শিরোনাম

মুহাররম ও আশুরার ফযীলত, আমল ও শিক্ষা

মাওলানা ইমদাদুল হক  |  ১৬:৩৮, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯

মুহাররম মাসের মর্যাদা ও আমল: হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররম। মুহাররম অর্থ মহাপবিত্র, মহাসম্মানিত। কুরআন-হাদীসের আলোকে এ মাসটি খুবই ফযীলতপূর্ণ ও মর্যাদাময়।

আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে, তাঁর লেখনিতে আসমান-যমিন সৃষ্টির দিন থেকেই মাসের সংখ্যা বারোটি নির্ধারিত; তার মধ্যে চারটি সম্মানিত- এটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান’।

এই সম্মানিত চার মাসের মর্যাদা রক্ষায় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর বিশেষ বিধান নাযিল করে আয়াতের মাঝখানের অংশে বলেন, ‘সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোর ভেতরে নিজেদের উপর যুলুম কোরো না’ (সূরা তাওবাহ, আয়াত ৩৬)।

অন্যত্র তিনি বলেন, (হে রাসূল) তারা আপনাকে সম্মানিত মাসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; আপনি বলে দিন, তাতে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ভয়ঙ্কর অপরাধ (সূরা বাকারাহ, আয়াত ২১৭)।

এই সম্মানিত ও মর্যাদা রক্ষার বিশেষ তাকিদযুক্ত মাসগুলোর পরিচয় বর্ণিত হয়েছে হাদীস শরীফে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ যেদিন আসমান-যমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে একই ধারায় সময় আবর্তিত হয়ে চলেছে। বছরের মাস বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত। তিনটি পরস্পর সংলগ্ন: যুল কা’দাহ, যুল হিজ্জাহ ও মুহাররম; আর একটি হল রজব (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস-২০৩৮৫; সহীহ বুখারি, হাদীস-৩১৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১৬৭৯; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-১৯৪৭)।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, এই মাসের মর্যাদা রক্ষা করা এবং কোনোভাবে আমাদের দ্বারা এই মাসে আল্লাহর অবাধ্যতা প্রকাশ না পায়, সে মর্মে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা।

হাদীস শরীফে মুহাররম মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ বলে আখ্যয়িত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এই মাসের রোযা রমাযানের পর বছরের সবচেয়ে ফযীলতপূর্ণ রোযা।

আবু হুরায়রা রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রমাযান মাসের পর সবচেয়ে ফযীলতপূর্ণ সিয়াম হল আল্লাহর মাস মুহাররম মাসের সিয়াম (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৬৩; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪২৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস-১৬১৩; সুনান তিরমিযি, হাদীস-৪৩৮; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস-১৭৪২)।

অন্য হাদীসে এসেছে, জুনদুব ইবন সুফিয়ান রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ফরয নামাযের পর সবচেয়ে ফযীলতপূর্ণ নামায হচ্ছে রাতের নামায এবং রমাযানের পর সবচেয়ে ফযীলতপূর্ণ রোযা হচ্ছে আল্লাহর মাসের রোযা- যে মাসকে তোমরা মুহাররম বল (তাবারানি, আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস-১৬৯৫; আল মু’জামুল আওসাত, হাদীস-৬৪১৭)।

এ মাসে তাওবা কবুলের একটি দিন আছে: আলী রা. থেকে বর্ণিত, একব্যক্তি তাঁর কাছে জানতে চায়, হে আমীরুল মু’মিনীন, রমাযান মাসের পর কোন মাসে আপনি আমাকে রোযা রাখতে আদেশ করেন? তিনি তাকে বলেন, একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল, রমাযান মাসের পর কোন মাসে আপনি আমাকে রোযা রাখতে আদেশ করেন? তখন আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর আর এ বিষয়ে কাউকে প্রশ্ন করতে শুনি নি।

তার উত্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি যদি রমাযানের পর আর কোনো মাসে রোযা রাখতে চাও তাহলে মুহাররমে মাসে রোযা রাখো। কেননা সেটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে যেদিন আল্লাহ অনেকের তাওবা কবুল করেছেন এবং সেদিন আরো অনেকের তাওবা কবুল করবেন (সুনান তিরমিযি, হাদীস-৭৪১; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস-১৩২২)।

আশুরার ফযীলত ও আমল: মুহাররম মাসের সবচেয়ে তাৎপর্যময় দিন দশ তারিখ, যাকে পরিভাষায় আশুরা বলা হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, রমাযান মাস ও আশুরার দিন ব্যতীত রোযার ক্ষেত্রে একদিনের উপর অন্য দিনের কোনো ফযীলত নেই (তাবারানি, আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস-১১২৫৩)।

ইবন আব্বাস রা. আশুরার সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এ দিনটি অর্থাৎ আশুরার দিন ব্যতীত অন্য কোনো দিনকে এবং রমাযান মাস ব্যতিত অন্য কোনো মাসকে অন্য সময়ের উপর শ্রেষ্ঠ মনে করে সিয়াম পালন করেছেন বলে আমার জানা নেই (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩২; সহীহ বুখারি, হাদীস-২০০৬; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস-১৯৩৮)।

অন্য হাদীসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয় আশুরা আল্লাহর দিনগুলোর একটি, সুতরাং যে চায় সে যেন তাতে রোযা রাখে (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১২৬)।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, আশুরার রোযার ওসিলায় আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, তিনি পূর্বের একবছরের গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৬২; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪২৫; সুনান তিরমিযি, হাদীস-৭৫২; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস-১৭৩৮)।

ইসলামপূর্ব সময়ে ও বিভিন্ন জাতিতে আশুরা: ইসলামপূর্ব সময়েও আশুরার দিনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী দিনটিকে নানাভাবে উৎযাপন করত। ইয়াহুদি, খ্রিস্টান, মক্কার কুরাইশ ও খয়বারবাসীদের নিকট দিনটির বিশেষ আবেদন ছিল।

আয়িশা রা. বলেন, জাহিলিয়াতের সময়ে কুরাইশরা (জাহিলিয়াতবাসী) আশুরার দিন সিয়াম পালন করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও জাহিলিয়াতের সময় এই দিনে সিয়াম পালন করতেন। এবং তাদের একটি দিন ছিল, যেদিন তারা কাবাগৃহে গিলাফ পরাত (সহীহ বুখারি, হাদীস-১৫৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১২৬; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪৪২)।

আবু মুসা আশআরি রা. বলেন, আশুরার দিনকে ইয়াহুদিরা সম্মান করত এবং এদিনে তারা ঈদ উৎযাপন করত (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩১)।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, খয়বারবাসী আশুরার দিন সিয়াম পালন করত এবং ঈদ উৎযাপন করত আর তাদের নারীদেরকে অলঙ্কারাদি ও সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদে বিশেষভাবে সজ্জিত করত (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩১)।

ইবন আব্বাস রা. (দীর্ঘ হাদীস, যার পূর্ণ বিবরণ সামনে আসছে) বলেন, সাহাবিগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, ইয়াহুদি-খ্রিস্টানগণ তো এই দিনটিকে সম্মান করে (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪৪৫)।

আয়িশা রা. বর্ণিত হাদীস থেকে আমরা জেনেছি, ইসলামপূর্বকালে নবীজিও এই দিনে সিয়াম পালন করেছে। ইবন উমারের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সাহাবিগণও সেসময়ে এই দিনে সিয়াম পালন করতেন।

তিনি বলেন, আশুরার দিনটিতে তো জাহিলিয়াতের সময়েও আমরা সিয়াম পালন করেছি (সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪৪৩)।

আশুরার সিয়ামের গুরুত্ব: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজে আশুরার দিন রোযা রাখতেন এবং সাহাবিদেরকে রোযা পালনের আদেশ করেছিলেন। এমনকি ভুলক্রমে এদিন রোযা না রাখলে দিনের অবশিষ্ট অংশ অভুক্ত থেকে পরবর্তীতে কাযা করে নেওয়ার নির্দেশ দেন। সাহাবিরা রমাযানের রোযার মতো এ রোযার জন্য ফিতরাও আদায় করতেন।

হাফসা রা. বলেন, চারটি বিষয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কখনো পরিত্যাগ করতেন না: ১. আশুরার রোযা, ২. জিলহজ্জের প্রথম দশকের নয়দিনের রোযা, ৩. প্রতি মাসে তিনদিন আইয়ামে বীযের রোযা এবং ৪. ফজরের পূর্বে দুই রাকআত সুন্নাত নামায (সুনান নাসায়ি, হাদীস-২৪১৬)।

জাবির ইবন সামুরা রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন আমাদেরকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দিতেন। তিনি এ ব্যাপারে আমাদেরকে উৎসাহিত করতেন এবং খোঁজ-খবর নিতেন (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১২৮)।

আব্দুর রাহমান ইবন মাসলামা তার চাচা থেকে বর্ণনা করেন, আসলাম গোত্রের লোকেরা (আশুরার দিন) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট আগমন করলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন তোমরা কি আজ রোযা রেখেছ? তারা বলে, না।

তিনি বলেন, তাহলে দিনের বাকি অংশ (পানাহার না করে) পূর্ণ করো এবং (পরবর্তীতে) এর কাযা আদায় করে নিয়ো (সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪৪৭)।

আবু সায়ীদ খুদরি রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিনের আলোচনা করলেন এবং এদিনের অনেক মহিমা বর্ণনা করলেন। অতঃপর তাঁর পাশের লোকদেরকে বললেন, তোমাদের মধ্যে যে এখনো আহার করে নি, সে আজ রোযা রাখবে; আর যে আহার করেছে সে অবশিষ্ট দিন পানাহার থেকে বিরত থাকবে (তাবারানি, আল মু’জামুল আওসাত, হাদীস-৩২৩১)।

কায়স ইবন সা’দ রা. বলেন, আমরা আশুরার দিন সিয়াম পালন করতাম এবং সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম (সুনান নাসায়ি, হাদীস-২৫০৬)।

আশুরার সিয়ামের নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা ও প্রতিনিধি প্রেরণ: এ থেকেও আশুরার রোযার গুরুত্ব বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আশুরার সিয়ামের নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন এবং বিভিন্ন গোত্রে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

সালামা ইবন আকওয়া রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আসলাম গোত্রের একব্যক্তিকে নির্দেশ দেন যে, তুমি তোমার কওমের মাঝে অথবা লোকদের মাঝে ঘোষণা করো, যে আহার করেছে সে অবশিষ্ট দিন রাত পর্যন্ত পানাহার করবে না আর যে আহার করে নি সে রোযা রাখবে। কেননা আজ আশুরার দিন (সহীহ বুখারি, হাদীস-২০০৭, ৭২৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস-১৬৫২৬)।

রুবাই বিনতু মুআব্বিয রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আশুরার সকালে মদীনার আশপাশের আনসারদের পল্লীগুলোতে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা করান/ ঘোষণা করতে বলেন, যে ব্যক্তি রোযা অবস্থায় সকাল করেছে সে রোযা পূর্ণ করবে আর যে পানাহার করে ফেলেছে সে অবশিষ্ট দিন অভুক্ত থাকবে (সহীহ বুখারি, হাদীস-১৯৬০; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩৬; সুনান নাসায়ি, হাদীস-২৩২০; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস-১৭৩৫)।

আব্দুল্লাহ ইবন বদর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একদিন তাদেরকে বলেন, আজ আশুরার দিন, সুতরাং তোমরা রোযা রাখো। তখন আমর ইবন আওফ গোত্রের একব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আমার কওমকে রেখে এসেছি। তাদের অনেকে রোযা রেখেছে, অনেকে রাখে নি। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি তাদের কাছে যাও- যে রোযা রাখে নি সে যেন দিনের বাকি অংশ অভুক্ত থাকে, আর যে রোযা রেখেছে সে যেন রোযা পূর্ণ করে (তাবারানি, আল মু’জামুল আওসাত, হাদীস-৫৬৮৩; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস-২৭৬৪৬)।

আসমা ইবন হারিসা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন আমাকে আমার কওমের কাছে পাঠান এবং বলে দেন, তুমি তাদেরকে আজ রোযা পালন করার আদেশ করবে। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি পৌঁছানোর আগেই যদি তারা আহার করে ফেলে তখন কী করব? তিনি বলেন, যারা আহার করে ফেলবে তাদের দিনের বাকি অংশ রোযা রাখতে বলবে (তাবারানি, আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস-৮৬৯; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ায়িদ, হাদীস-৫১১৩)।

মা’বাদ কুরাশি রা. বলেন, আশুরার দিন একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে এলে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি আজ কিছু খেয়েছ? লোকটি বলে, না। তবে পানি পান করেছি। তিনি বলেন, তাহলে তুমি সূর্যাস্ত পর্যন্ত আহার করবে না এবং তোমার অধীনস্তদের আজ রোযা রাখতে বলবে (তাবারানি, আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস-৮০৩; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ায়িদ, হাদীস-৫১২৭)।

শিশুদের আশুরার সিয়াম: হাদীস শরীফে শিশুদেরকেও বিশেষ গুরুত্ব সহকারে আশুরার রোযা রাখানোর নির্দেশনা এসেছে। উলায়লাহ তার মা থেকে বর্ণনা করেন, আমি আমাতুল্লাহ বিনতু রুযায়নাকে বললাম, হে আমাতুল্লাহ, তোমার মা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আশুরার সিয়াম নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ।

নবীজি তার এতটাই গুরুত্ব দিলেন যে, তার ও তার কন্যা ফাতিমার দুগ্ধপায়ী শিশুদেরকে ডাকলেন, অতঃপর তাদের মুখে থুতু দিলেন এবং মায়েদেরকে বললেন, রাত পর্যন্ত এদেরকে দুধ পান করাবে না, থুতুই তাদের জন্য যথেষ্ট হবে (মুসনাদ আবু ইয়া’লা, হাদীস-৭১৬২; তাবারানি, আল মু’জামুল আওসাত, হাদীস-২৫৬৮; মাজমাউয যাওয়ায়িদ, হাদীস-৫১১৮)।

রুবাই বিনতু মুআব্বিয রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আনসারি পল্লীগুলোতে আশুরার সিয়ামের ঘোষণা দিলে তারপর থেকে আমরা এদিন রোযা রাখতাম এবং আমাদের ছোট ছোট শিশুদের রোযা রাখাতাম, তাদেরকে নিয়ে মসজিদে যেতাম। তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে রাখতাম, কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে সামনে খেলনা দিয়ে আমরা তার সাথে খেলতাম। এভাবে ইফতারের সময় হয়ে যেত এবং তারা রোযা পূর্ণ করে ফেলত (সহীহ বুখারি, হাদীস-১৯৬০; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩৬; ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, হাদীস-৪৪৪৪)।

আশুরার সিয়ামের ইতিহাস: ইসলামপূর্ব সময় থেকেই এদিনটি ছিল বিশেষভাবে সম্মানিত। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী এদিনটি বিভিন্নভাবে উৎযাপন করত এবং সিয়াম পালন করত, এমনকি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও জাহিলিয়াতের সময়ে এদিনে সিয়াম পালন করতেন। সাহাবিদের অনেকেই জাহিলিয়াতের সময়ে এদিনে রোযা রেখেছেন। তবে ইসলামে এদিনের সিয়ামের বিশেষ নির্দেশনা আসে হিজরতের পর। তার রয়েছে বিশেষ প্রেক্ষাপট।

ইবন আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করে গিয়ে দেখতে পান ইয়াহুদিরা আশুরার দিন রোযা রাখছে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, এদিনে কেন তোমরা রোযা রাখ? তারা বলল, এটা মহান কল্যাণময় একটা দিন। এদিনে মহান আল্লাহ তাঁর নবী মুসা ও তাঁর কওম বনীইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল থেকে মুক্তি দেন এবং ফিরআউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে মারেন। তাই মুসা আ. আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রোযা পালন করেন। আর আমরা তাঁর সম্মানার্থে রোযা রাখি।

তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, তবে তো তোমাদের চেয়ে মুসা আ.-এর অনুসরণের আমরাই অধিক হকদার ও উপযুক্ত। ফলে তিনি রোযা রাখেন এবং সাহাবিদেরকে রোযা রাখার আদেশ করেন (সহীহ বুখারি, হাদীস-৩৩৯৭, ৩৯৪৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩০; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪৪৪)।

তাসুআর সিয়াম ও সাহাবা মানস: তাসুআ মানে নয় তারিখ। আশুরার সিয়ামের সাথে মুহাররমের নয় তারিখ তাসুআর সিয়ামেরও নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। উপরের আলোচনা থেকে আমরা আশুরার রোযার গুরুত্ব ও মর্যাদা বুঝতে পারলাম। কিন্তু তাসুআর রোযা কেন? কোনো জাতি-গোষ্ঠীর পৃথিবীর বুকে সম্মানের সাথে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন উন্নত সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট। যে জাতির সংস্কৃতি যত উন্নত এবং বৈশিষ্টগুলো যত স্বতন্ত্র সে জাতি তত সম্মানিত এবং তাদের স্থায়িত্বও ততটাই বেশি। যে জাতির ভিনসংস্কৃতি মোকাবালা করার উন্নত শক্তিশালী সংস্কৃতি নেই, যারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে না, বরং পরজাতির নির্বিচার অনুকরণ করে তারা সম্মান ও ঔজ্জ্বল্য খুইয়ে মলিন ও এক সময় অন্যের মাঝে বিলীন হয়ে যায়।

ইসলাম মানব জাতির মুক্তির জন্য আল্লাহর দেওয়া সর্বশেষ পয়গাম। তাই কিয়ামত পর্যন্ত এর সগৌরব স্থায়িত্ব জরুরি। এজন্য তার অনিবার্য নিয়ামক হিসাবে ইসলামের রয়েছে উন্নত সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট। মুসলিম জাতির এখন প্রয়োজন এই সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্যের সচেতন চর্চা এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মোকাবালা।

এই নিবন্ধে উল্লেখিত প্রথম আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা সর্বতভাবে মুশরিকদের মোকাবালা করো, যেমন তারা সর্বতভাবে তোমাদের মোকাবালা করে; আর জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে আছেন (সূরা তাওবাহ, আয়াত ৩৬)।

সাহাবি কিরাম রা. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে থেকে এই শিক্ষা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। আশুরার সিয়াম তাদের পালন করতে হচ্ছিল আল্লাহর নবী মুসা আ.-এর স্মৃতির স্মরণ এবং আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কর্ম ও আদেশের অনুসরণের জন্য। তবুও তো দৃশ্যত বিষয়টি ইয়াহুদি-খ্রিস্টান ও অন্যান্য জাতির সাথে মিলে যাচ্ছিল। তখনই তাদের মাঝে স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগ্রত হয়ে ওঠে।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন রোযা রাখলেন এবং অন্যদেরকে রোযা রাখার আদেশ করলেন তখন সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনটিকে তো ইয়াহুদি-খ্রিস্টানরা সম্মান করে? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, আগামী বছর নবম তারিখেও আমি রোযা রাখব, ইনশাআল্লাহ (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪৪৫)।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের শিক্ষার আলোকে ইবন আব্বাস রা. লোকদেরকে এভাবেই শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, তোমরা মুহাররমের নয় ও দশ তারিখ সিয়াম পালন করবে এবং এভাবে ইয়াহুদিদের বিরুদ্ধাচারণ করবে (সুনান তিরমিযি, হাদীস-৭৫৫)।

মাওলানা আবদুল মালেক হাফিযাহুল্লাহ বলেন, আশুরার রোযার সঙ্গে ৯ মুহাররমের রোযা রাখাও ভালো। বরং আশুরার সঙ্গে যদি ৯ বা ১১ মুহাররমে রোযা রাখা তাহলে আরো ভালো (মাসিক আলকাউসার, অক্টোবর ২০১৮, পৃষ্ঠা: ০৬)।

রমাযানের সিয়াম ফরয হওয়ার পর আশুরার সিয়াম: রমাযানের সিয়াম ফরয হওয়ার আগ পর্যন্ত আশুরার সিয়াম আবশ্যকভাবে পালন করা হত। রমাযানের রোযা ফরয হওয়ার পর তার গুরুত্ব কমে নফলের পর্যায়ে নেমে আসে। তবে সাধারণ নফলের চেয়ে এ রোযার ফযীলত ও মর্যাদা অনেক বেশি।

ইবন উমার রা. বলেন, জাহিলিয়াতবাসী আশুরার দিন রোযা রাখত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও মুসলিমগণও রমাযান ফরয হওয়ার আগ পর্যন্ত এ দিনে সিয়াম পালন করতেন। তারপর যখন রমাযান ফরয হল, নবীজি বললেন, নিশ্চয় আশুরা আল্লাহর দিনগুলোর একটি, সুতরাং যে চায় সে যেন তাতে রোযা রাখে (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১২৬)।

জাবির ইবন সামুরা রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন আমাদেরকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দিতেন, আমাদেরকে উৎসাহিত করতেন এবং খোঁজ-খবর নিতেন। তারপর যখন রমাযান ফরয হল, তিনি আর আদেশ-নিষেধ করলেন না এবং খোঁজ-খবরও নিলেন না (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১২৮)।

কায়স ইবন সা’দ রা. বলেন, আমরা আশুরার দিন সিয়াম পালন করতাম এবং সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম। তারপর যখন রমাযান নাযিল হল এবং যাকাতের বিধান এল, আমাদেরকে আর এব্যাপারে আদেশ-নিষেধ করা হল না, তবে আমরা তা পালন করতাম (সুনান নাসায়ি, হাদীস-২৫০৬)।

সাহাবিদের আমলে আশুরার সিয়াম: রমাযানের সিয়াম ফরয হওয়ার পর আশুরার সিয়াম নফল হয়ে গেলেও সাহাবি কিরাম, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পরেও, এ বিধান যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করতেন।

উমার রা. হারিস ইবন হিশামের নিকট এ মর্মে লোক পাঠান যে, আগামী কাল আশুরার দিন, সুতরাং তুমি রোযা রাখবে এবং তোমার পরিবারবর্গকে রোযা রাখতে আদেশ করবে (মুআত্তা মালিক, হাদীস-৮৪৪)।

মুআবিয়া রা. আশুরার দিন মদীনায় খুতবা দিতে গিয়ে বলেন, হে মদীনাবাসী, তোমাদের আলিমগণ কোথায়? আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আজ আশুরার দিন, আল্লাহ এ দিনের রোযা তোমাদের উপর ফরয করেন নি, তবে আমি আজ রোযা রেখেছি। সুতরাং যে রোযা রাখতে চায় সে রোযা রাখবে, আর যে না চায় সে না রাখবে (সহীহ বুখারি, হাদীস-২০০৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১২৯)।

হাকীম ইবন আ’রাজ বলেন, আমি তাকে (ইবন আব্বাস রা.কে) বললাম, আমাকে আশুরার রোযা সম্পর্কে জানান। তিনি বললেন, মুহাররমের চাঁদ দেখে তারিখ গোণনা করতে থাকবে এবং নয় তারিখে রোযা অবস্থায় সকাল করবে। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এমন করতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৩৩; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৪৪৬)।

কায়স ইবন আবদ বলেন, আমি বছরের বিভিন্ন সময়ে আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রা.-এর কাছে যেতাম। তাকে কখনো দুহার সালাত আদায় করতে দেখি নি এবং আশুরা ছাড়া অন্য কোনো নফল সিয়াম পালন করতে দেখি নি (তাবারানি, আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস-৮৮৭৭)।

উপসংহার: হিজরি চান্দ্র বর্ষ। চাঁদের উদয়াস্তের ভিত্তিতে চান্দ্রবর্ষের মাস হয় ২৯ বা ৩০ দিনে। সুতরাং মুহাররম ২৯/৩০ দিন ব্যাপ্ত একটি মাস। এ মাসের একটি দিন দশ তারিখের নাম আশুরা। কিন্তু বাঙালি মুসলিমরা সাধারণত আশুরা কেন্দ্রিক সকল বিষয়কে মুহাররম বলে আখ্যায়িত করে। যেমন আশুরার রোযাকে তারা বলে মুহাররমের রোযা। এটা একটি ভুল।

৬১ হিজরিতে এমাসের দশ তারিখে কারবালার প্রান্তরে ঘটে ইসলামের ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ঘটনা- ইমাম হুসাইনের (রা.) শাহাদত। সে ঘটনাকে উপজীব্য করে আমাদের মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ সিন্ধু’ নামে একটি উপন্যাস লেখেন। কিন্তু বাঙালি মুসলিম সমাজ সেই উপন্যাসকে পড়তে থাকে ইতিহাস হিসাবে। যে কারণে কারাবালার ইতিহাস কেন্দ্রিক অনেক বিভ্রান্তি সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আশুরা আমাদের ইবাদত এবং কারবালা আমাদের ইতিহাস।

বিষাদ সিন্ধু একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, কোনো ইতিহাস গ্রন্থ নয়। বিষাদ সিন্ধু আমরা পড়তে পারি সাহিত্যের স্বাদ নিতে, তা পাঠ করে আমরা চোখের জলে ভাসতে পারি। তবে ইতিহাস নিতে হবে ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে। আর মুহাররম-আশুরা পালন করতে হবে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে, যা আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। মহান আল্লাহ তাওফীক দান করুন, আমীন।

লেখক: ইমদাদুল হক, ইমাম ও খতীব- বাইতুল মামুর জামে মসজিদ, আনন্দধাম, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা।

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত