বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০

২১ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১৪,২০২০, ০৪:৫৭

ফেব্রুয়ারি ১৪,২০২০, ১০:৫৭

বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালান

ক্লিনারদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থামছেই না সোনার চোরাচালান। খোদ বিমান ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরাই জড়াচ্ছে চোরাচালানকাণ্ডে। এটা নতুন গল্প নয়, দীর্ঘদিন ধরেই বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতা, বিমানকর্মীসহ বিমানবন্দরে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত একাধিক সংস্থার কর্মীরাও সোনার চোরাচালানে জড়িত।

বিগত দিনে এ ধরনের ঘটনার বহু নজির রয়েছে তবুও এ কাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। একের পর এক আটকের ঘটনায়ও চোরাচালানে জড়িত বিমাবন্দরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য থামাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এরই মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা মূল্যের চার কেজি ওজনের সোনার চালানসহ গ্রেপ্তার করা হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের পরিচ্ছন্নতাকর্মী জনাথন মুক্তি বারিকদারকে।

বিমানের ক্লিনিং ইনচার্জ আতিকের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিলো জনাথনের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত চার কেজি ওজনের সোনা। এমনটাই জানিয়েছেন বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপস অ্যান্ড মিডিয়া) আলমগীর হোসেন।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বোর্ড-ইন ব্রিজ থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কক্ষের দূরত্ব মাত্র ২০০ গজ। সোনার চালান নিয়ে এই ২০০ গজ পাড়ি দেয়ার আগেই এপিবিএন সদস্যরা জনাথনকে তল্লাশি করার কথা বলেন। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়ান।

জনাথনের সঙ্গে থাকা সোনার চালান নিয়ে ২০০ গজ পাড়ি দিয়ে ক্লিনিং ইনচার্জ আতিকের কক্ষে পৌঁছতে পারলেই মিলতো ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বাকবিতণ্ডার কারণে এপিবিএন সদস্যদের সন্দেহ প্রবল করে তোলে।

সেখানে তল্লাশি করতে না পেরে জনাথনকে বিমানবন্দর এপিবিএন কার্যালয়ে নিয়ে তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে জনাথনের পরনে দুই জুতার শুকতলায় ১৬টি করে মোট ৩২টি সোনার বার পাওয়া যায়। আতিকের কাছে এ চালান গছানোর আগেই তাকে গ্রেপ্তার করে এপিবিএন সদস্যরা।

বিমানবন্দর এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপস অ্যান্ড মিডিয়া) আলমগীর হোসেন বলেন, জনাথন মুক্তি বারিকদার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তার কাছ থেকে পাওয়া সোনার বাজারমূল্য ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

গ্রেপ্তারের পর জনাথন মুক্তি বারিকদার নিজেকে সোনার চালানটির বাহক হিসেবে দাবি করেন। চালানটি উড়োজাহাজ থেকে বের করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিলে তিনি ২০ হাজার টাকা পেতেন।

এপিবিএন সূত্র জানায়, দুবাই থেকে সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে ঢাকায় আসে এমিরেটসের ফ্লাইট। ইকে ৫৮২ নম্বর এই ফ্লাইটে পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে যান জনাথন মুক্তি বারিকদার।

বিমানবন্দরের ৭ নম্বর বোর্ড-ইন ব্রিজে এমিরেটসের এই উড়োজাহাজ থেকে যাত্রী নামানোর জন্য ডকিং করার পর জনাথন ভেতরে ঢোকেন। ঘণ্টা খানেক পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষে নেমে আসেন তিনি।

এসময় উড়োজাহাজটি নিরাপত্তায় থাকা এপিবিএনের সদস্যরা জনাথনকে তল্লাশি করতে চান। কিন্তু তিনি এপিবিএনের সদস্যদের সঙ্গে বাগ্?বিতণ্ডা শুরু করেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জনাথনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাতে এপিবিএন জানায়, মামুন নামে তার এক সহকর্মী তাকে এমিরেটসের উড়োজাহাজের ভেতরই সোনার এই চালান হস্তান্তর করেন। এরপর জনাথন ওই উড়োজাহাজের টয়লেটে গিয়ে তার পরনে জুতোর শুকতলায় সুকৌশলে কালো স্কচটেপে মোড়ানো সোনার চালানটি লুকিয়ে রাখেন।

বোর্ড-ইন ব্রিজ থেকে বাইরে এসে এই চালান বিমানের ক্লিনিং ইনচার্জ আতিককে হস্তান্তর করার কথা ছিলো জনাথনের। ক্লিনারদের কক্ষে সোনার চালানটি পৌঁছে দেয়ার বিনিময়ে তিনি ২০ হাজার টাকা পেতেন। জনাথনের বাড়ি খুলনার খালিশপুর উপজেলার বড় বয়রা গ্রামে। তিনি ২০১৪ সাল থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে বিমানে যোগ দেন।

এর আগেও একাধিকবার এভাবে সোনা চোরাচালান করেছেন। জনাথনের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের চোরাচালানবিরোধী ধারায় মামলা হয়েছে।

তবে বিমানের ক্লিনিং ইনচার্জ আতিকসহ এ ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ধরতে বিমানবন্দরে অভিযান চালানোর আগেই কৌশলে তারা পালিয়ে গেছেন। আতিককে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

গত মাসেও (৪ জানুয়ারি) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ২ কেজি ৩২ গ্রাম ওজনের সোনার চালানসহ গ্রেপ্তার করে এপিবিএন সদস্যরা।

এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর জানান, ওইদিন বেলা ১১টা ২০ মিনিটের সময় বিমানবন্দরের কনকোর্স হলে বিমানের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুমন শিকদারের (৩৪) কাছ থেকে ২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। বারগুলো তার জুতার তলায় লুকানো ছিলো। এসময় তার সহযোগী পরিচ্ছন্নতাকর্মী শাহীন হোসেন (২৭) ও বেলাল আকনকেও (২৮) আটক করা হয়।

আবুধাবিতে উড্ডয়ন করা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বিজি ০২৮ চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় অবরতণ করার পর ওই ফ্লাইটে বিমানের পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন সুমন, শাহীন ও বেলাল। বিমানবন্দরের ১ নম্বর বে’তে বিমানটি যাত্রী নামানোর জন্যে ডকিং করার পর পরিচ্ছন্নকর্মীরা বিমানে প্রবেশ করেন। কাজ শেষে তারা নেমে আসেন।

এসময় বিমানের নিরাপত্তায় থাকা আর্মড পুলিশের সদস্যরা সুমনকে তল্লাশি করতে চাইলে সে বাকবিতণ্ডা করেন। পরে সুমনসহ ৩ জনকে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের ?অফিসে এনে তল্লাশি করলে সুমনের দুই জুতার শুকতলায় ২০ পিস সোনা বার পাওয়া যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানায়, কালাম নামে বিমানের এক টেকনিশিয়ান বিমানের মধ্যেই তাকে এই স্বর্ণবার দেন। এই কাজে সে ২০ হাজার টাকা পেতো। আটক সোনার বাজার মূল্য ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা বলে জানা গেছে।

আলমগীর হোসেন বলেন, আটককৃতদের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে চোরাচালানবিরোধী ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ