শুক্রবার ০৩ এপ্রিল ২০২০

২০ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

রফিকুল ইসলাম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৪,২০২০, ১০:০৮

ফেব্রুয়ারি ২৪,২০২০, ১০:০৮

তৃণমূল আ.লীগে নতুন নেতৃত্ব

পকেট কমিটির শেষ কোথায়!

  • বিলয় ভারী করছেন দলের প্রভাবশালীরা
  • কেউ মানছেন না হাইকমান্ডের নির্দেশনা
  • কোণঠাসা পরিশ্রমী ও পরীক্ষিতরা
  • পিকেট কমিটির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন

তৃণমূলে থামছেই না পকেট কমিটি গঠন। দায়িত্বশীল অধিকাংশ নেতা কেন্দ্রীয় নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে পকেট কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিজ নিজ বলয় ভারী করছেন। তাদের এমন কার্যক্রমে বাদ পড়ছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা।

একই সাথে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। তৃণমূলের রাজনীতিতে এমন অবস্থা তৈরি হলেও মানতে নারাজ দলটির দায়িত্বশীল নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, তৃণমূলে পকেট কমিটি নয়, সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেই ত্যাগী, পরিশ্রমী ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে।

গতকাল ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মুন্সিগঞ্জ জেলার নেতাদের সাথে বর্ধিত সভা করেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। কার্যালয়ের ভেতরে তাদের বর্ধিত সভা চলাকালীন সময়ে কার্যালয়ের বাইরে তৃণমূলে বিভিন্ন ইউনিটিতে পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগে মানববন্ধন করেন জেলার শ্রীনগর থানার বিভিন্নপর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

এসময় তারা অভিযোগ করেন, শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এবং নিজ বলয় ভারী করতেই ঘরে বসে পকেট কমিটি গঠন করছেন।

মানববন্ধনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার দায়িত্বশীল নেতা ও স্থানীয় সাংসদের ইন্ধনে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে উপজেলাপর্যায়ের সভাপতি-সম্পাদকরা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সম্মেলন ছাড়াই ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানাসহ বিভিন্নপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছেন। ফলে দলের দায়িত্বশীল পদপদবি থেকে বাদ পড়ছেন তৃণমূলের পরীক্ষিত ও ত্যাগীরা।

গঠিত কমিটি হয়ে পড়েছে পকেট লীগ। এমন অবস্থায় জেলার তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মাঝে বেগবান হতে শুরু করেছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বিষয়টি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন স্থানীয় পদবঞ্চিতরা।

গজারিয়া থানার নেতা মুসা আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, গজারিয়া থানার কোনো ইউনিয়ন সম্মেলন করা হয়নি। ঘরে বসে টাকার বিনিময়ে কমিটি করছে গজারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম।

এর সঙ্গে যুক্ত আছেন থানার সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন এবং মুন্সিগঞ্জ জেলার মূলপর্যায়ের নেতারা। কোলাপাড়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড সভাপতি মো. শওকত হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, দায়িত্বশীল নেতারা ঘরে বসে তৃণমূল কমিটি করছে। টাকার বিনিময়ে উপজেলা ও জেলাপর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা বিএনপি-জামায়াতপন্থি নেতাদের দলের দায়িত্বশীল পদপদবিতে বসিয়ে নিজ নিজ বলয় ভারী করছেন।

তাদের এসব কার্যক্রমের কারণে ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাকর্মীরা কেউ কমিটিতে আসতে পারছেন না। কোলাপাড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা বারবার অভিযোগ দেয়ার পরও জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি, তাই বাধ্য হয়ে আজ আমরা মানববন্ধন করছি।

মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ শেখ মো. লুৎফর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, সম্মেলন ছাড়া যেসব কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেসব কমিটি আমরা বাতিল করে দিয়েছি।

পকেট কমিটি গঠন বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক বলেন, তৃণমূলে পকেট কমিটি নয়, সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেই ত্যাগী, পরিশ্রমী ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছু কিছু স্থানে কমিটি গঠনে অনিয়ম হয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

আ.লীগ সূত্রে, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষ করে জেলা, মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ইউনিটে সম্মেলনের মধ্যদিয়ে চাঁদাবাজ, টেন্ডার ও দখলবাজ, জুয়া কারবারি, মাদক ব্যবসায়ী এবং তৃণমূলপর্যায়ে দলের মধ্য বিভেদ সৃষ্টিসহ নানা অপকর্মে জড়িতদের দল থেকে ছেঁটে ফেলতে চান সরকারপ্রধান।

দলীয় প্রধানের এমন নির্দেশনার পর থেকেই তৃণমূলে সৎ, আদর্শবান, জনপ্রিয় ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠনের জন্য কাজ শুরু করেন কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

কিন্তু মাঠের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, এমপি ও মন্ত্রীদের ইচ্ছায় নিজ নিজ বলয়ের নেতাদের বসানো হচ্ছে দায়িত্বশীল পদপদবিতে। এতে হতাশ ও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন দলের ত্যাগী ও পরিশ্রমীরা। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন বহুদিনের পরীক্ষিত রাজপথের নেতাকর্মীরাও।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে টানা তৃতীয় মেয়েদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। দলটি সরকার গঠনের পর থেকেই দল ও সরকারকে আলাদা করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সর্বশেষ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্যদিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েন বেশ কয়েকজন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য।
একই সাথে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শীর্ষ পদগুলোতে স্থানীয় সাংসদকে না রাখতে নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। তার এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূলে পকেট কমিটি দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

স্থানীয় সাংসদরা বিভিন্ন ইউনিটিতে নিজ নিজ বলয়ের নেতাদের দায়িত্বশীল পদে বসিয়ে পকেট কমিটি তৈরি করছেন। আর এ কারণেই ভোটে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে কমিটি দেয়ার চেষ্টা করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এতে অনেক এলাকার জনপ্রিয়, সৎ, নিষ্ঠাবান নেতা বাদ পড়ছেন। দায়িত্ব পাচ্ছেন এমপির আস্থাভাজনরা।

আমারসংবাদ/এমএআই