শনিবার ০৪ এপ্রিল ২০২০

২১ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৪,২০২০, ০৯:৫৬

ফেব্রুয়ারি ২৪,২০২০, ০৬:০৮

সাত সুন্দরীতেই কোটিপতি পাপিয়া

  • ঢাকা ও নরসিংদীতে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়
  • সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, পতিতাবৃত্তি ও ব্ল্যাকমেইলে কোটি টাকার সাম্রাজ্য
  • যুব মহিলা লীগ থেকে আজীবন বহিষ্কার
  • ২০০১ সালে কমিশনার মানিক মিয়াকে হত্যা করেই আলোচনায় আসেন সুমন

সাত সুন্দরীতেই কোটিপতি নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমা নুর পাপিয়া। দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীর অভিজাত হোটেল ওয়েস্টিনে যাদের মাসিক ভিত্তিতে পরিশোধের মাধ্যমে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের এলিট শ্রেণির লোকদের মনোরঞ্জনের খোরাক বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা।

যার নমুনা মেলে র্যাবের অনুসন্ধানে। র্যাবের ভাষ্যানুযায়ী, ওই হোটেলটিতে দৈনিক বারের বিলই পরিশোধ করতেন আড়াই লাখ টাকা।

এছাড়া গত তিন মাসে ওই হোটেলের বিলবাবদ পরিশোধ করেন এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ হিসাবে সহজেই অনুমেয় অসহায় সাত সুন্দরীকে ব্যবহার করে হোটেল ওয়েস্টিন থেকে কামানো অর্থেই কোটিপতি বনে যান পাপিয়া।

এছাড়া অস্ত্র, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা তো রয়েছেই। রয়েছে তেজগাঁও এফডিসি গেট সংলগ্ন এলাকায় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গাড়ির শো রুম এবং নরসিংদীতে রয়েছে গাড়ির সার্ভিসিং সেন্টার। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালেই অনৈতিক সব কাজ করে আসছেন পাপিয়া।

চাঁদাবাজিসহ তদবির বাণিজ্যেও সক্রিয় পাপিয়ার অনৈতিক এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গড়ে তোলা কোটি টাকার সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন নরসিংদী ও ঢাকার একাধিক রাজনৈতিক রাঘববোয়ালের প্রত্যক্ষ মদদ— এমনটাই বলছে একাধিক রাজনৈতিক সূত্র।

র‌্যাব জানায়, পুলিশের এসআই ও রেলওয়ের বিভিন্ন পদে সাধারণ মানুষকে চাকরি দেয়ার কথা বলেও বিপুল অর্থ হাতিয়েছেন পাপিয়া ও সুমন দম্পতি। শুধু তাই নয়, জমির দালালি, সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স দেয়া, গ্যাসলাইন সংযোগের নামেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়েছেন মোটা অঙ্কের অর্থ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে এ দম্পত্তির রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থও।

অনৈতিক কাজে দাপিয়ে বেড়ানো পাপিয়ার খুঁটির জোর কোথায় এমন আলোচনায় স্থানীয় ও একাধিক রাজনৈতিক সূত্র জানায়, ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমনের উত্থান শুরু। শৈশব থেকেই যার প্রধান পেশা ছিলো চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্ল্যাকমেইলিং।

দূরদর্শী চতুর ও মাস্টারমাইন্ড সুমন রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও সে সময় থেকেই গড়ে তোলে সখ্যতা। ২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়া হত্যার পরই মূলত আলোচনায় আসেন সুমন। এরই মধ্যে পাপিয়াকে বিয়ে করেন সুমন। তারপর থেকেই সুমন রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে পাপিয়াকে কাজে লাগান রাজনৈতিক অঙ্গনে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর দুর্বৃত্তায়ন রোধে বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল সন্ত্রাসী সুমন ও তার স্ত্রী পাপিয়া চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে আসতে নিষেধ করেন।

পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিভাজনকে কেন্দ্র করে পাপিয়া চৌধুরী ও তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন সদর আসনের এমপি লে. কর্নেল (অব.) মো. নজরুল ইসলামের (বীরপ্রতীক) বলয়ে যোগ দেন। পাশাপাশি তাদের ঢাকা সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গেও সখ্যতা গড়ে ওঠে পাপিয়ার।

এরই মধ্যে ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে তৌহিদা সরকার রুনা সভাপতি ও পাপিয়া চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এরপর থেকেই মূলত পাপিয়া হয়ে ওঠেন অদম্য। শুরু করেন অনৈতিক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও তদবির বাণিজ্য।

রাজনীতির অন্তরালে অস্ত্র, মাদক ও দেহ ব্যবসায় জড়িত থাকার দায়ে শনিবার শাহজালাল বিমানবন্দরে আটকের পর থেকেই পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনকে নিয়ে নরসিংদীজুড়ে চলছে সমালোচনার ঝড়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হচ্ছে বাইজি সর্দারনিবেশে পাপিয়ার ভিডিও। নারী নেত্রীর অন্তরালে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কথা বের হতে শুরু হয়েছে। মুখ খুলতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও পতিতাবৃত্তি ব্যবসার পাশাপাশি ব্ল্যাকমেইল করে গড়ে তুলেছেন কোটি টাকার সাম্রাজ্য।

সাত সুন্দরীর অনৈতিক কার্যকলাপের ভিডিও ধারণ করে এলিট শ্রেণির ধণাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতানোই ছিলো এ দম্পতির প্রধান পেশা। পাপিয়া-সুমনের নেপথ্যের কাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সন্ত্রাসী এই দম্পতির কথাই এখন ‘টপ অব দ্য টাউন’।

র্যাব জানায়, পাপিয়ার বাৎসরিক বৈধ আয় মাত্র ১৯ লাখ টাকা হলেও অনৈতিক কাজে ব্যবহূত ব্যয়বহুল হোটেল ওয়েস্টিনে তিন মাসের বিল পরিশোধ করেন এক কোটি ৩০ লাখ টাকা।

কিভাবে সম্ভব তার অনুসন্ধান করতে গিয়েই র‌্যাব শুধু চাঞ্চল্যকর তথ্যই পায়নি বরং দেশত্যাগের সময় শনিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটকও করে।

আটক করা হয় তার স্বামী সুমন, সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়িব্যাকেও। এরপর থেকেই শুধু নরসিংদীই নয়, গোটা দেশজুড়েই সমালোচনার ঝড় বইছে। জন্ম নিচ্ছে নানা প্রশ্নের, যেসবের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ক্ষমতার দাপটে এতটাই বেপরোয়া হয়েছেন পাপিয়া, নারী হয়েও যেন তিনি তার বোধ হারিয়েছেন এমনটা বলছে অনেকেই। যুব মহিলা লীগের জেলাপর্যায়ের এ নেত্রীর ফার্মগেটের বাসায়ও গতকাল অভিযান চালায় র‌্যাব।

সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

ফার্মগেটে পাপিয়ার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নরসিংদী শহরে দুটি ফ্ল্যাট, দুই কোটি টাকা মূল্যের দুটি প্লট, চারটি বিলাসবহুল গাড়ি এবং গাড়ি ব্যবসায় প্রায় দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্যও পায় র্যাব।

এছাড়াও এ দম্পত্তি রেলওয়ে ও পুলিশে চাকরির প্রলোভনে ১১ লাখ টাকা, একটি কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা বলে ৩৫ লাখ টাকা, একটি সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স করে দেয়ার কথা বলে ২৯ লাখ টাকা নিয়েছেন বলেও প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের কথাও জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক শফিউল্লাহ বুলবুল বলেন, পাপিয়ার আয়ের অন্যতম উৎস নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করানো। ঢাকার বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে কমবয়সি মেয়েদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করতেন পাপিয়া। যাদের অধিকাংশকে নরসিংদী এলাকা থেকে চাকরির প্রলোভনে ঢাকায় আনা হয়েছিল। অনৈতিক কাজে বাধ্য না হলে তাদের নানভাবে করা হতো নির্যাতন।

এদিকে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আখতার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল জানানো হয় অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে পাপিয়াকে যুব মহিলা লীগ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাপিয়ার এমন কাণ্ডে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। ভেসে বেড়াচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে তোলা পাপিয়ার ছবি। ফেসবুক পোস্টে পাওয়া সেসব ছবিতে কেউ কেউ মন্তব্য করছেন ছবিতে থাকা দলের বড় নেতাদের সংস্পর্শে থেকেই পাপিয়ার অপরাধ জগতে এমন উত্থান।

আবার কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, যে হোটেলে এসব করছেন তিনি সে হোটেলের বিরুদ্ধেও কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না, যারা অপরাধ সংগঠনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে দিলো।

আবার অনেকে বলছেন, অর্থপাচারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও তা দেখবে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এছাড়াও নানা রকমের মুখরোচক আলোচনা-সমালোচনা চলছেই।

র‌্যাব জানায়, পাপিয়া সমাজসেবার নামে নরসিংদী এলাকায় অসহায় নারীদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের অনৈতিক কাজে লিপ্ত করতেন। এজন্য অধিকাংশ সময় নরসিংদী ও রাজধানীর বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করে অনৈতিক কাজে নারী সরবরাহ করে আসছিলেন তিনি।

এর মধ্যে হোটেল ওয়েস্টিনে অসহায় সাত সুন্দরী নারীকে নিয়ে অনৈতিক ব্যবসার রহস্যও বের করতে সক্ষম হয় র‌্যাব। এ ব্যবসাতেই তিনি হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। হোটেল ওয়েস্টিনে প্রেসিডেন্ট স্যুট নিজের নামে সবসময় বুকড করেই চালিয়ে আসছেন নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিউল্লাহ বুলবুল বলেন, পাপিয়া গত তিন মাসে শুধু ওয়েস্টিন হোটেলে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। তার নামে ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট সবসময় বুকড থাকতো।

হোটেলে প্রতিদিন শুধু বারের খরচবাবদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা পরিশোধ করতেন। ওয়েস্টিনে তার নিয়ন্ত্রণে সাতটি মেয়ের কথা জানা গেছে। যাদের প্রতি মাসে ৩০ হাজার করে মোট দুই লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতেন তিনি।

র‌্যাব জানায়, নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজির জন্য পাপিয়ার একটি ক্যাডারবাহিনী রয়েছে। স্বামী সুমনের সহযোগিতায় অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি নরসিংদী ও ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন।

এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ধরনের তদবির বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত। এদিকে পাপিয়ার স্বামী সুমন পেশায় ব্যবসায়ী। দেশে স্ত্রীর ব্যবসায় সহযোগিতার পাশাপাশি থাইল্যান্ডে তার বারের ব্যবসা রয়েছে।

তিনি তার স্ত্রীর মাধ্যম প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় নারীদের অনৈতিক কাজে ব্যবহার করতেন। অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য নরসিংদী এলাকায় তার কুখ্যাতি রয়েছে।

আটক সাব্বির খন্দকার পাপিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী এবং তায়্যিবা মতি সুমনের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। পাপিয়া ও মতি সুমনের ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব রক্ষণাবেক্ষণসহ সব অবৈধ ব্যবসায় এবং অর্থপাচার ও রাজস্ব ফাঁকি দিতে সহযোগিতা করে আসছিলেন তারা।

আমারসংবাদ/এমএআই