শিরোনাম

নরপিশাচরূপী ধর্ষক কারা?

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাশেদা রওনক খান  |  ০৭:০১, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

ধর্ষক তৈরির কারখানা তো আমাদের পরিবারেই। বেশ কয়েকমাস আগে লিখেছিলাম, ‘সাবধান, ধর্ষক আপনার পাশেই ঘুরছে’। ওই লেখাটি পড়ে কত বাবা-মা যে আমাকে প্রশ্ন করেছেন ‘এখন আমরা তাহলে কী করবো?’ অনেক দিন ধরেই চাপ ছিলো এই লেখাটার, যেখানে থাকবে কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়।

আলোচনার শুরুতেই বলে নিই, ধর্ষণমুক্ত সমাজের জন্য আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। প্রথমত, পারিবারিক পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে শিশুদের জন্য। ‘আমার সন্তান আমার সচেতনতা’- এর কোনও বিকল্প নেই।

এই সচেতনতা কেবল ধর্ষকের হাত থেকে রক্ষার জন্য নয়, এই সচেতনতা আমার ছেলে যেন ধর্ষক না হয়ে ওঠে, সেই জন্যও জরুরি। আমরা কেবল ধর্ষণ রোধে নাজুক সন্তানটিকে কীভাবে বাঁচানো যায় তা নিয়ে ভাবছি, কিন্তু কেউ ভাবছি না ধর্ষকের উৎপাদন কারখানা নিয়ে। এই কারখানা কিন্তু আমার আপনার ঘর, আমার আপনার সন্তান, আমার আপনার স্বামী-বাবা খালু-চাচা-মামা। শুনতে খারাপ শোনালেও এটাই সত্যি।

ধর্ষক ভিনদেশ থেকে উড়ে আসে না। আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, সহকর্মী-যারা আছেন তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ। অতএব, ধর্ষণ প্রতিরোধে আমার সন্তানকে যেমন নিরাপদে রাখতে হবে, তার চেয়েও জরুরি এই ধর্ষক তৈরির কারখানা বন্ধ করা।

দ্বিতীয়ত, স্কুলগুলোর পাঠ্যসূচিতে সেক্স এডুকেশন, সাইবার ক্রাইম, প্রতিরোধ, সম্পর্ক তৈরির ধাপসমূহ, সামাজিক সম্পর্ক ইত্যাদি সম্পর্কে আলাপ আলোচনা থাকতে হবে। এবার স্কুল পর্যায়ে আসি। ইউরোপ আমেরিকায় ৪ বছরেই বাচ্চাদের স্কুলে ‘সেক্স এডুকেশন’ নিয়ে পড়ানো শুরু হয়।

তারপরও প্রচুর ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিংয়ের শিকার যে তারা হচ্ছে না তা নয়। তারা প্রতিনিয়ত গবেষণা করে চলছে কীভাবে এই ধর্ষণ, যৌন হয়রানির প্রবণতা কমানো যায়। ইংল্যান্ডে প্রতি সপ্তাহে মা-বাবাদের ইমেইলে জানিয়ে দেয়া হয় পরের সপ্তাহে কী পড়ানো হবে ক্লাসে।

সেদিন আমার পাঁচ বছরের বাচ্চার স্কুল থেকে চিঠি এলো, আগামী ক্লাসে তারা বাচ্চাদের শেখাবে ‘সেক্স এডুকেশন, সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, নারী-পুরুষের সম্পর্ক’ এ ধরনের আরও কিছু বিষয়। তারা এই প্রক্রিয়াকে নাম দিয়েছে ‘নরমালাইজেশন’।

তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদাসীন। ধর্ষণ প্রতিরোধে নতুন ভাবনার প্রয়োজন, ধর্ষকের শাস্তি কী হবে, ধর্ষককে কীভাবে দ্রুতবিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায়। ক্রসফায়ার সমাধান নয় বরং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হবে একমাত্র উপায়।

এই তিনটি পর্যায়ে আমরা সচেষ্ট হলে সমাজে ধর্ষণ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। যা হোক, আগেই বলেছি ‘আমার সন্তান আমার সচেতনতা’- এর কোনও বিকল্প নেই। তাই পারিবারিক পর্যায়ে আমাদের কী কী প্রক্রিয়ায় সচেতন হওয়া জরুরি, তা দেখে নিই— (১). আমরা অনেক সময়ই বলি, পাশের ফ্ল্যাটে কে বা কারা থাকে জানি না।

আমরা বড্ড অসামাজিক হয়ে গেছি। কিন্তু এসবের ভিড়েও যখন সায়েমাদের মতো কিছু পরিবার ফ্ল্যাট বাড়িতেই পাড়া তৈরি করে নিচ্ছি, বাচ্চাদের কিছুটা সামাজিক বানানোর চেষ্টা করছি, তখন ধর্ষক নামক নরপিশাচরা অপেক্ষা করে সুযোগের। বাবা-মায়েদের বলতে চাই, আপনার আশপাশেই ধর্ষক ঘোরাফেরা করছে।

আপনার আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের মাঝেই এমন কিছু মানুষ আছে, যারা অপরাধী মানসিকতার! তারা খুব সহজে, বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ না থাকার কারণে নির্দ্বিধায় আপনার আমার ছোট্ট শিশুকে ধর্ষণসহ যেকোনও অপরাধ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, আপনার সন্তান আপনার কাছে শিশু হলেও তার কাছে কেবলই ভোগ্যপণ্য, কেবল একটি থলথলে মাংসপিণ্ড। (২). ছেলে বা মেয়ে হোক, শিশুরা নাজুক, তারা সহজে সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারে না, তাই তাদেরকে আমাদেরই আগলে রাখতে হবে।

ছেলেদের আমরা মাদ্রাসায় পাঠিয়ে কিংবা ঘরে শিক্ষক রেখে ধর্মীয় শিক্ষা দেই। একইসঙ্গে গৃহশিক্ষক রেখেও পড়ানোর ব্যবস্থা করি। তবে তাদেরও যে বিকৃত যৌন চাহিদা নেই- এমনটা বলা যায় না।

সবাইকেই যে অবিশ্বাসের চোখে দেখবেন এমনটা বলছি না। বলছি, যারা আপনার সন্তানকে পড়াতে আসছে, তাদের দিকেও নজর দিতে হবে। (৩). আমাদের বোনের ছেলে কিংবা চাচাতো ভাই বা মামা- চাচা-খালু যেই হোক, এমনকি আমাদের রক্ত সম্পর্কের কেউ ধর্ষক হতে পারে- যে কিনা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, যা আপনার আমার কল্পনাতেও নেই।

তাদের মাঝে অনেকেই আপনার শিশু সন্তানটিকে বেছে নেয় আপনাদের সরলতা কিংবা উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে। পরম আত্মীয়কেও চোখ দিয়ে পরখ করুন।

বিশেষ করে লক্ষ্য করবেন, আপনার কোনও পুরুষ নিকট আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীর খুব বেশি ঘন ঘন আপনার বাচ্চাটির কাছে আসার প্রবণতা আছে কিনা। এ ক্ষেত্রে একটু নিরাপদ দূরত্বে থেকে লক্ষ্য করুন আপনার শিশুর দেহে তার স্পর্শ কতটা নিরাপদ। (৪). আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষরা বিয়ের আগে ‘সেক্স’ করতে পারে না সমাজের বিধি নিষেধের কারণে। পতিতালয় থাকলেও যেতে পারছে না নানা ট্যাবুর কারণে।

হয়তো সেখানে যাওয়ার সুযোগ ও সামর্থ্য সবার থাকে না। কিন্তু শরীরের চাহিদাটা থেকে যায় খুব ভালোভাবেই। ফলে তারা সুযোগ খোঁজে নিকট কোনও আত্মীয়ের। যার বা যাদের বাসায় তাদের অবাধ যাতায়াত বা মেলামেশার সুযোগ থাকে।

তারা আপনার একটু অনুপস্থিতিতে যেকোনও সময় আপনার মেয়ে, এমনকি ছেলে শিশুকে একা পেলে ধর্ষণ করে, যা এখন আমরা প্রকটভাবে দেখতে পাচ্ছি। তাই কারও কাছে সন্তান দিয়ে চোখের আড়াল হবেন না, যেভাবেই হোক আপনি সঙ্গে থাকার চেষ্টা করুন।

(৫). আপনার আত্মীয়স্বজনের মাঝেই সাইকোপ্যাথিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী লোকজন থাকতে পারে। যার কাছে আপনি খুব সহজেই বিশ্বাস করে বাচ্চা দিয়ে যাচ্ছেন। যে কাজটি ১ বছর ১০ মাস বয়সী বাচ্চাটির মা পারভিন আক্তার করেছেন।

আপনার কাছে মনে হতে পারে, ও তো শিশু, একদম দুধ খায়, এত ছোট শিশু, ওকে কী করবে? আপনি হয়তো জানেনই না, যার কাছে শিশুটিকে দিয়েছেন, তার মধ্যে কাম প্রবৃত্তি বা অন্যকে নির্যাতন করে যৌনসুখ লাভের মানসিকতা আছে, যা তাকে শিশুর যোনিপথকে রক্তাক্ত করতেই আনন্দ দেয়।

এতেই বিকৃত পশুটি যৌনসুখ লাভ করে। (৬). বিদেশে বেশিরভাগ স্কুলেই বাচ্চাদের বাবা-মা এবং দাদা- দাদি, নানা- নানি ছাড়া স্কুলে আনা- নেওয়া করার দায়িত্ব আর কাউকে দেওয়া হয় না।

অথচ আমরা অনেক সময় ড্রাইভার বা বাসার সাহায্যকারী বা দারোয়ানদের দিয়ে বাচ্চা স্কুলে আনা- নেওয়া করাই। এ ক্ষেত্রে ভাবতে হবে আমাদের সন্তান আসলে অন্যের হাতে কতটা নিরাপদ? টাকার পেছনে দৌড়ে আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে অমূল্যধনকে কত অবহেলাই না করছি কেউ কেউ! (৭). খুব সাবধান থাকতে হবে মাদকাসক্ত কোনও আত্মীয় বা পরিচিতজনের কাছ থেকে।

আপনি হয়তো জানেনও না যে আপনার আত্মীয় মাদকাসক্ত, সেক্ষেত্রে অনেক বড় বিপদ হতে পারে। বিশেষ করে, ইয়াবা সেবক আজকাল তরুণদের ভেতরে এতটাই প্রবল এবং স্বাভাবিক যে আপনি টেরই পাবেন না লোকটি ইয়াবা সেবন করে।

তাই সবসময় লক্ষ্য রাখুন আপনার শিশু বা কন্যার সঙ্গে মেলামেশা করে এমন কেউ মাদকাসক্ত কিনা। মনে রাখবেন, মাদকাসক্তি মানুষের স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ লোপ করে।

তাই মাদকাসক্ত যদি আপন মামা- চাচাও হয়, এমনকি বাবা হলেও তাদের কাছ থেকে সন্তানকে নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। গত ২৮ মার্চ আমরা দেখলাম, রশিদপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম তার পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিশুকন্যাকে ৭/৮ দিন নিজ ঘরে ধর্ষণ করে এবং এতে একপর্যায়ে শিশুটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে (সময় নিউজ টিভি, ২৮ মার্চ)। আমরা জানি না রবিউল ইসলাম মাদকাসক্ত কিনা, কিন্তু মাদকাসক্তি পারিবারিক পরিসরে ধর্ষণের একটি কারণ। (৮). কখনও কখনও বন্ধুবান্ধবরা ফ্যান্টাসি হিসেবে একসঙ্গে হয়ে বা খুব পরিকল্পিতভাবে সাজানো পরিবেশে এনে কোনও মেয়েকে একা পেয়ে আনন্দ- ফূর্তি করার জন্য ধর্ষণ করে।

যেমনটি ঘটেছিল আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের ক্ষেত্রে। অতএব, বন্ধুবান্ধব কারা সেটি খুব সচেতনতার সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিশেষ করে, কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছে কিংবা দূরে কোথাও যাবে শুনলেই একটু খবর নিতে হবে বা সঙ্গে যেতে হবে, অন্তত পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

তাতে যারা পরিকল্পনা ফাঁদে, তারা একটু হলেও ভয়ে থাকে যে অভিভাবক জানেন কার সঙ্গে কোথায় মেয়েটি আছে। কড়া শাসন করা যাবে না এক্ষেত্রে, খুব কৌশলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মেয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে সব বন্ধু-বান্ধবের আদ্যোপান্ত জানতে হবে। (৯). মাদ্রাসার শিক্ষকদের দ্বারাও শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ হওয়ার ঘটনা আমরা পত্রিকার পাতায় দেখতে পাচ্ছি। এই প্রবণতা হয়তো আগেও ছিলো কিন্তু গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে এখন বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।

মাদ্রাসা বা এতিমখানার কোমলমতি অসহায় অনেক শিশুর ওপর বর্বর নির্যাতন করলেও লেবাসে লুকিয়ে থাকা এসব ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সহজে কেউ মুখ খুলে না বলে তারা এসব জঘন্য অপরাধ করতেই থাকে। তাছাড়া আমাদের সমাজের বাবা- মায়েরা এতটাই সহজ-সরল ও ধর্মভীরু যে ‘হুজুর’ দ্বারা নিপীড়িত হলেও অনেক সময় তারা নীরব থাকেন।

এটাকে সামষ্টিক নীরবতা পালন বলা যেতে পারে কিংবা এ ক্ষেত্রে বাবা- মায়ের ‘সামাজিক চাপ’-এর মুখে নীরব থাকার প্রবণতা খুব লক্ষণীয়। সোনাগাজীর নুসরাতের ঘটনাও আমরা দেশবাসী দেখেছি, জান্নাতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।

আবারও বলছি, প্রতিটি পেশায় কিংবা কমিউনিটিতে ভালো- মন্দ দুই প্রকার লোকজনই আছে। এই মন্দ অর্থাৎ এই নিপীড়কদের চিহ্নিত করা মাত্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে। কোনও কারণে চেপে যাওয়া যাবে না।

একইসঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে- যারা ভালো তারা যেন ক্ষতির মুখোমুখি না হন। (১০). কোচিং সেন্টারগুলোতে স্কুলশিক্ষক দ্বারাও আজকাল কোমলমতি ছেলে-মেয়েরা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

এসব নির্যাতনের কথা যেন বাসায় এসে আপনাকে বলে সেই সম্পর্ক তৈরি করতে হবে সন্তানের সাথে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ভয়ের সম্পর্ক থাকলে তারা কখনোই আপনাকে ঘটে যাওয়া ঘটনা জানাবে না।

তাই আমার/ আপনার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব, যেকোনও অনুষ্ঠান, স্কুল, কোচিং বা মাদ্রাসা থেকে ফেরার পর সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা বন্ধুত্বের ছলে, আজ কী কী হয়েছে, কোনও সমস্যা হয়েছিলো কিনা, কেউ তাকে কিছু বলেছে কিনা, কেউ তার শরীরে কোথাও ছুঁয়েছে কিনা, ইত্যাদি।

জানি, বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করা খুব কঠিন একজন অভিভাবক হিসেবে। তবুও আমাদের যে অস্থির যুগ পড়েছে তাতে এসব আলোচনা খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়মিত করতে হবে।

(১১). ফ্ল্যাটগুলোতে অনেক দারোয়ান বা ড্রাইভার থাকে, এমনকি বাসাবাড়িতে ছেলে বা পুরুষ হাউস এইড থাকে, তাদের সাথে সন্তানদের বা কিশোর-কিশোরীদের আচরণ খেয়াল রাখতে হবে।


শাজনীন হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে, যে কিনা বাড়ির কাজের ছেলে দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলো এবং তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। তাদের হাতে সন্তানদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাদের ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। (১২). ঘরে যদি স্পেশাল চাইল্ড থাকে, তাকে অতিরিক্ত যত্ন নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে কাজটি খুব কঠিন মায়েদের জন্য। কারণ, মায়েরা এমনিতেই এক ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক পীড়নের মাঝে থাকেন এই সন্তানের জন্য। তাছাড়া অন্য ছেলে-মেয়েদের দিকে মনোযোগ বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। ফলে দুদিক সামলাতে সামলাতে মা হাঁপিয়ে ওঠেন।

এই ফাঁকে সুযোগসন্ধানী আত্মীয় বা প্রতিবেশী বিকৃত পুরুষ আপনার স্পেশাল চাইল্ডের ওপর নিপীড়ন, এমনকি ধর্ষণ করতে পারে। স্পেশাল চাইল্ড পরিবারে মা ছাড়া সবার কাছেই অবহেলিত থাকে। এ বিষয়টি থেকে বের হতে হবে। এই অবহেলার সুযোগ নিয়ে আশপাশের মানুষজন তাদের নিপীড়ন করে যৌনসুখ পায়।

পারিবারিক ক্ষেত্রে দুটো বিষয় খুব জরুরি:-
(এক). অতিরিক্ত শাসন করে ছেলে-মেয়েকে আমরা অনেক সময়ই খুব ভয়ে ভয়ে নিরীহ সুবোধ বালক-বালিকা হিসেবে তৈরি করতে পছন্দ করি। অসহায় শিশুগুলোর ওপর জুলুম করা সহজ।

কারণ, এরা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে দুর্বল। তাই ভয় দেখিয়ে বা জোর করে এদের ধর্ষণ করা যায়। সন্তানকে, ছেলে কিংবা মেয়ে, আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে গড়ে তুলতে হবে।

(দুই). সারা দিনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে শোনার মতো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এজন্য বাবা- মায়ের সন্তানের জন্য একটু বেশি সময় দেওয়া প্রয়োজন, যার অভাব আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি! শেষ কথা, আমাদের অভিভাবকরা যেভাবে আমাদের লালন পালন করেছেন, সেভাবে আমাদের সন্তানদের করা যাবে না।

কারণ, তারা এখন একটা ভিন্ন পৃথিবীতে (ইন্টারনেটভিত্তিক) বেড়ে উঠছে। যেখানে ভালোর পাশাপাশি খারাপের হাতছানি রয়েছে। আপনি চাইলেই কেবল ভালো শেখাবেন, এটা কঠিন। বরং আমরা যা করতে পারি, ভালো ও খারাপ দুটোর পার্থক্য তাদের শেখাতে পারি।

খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষাটা বেশ ভালোভাবে দিতে পারি। ভালো শিক্ষার্থী হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা দিলে সমাজে ধর্ষকের সংখ্যা কমে যাবে।

নিপীড়িত যেমন আমার/ আপনার সন্তান, নিপীড়কও কিন্তু আমার/ আপনার সন্তান বা আত্মীয়। তাই সন্তান ধর্ষক হবে নাকি একজন ভালো মানুষ হবে— তার চাবিকাঠি আমাদের হাতেই। পরিবারে ছেলে সন্তানদের বখে যাওয়া প্রথমত পরিবারই টের পায় এবং সবচেয়ে আগে টের পান মা (কারণ, মায়ের মতো করে জগতে সন্তানকে আর কেউ ভালোবাসে না এবং সংসারে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকেন তিনি)।

এ ক্ষেত্রে ‘আমার ছেলে জগতের সেরা’- এই ধারণা থেকে সেসব মা’কে বের হয়ে আসতে হবে। আমি দেখেছি, অনেক পরিবারেই মা-বাবারা ছেলে সন্তানের খারাপ দিকগুলো লুকিয়ে রাখেন। অনেক ক্ষেত্রে বলা যায়, আসকারা দিয়ে থাকেন। আপনার এসব আসকারা একদিন বিপদ হয়ে ফিরে আসবে।

ছেলেরা বাবার আচরণ দেখে শেখে অনেক কিছু। তাই বাবাদের হওয়া উচিত আদর্শ। যখন ছেলে দেখে বাবা চরিত্রহীন, দুর্নীতিবাজ, মায়ের প্রতি অবিবেচক, নিপীড়ক- ছেলেও তা-ই শিখবে। মেয়ে শিখবে সেও মায়ের মতো নিপীড়িত হবে, এটাই স্বাভাবিক।

তাই প্রতিটি পরিবার যদি নিজের ছেলে সন্তানকে ‘বীর’ আর মেয়েকে ‘অন্যের সংসারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও’ ধরনের তৈরি না করে ছোটবেলা থেকে আত্মবিশ্বাসী, সৎ ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ তৈরি করে তাহলে এই সমাজে ধর্ষক থাকবে কোথা হতে? আর নরম কোমল নারীর ধারণা থেকেও সমাজ বের হয়ে আসবে।

ধর্ষকের কারখানা আমাদের পরিবারেই— এটাই শেষ কথা।

লেখক : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত