শিরোনাম

ধর্ষণের মহামারি থামাতে কার্যকরী উদ্যোগ জরুরি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আশিকুর রহমান হান্নান  |  ০৫:৩৩, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯

দেশে দিন দিন বাড়ছে ধর্ষণ নামের নির্মমতা। শুধু নারীই নয়, শিশু-কিশোরও শিকার হচ্ছে এই বর্বরতার। ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণই শেষ নয়, খুন করা হচ্ছে নৃশংসভাবে। গত কয়েক মাস ধরে যেন ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর খুনের উৎসব চলছে।

এভাবে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী। বাদ যাচ্ছে না ৫/৬ বছরের কম বয়সী কন্যা শিশুও। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তিন বা চার বছরের দুধের শিশুও শিকার হচ্ছে এই বিকৃত যৌনতারে।

এতেও থামছে না ধর্ষক। ধর্ষণের পর খুনও করা হচ্ছে। কিন্তু সমাজে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর লোকলজ্জায় এসব ঘটনার সিংহভাগই প্রকাশ করছে না ভিকটিম। সামাজিক অসম্মানের ভয়ে তা লুকিয়ে যাচ্ছে তাদের পরিবার। হেনস্থার ভয়ে করছে না মামলা। তারপরও ছিটেফোঁটা যে ক’টি ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে তাতেই এখন আঁতকে উঠার মতো পরিস্থিতি।

এ চিত্র সারা দেশেই। ৫/৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধাও রেহাই পাচ্ছেন না ধর্ষণের হাত থেকে। নিজের জন্মদাতা পিতা, সৎ পিতা, শিক্ষক, নিকটাত্মীয় কারো হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না তারা। কর্মক্ষেত্রে, চলন্ত বাসে, এমনকি নিজের ঘরে পর্যন্ত নেই নিরাপত্তা। এ যেন এক অন্তবিহীন ঘূর্ণিঝড়ের করাল থাবা।

অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্খা, দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, যৌন উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, ব্লুফিল্ম, পর্নোগ্রাফি, চলচ্চিত্রে নারীকে ধর্ষণের দৃশ্যের মাধ্যমে সমাজে রাস্তাঘাটে বাস্তবে ধর্ষণ করার উৎসাহ যোগান, নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উম্মুক্ত করে দেয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, ১৮ প্লাস চ্যানেলে নীল ছবি প্রদর্শন, যৌন উত্তেজক মাদক ইয়াবার বহুল প্রসার ইত্যাদি কারণে দিন দিন ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবকিছুকে ছাড়িয়ে ধর্ষণ এক মহামারীতে রূপান্তরিত হয়েছে সারা দেশ জুড়ে।

নতুন নতুন পদ্ধতি, নতুন নতুন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলে ধর্ষণের হার। গণধর্ষণ, পালাক্রমে ধর্ষণ, উপর্যপুরি ধর্ষণ, আটকে রেখে ধর্ষণের খবর বেরোচ্ছে প্রতিদিন। আইনের কঠোরতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কোনো কিছুই যেন রোধ করতে পারছেনা ধর্ষণের মহামারী।

নারীদের জন্য বিশেষ বক্ষবন্ধনী, শারীরিক কলাকৌশল ও আত্মরক্ষার নানা কৌশল নিয়ে নানা ফর্মুলা ও উপদেশবাণী প্রয়োগ করা হলেও কোনো কাজে আসছে না এসব তরিকা। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কেন এই ধর্ষণের মহামারী এবং ধর্ষণের মহোৎসব।

এর কারণ হচ্ছে চলচ্চিত্রে, টেলিভিশনে এবং সংস্কৃতিতে নগ্নতার ছড়াছড়ি এমন হয়েছে যে, দেশে নারীরা যেন শুধুমাত্র যৌনতার প্রতীক। সেখানে এমন একটি সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে যে, যে নারী যত নগ্ন হতে পারবে, যে নারী যত সংস্কারবিরোধী হতে পারবে তাকে ততো বেশি মূল্যায়ন করা হবে।

অর্থ-বিত্ত, প্রতিপত্তি সব তাদের পায়ে লুটাবে। নারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বিরাজ করে কে কাকে টেক্কা দিয়ে শরীর থেকে কাপড় কত ছাড়তে পারে। আমরা জানি চলচ্চিত্রের একেকজন তারকা ক্ষমতাবান যে কোনো নেতা-নেত্রীদের চেয়ে বেশি মূল্যায়িত হন। এই অবস্থা বজায় রেখে ধর্ষণ মহামারী থেকে বাংলাদেশ কিছুতেই রেহাই পেতে পারে না।

মানুষের ঘরে ঘরে বিস্তার ঘটিয়ে এখন মন্দিরের চৌহদ্দি খুলে তা যে ভেতরে প্রবেশ করেছে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনা অনেকের কাছে খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার মনে হলেও আলোচনা সমালোচনায় অংশ নিয়েছেন সবাই। কারো দৃষ্টিতে ধর্ষণের জন্য দায়ী নারীরা নিজেই এবং তাদের পোশাকআশাক।

কেউ বলছেন ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলা, ধর্মীয় এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং নৈতিক চরিত্রের স্খলনই এর কারণ। নির্মমভাবে ধর্ষণের শিকার হয়ে তনুর মতো অনেকে পৃথিবী ছেড়েছে। বিচার না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে পৃথিবী ছেড়েছেন হতভাগা পিতা! এমন অনেক ঘটনা আজ আমরা ভুলে গেছি! সেসব চাপা পরেছে ক্ষমতার ঘৃণ্য চাদরে।

টাকা আর ক্ষমতার কাছে ধর্ষিত হয়েছে বহু বোনের ইজ্জত। আইনের শাসন নাই, ধর্ষণের বিচার নাই! তাই ধর্ষকরা অট্টহাসিতে ফেটে পরে আর ডুকরে কাঁদে ধর্ষিত বোনের আত্মা!

যখন ধর্ষকদের ক্ষমতার দাপটে, টাকার গরমে ধর্ষিতার ঋণ পরিশোধ হয়ে যায়, তখনি বন্ধু কর্তৃক বান্ধবী ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়। মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত কর্তৃক কিশোরী ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়।

কি ইমাম আর কি ঠাকুর কিংবা পুরোহিত সব জায়গায় নৈতিক চরিত্রের চরম অবক্ষয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ তো পরের কথা নেই মানবিক মূল্যবোধ। ন্যূনতম মানবিকতা থাকলে বাবা বয়সী একজন রাক্ষস ৫ বছরের শিশুর সাথে ধর্ষণের মতো নোংরা কাজ করতে পারে? শ্বশুর হয়ে বউমাকে ধর্ষণের মতো ঘটনার সাক্ষী এ জাতি।

এমনকি বাবার হাতে মেয়েও রেহাই পায়নি! তাহলে কি দাঁড়ায়? এভাবেই চলতেই থাকবে? এ মহামারী থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই? দেশের নীতিনির্ধারকরা এজন্য কি কোনো পদক্ষেপ নিবেন না? অবস্থার পর্যবেক্ষণ করে তাদেরকেই প্রথমে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নৈতিকতা, মানবিকতা, চারিত্রিক পরিবর্তন সব কিছুর আগে প্রয়োজন ধর্ষণের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান।

আর সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হতে হবে মৃত্যুদন্ড অথবা আমৃত্যু কারাদণ্ড। ঘরে-বাইরে নারীরা যেভাবে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তা অনাকাঙ্খিত ও অনভিপ্রেত। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিমাসে ৩০০টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। প্রকৃত অর্থে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে সংগত কারণে যে, গ্রাম-গঞ্জ এমনকি শহরেও অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের কথা প্রকাশ করতে চান না।

যেহেতু ধর্ষণের শিকার নারীটির ওপরই সামাজিকভাবে ঘৃণা বর্ষিত হয়। তাই অনেকে ধর্ষণের শিকার হয়েও থানায় মামলা করেন না। আর থানায় মামলা দিতে গেলেও অনেক অনাকাঙ্খিত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় ধর্ষিতাকেই। এরপর সাহস করে যারা ধর্ষণের মামলা থানায় বা আদালতে করেন সেই মামলার সিংহভাগ অভিযুক্তই রাজনৈতিক কারণে রেহাই পেয়ে যায়।

এছাড়া ধর্ষণের মামলা তদন্ত করতে গিয়েও একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তা ধর্ষিতাকেই নানাভাবে হেনস্তা করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ধর্ষণ ও গণধর্ষণ দেশের সকল মহলে চরম উদ্বেগ ও আতংক সৃষ্টির পাশাপাশি গোটা দেশজুড়ে মহামারী আকার ধারণ করেছে বলে দাবি করেছে ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন।

সংগঠনটি এ দাবির পাশাপাশি আরো জানায়, চলতি বছর শুধু জানুয়ারি মাসে দেশে ৫২ টি ধর্ষণ, ২২টি গণধর্ষণ এবং ৫টি ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তারা গত বছরে সংঘটিত দেশের ধর্ষণ ও গণধর্ষণের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০১৮ সালে ৯৪২টি ধর্ষণের ঘটনা হয়েছে সারাদেশে। মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ১৮২ জন নারী গণধর্ষণ, ৬৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ৬৯৭ টি ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

সমপ্রতি সবাই লক্ষ্য করেছেন, ধর্ষণ মামলার আসামি অর্থাৎ ধর্ষক তিনজন পৃথকভাবে খুন হয়েছে। সবার লাশের পাশে চিরকুট, সেখানে লেখা ছিলো, ‘আমিই অমুকের ধর্ষক, ধর্ষণের পরিণতি ইহাই’ সম্ভবত এরকম টাইপের চিরকুট। তিন নম্বর লাশের পাশের চিরকুটে লেখা ছিলো

এরকমই, সঙ্গে যোগ করা ছিলো- “হারকিউলিস”। এই তিন ধর্ষককে কারা হত্যা করেছে তা জানা না গেলেও ধর্ষক নামক কুলাঙ্গাররা খুন হওয়ায় খুশি সাধারণ মানুষ। আইনবিদদের মতে, যৌনতা মানুষের জীবনের একটি অন্যতম অধিকার। তবে এই যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপনই হচ্ছে ধর্ষণ।

ধর্ষণের সঙ্গে যৌনতার চেয়েও ক্ষমতার বিষয়টি বেশি সম্পর্কিত। একজন যৌনকর্মীরও অধিকার আছে তিনি কার সঙ্গে যৌনকাজ করবেন আর কার সঙ্গে করবেন না। একজন যৌনকর্মী যদি ‘না’ করেন, তা মানা নাহলে তা হবে ধর্ষণ। একইভাবে একজন স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সহবাস করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই পারেন। স্ত্রীর ইচ্ছার সম্মান না দিয়ে জোর করে সহবাস করা হলেও সেটি হবে ধর্ষণ।

কিন্তু এই বিষয়গুলো সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি বলেই ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। পরিচিতজনদের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। সবকিছুর মূলে আছে মূল্যবোধের অভাব।

অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বল্প পরিচয়ের পর ওই ছেলের সঙ্গে বাছবিচার না করে মেলামেশা, বিভিন্ন চ্যানেল, বিশেষ করে পাশের দেশ ভারতের বিভিন্ন চ্যানেলে যা দেখানো হয়, তা-ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে।

ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটে কোন সাইট দেখছে, তা-ও অভিভাবকরা কখনো নজরে আনছেন না। ধর্ষণের পরীক্ষায় ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিয়ে এত আলোচনার পরও তা বন্ধ হয়নি। বর্তমানে ধর্ষণের শিকার হয়ে অনেকেই সাহস করে মামলা করছেন। তবে ‘লিগ্যাল প্রসিকিউশন’ এখন পর্যন্ত নারীবান্ধব হয়নি। ধর্ষণ কোন সাধারণ অপরাধ নয়। এটি একটি গর্হিত ও অমার্জনীয় অপরাধ।

এ অপরাধের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের মাত্রা দেশে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এর একটি মাত্র কারণ, ধর্ষকরা শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে নানাভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। এ কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধ করেও অনেকে বেঁচে যায়।

ফলে এমন অপরাধ দেশে বেড়েই চলেছে। ধর্ষণের অপরাধীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াতে একশ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষ প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে মেয়েদের ইজ্জত-সম্ভ্রম লুটে নেবার দুঃসাহস করে। যারা ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধ করে তাদের বিবেকের মৃত্যু ঘটে।

তারা মানুষ না পশুতে পরিণত হয়। আর এদের প্রতিহত এবং নিরপরাধ নারীদের রক্ষা করতেই তৈরি হয়েছে কঠোর আইন। ধর্ষকদের আইনানুগভাবে বিচারের মুখোমুখি করতে পারলেই বাংলাদেশের মেয়েরা সমাজে নিরাপদে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে যেমন সক্ষম হবে, তেমনই অপরাধের সংঘটকরাও অনেকটা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে।

বিশেষত ধর্ষণ কাজে জড়িত অপরাধীদের যেন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া হয় সে বিষয়টি সম্পর্কে সজাগ থেকে তাদের আইনের হাতে তুলে দেবার ব্যাপারে যত্নবান থাকতে হবে সবাইকে।

এছাড়া প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, শিশু থেকে তরুণী সমাজের সব ক্ষেত্রে, সব বয়সেই ঘটে যাচ্ছে ধর্ষণের ঘটনা। একের পর এক ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে, আমরা নির্বিকার।

এর শেষ কোথায়? যখন একটি শিশুর হামাগুড়ি দেবার বয়স, যখন তার টলমলে পায়ে সদ্য হাঁটতে পারার বয়স, যখন মায়ের কোল ছেড়ে প্রথম গুটি গুটি পায়ে নার্সারিতে যাবার, খেলতে যাবার বয়স, ঠিক তখনই তার শরীরে বসে যাচ্ছে যৌন নির্যাতনের হিংস্র থাবা।

যে থাবার বিষাক্ত নখে ছিঁড়িয়ে যাচ্ছে তার সুকোমল প্রত্যঙ্গ। অতি পরিচিত, নিকট আত্মীয় কখনও বা পরিবারেরই বয়স্ক সদস্যদের দ্বারা ঘটছে। কখনও বা কোনো স্বল্প পরিচিত, অপরিচিতও আদর করে চকলেট দেবার ছলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যাচ্ছে। শুধু যৌন বিকৃতি চরিতার্থের জন্যে নারী এমনকি দুধের শিশুর ওপরও যে বল্গাহীন নিষ্ঠুর আচরণ, তার প্রতিবিধানে সমাজ, সরকার এত উদাসীন কেন? যে ট্রমা নিয়ে ওই নির্যাতিত শিশুরা বড় হবে, ধর্ষিত নারীর দিন অতিবাহিত হবে, ভবিষ্যতে পারিবারিক, সামাজিক সম্পর্কগুলোকে কি তারা বিশ্বাস ও সম্মান করতে পারবে?

সেই সম্পর্কগুলোতে শেষাবধি তাদের কোনো আস্থা জন্মাবে কি? সারাজীবন যে ক্ষত নিয়ে তারা পথ চলবে কোনো কিছু দিয়েই কি মুছে ফেলা সম্ভব তা? এইসব নারী ও শিশুদের ওপর নির্মম অত্যাচারের রক্তের দাগ আমাদের প্রত্যেকের হাতেও লেগে যাবে, যদি আমরা সবাই তার বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হই।

ক্যান্সার রোগীকে সুস্থ করতে আক্রান্ত সেলগুলোকে যেমন সমূলে উৎপাটন করতে হয়, সমাজে ছড়িয়ে পড়া ওই ধর্ষক নামক ক্যান্সার সেলগুলোকেও তেমনি উপড়ে ফেলতে হবে। মানবাধিকাররা বলেছেন, জবাবদিহিতা না থাকায় সমাজে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে।

দেখা যায়, ধর্ষণ মামলার তদন্ত চলাকালে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ায় ভিকটিম দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হয়। এই ভয়ে মামলা থেকেই ভিকটিম নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তারা বলেন, বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তিরাই এই ঘৃণ্য অপরাধগুলো ঘটাচ্ছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি একে আরও উসকে দিচ্ছে। বিচারব্যবস্থার গতি ছাড়া ধর্ষণ মামলার বিষয়ে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি সম্ভব নয়। নারী ও শিশু ধর্ষণ মামলার তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আরও আন্তরিক হতে হবে।

নারীকে মানুষ ভাবতে শিখতে হবে পুরুষকে এবং নারীর নিজেকেও। প্রতিটি পরিবারের উচিত তাদের ছেলে বা মেয়েকে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ সম্পর্কিত শিক্ষা দেয়া, বিবেকবোধ, সংবেদনশীলতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগিয়ে দেওয়া। এবং অবশ্যই নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখানো।

সেই সাথে আইনের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ধর্ষণ প্রতিরোধে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হতে হবে। ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে।

একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম এমনভাবে খবরটা প্রকাশ বা প্রচার করছে, তাতে বিষয়টিতে অন্যদের আরও বেশি করে সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। এ প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। বাংলাদেশে নারী ধর্ষণের ঘটনা আগেও ছিলো এবং ভবিষ্যতেও হয়তো তা পরিপূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হবে না।

তবে কয়েকটি পদক্ষেপ যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে নেওয়া যায় তাহলে ধর্ষণের ঘটনা কমবে। ধর্ষণ প্রতিরোধে পরিবার এবং নারীদের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। সর্বোপরি ধর্ষণের মহামারী থামাতে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত