শিরোনাম

যদি মৃত্যু না হতো ...!

প্রিন্ট সংস্করণ॥অধ্যক্ষ নূরুল আমিন চৌধুরী   |  ০৮:২৯, অক্টোবর ১১, ২০১৯

জন্ম গ্রহণ মানেই মৃত্যু অবধারিত। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো ব্যবস্থাও নেই- এমনকি কোনো উপায়ও নেই। নবী সুলায়মান (আ.) ছিলেন সমগ্র পৃথিবীর বাদশাহ। বায়ু পর্যন্ত তার আওতাধীন ছিলো। কথিত আছে যে, একদা এক ব্যক্তি সুলায়মান (আ.) এর নিকট নিবেদন করলো যে, তিনি যেখানেই যায়, ভীষণ মূর্তি ধারণকারী কেউ একজন তাকে অনুসরণ করে। ভীষণ মূর্তি ধারণকারী ব্যক্তিটি তার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকায় যে তা দেখে তার হূৎকম্পন শুরু হয়ে যায়।

নবী সুলায়মান (আ.) বললেন, তোমার জন্যে আমি কী করতে পারি? লোকটি বললো, বাতাস আপনার আওতাধীন। তাকে হুকুম করুন সে যেন আমাকে সুদূর চীন দেশে পৌঁছে দেয়। নবী বললেন ‘তাই হবে’। নবীর আদেশে বাতাস তাকে চক্ষের নিমিষে চীন দেশে পৌঁছে দিলো। ওখানে পৌঁছা মাত্রই লোকটি দেখতে পেলো ঐ ভীষণ মূর্তি ধারণকারী ব্যক্তিটি সেখানেও উপস্থিত এবং তার দিকে আগের চেয়েও ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লোকটি একটু সাহস সঞ্চয় করে ভয়ে ভয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো- তুমি কে ভাই? তোমার ভয়ে আমি এখানে পালিয়ে এসেছি।

আর এখানে এসেও দেখি তুমিও এখানে। তোমার উদ্দেশ্য কী জানতে পারি? ভীষণ মূর্তি ধারণকারী ব্যক্তিটি বললো, আমি মালাকুল মউত। লোকটি বললো, তুমি আমাকে কেন এভাবে অনুসরণ করছো? জবাবে ব্যক্তিটি বললো, আমি তোমার জান কবচ করবো। লোকটি বললো, সেটাতো তুমি ওখানেও করতে পারতে। তখন তিনি বললেন- পারতাম।

কিন্তু তোমার মৃত্যু এখানেই এবং এই সময়ে নির্ধারিত। -হায়! এটার ভয়ে আমি এখানে পালিয়ে আসলাম... -মৃত্যু থেকে কেউ পালাতে পারেনা। আর যে মুহূর্তে যেখানে যার মৃত্যু নির্ধারিত সেহেতু সেখানেই সেটা কার্যকর হয়। এটাই নিয়তি। অবিশ্বাসী ও দুর্ভাগা যারা, তারা এই উপমাটাকে কাল্পনিক বলে নাকচ করে দিলেও এটাতো অনিবার্য সত্য যে, মৃত্যু এক অমোঘ পরিণতি।

তবে একমাত্র মৃত্যুই জীবনের পরিসমাপ্তি নয়। বিশ্বাসীরা এটা স্বীকার করে যে- মৃত্যুর পর দেহকে কবরস্থ করা হোক বা দাহ করা হোক বা পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হোক ওই একই দেহ নিয়ে সবাইকে এক নির্দিষ্ট দিনে পুনর্জীবিত হয়ে শেষ বিচারের লক্ষে হাসর ময়দানে দণ্ডায়মান হতে হবে। সেদিন কারো প্রতি কেউ তাকাবার সুযোগ পাবে না।

কম্পিত হূদয়ে ভাববে, হায়! আজকের এ দিনের কথাটা জেনেও আমরা এর প্রতি গুরুত্ব দিতাম না। আজ যে ভালো মন্দ, নেক- বদের হিসাব নেওয়া হবে। মন্দ ও বদ কর্মের পরিমাণ বেশি হলে নির্ঘাত মহা অগ্নিকুণ্ড সম্পন্ন জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। আর যারা ভালো ও নেক কর্ম করেছিলো তারা চির শান্তির জান্নাতে প্রবেশ করবে। বদ কর্ম করা লোকরা এসব ভেবে অস্থির ও পেরেশান হয়ে পড়বে।

মৃত্যুর হাত থেকে যেমন কেউ রেহাই পাবে না, আল্লাহর ক্রোধ থেকেও সেদিন বদ লোকেরা কেউই রেহাই পাবেনা। এটাই পরম সত্য। তাহলে এসব জেনেও কেন মানুষ বদ কর্ম করে? কেন মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, হত্যা, সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, কালোবাজারি, মজুদদারী, খাদ্যে ভেজাল মেশানোসহ শত অপরাধ কর্ম করে বিত্ত-বৈভব অর্জন করতে এতো তৎপর হয়? আইন কানুনের ধার ধারেনা। পরকাল দূরে থাক, জাগতিক শাস্তিও অপদস্থতারও তোয়াক্কা করেনা। লোভের কারণে মানুষ লজ্জা শরমেরও পরোয়া করেনা। মানুষ সে শুধু নিজের জন্যে এসব করে তা কিন্তু নয়।

এসব করে তার নিজের, পরিবার, পরিজন, সন্তান সন্ততির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সুখ শান্তির জন্য। অথচ সে একটুও ভাবেনা যে, যাদের জন্যে সে এসব অপকর্ম করে তারা কিন্তু এতে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। ওপর দিয়ে দেখালেও তারা কেউই ভেতরে ভেতরে তাকে সত্যিকারে ভালোও বাসেনা এবং এতে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্টও হতে পারে না। তারা জানে সে একজন চোর, মন্দ লোক। পরজগতের বিচার দিনেও তারা কেউই তার এসব পাপের ভাগীদার হতে চাইবেনা।

এসব অপরাধ, অপকর্মের দায় তাকে একাই বহন করতে হবে এবং তার শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে। মজার ব্যাপারটা হবে এই যে, শেষ বিচার দিবসে আল্লাহর কাছে এই বাহানা পেশ করবে যে, সে তাদের জন্যেই এসব করেছিল, তখন তারাই বলবে যে, আমরা তোমাকে আমাদের সুখ স্বাছন্দের জন্য কোনো অপকর্ম করতে বলিনি বরং তোমাকে আমরা এসব না করতে বারণও করেছি। তুমি আমাদের কথায় কর্ণপাত করনি। সুতরাং আমরা কেউই তোমার অপরাধের সামান্যতম দায়ও নেবো না। অতঃপর বিচারে কী হবে তা আর বলার অপেক্ষা থাকে না।

এখন কথা হলো, মৃত্যু ও শেষ বিচারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো রাস্তা নেই- জেনেও মানুষ কেন এমন করে নিজের সর্বনাশ করে? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও পড়াশোনার নিরীখে এর জবাব হচ্ছে :-

(১). আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে নৈতিক শিক্ষার কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেই। (২). শিক্ষকতাসহ যে কোনো চাকরি নিতে হলে ঘুষ প্রদান করতে হয়। ঘুষের মাধ্যমে যে পেশার সূচনা হয় সে পেশার সর্বস্তরে ফাঁকি ও চুরি করার প্রবণতাটাই কার্যকর হয়। (৩). শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদের কারণেই শিক্ষিত লোকদের ভেতরেই দুর্নীতি বেশি করে বিস্তার লাভ করে। (৪). দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে সংসার ও জীবিকা নির্বাহের কারণেই পরিবারের সন্তান সন্ততিদের মজ্জার ভেতরেই দুর্নীতি ও অসততা এবং লজ্জাহীনতার বীজ বপিত হতে থাকে। (৫). শেষ কথাটা হলো, আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, বেহেস্ত-দোজখ সৃষ্টি করেছেন, নবী রাসূলগণের মাধ্যমে আসমানি কিতাব নাজেল করে জীবন বিধান দিয়েছেন, এবং একমাত্র মানুষের মধ্যেই ঋৎববফড়স ড়ভ রিষষ অর্থাৎ ইচ্ছা মক্তিসহ ভালো-মন্দ যাচাই করে চলার জন্য বিবেক বুদ্ধি দিয়েছেন।

যারা সঠিক বিবেক বুদ্ধি ধারণ করে জীবন যাপন করবে তারা ইহকালে সম্মানিত হবে ও পরকালে মুক্তি পাবে। যারা তার বিপরীত করবে তাদের জন্য রয়েছে কেবলই দুর্ভাগ্য। এটাই খোদায়ী বিধান। আর মৃত্যু যদি না থাকতো, তাহলে খোদায়ী বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের বহু আগেই দুর্নীতি, দুষ্কর্মে জগৎ ভরে যেত এবং ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং আল্লাহই সর্বজ্ঞানী ও সকল ভারসাম্য রক্ষাকারী।

পরিশেষে, মানুষের জীবন তার বিবেক বিচার-বুদ্ধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে এটাই খোদায়ী বিধান। মানুষ ভুল করবে, ভুল বুঝে অনুশোচনাসহ তওবা করবে এটাই আল্লাহর নির্দেশ। কিন্তু তা না করে হটকারী করবে, অপকর্ম করবে, অনুশোচনাও করবেনা, তওবা ও করবেনা, এটা হতে পারেনা। ইহ ও পরকালে এর সঠিক পরিণাম অবধারিত। আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে সকল পাপাচার থেকে বাঁচার জন্য আকুল প্রার্থনা করছি।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, ভুলুয়া কলেজ, নোয়াখালী, গবেষক ও কলামিস্ট

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত