শুক্রবার ১০ এপ্রিল ২০২০

২৭ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

ফারুক আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২০,২০২০, ০১:১৬

ফেব্রুয়ারি ২০,২০২০, ০১:৩২

চাল রপ্তানি প্রত্যাহারে বেকায়দায় সিন্ডিকেট

দেশের ৮০ শতাংশ সাধারণ ভোক্তা বাজারে চাল ক্রয় করেন। যেখানে সর্বনিম্ন্ন চালের কেজি ৪৫ টাকা, সেখানে কৃষক ধান বিক্রি করছেন মাত্র ১২ টাকায়। এর মধ্যে সরকার চাল রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা দিলেও শেষমেশ তা প্রত্যাহার করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে দেশের চালের বাজারে কয়েকটি অটো-রাইস মিলের মালিকদের সিন্ডিকেটের কপাল পুড়লো।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করায় চলতি অর্থবছরে সেদ্ধ মোটা চাল রপ্তানির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে।

নতুন মৌসুমে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হওয়ার পরেও এ ধরনের চাল রপ্তানির কথা আর ভাবা হচ্ছে না।তবে সুগন্ধি চাল রপ্তানির পূর্ব সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে।

জানা যায়, দেশের চালের বাজারে বড় বেশ কয়েকটি অটোমেটিক রাইস মিলের মালিকদের একটা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে।

২০১৮ সালে যোগসাজশকারী অতি গোপনে চালের বাজারদরকে কয়েক মাস ধরে কৃত্রিমভাবে বেশ খানিকটা বাড়াতে সমর্থ হয়েছিল।

ওই সময় চালের কোনো উৎপাদন ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে চাল আমদানি অনেক কম হওয়ায় মুনাফাবাজির উদ্দেশ্যে বাজারে তাদের এক ধরনের কার্টেল পাওয়ার খাটাতে সমর্থ হয়েছিল তারা।

বড় চালকল মালিকদের ওই সিন্ডিকেট কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এর সঙ্গে দেশের চালের বাজারের বড় মোকামগুলোর বৃহৎ আড়তদারদের যোগসূত্রকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

মুনাফাবাজির সুযোগ সৃষ্টি হলে সংঘবদ্ধ মজুদদারির মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা চালের বাজারে আগুন লাগাতে এরা মোটেই দেরি করবে না (গত কয়েক সপ্তাহে চালের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর প্রয়াস আবারো জোরদার হয়েছে)।

বৃহৎ চালকল মালিক, মজুদদার ও অতি বড় ভূস্বামীদের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রপ্তানি ও ভর্তুকির সুফল লুটে নেবে অথচ দেশের ৮০ শতাংশ চাল কিনে খাওয়া সাধারণ ভোক্তা এর ফলে বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধির অসহায় শিকারে পরিণত হবে। আর চালের বাজারে আগুন লাগলে সব বাজারে মূল্যস্ফীতির আগুন ছড়িয়ে পড়তে মোটেও বিলম্ব হবে না।

সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৭ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন হওয়ার পর দেশের চাহিদা ঠিক রেখে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য রপ্তানির কথা চিন্তা করে সরকার।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ থেকে সুগন্ধি চালের পাশাপাশি সেদ্ধ মোটা চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

কৃষক পর্যায়ে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সে সময় পরীক্ষামূলকভাবে দুই লাখ টন চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। তবে এই সিদ্ধান্ত ছয় মাসের মধ্যেই প্রত্যাহার করে নেয় সরকার।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সেদ্ধ মোটা চাল রপ্তানির অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দুই মাস আগে নেয়া সে সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রেখেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এদিকে চাল রপ্তানির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অব্যাহতভাবে আবেদন জানিয়ে আসছেন চাল ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, এই মুহূর্তে দেশে প্রচুর চাল মজুত রয়েছে।

গত বছরের চালও রয়েছে গুদামগুলোতে। নতুন চালও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তাই স্থান সঙ্কুলানের অভাবে সংরক্ষণের এ চেষ্টা ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে এই মুহূর্তে ফের চাল রপ্তানির অনুমতি দিলে কৃষকরা লাভবান হবেন। তারা ন্যায্যমূল্য পাবেন।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ১০-১৫ লাখ টন চাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ খুব বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে না। কিন্তু কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারলে অভ্যন্তরীণ চালের বাজারে আগুন লেগে গেলে অন্যান্য পণ্যের দামেও ওই আগুন ছড়াতে দেরি হবে না।

অতএব, সিদ্ধান্তটি নিতে হবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের ন্যায্য দাম পাওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে। রপ্তানি না করেও যদি সরকার ন্যায্য দামে বাজার থেকে বেশকিছু পরিমাণ বোরো ধান সংগ্রহ করে সরকারের বাফার স্টক জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওই ধানের চাল শহরের গার্মেন্ট শ্রমিক ও গ্রামের প্রান্তিক অবস্থানের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ভর্তুকি দামে বিক্রয় করে সরকার রাজনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হবে বলেই আমার বিশ্বাস।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অটো, মেজর, হাসকিং ও মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, চাল রপ্তানির সুযোগ পেলে কৃষক লাভবান হবে। তারা ন্যায্য মূল্য পাবেন।

এতে তারা ধান উৎপাদনে উৎসাহী হবেন। দেশে প্রচুর ধান উৎপাদন হয়েছে। যা উদ্বৃত্ত। যদি ঘাটতি না থাকে, চাহিদা যদি পূরণ হয়, তাহলে রপ্তানিতে বাধা কোথায়? তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের চালের চাহিদা রয়েছে। তবে তাদের কথা আর কানে তুলছে না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়টির একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার ২০১৯ সালের জুলাইতে দুই লাখ টন চাল রপ্তানির সুযোগ দিলেও জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা মাত্র এক লাখ টনের মতো চাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে তারা তাল মেলাতে পারছে না বলে রপ্তানি করতে পারছে না। চাল কিনতে আগ্রহী দেশ যে দামে কিনতে চায়, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সে দামে বিক্রি করতে পারে না।

ওই দামে ভিয়েতনামের ব্যবসায়ীরা বিক্রি করে বলে বাংলাদেশ থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে চাল রপ্তানি করা যায়নি বলে মনে করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাই দেশের আপৎকালীন খাদ্য মজুত ঠিক রাখতে নতুন করে চাল রপ্তানির পরিকল্পনা নেই।

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সামনে রমজান। একই সঙ্গে বন্যার মৌসুমও সেটি। এসব কারণে খাদ্য নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকিতে যাওয়া যাবে না বলেই আমরা নতুন করে এ সময় মোটা চাল রপ্তানির কথা ভাবছি না।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, আপাতত মোটা সেদ্ধ চাল রপ্তানির অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। তবে সুগন্ধি চাল রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। কৌশলগত কারণেই মোটা চাল রপ্তানির অনুমতি বন্ধ রাখা হয়েছে।

আমারসংবাদ/এমএআই