শনিবার ০৪ এপ্রিল ২০২০

২১ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

আবদুর রহিম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১৭,২০২০, ০৬:০০

ফেব্রুয়ারি ১৭,২০২০, ০৬:০০

শর্তে প্যারোল খালেদার না!

  • জীবন্ত খালেদার চিকিৎসা জরুরি নাকি রাজনীতি, এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি
  • সরকার চায় অপরাধ ও শাস্তি মেনে নিয়ে ক্ষমা; চিকিৎসার সুযোগে করা যাবে না ‘রাজনীতি’
  • বিএনপি যদি খালেদার প্যারোল চায়, তাহলে আদালতে আবেদন করতে হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

খালেদা জিয়াকে জীবন্ত অবস্থায় পেতে প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে রাজি দলের বড় অংশ ও পরিবার। গত সপ্তাহে খালেদা জিয়াও প্যারোলের ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠিও দিয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সুপারিশের জন্য।

খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি দেশের বাইরে যেতে সম্মতি দিয়েছেন। প্যারোলের প্রস্তুতি নিতেও বলেছেন।

তবে সরকার থেকে যদি কোনো শর্ত দেয়া থাকে, তাহলে তিনি প্যারোল নেবেন না। প্যারোল হতে হবে শর্তহীন। আওয়ামী লীগ চায়, অপরাধ ও শাস্তি মেনে নিয়ে সরকারের কাছে আবেদন। চিকিৎসার জন্য প্যারোল নিয়ে খালেদা জিয়া ‘রাজনীতি’ করবে— সেই সুযোগ সরকার দেবে না। শর্তবিহীন মুক্তিতে সরকারও কোনোভাবে রাজি থাকবে না।

অন্যদিকে বিএনপিও শঙ্কা করছে— প্যারোল নিয়েও সরকার নতুন কোনো নাটক করতে পারে। তবে জীবন্ত খালেদার চিকিৎসা জরুরি নাকি রাজনীতি— এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি।

তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন, প্যারোলে আবেদন করলে খালেদা জিয়াকে আগে দোষ স্বীকার করতে হবে।

এ নিয়ে বিএনপির দলীয় সূত্রের ভাষ্য, সরকারের তরফে ইতিবাচক বার্তা পেলেই কেবল খালেদার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হবে। পর্দার আড়ালে প্যারোল নিয়ে যদি কোনো বার্তা পাওয়া যায়, তাহলেই প্যারোলপেপার নিয়ে স্বাক্ষরের জন্য খালেদার কাছে যাবে পরিবার।

ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্যারোলে যদি সরকারের পক্ষ থেকে শর্ত যুক্ত করে দেয়া হয়, তাহলে খালেদা জিয়া প্যারোল নেবেন না, এমন বার্তাই তিনি পরিবারকে দিয়েছেন।

খালেদা জিয়ার নির্দেশনার আলোকেই পরিবার এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। আজকালের মধ্যেই রাষ্ট্রের কাছে শর্তবিহীন প্যারোলের জন্য আবেদন করা হতে পারে। সামনে থেকে প্যারোলে মুক্তির কার্যক্রমে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

তবে এ বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত দল বা পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন পাননি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শেষ পর্যন্ত সরকার রাজি না হলে আন্দোলনের মাধ্যমেই বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে চায় দলটি, এমনটিই দাবি।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসার পর এ নিয়ে জানতে চাইলে দলটির নীতিনির্ধারকদের দাবি, প্যারোলে মুক্তির আলোচনা এনেছে সরকার। খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই শর্ত নিয়ে প্যারোল নিতে সরকার নানাভাবেই বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে। শুরু থেকে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি ফাঁদ হিসেবে দেখছে বিএনপি।

তবে দলটির আইনজীবী ও একটি অংশের ভাষ্য, খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা, রাজনীতিতে জরুরির চাইতে তাকে জীবন্ত অবস্থায় কারাগার থেকে বের করাই একমাত্র বিষয় হওয়া উচিত। কারণ সরকারের ইচ্ছা ছাড়া বিএনপি আন্দোলন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে বের করা সম্ভব হবে না। যেকোনো উপায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করাই একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

তবে এখনো খালেদা জিয়ার মুক্তি কীভাবে আসবে এ নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য আসছে শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে— আন্দোলন, আইনি লড়াই, সমঝোতা, নাকি প্যারোলে মুক্তি।

প্রথম থেকেই প্যারোলে মুক্তির কথা বলে আসছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন। যিনি খালেদা জিয়ার মামলার অন্যতম আইনজীবী। দুর্নীতির দায়ে সাজা মাথায় নিয়ে কারাগারে থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে দলের মধ্যেই চলছে নানামুখী কথাবার্তা।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের দাবি, প্যারোল বা জামিন দু’টোই সরকারের হাতে। তারা চাইলে যেকোনোভাবে তাকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দিতে পারে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্যারোলে নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলে। পাকিস্তানেও নওয়াজ শরীফ প্যারোল নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন, বিশ্বে এমন অনেক নজির আছে।

সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘যারা খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি চান তারা দালাল’ যারা সমঝোতা করে প্যারোলে খালেদা জিয়ার মুক্তি চান, এমন দালাল আমাদের দলে আছে।

খালেদা জিয়া কেনো প্যারোলে মুক্তি পাবে, এটা হতে পারে না। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ‘প্যারোল আইনগত অধিকার। না বুঝেই দলের কেউ কেউ প্যারোলের বিরোধিতা করছেন। আপসহীনতা মানে ধুকে ধুকে মরে যাওয়া নয়।’

অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘ম্যাডাম খালেদা জিয়া কারাগারে তখন যদি কোনো আইনজীবী তাকে গিয়ে বলে আপনি কেন প্যারোলে যাবেন, কিছুদিনের মধ্যেই আপনার জামিন হয়ে যাবে। তাহলে তিনি অবশ্যই চিন্তা করবেন, যেহেতু আমার জামিন হয়ে যাচ্ছে; আমি কেন প্যারোলে যাবো। এতে ম্যাডামের মধ্যে একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, আইনজীবীদের মধ্যেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তারা প্যারোল সম্পর্কে একটি ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছে। প্যারোলের সঙ্গে দোষ স্বীকার করার কোনো সম্পর্ক নেই।’

তিনি বলেন, ‘প্যারোল বিষয়ে না বুঝে যারা বক্তব্য দিচ্ছে তারা এর সম্পর্কে আসলে কিছু না জেনেই দিচ্ছে। এতে আমাদের মধ্যে একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। আমি যদি নিজেই বেঁচে না থাকি, তাহলে রাজনীতি করবো কীভাবে। তখন তো আর আপস করার সুযোগও থাকবে না। আমরা কখনো চাই না ম্যাডামের জীবনের ওপরে কোনো ঝুঁকি আসুক।’

আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলার সমালোচনা করে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘অনেক নেতা অনেক কিছু বলেন। কিছু নেতার বিরুদ্ধে তৃণমূল থেকেও অনেক ধরনের মন্তব্য শোনা যায়। এমনও শোনা যায় যে, নির্বাচনের সময় তারা মনোনয়নবাণিজ্য করেছে। আমি দালাল হতে রাজি আছি, কিন্তু আমি যে বক্তব্য দিয়েছি সেই বক্তব্যে আমি বিশ্বাসী।’

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, খালেদা জিয়ার জেলজীবনের জন্য বিএনপির বর্তমান নেতৃবৃন্দেরও দায় আছে। তারা খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে হাসিমুখেই সংসদে যাচ্ছেন। নির্বাচন উৎসবে থাকছেন।

সমপ্রতি বিএনপির মহাসচিব এও বলেছেন, আগের দুটি নির্বাচনে অংশ না নেয়া বিএনপির জন্য ভুল ছিলো। তাই গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে সকল নির্বাচনেই যাবে তারা। বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সংসদে গমন সরকারকে এক ধরনের বৈধতাও দান করছে বলে এখন দলটি থেকে অভিযোগ আসছে। সরকার প্রমাণ করতে চাচ্ছে, দেশে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি বিরাজ করছে। আর নির্বাচন নিয়ে সব দেশেই কমবেশি পরাজিতপক্ষের অভিযোগ থাকে।

বিএনপিও তেমন অভিযোগ করছে। খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পরও কোনো হরতাল আসেনি, কিন্তু সিটি নির্বাচনের রাজধানীতে দেয়া হয় হরতাল। নয়াপল্টনের মধ্যে থেকে মির্জা ফখরুল ও রুহুল কবির রিজভী হরতাল পালন করেন। রাজধানীতে পড়েনি বিন্দুমাত্রও হরতালের প্রভাব।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোল মুক্তির বিষয়ে পরিবার কিংবা বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো আবেদন করা হয়নি বলে গতকাল জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

তিনি বলেন, ‘তারা চিকিৎসকদের কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে চিকিৎসকরা কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। তারা যদি প্যারোলে চায়, তাহলে আদালতে আবেদন করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও আবেদন করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার টেবিলে এমন কোনো আবেদন নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি বা প্যারোল সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। এ বিষয়ে সরকারের কিছু করার নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন আসেনি। আবেদন তারা (বিএনপি) কোথায় করেছে আমার জানা নেই।’

আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, ‘উনি (খালেদা জিয়া) দুর্নীতি মামলায় আদালতের আদেশে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে আছেন। উনি কোনো আবেদন করতে চাইলে আদালতের মাধ্যমেই করতে হবে।’

খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছে, তার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে, যে কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানো প্রয়োজন। প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে পরিবারের আবেদন সম্পর্কে শামীম ইস্কান্দার সাংবাদিকদের বলেন, তার দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে যেকোনো অপূরণীয় ক্ষতি এড়াতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন।

পরিবারের পক্ষ থেকে ব্যয় বহনসহ তাদের দায়িত্বে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে আবেদনে।

খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম বলেন, ‘খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে আমরা বিদেশে নিতে চাচ্ছি। এখানে তার চিকিৎসা হচ্ছে না।’

আমারসংবাদ/এসটিএমএ