষণে ২০১৮-এর পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ২৮ প্রতিবন্ধী শিশুসহ ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

এর মধ্যে ৯৪ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬ শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে। এদিকে একই বছরে ৮১২ শিশু বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

এছাড়া গত বছর ৪৩ শিশু উত্ত্যক্তের এবং ৮৭ শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে, এই সংখ্যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা।

কিন্তু বাস্তবে এর সংখ্যা আরও বেশি। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নরপিশাচদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে, অপরাধের ভীতিটা জানাতে হবে।

রোগ হলে প্রথম কাজ রোগ চিহ্নিত ও সনাক্তকরণ। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত এবং আন্তরিক চিকিৎসক, রোগ নির্ণয়ের সঠিক ব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতি। তারপর চিকিৎসা।

তবেই সফলতা আশা করা যেতে পারে। দেশের ধর্ষণ সমস্যার মূল জায়গায় এখনো কেউ হাত দেয়নি! ধর্ষক তৈরি হচ্ছে পর্নগ্রাফির ব্যাপক সমপ্রসারণের পরিণতি হিসেবে।

পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে ধর্ষণ ঘটবার সহজ পরিবেশ, উপায়, উপাত্ত বহাল তবিয়তে রেখে এই পাপ থেকে মানুষ মুক্তি পেতে পারে না।

এজন্য ধর্ষণ কেন বাড়ছে বা ধর্ষণ কেন করা হচ্ছে, এই বিষয়টা নিয়ে ভাবার মতো যথেষ্ট সময় এসেছে। এখনই এই সমস্যা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হবে।

ধর্ষণ মূলত একটা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। এই বিষয়কে সমাধান করতে হলে মনস্তাত্ত্বিকভাবেই এর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

পাশাপাশি আমাদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানবিকতার শিক্ষাকে আরও বেশি জাগ্রত ও জোরদার করতে হবে।

ধর্ষণের পর আইন-আদালতে শাস্তি হওয়াই মূল সমাধান নয়। এটা অনেকটা অসুখ হওয়ার পর ওষুধ দেয়ার মতো। অসুখ আসার আগেই প্রতিরোধ করতে হবে।

সমাজ সংস্কৃতিতে নৈতিক শিক্ষার অভাবই এসব অপরাধ ঘটার মূল কারণ।

অবাধ ইন্টারনেট, প্রায় সকল অঞ্চলে মাদক দ্রব্যের সহজলভ্যতা, পত্রিকা ও মিডিয়ায় আবেদনময়ী নারীদের আলোকচিত্র, যা তরুণ ও যুবসমাজের সহজ জীবন যাপনের জন্য হুমকি।

তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।

মানব সভ্যতার এই পর্যায়ে এসেও আমাদের সমাজে যদি নারী ও শিশুরা নিরাপদ না থাকতে পারে, তাহলে এই সভ্যতাকে আমরা কীসের সভ্যতা বলবো!

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত