শিরোনাম

কন্যাশিশুর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রিন্ট সংস্করণ॥অলোক আচার্য  |  ১০:৪৩, অক্টোবর ০৩, ২০১৯

কন্যা সন্তান বা ছেলে সন্তান জন্ম দেওয়া একজন মায়ের বা বাবার ইচ্ছাকৃত কোনো বিষয় নয়। কিন্তু অবাক বিষয় হচ্ছে এই নারীদেরকেই কন্যাশিশু জন্ম দেওয়ার কারণে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়। অতীতকাল থেকেই এটা আমাদের সামজে দোষারূপ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা আমাদের জন্য বড় ধরনের দুর্ভাগ্য।

আজ আমরা যারা শিক্ষিত, যারা প্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছি তাদের তো একটাই কথা- ছেলে হোক মেয়ে হোক সে তো একই কথা। যেখানে প্রতি পদক্ষেপে তাকে মোকাবিলা করতে হবে বাধা বিপত্তি। একটু বড় হলেই রাস্তাঘাটগুলো তার একাকী চলার জন্য ক্রমেই বিপদ সংকুল হয়ে উঠে।

রাস্তায় লুকিয়ে থাকে মুখোশ পরা হিংস্র মানুষের বিপদ। এরকম পশু সম মানুষ দিয়ে আমাদের সমাজটা ভরে উঠছে। ছেলেকে যেমন মানুষ করার শিক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে বাবা মা বড় করে মেয়েকেও ঠিক একই চিন্তা ভাবনায়- মানে মানুষ করার চিন্তা ভাবনায় বড় করা উচিত। ছেলে বা মেয়ে না বরং সন্তান মানুষ করা, তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাই বড় কথা।

কিন্তু আমাদের সমাজে প্রচলিত বিশ্বাসে ছেলে বড় হলে চাকরি করবে আর মেয়ে বড় হলে বিয়ে দিয়ে শ্বশুড়বাড়ি পাঠাতে হবে এই চিন্তা চেতনা থেকে কি আজও আমরা বের হতে পেরেছি। আমাদের উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে যদিও ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক পরিবারেই বিয়ে দিয়ে দেওয়াই যেন মেয়ের চূড়ান্ত পরিণতি একথা জন্মের পর থেকেই মনে মনে ঠিক করে রাখা হয়।

এই অবস্থারও পরিবর্তন ঘটছে কিন্তু তা খুব ধীর গতিতে। একসময় ছেলে আর মেয়েতে ছিলো বিস্তর বিভেদ। অনেক পরিবারে মেয়ে জন্ম হলে যেন পরিবারে আনন্দিত হবার বদলে কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা যেত। কন্যাশিশু জন্ম হওয়াতে পরিবারের সবার কপালে এই ভাঁজ পরতো। মেয়েদের ক্ষেত্রে ছিলো পদে পদে নিষেধাজ্ঞা। তাদের পৃথিবী ছিলো ছোট। মেয়েদের এটা করা যাবে না ওটা করা যাবে না। এখানে মেয়েদের থাকা ঠিক না বা মেয়েরা এ কাজ করতে পারে না। তাদেরকে নানাভাবে ছোট করা হয়েছে, বানানো হয়েছে পুতুল। কত শত নিয়মের বেড়াজালে ছিলো বন্দি ছিলো মেয়েদের জীবন।

মেয়েদের ঘরের বাইরে বের হওয়াই ছিলো প্রায় নিষেধ। একটা সময় ছিলো না লেখাপড়া করার মত সুযোগ ছিলো কম। সে অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে বেগম রোকেয়া কামালের মত মহিয়সী নারীরা এগিয়ে এসেছেন। তারা দেখিয়েছেন পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও সমান অবদান রাখতে পারে। আজ যোগ্যতার সাথে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা বিশ্ব রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে সমান ভূমিকা পালন করে চলেছে। পিছিয়ে নেই কোনো ক্ষেত্রেই। মেয়েরা লিখছে, পড়ছে এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। এবছর তো এইচএসসিতে ছেলেদের থেকে মেয়েদের পাশের হার বেশী। শুধু এ বছর নয়। বরং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে। সমরক্ষেত্রে যুদ্ধ বিমান নিয়ে শত্রুর দিকে উড়ে চলেছে নারীরা। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি অবদান রেখে চলছে না। প্রযুক্তির উৎকর্ষে পৃথিবী এগিয়েছে।

সেই সাথে এগিয়েছে মানুষের ধ্যান ধারণা চিন্তা চেতনা। চেতনার উৎকর্ষে আজ নারী পুরুষের বিভেদ, হিনমন্যতা সমাজ থেকে কমছে। কিন্তু আজও আমরা পারিনি সমাজ থেকে ছেলে মেয়ের সমান অধিকার সমভাবে নিশ্চিত করতে। পারিনি কন্যাশিশুদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে। আজও সমাজের অনেক জায়গায় কন্যা শিশু জন্ম নেওয়ার কারণে স্ত্রীকে লাঞ্চনার শিকার হতে হয়। আজও কন্যা শিশু জন্ম নিলে অনেকে হীন মানসিকতায় ভোগে। এটা আমাদের অনেকের হীন মানসিকতার ব্যাপার। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে ৩০ তারিখে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আজকের কন্যা শিশু এরা একটা শক্তি যাদের বাদ দিয়ে কোনো ক্ষেত্রেই সফলতা আসবে না। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে নারী পুরুষ সমানভাবে অবদান রাখা জরুরি।

আমাদের সমাজের কন্যা শিশুর সব থেকে বড় বাধা হলো বাল্য বিয়ে। আমাদের শহরের অবস্থা কিছুটা পাল্টালেও গ্রামের চিত্র কিন্তু ভালো নয়। গ্রামের মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখা যায় ক্লাস সেভেন, এইট থেকেই বিয়ে দেবার তোড়জোড় শুরু করে অভিভাবকরা। এসব অভিভাবকদের বেশীর ভাগই কিন্তু নিরক্ষর বা অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন। বাল্য বিয়ে আজও আমাদের দেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় একটি বাধা। কেবল আমাদের দেশেই নয় অনেক উন্নয়নশীল দেশেরই সমস্যা বাল্য বিয়ে। বাল্য বিয়ে আমাদের উন্নয়নের গতি তরান্বিত ব্যাহত করছে। বাল্য বিয়ে একজন কন্যা শিশুর অধিকার ও সুযোগকেই হরণ করে না বরং তার নারী হয়ে উঠার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করে। আমাদের মত অনেক দেশেই কন্যা শিশু ভ্রুণ অবস্থাতেই ঘৃণার শিকার হয়। পার্শ্ববর্তী ভারতে নিষিদ্ধ হলেও কন্যা শিশুর ভ্রুণ হত্যার হার অনেক বেশি।

এর সাথে জড়িত যেমন কিছু অসাধু ডাক্তার তেমনি সেই ভ্রুণের অধিকারি মা ও তার পরিবার রয়েছে। সেখানে এমন অনেক রাজ্যই রয়েছে যেখানে বিয়ের উপযুক্ত পাত্রীর সংখ্যা হাতে গোণা। অন্য রাজ্য থেকে রীতিমত দালাল ধরে মেয়ে আনতে হয়। এটা প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মেয়েদের বোঝা হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা আজও তারা ত্যাগ করতে পারেনি।

ফলে অনেক মেধাবী কন্যা শিশুকেই অসময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে মেধা বিকাশের সুযোগটাই হত্যা করা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই আবার পঞ্চম শ্রেণির মেয়েটিকের বিয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরিবার থেকে জোর করেই এটা করতে বাধ্য করতে হচ্ছে। এটাই আমাদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ। কারণ যেসব শিশুদের এইভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে তাদের পরিবার থেকে মানসিক চাপ থাকে বিয়ে করার জন্য।

এসব হচ্ছেও কিন্তু নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে। মেয়ে জন্ম নেওয়ার পর থেকে বিয়ে দেওয়াটাই যেন তাদে লক্ষ্য। কিন্তু ওরাও যে একদিন বড় হয়ে ছেলেদের পাশাপাশি পরিবারের হাল ধরবে এ কথা যেন মাথাতেই থাকে না বা বিশ্বাস করতে চায় না। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে কন্যা শিশু ও নারীদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। যে কোন মূল্যেই বাল্য বিয়ে রোধ করতে হবে। এটা শুধু কর্তৃপক্ষ নয় বরং তাদের পাশাপাশি শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবকসহ প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে।

অভিভাবকদের তার কন্যা শিশুকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রত্যয় নিয়ে বড় করতে হয়। তাদের ছেলে সন্তান থেকে আলাদা নয়, বোঝা নয় বরং মানুষ করার, সুশিক্ষিত করার প্রত্যয় ধারণ করতে হবে। দেশের উন্নয়ন করতে হলে নারীর উন্নয়ন আবশ্যক আর আজকের কন্যা শিশু আগামী দিনে একজন প্রতিষ্ঠিত মহিয়সী নারী।

দেশ উন্নয়ন করতে হলে কন্যা শিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর কোনো বিকল্প নেই। সেটা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। কারণ নিজে না বদলালে অন্যকে বদলানোর উপদেশ দিতে নেই। একটি পরিবারে সেক্ষেত্রে মা বাবার দায়িত্বই সর্বাধিক। পরিবারের অন্য সদস্যদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রক্ষা করার জন্য তাকে বেড়ে ওঠার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রথমে মা বাবাকেই এগিয়ে আসতে হবে। সম সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : শিক্ষক-সাংবদিক ও কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত