শিরোনাম

আশুরা ও কারবালার শিক্ষা

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী   |  ০৮:৫৯, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

মহররম মাসের ১০ তারিখ ইতিহাসে আশুরা নামে পরিচিত। ইতিহাসের অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এই দিনে। আসমান জমিন সৃষ্টি হয়েছে। হযরত আদম (আ.) এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে প্রেরণ, এবং তার তওবা কবুল হয়েছে, পৃথিবীতে রহমতের বৃষ্টি হয়েছে এই দিনে। হযরত নূহ (আ.) এর জাহাজ জুদি পাহাড়ে অবতরণ করে এই দিনে।

ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তিলাভ করে বনি ইসরাইল আজকের এই দিনে। এই দিনে হযরত ইউনুস মাছের পেট থেকে নাজাত লাভ করেন। এই দিনে ইব্রাহিম (আ.) আগুন থেকে মুক্তিলাভ করেন।

এইদিনে হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। ইহুদীরা তাদের এই দিনটিকে জাতীয় মুক্তি দিবস হিসাবে পালন করতো। আরবি ‘শাহরুন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে মাস, আর ‘মুহাররম’ শব্দের অর্থ সম্মানিত। সুতরাং ‘শাহরুল মুহাররম’ এর যৌগিক অর্থ হলো সম্মানিত মাস।

আরবি ‘মুহাররম’ থেকেই ‘মহররম’ শব্দটি বাংলা সাহিত্যে ও বাংলাভাষী মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়। সে যাই হোক, মহররম হলো হিজরি সনের প্রথম মাস। যা আল্লাহ তায়ালার নিকট সম্মানিত চার মাসের এক মাস।

পবিত্র কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের এটি ব্যবহূত হয়েছে। “নিশ্চয় আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি দিন হতে আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস ১২টি তার মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করবে না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করবে।

যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে। এবং জেনে রেখো আল্লাহ মুত্তাকীনদের সঙ্গে আছেন। (সুরা তওবা আয়াত ৩৬)। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমি আশাবাদী যে আশুরার রোজা দ্বারা আল্লাহ অতীতের এক বছরের সগীরা গুনাহ মাফ করে দিবেন (সহি মুসলিম)।

এ মাসের দশ তারিখকে বলা হয় ‘আশুরা।’ কারণ, আরবি ‘আশারা’ থেকে এর উৎকলণ। যার অর্থ হচ্ছে দশ। তাই এ মাসের দশ তারিখকে পবিত্র আশুরা বলে অবহিত করা হয়। আদিকাল থেকেই যুগে যুগে আশুরার এই দিবসে বহু স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফ থেকে জানতে পাই।

হাদিসে এসেছে আল্লাহ রাববুল আলামিন যেদিন আকাশ, বাতাস, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, জান্নাত-জাহান্নাম, লাউহু মাহফুজ ও যাবতীয় সৃষ্টি জীবের আত্মা সৃজন করেছেন, সে দিনটি ছিলো ১০ মুহাররম তথা পবিত্র আশুরার দিবস। আবার এ দিনেরই কোনো এক জুমা বারে হযরত ইস্রাফিল আ. এর ফুঁৎকারে নেমে আসবে মহাপ্রলয়।

পবিত্র কুরআনের ভাষায় যাকে বলা হয় কেয়ামত। মদিনায় হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লক্ষ্য করেন ইহুদিরা আশুরার রোজা রাখছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন এটা কোন দিন- যাতে তোমরা রোজা রাখছ? তারা বলেন, এটা এমন এক মহান দিবস এদিন আল্লাহ তা-আলা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তার সম্প্রদায়কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি প্রদান করেছিলেন। আর ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন তাই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম রোজা রাখেন। এজন্য আমরা রোজা রাখি।

এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা আলীর সালাতু সালামের উত্তর ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী। তাই নিজে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন (সহি মুসলিম)। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবার পরিজনদের ওপর খরচ বেশি করবে আল্লাহ তার ওপর প্রশস্ততা এনে দেবেন।

পবিত্র আশুরার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক কারবালার রক্তাক্ত ইতিহাস মিলিত হয়েছে যা বুকে ধারণ করে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কারবালা। খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য উমাইয়া শাসকদের অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা-আলা আনহু। কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা ইয়াহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাভার ষড়যন্ত্রের শিকার হন তিনি।

ইয়াজিদের বিরুদ্ধে কুফাবাসীর সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে ২০০ জনের একটি কাফেলা নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ফোরাত নদীর তীরে কারবালা নামক জায়গায় পৌঁছালে ইবনে যিয়াদ বাহিনীর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ আত্মসমর্পণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।

কিন্তু তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের বাহিনী হযরত হোসাইনকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ফোরাত নদীতে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। হযরত হুসাইনের শিবিরে পানির হাহাকার উঠে। তিনি তার শিশুপুত্র হযরত আলী আজগরকে কুলে নিয়ে পানির জন্য গেলে এজিদ বাহিনী শিশুটিকে তীর নিক্ষেপ করেন।

এবং শিশু আলী আজগর শাহাদত বরণ করেন। দশ মুহাররম এজিদ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা-আলা আনহুর ওপর। একমাত্র ছেলে হযরত জয়নাল আবেদীন ছাড়া ৭০ জন পুরুষ শাহাদত বরণ করেন।

হযরত হুসাইনের মস্তক দামেস্কে পাঠানো হয়। হযরত হুসাইন তার আদর্শে অবিচল থেকে নিজের প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু আপোস করেননি। কারবালার ইতিহাস আজো মুসলিম মিল্লাতকে নিরব ভাষায় আহ্বান জানায়। দ্বীন প্রতিষ্ঠায় বাতিলের সাথে আপোস করা যাবে না। আজ পৃথিবীতে জায়গায় জায়গায় কারবালা, চলছে ইয়াজিদ সীমারদের শাসন।

জাতিকে মুক্ত করতে হলে হুসাইনী আদর্শে অগ্রসর হয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই হবে কারবালার আসল শিক্ষা। মহররম থেকে আমাদের শিক্ষণীয় : পাঁচটি কারণে মুহাররম মাসটি অধিক সম্মানিত : (১). আল্লাহ তায়ালা নিজে এ মাসটিকে সম্মানিত ঘোষণা দিয়েছেন। (২). মুহাররম শব্দের অর্থই সম্মানিত। (৩). রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এটি আল্লাহ তায়ালার মাস। (৪). রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ মাসের যে কোনো দিনের রোজা (শুধু আশুরার রোজা নয়) রমজানের রোজার পরে সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ। (৫). এ মাসে রয়েছে পবিত্র আশুরা। মুহাররম মাস পুরোটাই দামি ও সম্মানিত, গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে বিশেষ করে এ মাসের দিনগুলোর মধ্যে আশুরার দিনটি হলো সর্বাধিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।

আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য:- পৃথিবীর শুরু থেকেই সকল জাতির কাছে মহররম ও আশুরা গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ ছিলো অতুলনীয়। আজও তা স্বতন্ত্র গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিদ্যমান রয়েছে। কারণ আশুরার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দুটি দৃষ্টিকোণ। শরীয়তের বিধি বিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে :- (১) রমজান মাসের রোজার আগে আশুরার একটি রোজা ফরজ ছিলো। (২) রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর থেকে আশুরার রোজা গুরত্বপূর্ণ একটি নফল ইবাদ হিসেবে আজও রয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা আশুরার রোজা পালন করো।

আমি আশা করছি, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহ তায়ালা পিছনের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। মদীনায় হিজরতের কয়েক বছর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারেন মদীনার ইয়াহুদীরাও এ দিনে রোজা রাখে। বিষয়টি জেনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি যদি আগামীতে বেঁচে থাকি তাহলে আশুরার সাথে মিলিয়ে আগে বা পরে একটি রোজা মিলিয়ে রাখবো।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরের বছর আর জীবিত ছিলেন না। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সা.) এর চাহিদা মোতাবেক আশুরার আগে পরে একটি দুটি রোজা মিলিয়ে রাখতেন। সুতরাং এই হাদিস থেকে আমরা শিক্ষা পাই মহররমের রোজা ১০ তারিখের সাথে আগে বা পরের সাথে মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে হবে।

অর্থাৎ ৯ বা ১০ অথবা ১০ বা ১১ তারিখ রোজা রাখতে হবে। (৩)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে নিজের পরিবারের জন্য মুক্ত হস্তে (হাতখুলে বেশি বেশি) খরচ করবে, আল্লাহ পাক তার জন্য সারা বছর (রহমতের দুয়ার খুলে) তার রিজিকের (প্রাচুর্যের) ফায়সালা করবেন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে :- পৃথিবীর শুরু থেকেই এ দিনটি ঘটনা বহুল। বহু ঘটনা বা ইতিহাসের জ্বলন্ত সাক্ষী এই আশুরা। বর্তমানে এই তারিখের ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের দুটি অধ্যায় রয়েছে। (ক). আনন্দ ও বিজয় গাঁথা ইতিহাস। (খ). বেদনা ও বিষাদের ইতিহাস।

বিজয় গাঁথার মধ্যে অন্যতম ১০টি ইতিহাস:- (১). এই দিনে প্রথম পৃথিবীতে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। (২). হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ. এর দোয়া কবুল হয়। (৩). হযরত নুহ আ. কিসতি থেকে জমিনে অবতরণ করেন। (৪). হযরত ইবরাহীম আ. নমরুদের আগুন থেকে মুক্তি পান। (৫). হযরত আইয়ুব আ. ১৮ বছর পর রোগমুক্ত হন। (৬). হযরত ইউনুস আ. মাছের উদর থেকে নিষ্কৃতি পান। (৭). হযরত মুসা আ. ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পান। (৯). হযরত ইউসুফ আ. ও হযরত ইয়াকুব আ. এর সাক্ষাত হয়। (১০). কাবা শরিফে প্রথম গিলাফাবৃত করা হয়। কারবালা ও আশুরার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন চলার পথে আল্লাহ পাক আমাদেরকে এর বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : প্রিন্সিপাল, জামেয়া মা‘আরিফুল কুরআন ও ইসলামি গবেষক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত