শিরোনাম

ক্রিকেটের আফিম, চন্দ্রযান এবং আমাদের মুখস্থ জ্ঞান

মুরাদ খান  |  ১৩:১৫, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

ক্রিকেট আমাদের কাছে আফিমের নেশার মতো। আপনি ইচ্ছা করলে ক্রিকেট খেলা দিয়ে একটা জাতির পুরো যুব সমাজকে বেঁধে রাখতে পারবেন। ক্রিকেট এই মহান শক্তি দিয়েছে আমাদের।

আমাদের পেছনে এসে হু হু করে আমাদের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অনেক দেশ। আমাদের অবস্থা ঢাকার ৬ নম্বর বাসের মতো। পেছনে ছেড়ে আসা বাস সাইরেন বাজিয়ে সামনে চলে যাচ্ছে অথচ আমাদের কোনো তাড়া নেই।

আমাদের যথেষ্ট কাণ্ডজ্ঞান আছে। আমরা হার মেনে নিতে পারি না। হেরে গেলে জাত তুলে তুলোধুনো করি। জিতে গেলে মাথায় রাখি। তার থেকেও বড় কাণ্ড হচ্ছে ভিনদেশিদের নিয়ে ট্রল করতেই হবে।

ক্রিকেট যেমন বিনোদন তেমনি ট্রল হচ্ছে তার থেকেও বড়। অশ্লীল বিনোদন বলায় যায়। একটা ক্রিকেট টিম গড়তে বছরের পর বছর হাজার হাজার কোটি যাচ্ছে আমাদের আফসোস নেই। ম্যাচ জেতার আগেই ফ্ল্যাট গাড়ি বাড়ি দিয়ে বসে থাকি।

কেন দেই? উৎসাহ দিতে। এইগুলো কি আসলেই উৎসাহ বৃদ্ধি করে?

অন্যদেশ যখন মহাকাশ দখল নিয়ে ব্যস্ত সেখানে আমাদের সাফল্য চাঁদ দেখার কমিটির বৈঠক। তাও বছরে তিনবার তিনটা বৈঠকের দিকে তাকিয়ে থাকে সারা দেশ।

যেখানে অন্যদেশগুলো বছরের পর দক্ষ শিক্ষিত গড়ে তুলতে ব্যস্ত সেখানে আমরা শিক্ষিত বেকার গড়ে তুলাকে সফলতা হিসেবে দেখি।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মুখস্থনির্ভর। এখনো বাজারে নোট বইয়ের বাহার আছে। আছে হাজারো বোর্ড বই। রুটিন মাফিক পরীক্ষা। কিন্তু কোথাও দক্ষতা নির্ভর বা স্কিল নির্ভর পড়াশোনা নেই।

যেখানে দশজন ইয়াং ছেলেমেয়ে সেখানে গিয়ে কোনো একটা ডিগ্রির নাম ধরে ডাকুন একবার তারপর দেখুন কি হয়।

যেমন ধরুন বাজারে গিয়ে ডাকলেন বিবিএ হবে বিবিএ। দেখবেন ৫০ জন আপনার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে।

এদেশের বিবিএ এমবিএ পড়া ছেলে মেয়েগুলো ভিনদেশের কোম্পানিগুলোকে মার্কেটিং করেই সন্তুষ্ট। কারণ এর থেকে ভাল চাকরি নেই দেশে।

দেশে যেমন চাকরির জন্য তেমন সুযোগ নেই তেমনি নিজেরা কিছু করবে সেই দক্ষতা নেই। আমাদের দৌড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিবিএ, এমবিএ এর মুখস্থ সার্টিফিকেট পর্যন্ত। দক্ষতা বা স্কিল বেইজড হিউম্যান রিসোর্স আমাদের কোথায়?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা হয়। হরতাল অবরোধ স্লোগান শেখানো হয়। কিন্তু কোনো গবেষণা হয় না। গবেষণার জন্য যে বাজেট দরকার তাও তাদের দেওয়া হয় না।

কারণ আমাদের দরকার মেধাবি নামে সিজিপিএ। আর ঘোলাটে কাগজের সার্টিফিকেট। দেশের সরকারি টিভি চ্যানেলের ব্যয় দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলো থেকেও বেশি।

ভারত নিজেদের তৈরি রকেট চাঁদে পাঠায়। আমাদের ছেলেরাও নাসার মহাকাশ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় নিজেদের চেষ্টায়। রাষ্ট্র তাদের খবর রাখে না। তাদের পেছনে ব্যয় করে কী হবে?

আমাদের আছে ক্রিকেট, ক্রিকেট আর ক্রিকেট! তাছাড়া আমাদের জ্ঞান দরকার গবেষণা বা দক্ষতা না। কারণ আমরা এখনও আটকে আছি নলেজ ইজ পাওয়ার ঠিক এই জায়গায়।

বর্তমানে বাংলাদেশ উচ্চারণ করতে গিয়ে আমরা অহংকার করেই বলি ডিজিটাল বাংলাদেশ। কিন্তু তাতে আমাদের দেশের কি এমন পরিবর্তন হয়েছে বুঝি না।

ডিজিটাল বলতে কি মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার আর কাগজের বইয়ের পরিবর্তে কম্পিউটারের স্ক্রিন নাকি স্যাটালাইট?

আমরা একটা স্যাটালাইট তৈরি করেছি বহু কষ্টে। অথচ সবকিছু তৈরি করেছে বিদেশি কোম্পানি আমরা শুধু দাওয়াতে গিয়ে হাততালি দিয়ে এসেছি। উড্ডয়নের মজা নিয়েছি।

অথচ হতে পারতো স্যাটেলাইট তৈরির সময় সার্বক্ষণিক আমাদের একটা টিম তাদের সাথে থাকবে। তারাও বিষয়টা পুরোপুরি আয়ত্তে আনবে যেন দেশে এসে প্রাক্টিস করতে পারে। কিন্তু না আমাদের অনুষ্ঠানে আমরাই গেস্ট।

যে কারণে আমাদের মশা নিধনে সিঙ্গাপুর না হয় খাবার পানির প্রষিক্ষণে উগান্ডা যেতে হয়।

বিশ্বাস করেন! বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ব্যয় না বাড়িয়ে মানে উপযুক্ত দক্ষতা বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট না করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া কোনো দিনেই সম্ভব না।

এখনো সময় আছে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে। নয়তো যখন সবাই চাঁদ দখলে নিবে তখন আমরা সার্টিফিকেট বগল দাবা করে চাঁদ দেখবো। আর রেডিও টিভিতে শুনবো আজ চাঁদ দেখার কমিটি বৈঠকে বসেছে।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত