রবিবার ০৫ এপ্রিল ২০২০

২২ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২০,২০২০, ০১:০৪

ফেব্রুয়ারি ২০,২০২০, ০১:০৪

প্রকল্প মূল্যায়নে কোটি কোটি টাকা জলে!

  • আইএমইডি ঘাম ঝরালেও আমলে নেয় না মন্ত্রণালয়
  • একজন ডিজির সম্মানী সাড়ে তিন লাখ টাকা
  • আইএমইডি কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ

দেশকে এগিয়ে নিতে প্রতি বছরই সরকার উন্নয়ন কাজে বেশি করে ব্যয় করছে। এই উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ও মান ঠিকভাবে হয় কি না তা দেখার জন্য বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ডেস্ক কর্মকর্তা, ডিজি ও সচিব পর্যন্ত মাঠে যান।

তারা প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম পেলে তুলে ধরেন সংশোধনের জন্য। কিন্তু তারপরও ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আমলে নেয় না।

বরং প্রতিবেদনে নেতিবাচক কিছু থাকলে আইএমইডি কর্মকর্তাদের পাল্টা অপবাদ দেয়া হয়। এই মূল্যায়ন কাজে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।

আগে শুধু নিজ সেক্টরে একজন মহাপরিচালক (ডিজি) দায়িত্বে থাকলেও এবার সেই গণ্ডির সীমা ছাড়িয়ে বিভিন্ন সেক্টরের ৩৬টি প্রকল্পে সভা করার সুযোগ করা হয়েছে।

অন্য সেক্টরের অভিজ্ঞতা না থাকলেও একজন ডিজি তিন পর্যায়ে ১০৮টি সভায় অংশ নেবেন। এতে মাত্র তিন মাসে সম্মানী পাবেন সাড়ে তিন লাখ টাকা। শুধু সম্মানীর জন্যই তাদের ওই সব সভায় অংশ নেয়ায় চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে আইএমইডি কর্মকর্তাদের মধ্যে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ আমার সংবাদকে বলেন, আমরা দায়িত্ব মনে করে প্রতি বছর চলমান ও সমাপ্ত প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন করে থাকি।

কোন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা আমলে নিলো আর কে নিলো না তা দেখার বিষয় নয়। আমরা প্রকল্পের অসঙ্গতি ও দুর্বলতা পেলে তা তুলে ধরে সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করে থাকি।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই এসব প্রতিবেদনে আমাদের ঘাম ঝরে। কারণ আমি নিজেও মাঠ পরিদর্শনে যাই। কোনো অনিয়ম ও অসঙ্গতি পেলে প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হয়।

প্রচলিত আইন বা বিধিমালায় তাদের বিরুদ্ধে আমাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার নেই। তাই প্রকল্পের কাজ সুষুমভাবে ও মান ভালো করতে কিছু সুপারিশ করা হয় সরকারের কাছে।

তিনি আরও বলেন, অর্থ ব্যয় যাতে কম হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে ডিজিদের সভায় অংশ নেয়া কমানো হয়েছে। প্রয়োজনে আরও কমানো হবে। একই সাথে মূল্যায়ন প্রকল্পের সংখ্যাও বাড়ানো হবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার প্রতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশে যত প্রকল্প থাকে, সেগুলোতে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না তা দেখভালোর জন্য আইএমইডি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প নির্ধারণ করে। আটটি সেক্টরের আটজন ডিজির নেতৃত্বে এসব কাজ করা হয়।

কিন্তু আইএমইডির লোকবল কম থাকায় পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করতে নিয়োগ দেয়া হয় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। যাকে বলা হয় আউটসোর্সিং। এই আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সব কাজ করা হয়।

চলমান প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ার কারণে এবার মূল্যায়ন প্রকল্পের সংখ্যাও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৭২টি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে (চলমান প্রকল্প) ইনডেপ্থ ৪২টি এবং প্রভাব নিরুপণের জন্য (শেষ হওয়া প্রকল্প) ইনপ্যাক্ট ৩৬টি।

এই মূল্যায়ন কাজে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান দেখভাল করতে প্রাথমিকভাবে ইনসেপশন সভা করা হয়। এরপরে ডাটা সংগ্রহ করার পর প্রথম সভা করা হয়। তাতে কিছু ত্রুটি ধরা পড়লে সংশোধন করার জন্য ড্রাফট রিপোর্ট করা হয়। সব শেষে চূড়ান্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর তৃতীয় সভা করা হয়।

এসব সভা পরিচালনার জন্য আইএমইডি সচিবের নেতৃত্বে (আহবায়ক) ১২ সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটি করা হয়েছে। এতে সচিব সভাপতিত্ব করেন।

আর একজন ডিজি (সেক্টর প্রধান) সদস্য হয়ে উপস্থিত থাকেন। ডিজি আগে শুধু নিজ সেক্টরের প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকতেন কিন্তু এবার তাদের সেই সীমা বাড়িয়ে ৩৬টি প্রকল্পে অংশ নেয়ার সুযোগ করা হয়েছে।

এতে একজন ডিজি ৩৬টি স্টিয়ারিং কমিটিতে অংশ নিয়ে সম্মানী পাচ্ছেন এক লাখ ৬২ হাজার টাকা। কারণ প্রতিটিতে পাচ্ছে দেড় হাজার টাকা। ৯টি কর্মশালার টেকনিক্যাল কমিটির সভায় প্রধান হিসেবে পাবেন ৬৩ হাজার টাকা। কারণ প্রতিটিতে সম্মানী পাবেন সাত হাজার টাকা।

এছাড়া ৬৩টি সমীক্ষায় অংশ নিয়ে সম্মানী পাবেন এক লাখ ২৬ হাজার টাকা। কারণ প্রতিটি সমীক্ষায় পাবেন দুই হাজার টাকা সম্মানী। এভাবে একজন ডিজি মাত্র তিন মাসে সম্মানী পাচ্ছেন তিন লাখ ৫১ হাজার টাকা।

তারা নিজ সেক্টরের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকলেও কিভাবে এই অল্প সময়ে ১০৮টি সভায় অংশ নেবেন তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অধিনস্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, অন্যান্য বছর শুধু নিজ সেক্টরেই হিমশিম খেতে হয় স্যারদের।

তাহলে রুটিন কাজের বাইরে এতগুলো সভায় কিভাবে উপস্থিত থাকবেন। তারা অধিকাংশ সময় মাঠ পরিদর্শনে যেতে পারেন না। জুনিয়র কর্মকর্তারাই প্রকল্প পরিদর্শনে যান। তারা কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে নিয়ে আসেন।

গত বছর মেট্রোরেলসহ ২৪টি চলমান প্রকল্পের ওপর নিবিড় পরিবীক্ষণ করা হয়। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক লেনে উন্নীতকরণ সমাপ্ত প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে অসংখ্য প্রকল্প মূল্যায়ন করে বিভিন্ন ত্রুটি ও অনিয়ম তুলে ধরে সংশোধনের জন্য সুপারিশ করা হয়।

২০১০ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ২৬০টি প্রকল্প বিভিন্ন আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করেছে, তার কোনোটিরই সুপারিশ আমলে নেয়নি কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।

বরং অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালক এ প্রতিবেদককে বলেন, আইএমইডি ইচ্ছামতো প্রতিবেদন তৈরি করে। তারা প্রকল্প এলাকায় একাই গিয়ে ইচ্চামতো তথ্য তুলে ধরেন। আমাদের সাথে আলোচনা করেন না।

অথচ প্রতি বছর কোটি কোটি ব্যয় করা হচ্ছে এসব বিভিন্ন প্রকল্প মূল্যায়নে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১২টি প্রকল্প মূল্যায়ন করা হয়। পরের বছর ১৫টি। এভাবে প্রতি বছর বাড়ছে প্রকল্পের সংখ্যা।

গত বছর বেড়ে ৪৭টি প্রকল্প মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাতে ১৬ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করা হয়েছে। চলতি বছর ৭২টি প্রকল্প মূল্যায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তাতে প্রায় ২৪ কোটি টাকার বাজেট করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৩০টি পরামর্শক ফার্মের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আট কোটি টাকা। আর ৪২টি পরামর্শক ফার্মের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া প্রকল্প নির্বাচনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ৯০ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। তাই তো প্রতি বছর বেশি বেশি অর্থ ব্যয় করছে।

কিন্তু কিছু কর্মকর্তার কারণে কাজের মান ভালো হচ্ছে না। তা আইএমইডি তুলে ধরলে অন্যরা আমলে নেয় না তা হতে পারে না। এ ব্যাপারটি সরকারকে কঠিনভাবে ভাবতে হবে।

আমারসংবাদ/এমএআই