শিরোনাম

ক্যাসিনো ও চুনোপুটি সমাচার

কাকন রেজা  |  ১৭:২১, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কে উদ্ধৃত করে ব্রাত্য রাইসু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকটা এভাবে বললেন, ‘লুটপাট যারা করছেন, তাদের যখন নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে তখন অপেক্ষাকৃত চুনোপুটিদের লুটপাট বন্ধেরও ব্যবস্থা হবে।’ মন্তব্যের শেষে নিজে প্রশ্ন রাখলেন, ‘ছোট লুটপাটিয়াদের আসলেই কি টাইম শেষ?’ এমন সময়ে রাইসু’র এই মন্তব্য অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে।

সারাদেশে ‘ক্যাসিনো কান্ড’ নিয়ে হাউকাউ চলছে। ‘ক্যাসিনো’ হলো জুয়ার আধুনিকিকরণ বা আধুনিক নাম। আমরা যারা ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাসিন্দা, তারা জানি আমাদের এই অঞ্চলের জন্যই বৃটিশরা জুয়া নিয়ে নতুন আইন করেছিলেন। এর আগে জুয়া অপরাধ হিসাবে তেমনভাবে গণ্য হতো না। বৃটিশরা এটাকে গণ্য করলেও, গুরুতর হিসাবে আখ্যা দেয়নি। ফলে জুয়ার জেল-জরিমানাও করা হয় সামান্য। বৃটিশ সেই আইনের কতটা পরিবর্তন হয়েছে তা আইনজ্ঞরা বলতে পারবেন।

তবে এ সময়েও জুয়া গুরুতর অপরাধ হিসাবে গণ্য নয়। কিছু জেল-জরিমানা ছাড়া জুয়া বিষয়ে আর কোন শাস্তির কথা আপাতত জানা নেই। আর জুয়ার ব্যবস্থাপনা আর জুয়া খেলা এ দুয়ের মধ্যে আইন কতটা পার্থক্য করেছে তাও স্পষ্ট নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে খেলা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই।

এ অর্থে ব্রাত্য রাইসুর কথা অনেকটাই ঠিক। জুয়া হলো অপরাধের জগতে চুনোপুটি। জুয়া কারা খেলে, ক্যাসিনোতে কারা যায় এই প্রশ্নটা ক্যাসিনো ও তার ব্যবস্থাপনার চেয়ে জরুরি। ক্যাসিনো কান্ডে যা বেড়িয়ে এসেছে তা থেকে ঠাহর করা যায় যে, এখানে যারা খেলতে আসতেন তারা সবাই রাঘব-বোয়াল শ্রেণির। রাজনীতি, আমলা আর ব্যবসায়ীরা হলেন এই শ্রেণিগত। সাথে অন্য পেশারও কিছু রয়েছেন। আছেন হাতেগোনা কিছু সাংবাদিকও। আর এদের উপার্জনের পথটা সাদা নয় কালো। যার ফলেই টাকার প্রতি মায়া কম। ঘাম ঝরানো টাকা হলে উড়াতে মায়া লাগতো। আর এমন টাকার মালিকদের হিসাব নেয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

জুয়া মূলত উপসর্গ। জ্বর যেমন বড় রোগের উপর্সগ, তেমনি। রোগ যখন বাড়ে তখন জ্বর দেখা দেয় উপর্সগ হয়ে। ক্যাসিনোটাও তেমনি। এটা স্রেফ দৃশ্যমানতা। সামাজিক শৃংখলা যে ভেঙে পড়েছে এটা অনেকদিন থেকেই বলে আসছেন অনেকে। আর সামাজিক শৃংখলার ব্যাপারটি রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রযন্ত্র ক্রমে বিকল হয়ে উঠলে তার প্রভাব পড়ে সমাজের উপর। সঙ্গতই তখন সামাজিক শৃংখলা ভেঙে পড়ে। ‘ক্যাসিনো’ হলো সেই ভেঙে পড়ার দৃশ্যচিত্র।

সমাজে এখন দুর্নীতি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিআইবি বলছে, ‘দেশের ৮৯ ভাগ মানুষ ঘুষ ছাড়া সেবা পান না।’ সাথে আরো বলছে, ‘তারা স্বাভাবিকভাবেই ঘুষ দেন।’ অর্থাৎ মানুষ বুঝে গেছে ঘুষ ছাড়া কাজ হবে না। এমন ধারণা বা ভাবনার ব্যাপারটা তখনই আসে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই শিথিল হয়ে উঠে। চারদিকের লুটপাট চিত্র তারই প্রমাণ। বালিশকাণ্ড, পর্দাকাণ্ড, ভিসিকাণ্ডসহ নানা কাণ্ডে এমনসবই দৃশ্যমান। দুই প্রকৌশলীকেই যদি দেড় হাজার কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়, তবে এই ‘টায়ার’টার উপরের অবস্থা কী! প্রশ্নটা সেখানেই।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী মালোয়েশিয়ায় চার হাজার বাংলাদেশি ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়েছেন। কানাডা, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়াতেও একই অবস্থা। বারবার শুনছি, দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে লক্ষ কোটি টাকা। সেকেন্ড হোম হয়তো সেই টাকারই দৃশ্যমান অবয়ব। ক্যাসিনো’র দুই-চার-দশ কোটিতো এসবেরই উপসর্গ। হাজার কোটির মালিকদের এটাও এক ধরণের অ্যাডভেঞ্চার।

উপসর্গ দূর করা মানে তো ‘প্যারাসিটামল’ চিকিৎসা। সমাজ যেভাবে আক্রান্ত তার জন্য প্রয়োজন ‘কেমোথেরাপি’। এই থেরাপিতে হয়তো সমাজের অনেক কোষই ধ্বংস হবে, কিন্তু সমাজটাতো বাঁচবে। জ্বর কমানোর জন্য শুধু ‘প্যারাসিটামল’ চিকিৎসা ভবিষ্যত সামাজিক মৃত্যুর নিশ্চিন্ত নামান্তর।

পুনশ্চ : ব্রাত্য রাইসুর ভাবনায় ‘চুনোপুটিদের টাইম শেষ’ যদি বড়দের রক্ষায় হয় তবেই মুশকিল।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত