শিরোনাম

অটিস্টিক শিশুর স্বাভাবিক জীবন

প্রিন্ট সংস্করণ॥রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ০৩:৪০, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

অটিজম কোনো রোগ, বংশগত বা মানসিক রোগ নয়, এটা স্নায়ুগত বা মানসিক সমস্যা। এ সমস্যাকে ইংরেজিতে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বলে। অটিজমকে সাধারণভাবে শিশুর মনোবিকাশগত জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বিশ্বে প্রায় প্রতি ১১০ জনে ১ জন শিশু এ সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে অটিজমের হার প্রায় ০.৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি হাজারে প্রায় আটজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন রোগ শনাক্তকরণের পদ্ধতিতে অটিজমকে একটি বিকাশজনিত রোগ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। ছেলে বা মেয়ে যে কোনো শিশুই অটিজমে আক্রান্ত হতে পারে।

তবে মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় চারগুণ বেশি। সাধারণত শিশুর বয়স তিন বছর হওয়ার আগেই অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। বাবা-মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা শিশুর প্রতি বাবা-মায়ের আচরণের সাথে শিশুর অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

তাই শিশুর অটিজম থাকলে কোনোভাবেই বাবা-মায়েরা যেন নিজেদের দায়ী বা নিজেদের অপরাধী মনে না করেন, যা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা সঠিক ইনফরমেশন না জানার কারণে অনেক সময় সেই পুরোনো আমলের চিন্তা চেতনা করি। যা গ্রাম্য এলাকাতে মানুষের কাছ থেকে শুনা যায। যার অন্যতম কারণ আমাদের জানার আগ্রহ অত্যন্ত নগণ্য।

বিগত ১০ বছরে অটিজম বিষয়ে ও প্রযুক্তি আমাদের জানার সুযোগকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। তাই অভিভাকদের কাছে অনুরোধ ফেসবুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট না করে আপনার স্বাস্থ্য, আপনার পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন।

আমাদের ভুল ধারণাগুলো সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে সহযোগিতা করুন। অটিজম বিষয়ে নতুন তথ্যবহুল বই, ইন্টারনেটে তথ্যবহুল ইনফরমেশন জানতে চেষ্টা করুন।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সহজে শনাক্ত করা যায়। উল্লেখ্য, বেশ কয়েকটি লক্ষণ দেখলেই বোঝা যায়, কোন শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত। নিম্নোক্ত কয়েকটি কারণ হলো- অটিস্টিক শিশুরা সামাজিকভাবে মেলামেশা করতে চায় না। মনে রাখতে হবে- কম কথা বললেই কিন্তু অটিস্টিক শিশু হওয়া নয়।

তার সঙ্গে অন্য আচরণ, সামাজিকতা, অন্য একটি শিশুর সঙ্গে বা বয়স্ক মানুষের সঙ্গে মেশার বিষয়ে গণ্ডগোল থাকলে ধরে নিতে হবে সে শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত। খেলার সময় সহপাঠীরা ডাকলে সে খেলতে আসে না। ক্লাসের মধ্যে সর্বদা নীরব থাকে। ক্লাসে কারও সঙ্গে মেশে না।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা কথা বলতে পারে, আবার নাও বলতে পারে। যদিও কথা বলে পুরোপুরি গুছিয়ে বলতে পারে না। তাদের ঘুম কম হয়। ঘুম স্বাভাবিকভাবে না হওয়ার কারণে তাদের মনোযোগ ও কাজের ক্ষমতা কমে যায়, আচার-আচরণে সেটা পরিষ্কার টের পাওয়া যায়।

তাদের ভাষা কিংবা কথা শেখানোর সময় সঙ্গে সঙ্গে কথা বলা বা আওয়াজ করে না। নিয়মমাফিক কাজ করা পছন্দ করে। পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ, অদক্ষতা, যোগাযোগে ব্যর্থতা এ তিন বিষয়ের যে কোনোটা থাকা মানে অটিজম নয়।

এ তিনটির প্রত্যেকটিরই কমবেশি লক্ষণ দেখলে বুঝতে হবে সে শিশুটি অটিস্টিক শিশু। তবে শিশুরা অটিজমে আক্রান্ত কি না, তা অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকরাই সিদ্ধান্ত দেবেন। বই বা পত্রিকা পড়ে কিংবা ইন্টারনেট ঘেঁটে উৎসর্গ মিলিয়ে ঘর বসে শিশুকে অটিস্টিক শিশু ভেবে নেয়া উচিত নয়।

আর তাই তো গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর ২ এপ্রিল ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আমাদের দেশের অনেক শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী জীবনযাপন করছে।

সমাজের দিকে তাকালে আমরা অনেক প্রতিবন্ধী লোক দেখতে পাই। তাদের মধ্যে কেউ মানসিক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, কেউ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, আবার কেউ আত্মমগ্ন প্রতিবন্ধী। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের অটিস্টিক শিশু বলা হয়। আমরা হয়তো অনেকে অটিজমের নাম শুনেছি; কিন্তু অটিজম কী, কী কারণে অটিজম হয়, তা এখনো জানি না।

অটিজম একটি মানসিক বিকাশঘটিত সমস্যা, যা স্নায়ু বা স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও পরিবর্ধনজনিত অস্বাভাবিকতার ফলে হয়। সাধারণত ১৮ মাস থেকে ৩ বছর সময়ের মধ্যেই এ রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে সমস্যা হয়।

অটিজমের কারণে কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি, আচরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, আবার অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের মানসিক ও ভাষার ওপর দক্ষতা কম থাকে। অনেক শিশুর সঠিক সময়ে কথা বলতে সমস্যা হয়।

তাদের বুদ্ধিও কম থাকে। অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশু দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ ও স্পর্শের প্রতি অতি সংবেদনশীল অথবা প্রতিক্রিয়াহীন। সাধারণত তাদের প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের খিঁচুনি সমস্যা থাকতে পারে।

তাদের মানসিক অস্থিরতার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ ছাড়া শিশুদের বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা ও মনোযোগের ঘাটতি থাকে। তাদের হজম শক্তি কম থাকে। পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে গ্যাস ও বমি ইত্যাদি হতে পারে। অটিস্টিক শিশুরা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।

স্বাভাবিক একটি শিশু বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় মা-বাবা ও পরবর্তী সময়ে অন্যদের সঙ্গে যেভাবে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে অটিস্টিক শিশুরা তা করতে পারে না।

তাই তারা শিশুকালে মা-বাবার চোখে চোখ রাখা, কোলে ওঠার জন্য হাত বাড়ানোর, চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি দিয়ে মা-বাবাকে অনুকরণ করতে পারে না। তাদের নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না।

অন্য শিশুদের মাঝে রাখলে দূরে গিয়ে একা বসে থাকে। অন্যদের ব্যাপারে আগ্রহবোধ করে না। আপন মনে থাকতে পছন্দ করে। খেলনা দিলে খেলে না। অন্য কারো কোলে যায় না। আমাদের দেশের অনেকে অটিস্টিক শিশুদের সমাজ বা পরিবারের বোঝা মনে করেন।

তাদের সন্তানদের অটিস্টিক শিশুদের সঙ্গে মিশতে দেন না। আদর করতে তাদের সম্মানে বাধা দেয়। আবার অনেকে এসব শিশুকে অভিশপ্ত মনে করেন। অনেকে তাদের এড়িয়ে চলেন। কাছে টেনে নিতে দ্বিধাবোধ মনে করেন।

আবার অনেককে তাদের তিরস্কার করতে দেখা যায়। কিন্তু এসব করা মোটেও সমীচীন নয়। মানুষ মানুষের জন্য এ কথা আমরা সবাই জানি। অটিস্টিক শিশুদের সমাজের বা পরিবারের বোঝা মনে না করে তাদের কাছে টেনে নিয়ে আদর সোহাগ দিলে তারা নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ পাবে। তাদের প্রতি আমাদের দরদমাখা দৃষ্টি দেয়া উচিত।

আল্লাহ তাদের যেমনভাবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন এতে অন্য কারো হাত নেই। আল্লাহ চাইলে আমাদেরও তো তাদের মতো তৈরি করতে পারত। তাই, শিশুদের মানসিক বিকাশগত সমস্যা অটিজমে আক্রান্তদের ভালোবাসা উচিত।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত মা-বাবা পরিবারের সদস্যের মধ্যে জনসচেনতা সৃষ্টি হয়নি বা বুঝে উঠতে পারেননি এরকম একটি পরিস্থিতিতে তারা কি করবেন, কার কাছে যাবেন, কোথায় ভালো চিকিৎসা পাবেন, কত দ্রুত এর সমাধান হবে ইত্যাদি।

এ ছাড়া আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অটিজম সম্পর্কে ভুল ধারণা, শত বছরের পুরানো কুসংস্কার-একটি অটিস্টিক শিশুর মা-বাবা পরিবারকে অনেকটা হতাশার মধ্যে ফেলে দেয়। তাই অভিভাবকদের উচিত- অটিজমের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। সেক্ষেত্রে অটিজম বিষয়ে বাংলাদেশে যারা কাজ করছেন যথা চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, থেরাপিস্ট সকলের পরামর্শ নেয়া খুব জরুরি।

এ ছাড়াও ওপেন তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আপনি ঘরে বসেই জানতে পারেন এবং পরিবারের সকলকেও জানাতে পারেন। শিশুদের বিকাশগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য আমাদের সচেতনতা প্রয়োজন। সরকার প্রতিবন্ধীদের আর্থিক ও সামাজিক ঝুঁকি কমাতে প্রতিবন্ধী ভাতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি দিচ্ছে। অটিস্টিক শিশুর বিকাশের জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

আমাদের ভালোবাসা, ভালো ব্যবহার, পরিচর্যা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা অটিস্টিক শিশুর বিকাশের বাধা দূর করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পারে।

এ জন্য গণসচেতনতা তৈরি করা দরকার। সরকার প্রতিবন্ধীদের আর্থিক ও সামাজিক ঝুঁকি কমাতে প্রতিবন্ধী ভাতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি দিচ্ছে।

অটিস্টিক শিশুদের প্রতি আমাদের সবার ভালোবাসা, ভালো ব্যবহার, পরিচর্যা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতাই পারে তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে। বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুদের যেমন সঠিক কোনো পরিসংখ্যান এখনো পর্যন্ত নেই, তেমনি নেই শিশুদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠানও। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নের আরো উদ্যোগ নেয়া হবে।

কিন্তু অটিস্টিক শিশুদের জন্য কাজ করছেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, সবার আগে প্রয়োজন অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা। তবে এই পারদর্শিতা প্রদর্শনের জন্য এই ধরনের শিশুদের বিশেষ ধরনের শিক্ষার একান্ত প্রয়োজন।

আর এ কারণে অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে বিশেষ প্রয়োজন সম্পন্ন শিশু বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন বলা হয়। এ সব শিশুকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তাদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

লেখক : কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত