শিরোনাম

জানার কোনো শেষ নাই

প্রিন্ট সংস্করণ॥সাদিক সাকলায়েন   |  ০৭:৪৫, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

শিক্ষা পাওয়া বা শিক্ষা হওয়া ছাড়া আরেকটি জিনিস আছে, সেটিকে বলে শিক্ষা অর্জন করা। শিক্ষা অর্জনের জন্য প্রথাগত পদ্ধতি রয়েছে, দেওয়ার জন্য রয়েছে নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান। তবে জ্ঞান আর শিক্ষা অর্জনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জ্ঞান ও শিক্ষার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায়- কিন্তু জ্ঞান বাস্তব অভিজ্ঞতা নির্ভর। অর্থাৎ জ্ঞান হলো উপলব্ধি করা, জানা। যদিও দুটোর মধ্যে শুধু পার্থক্যই নয়, সম্পর্কও রয়েছে। যে যত বেশি শিক্ষা অর্জন করবে (শিক্ষিত হবে) সে তত বেশী জানবে।

আর জানা জিনিসগুলো কেউ চর্চার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে সে-ই কেবল জ্ঞানসম্পন্ন বা জ্ঞানী। আমাদের দেশে শিক্ষা গ্রহণের মোটামুটি চারটি ধাপ রয়েছে- প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। এরমধ্যে স্কুল কলেজগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানো হয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাথায় পাঠ্যবইয়ের আলোকে শিক্ষা বিতরণের নামে গতানুগতিক বিদ্যা সেঁটিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এগুলোর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রতিষ্ঠান। এখানে শিক্ষা বিতরণের চেয়ে জ্ঞান সৃষ্টির বিষয়টি প্রাধান্য পায়।

অর্থাৎ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী যা শিখে আসে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে নিজেকে নতুন একটি অবস্থানে নিয়ে যাবে। এক সময় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিলো জ্ঞান সৃষ্টির কারখানা। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, এগুলো মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে ততই সরে আসছে। সামপ্রতিক সময়ে কিছু বিষয় পার্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা যাক। এখানকার উপাচার্য (ভিসি) নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজনকে ভর্তি করিয়েছিলেন; যারা পরে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদে নির্বাচিত হন (যে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে)।

এ বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে, তবে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। এরপর আসা যাক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথায়। এখানেও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে অর্থ বিনিময়ের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যের বিরুদ্ধে। এজন্য সেখানকার শিক্ষক শিক্ষার্থীরা মিলে আন্দোলন করেছেন ভিসির পদত্যাগের জন্য। আর ভিসি অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করছেন, বলেছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাকে এবং তার পরিবারকে হেয় করতে এসব প্রচারণা চালানো হয়েছে। তবে প্রকৃত ঘটনা যা-ই হোক, একজন উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠাটাই লজ্জাজনক।

আরেকটি ঘটনা গোপালগঞ্জে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বাবিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি)। সেখানে এক ছাত্রীকে বহিস্কার করা হয় যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ ছাড়াই। ওই ছাত্রীর ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাস নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। ছাত্রীটি জানতে চেয়েছিল- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী’। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে যান উপাচার্য। তিনি চান না কেউ কোনো প্রশ্ন করুক, কিছু জানুক। তাই ভিত্তিহীন কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ছাত্রীকে বহিষ্কার করা হলো (সমালোচনার মুখে ছাত্রীটির বহিষ্কারাদেশ পরে প্রত্যাহার করা হয়)। ছাত্রীর সঙ্গে কথপোকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়িয়ে পড়লে শোনা যায় ভিসির ‘কুরুচিপূর্ণ’ এবং অপমানজনক কথাবার্তা। তিনি ওই ছাত্রীকে যাচ্ছেতাই বলার পাশাপাশি তার বাবাকে নিয়েও কটু কথা বলেন।

এছাড়া তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ বেয়াদব তৈরি করা!’ শিক্ষকরা বরাবরই সমাজের সম্মানের স্থানে আসীন। তাদেরকে সমাজ গড়ার কারিগর বলা হয়ে থাকে। শিক্ষকদের মর্যাদা দেওয়ার প্রধান কারণ মনে হয় এটিই। কিন্তু শুধু শিক্ষকই কেন, শিক্ষার্থীদের সম্মান নেই? আমেরিকান সাহিত্যিক রালফ ওয়াল্ডো এমারসনের মতে, The secret of education lies in respecting the pupil. It is not for you to choose what he shall know, what he shall do. শিক্ষকরা সম্মান পেলেও শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিচ্ছেন না।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। দলবাজি, ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, দুর্নীতি, ছুটি নিয়ে বছরের পর বছর বিদেশে গিয়ে থাকা এমনকি চৌর্যবৃত্তিরও অভিযোগ ওঠে। অন্য কারো গবেষণাপত্র নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো অনৈতিক ও গর্হিত কাজ করতে পিছপা হন না। এই শিক্ষকরাও এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

তারা কী শিখে এসেছেন আর এখন শিক্ষার্থীদের কী শেখাচ্ছেন? শিক্ষার্থীরা কী জানতে চাইছে আর তারা কী জানাচ্ছেন? আজকে যিনি শিক্ষার্থী, তিনিই আগামী দিনের শিক্ষক বা উপাচার্য। শিক্ষার্থীরা কী শিখবে তা একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করবে না, বরং শিক্ষার্থীর ইচ্ছা অনুযায়ী জ্ঞান আহরণে সহায়তা করবে। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। পছন্দের বিভাগে ভর্তি হয়ে সিলেবাস নামে নির্দিষ্ট একটি গন্ডিতে শিক্ষার্থীদরে আটকে থাকছে।

তাদের শেখানো হচ্ছে, পাশ করে বের হও, চাকরি নাও। একারণে লাইব্রেরিগুলোতে গিয়ে দেখা যায় পাঠকের অভাব নেই, অসংখ্য ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে, কিন্তু জ্ঞানচর্চা নয়। শিল্প সাহিত্য, নিরীক্ষা নয়, বিসিএস’র জন্য গাইড বই মুখস্ত করছে। কথা হচ্ছে, তথ্য প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে তথ্য ধারণের জন্য বিশাল বিশাল হাউস রয়েছে। মাথার মধ্যে তথ্য রেখে লাভ নেই- যদি না সেগুলো জ্ঞান সৃষ্টিতে কোনো কাজে লাগে।

বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় পরিচালিত একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘হীরক রাজার দেশে’। রূপকের আশ্রয় নিয়ে চলচ্চিত্রটিতে কিছু ধ্রুব সত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর একটি বিশেষ দিক হচ্ছে মূল শিল্পীদের সকল সংলাপ ছড়ার আকারে করা হয়েছে। তবে কেবল একটি চরিত্র ছড়ার ভাষায় কথা বলেন না। তিনি হলেন শিক্ষক। এ দ্বারা বোঝানো হয়েছে একমাত্র শিক্ষক মুক্ত চিন্তার অধিকারী, বাদ বাকি সবার চিন্তাই নির্দিষ্ট পরিসরে আবদ্ধ।

কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যাচ্ছে উল্টো অবস্থা। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আছেন যাদের কথা উল্লেখ করলে এ লেখার কলেবর দীর্ঘ হয়ে যাবে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন যারা মুক্ত চিন্তা, মুক্ত বুদ্ধির বদলে সংকীর্ণতার চর্চা করেন। সামাজিক অবস্থানের কথা বাদই দিলাম, তারা আত্মসম্মান বোধটুকু রাখেন না। তারা ভুলে যান, মুক্ত চিন্তার মাধ্যমে, গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উন্নত, বিবেক ও মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষিত নয়, জ্ঞানী ‘উৎপাদন’ করতে হবে। হীরক রাজার দেশে চলচিত্রেই ‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালণ যন্ত্র’ নামে একটা যন্ত্র আছে যার ভেতরে ঢুকিয়ে ‘মগজ ধোলাই’ করা যায়। মগজ ধোলাইয়ের মন্ত্র সাধারণ মানুষের মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিলে এটি আওড়াতে থাকে এবং এই বদ্ধমূল ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। এমন একটি মন্ত্র হলো ‘জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।’ এজন্যই হয়তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বাবিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য ক্ষেপে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী সেটি জানতে চাওয়ায়। জানা যাবে না। শিক্ষিত হও, জ্ঞানী নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত