শিরোনাম

রাসূল (সা.)-এর বাণী ও অধপতনের শেষসীমা

প্রিন্ট সংস্করণ॥নূরুল আমিন চৌধুরী  |  ০২:২১, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯

সমগ্র সৃষ্টি জগৎ মহান আল্লাহর চূড়ান্ত কৌশলের অধীনে একটা বিস্ময়কর নিয়ম শৃঙ্খলার মাধ্যমে আবর্তিত হচ্ছে। আর এই নিয়ম শৃঙ্খলাটা বজায় থাকে আল্লাহর কুদরতি একটা নির্দিষ্ট সীমবদ্ধতার মধ্যে। সৃষ্টি রহস্যের দুটো দিক আছে। একটা লৌকিক বা জাগতিক, অন্যটা পরলৌকিক বা পরজাগতিক। একটা দৃশ্যমান অন্যটা অদৃশ্যমান। একটা অস্থায়ী, অন্যটা স্থায়ী।

তবে লৌকিক, জাগতিক বা দৃশ্যমান কোনো কিছু স্থায়ী নয়। বিশেষ করে একজন মানুষের জাগতিক জীবন। মানুষের জীবন শুধু অস্থায়ীই নয়, ক্ষণস্থায়ীও বটে। একটা মানুষ জন্মগ্রহণ করে একটা সুনির্দিষ্ট সময়ে। অর্থাৎ মার গর্ভে সঞ্চারিত হবার পর থেকে সাধারণ হিসেব মতে দশ মাস দশ দিন অতিবাহিত করার পরই সে ভূমিষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু ভূমিষ্ট হবার পর কতদিন সে তার ভঙ্গুর, নশ্বর দেহ নিয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করবে এর কোনো তথ্যই কেউ জানতে পারার কোনো উপায় নেই। এটা একেবারেই অনিশ্চিত একটা বিষয় যে, কখন, কোথায় কীভাবে একজন মানুষ তার অস্থায়ী জীবনের পাট চুকিয়ে অস্থায়ী জগৎ থেকে বিদায় নেবে।

বিজ্ঞানী নিউটনের মধ্যাকর্ষণ শক্তি বলে আপেল গাছ থেকে একটি আপেল বোঁটাচ্যুত হয়ে ওপরে না শূন্যের দিকে না গিয়ে সোজা ভ-ূতলে পতিত হয়, ঠিক একই প্রক্রিয়ায় একটা মানব শিশু মার গর্ভধারণ থেকে ভূ-তলে ভূমিষ্ট হয়। মার গর্ভাধান থেকে একটা শিশু অতি পূত-পবিত্র ও নিষ্পাপ হয়েই জগতের আলো-বাতাসে আবির্ভূত হয়। কালক্রমে এই নিষ্পাপ অসহায় শিশুটাই বয়ষ্কালে হয়তো সাধু-সন্যাসী, খোদাভীরু ও জীবজগতের হিতসাধনকারী নিঃস্বার্থ ব্যক্তি হিসেবে আভির্ভূত হবে এবং জীবন ও জগৎকে ধন্য করবে।

অথবা নানা-বিধ দুষ্কর্ম সাধন করে দুর্দান্ত প্রতাপশালী হয়ে সমাজ জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলবে। নিজেও অধপতিত হবে এবং সমাজকেও অধিপতিত করে ছাড়বে। মহান আল্লাহর অসীম কুদরতে মানুষ মার গর্ভ থেকে পতিত হয় নিষ্পাপ অসহায় হিসেবে, আর সেই মানুষটাই একসময় যাবতীয় দুষ্কর্মের মধ্য দিয়ে অধপতনের শেষ সীমায় উপনীত হয় আর সমাজ, দেশ ও জাতিকে নিয়ে যায় অধোপাতের দিকে।

এসব দুষ্কৃতিকারীদের প্রভাব দাপটে জনজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। এটা আদিকাল থেকেই এভাবে চলে এসেছে। এসব দুষ্কৃতিকারীদের প্রভাবে, সান্নিধ্যে ও দেখাদেখি অন্যরাও অধপতনের পথে ধাবিত হতে থাকে। এদেরকে ঠেকানোর জন্য যুগে যুগে মহান আল্লাহ অগণিত নবী রাসূল প্রেরণ করেছেন। কিন্তু তাদের অবাধ্যতা ও দাম্ভিকতার কাছে সকল নবী রাসূলই নাকাল হয়েছিলেন এবং অতপর ঐসব জনপদে খোদায়ী গজব নাজিল হয়ে নবী রাসূলগণ ও তাদের অনুগত। সামান্য কিছু ব্যক্তিব্যতীত সমগ্র জনপদই ধ্বংপ্রাপ্ত হয়েছিল।

এর বহু উদাহরণ শুধু বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থই নয়, বহুপ্রাচীন ইতিহাসের বর্ণিত আছে। এসব জানার পরও মানুষ অধপতনের পথে ধাবিত হয়। এসবতো সংঘটিত হয়েছিল যেসব সমাজে খোদা অস্বীকারকারী খোদাদ্রোহী মানুষ চরম সীমা লঙ্ঘনকারীতে পরিণত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নবী রাসূল প্রেরণের ধারাবাহিকতার শেষ পর্যায়ে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন বর্বর আরব সমাজে আবির্ভূত হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহম্মদ (সা.)। কঠোর সাধনা-তপস্যার পর চল্লিশ বছর বয়ঃক্রমে মহান আল্লাহ ফেরেস্তা জিব্রাইল (আ.) এর মাধ্যমে পবিত্র কুরআন অবতরণের প্রারম্ভকালেই তাকে নবুয়ত ও রিসলাত দান করে কেবল মানব জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবেই নয় সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ রাহমাতাল্লি আলামীন বলে ঘোষণা করেছেন।

পবিত্র মক্কায় জন্মগ্রহণকারী রাসূল (সা.) নিজ জন্মস্থানে স্বগোত্রীয়দের দ্বারা, যারা একসময়ে তার ন্যায় নিষ্ঠা, সততা ও পরহিতের জন্য তাকে আলআমীন বলে সম্মানিত করেছিল, কিন্তু নিজেরা দুষ্কর্মে নিয়োজিত ছিলো তাদেরকে ভালো হয়ে যাওয়ার আহ্বান করায় তারা তাকে শারীরিক নির্যাতনসহ মেরে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এমতাবস্থায় মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি জন্মভূমি মক্কা থেকে তিনশত মাইল দূরের ইয়াসরিব নামকস্থানে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হন। পরও ইয়াসরিবের বর্বরতার অন্ত ছিলো না।

তবুও তিনি সেখানে তার অনুগত লোকজন ও পরিবার নিয়ে নিরাপদে বসবাস করার সুযোগ পান। অবশেষে তার সততা, নিষ্ঠা ও একান্ত প্রচেষ্টায় তিনি সেখানে লোকদের অন্তর জয় করতে সক্ষম হন। তাই তারই সস্থানার্থে সেখানকার লোকেরাই ওই স্থানটিক মদিনা বা নবীর শহর হিসেবে নামকরণ করে। তার অনুপম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও আল্লাহর কৃপায় মদিনার মানুষদের মধ্যে শান্তি সাম্য ও ন্যায়ের অনুভব জাগ্রত করে একটা সুষম সরকার ব্যবস্থা চালু করেন এবং ভারসাম্যপূর্ণ সরকার ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন যেটা বিখ্যাত মদিনা সনদ নামে খ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত হয়।

দীর্ঘ তের বছর মদিনায় নবুয়তী জীবন যাপনকালের অধিকাংশ সময়ই তাকে খোদাদ্রোহীদের অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহ মোকাবিলা করতে হয়েছিল। নবুয়তীর এয়োদশ বছরে- এর জীবনের শেষ হজ্জ বা বিদায় হজ্জ উপলক্ষে তিনি মক্কা বিজয়ে সমার্থ এবং হজ্জ উপলক্ষে উপস্থিত অগণিত হাজীদের উদ্দেশ্যে জাবালে রহমতে দাঁড়িয়ে সমগ্র মানবজাতির প্রতি তার জীবনের শেষ ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন :- (১). মহান আল্লাহ তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন। (২). আমার পরে আর কোনো নবী বা রাসূল জগতে আবির্ভূত হবে না। (৩). পবিত্র কুরআন হলো মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। (৪). তোমরা পরস্পরে হানাহানিতে লিপ্ত হবে না। (৫). অন্যের সম্পদ ও এতিমদের হক নাহক করবে না। (৬). সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকবো। (৭). সুদ, ঘুষ, জুয়া, মদ্যপান নিদ্ধি করা হলো। (৮) অধীনস্থদের বা অন্যদের অহেতুক কষ্ট দেবে না। (৯). তোমরা যা খাবে ও পরবে, তোমাদের দাস-দাসীদের ও তা-ই খেতে ও পরতে দেবে। ইত্যাদি...।

মক্কা মদিনা ছাড়িয়ে পৃথিবীর নানান দেশে মুসলিম সমাজ গড়ে উঠেছে। তন্মধ্যে আমাদের এই বাংলাদেশ অন্যতম। লাখ লাখ শহীদ ও মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে মুসলমান নামধারী পশ্চিম পাকিস্তানিদের অনৈসলামিক রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা ভয়াবহ অসম মুক্তিযুদ্ধের পর যে স্বাধীন দেশটা আমরা পেয়েছি, তার ৪৮ বছরের পর একটা স্বাধীন মুসলিম দেশ হিসেবে আজ আমরা এত অগ্রগতি অর্জনের পরও কেন নৈতিকতার এমন অধপতনে পতিত হলাম? এর জন্য দায়ি কে বা কারা?

অবাধ তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে দেশ বিদেশের পত্র পত্রিকায় ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় মাত্র কয়েকদিনে যে সব সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, এতে কি প্রতীয়মান হয় এদেশে কোনো ধর্ম আছে? ঘুষ, দুর্নীত, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জুয়া, কালোবাজারি, মজুতদারীসহ যাবতীয় ভোগ্য পণ্যে বিষমিশ্রণ এসব কারা করছে? রাজনীতি, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ, নেতা, পাতি নেতা, ব্যবসা, বাণিজ্য, শিক্ষা সর্বস্তরে যে হারে অধঃপতনের মাত্রা বেড়ে চলছে, যেভাবে পরিবেশগত বৈরিতা আমাদের চারপাশ গ্রাস করেছে, তাতে অনিবার্য ধ্বংস থেকে আমাদের বাঁচার কি কোনো উপায় আছে?

ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা যদি শতভাগ কার্যকর ও সফল করে তোলার ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তা হলে জাতি হিসেবে আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। মৃত্যুকে উপেক্ষা করে, আল্লাহর ওয়াস্তে শেখ হাসিনার কঠোর পদক্ষেপই এদেশ ও জাতিকে ধ্বংস থেকে উদ্ধার করতে পারে। হে আল্লাহ! আমাদের প্রতি রহম করুন।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত