শুক্রবার ০৩ এপ্রিল ২০২০

২০ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

ফেব্রুয়ারি ২৪,২০২০, ১০:৩৮

ফেব্রুয়ারি ২৪,২০২০, ১০:৩৮

ডিএপি সারের জন্য হাহাকার কৃষকরা নিচ্ছেন না টিএসপি

কৃষকের লোকসান কমাতে সরকার প্রতি বস্তা ডিএপি সারে ৪৫০ টাকা বা প্রতি কেজিতে কমিয়েছে ৯ টাকা। এ সুযোগ কাজে লাগাতে কৃষকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ জেলায় তাদের অপ্রত্যাশিত চাহিদা বেড়ে গেছে। কৃষকদের বাড়তি চাহিদা মেটাতে ডিলারদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। চলছে সারের জন্য হাহাকার। নওয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ৯৩৫ টাকা বস্তাও বিক্রি হচ্ছে।

অপরদিকে প্রতি বস্তা টিএসপি সারে সরকারের কাছে এক হাজার টাকা জমা দেয়া হলেও কৃষকরা নিচ্ছে না। কম টাকাতেও রি-ডিলাররা নিচ্ছে না টিএসপি সার। ইউরিয়া সারও বিক্রি করতে পারছেন না ডিলাররা।

এর ফলে গোডাউনে জমছে লাখ লাখ টন ইউরিয়া সার। এমন পরিস্থিতিতে উভয় সংকটে পড়েছেন ডিলাররা। লোকসান থেকে রক্ষা পেতে প্রতি বস্তা টিএসপিতে ২০০ টাকা কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

তা না হলে জানে বাঁচতে মানববন্ধনের মতো কঠিন অবস্থানে যেতে পারেন তারা। কারণ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও বিক্রি করতে পারছেন না কোনো টিএসপি ও ইউরিয়া সার। দেশের বিভিন্ন জেলায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমনই অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে কৃষিসচিব মো. নাসিরুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, কৃষকদের স্বার্থে ডিএপি সারের দাম কমানো হয়েছে। এ কারণেই চাহিদা বেড়ে গেছে। এতে বড় ডিলারদের মধ্যে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

তবে ডিএপি সারের কোনো সংকট নেই। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিএপি সারের দাম কমার কারণে টিএসপি সারের চাহিদাও কমে গেছে, এ তথ্য আমাদের কাছেও এসেছে। তবে ব্যবহার একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি বা হবে না।

কারণ ফসল উৎপাদনে কৃষকদের সব সারই ব্যবহার করতে হয়। এ জন্য বলা যায়, টিএসপি সারের ব্যবহার ধীরে ধীরে হলেও হবে বা চলবে। ডিলাররা লোকসান দিয়েও টিএসপি বিক্রি করতে পারছে না— এ অবস্থায় সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা এমন প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিক্রি না হলে ডিলারদের কাছে থাকবে, তারা কৃষকের কাছে ধীরে ধীরে বিক্রি করবেন।

তিনি আরও বলেন, ডিএপির কারণে টিএসপি ও ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমে গেছে। এ ব্যাপারে আমরা অবহিত। সব মিলিয়ে বলা যায়, ডিএপির দাম কমার কারণে এ সমস্যা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই। তবে খোঁজখবর রাখা হবে বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

এ ব্যাপারে জানতে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সচিব রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, সরকারের বরাদ্দ অনুযায়ী ডিলাররা সার নিয়ে কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন। আমদানিকারক বা প্রাইভেট সেক্টর, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিএডিসি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিআইসির এসব সার কৃষকদের দেয়া হয়।

বর্তমানে ডিএপির দাম কমার কারণে ব্যাপকভাবে চাহিদা বেড়ে গেছে। তাই কোথাও ঘাটতির খবর পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাসেজ দেয়া হচ্ছে তাড়াতাড়ি সরবরাহ করার জন্য। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কেউ বেশি দামে ডিএপি বিক্রি করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করবে।

এ ব্যাপারে সরকারের কড়া নির্দেশ রয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিএপির কারণে টিএসপির চাহিদা কমে গেছে। কারণ এটার দাম বেশি। ইউরিয়া সারের চাহিদাও কমে গেছে। তবে একেবারে বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়নি বলে জানান তিনি।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ৪ ডিসেম্বর ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের দাম কৃষকপর্যায়ে প্রতি কেজিতে ৯ টাকা করে কমানো হয়েছে।

ওইদিন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক জানান, কৃষকপর্যায়ে ডিএপি সারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা এবং ডিলারপর্যায়ে প্রতি কেজি ২৩ টাকা থেকে কমিয়ে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সারের দাম কমানোর ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, সুষম সার ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ, গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ পরিবেশবান্ধব টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার ডিএপি সারের মূল্য পুনরায় হ্রাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

দেশের বৃহত্তম সারের মোকাম যশোরের নওয়াপাড়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার বস্তা সার বিক্রি হয়।

সম্প্রতি ডিএপি সারের দাম কমায় কৃষকের ব্যাপক চাহিদা বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়েও অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ডিএপি।

নওয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার ডিলাররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, ৭০০ টাকার ডিএপির বস্তা ৯৩৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। অপরদিকে সরকারের ঘরে এক হাজার টাকা জমা দিলেও তার চেয়ে কম দামেও টিএসপি সার নিচ্ছেন না রি-ডিলাররা।

তাই প্রতি বস্তায় ২০০ টাকা কমানো হলে ডিলাররা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন। অপরদিকে বিক্রিও বাড়বে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ডিলার জানান।

ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার মেদনীসাগর গ্রামের মামুন এ প্রতিবেদককে জানান, ডিএপি সারের দাম কমানোর কারণে এর ব্যবহার খুবই বেড়ে গেছে। এতে ব্যয় কম হচ্ছে। তাই প্রত্যাশার চাইতেও বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে টিএসপি সারে। সেটার বেশি দাম, তাই কৃষকরা কিনছে না। একই কথা জানান নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার আদমপুরের এনামুল হক।

তিনি বলেন, কম দামে ডিএপি ভালো সার পাওয়ায় আমরা বেশি দামে টিএসপি সার কিনছি না। ইউরিয়া সারের ব্যবহারও কমে গেছে। এভাবে ডিএপি সারের দাম কমায় আমাদের একটু হলেও উৎপাদন ব্যয় অন্যান্য বছরের চেয়ে কমবে।

কৃষকরা ডিএপি সারে হুমড়ি খেয়ে পড়ায় ডিলাররা চরমভাবে বিপাকে পড়েছেন। চাহিদা এতো বেড়েছে যে, কৃষকরা ৭০০ টাকা বস্তা দিতে চাইলেও দিতে পারছেন না। অপরদিকে ডিলাররা প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ৭০০ টাকার বেশি দামে কিনে কম দামে দিতে চাইলেও কৃষকরা বোরোর ভরা মৌসুমেও নিচ্ছে না। আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে ইউরিয়ার চাহিদা।

এর ফলে এই ভরা মৌসুমেও বিসিআইসির কাছে মজুদ বাড়ছে। ফলে ডিলারপর্যায়েও বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সারের মজুদ গড়ে উঠছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, ডিলাররা এই ভরা মৌসুমেও বিসিআইসির কারখানা বা বাফার গুদাম থেকে ইউরিয়া সার তুলতেই চাইছে না।

এখন মাঠে ইউরিয়া সারের চাহিদা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে, ডিলাররা এখন বোরো আবাদের ভরা মৌসুমেও ইউরিয়া সার তুলতে চাইছেন না। ইতোমধ্যে বিসিআইসির কাছে ইউরিয়া সারের মজুদ প্রায় ১১ লাখ টনে গিয়ে পৌঁছেছে। অথচ কয়েক মাস আগেও এই মজুদ ছিলো আট লাখ টন।

অথচ বোরো মৌসুমের চার মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৫ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। অনেক ডিলার তাদের কেন্দ্রীয় সংগঠন ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনকে জানিয়েছে যে, তারা আর ইউরিয়া সার নেবে না।

বিপরীতে বিভিন্ন জেলা থেকে ডিএপি সারের বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য ডিলাররা তাগাদা দিচ্ছেন কর্তৃপক্ষের কাছে। তারপরও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। কারণ জেলা প্রশাসক অফিস থেকে চাহিদাপত্র কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের কৃষিতে সাধারণত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড ব্যবহার করা হয়। টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) এ দুটোই হলো ফসফেট জাতীয় রাসায়নিক সার।

এই সার দুটোতে শতকরা ২০ ভাগ ফসফরাস থাকে। টিএসপিতে শতকরা ১৩ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ১.৩ ভাগ গন্ধক রয়েছে। ডিএপিতে ফসফেট ছাড়াও ১৮ ভাগ নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকে। যার কারণে ডিএপি সার প্রয়োগ করলে বিঘা প্রতি পাঁচ কেজি ইউরিয়া সার কম দিতে হয়।

এছাড়া ডিএপি একটি সুষম সার। এই সারের মধ্যে ফসফেট, অ্যামোনিয়া এবং পটাশ রয়েছে। অর্থাৎ ডিএপি সার একাধারে ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) এবং ইউরিয়া সারের কাজ করে। ফলে ডিএপি সার জমিতে প্রয়োগ করলে আর আলাদাভাবে ফসলে এই তিনটি সার প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। তাই অন্য সার ব্যবহারে বিমুখ হয়ে পড়ছে কৃষকরা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) এ দুটোই ফসফেট সমৃদ্ধ রাসায়নিক সার। বাংলাদেশে এ সার দুটোর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দানাদার দ্রব্য হিসেবে এ সার দুটো বাজারজাত করা হয়। এ সার দুটোতেই শতকরা ২০ ভাগ ফসফরাস থাকে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক সম্প্রতি বলেছেন, আমরা চাই সারের জন্য আর কোনো কৃষককে যেন কষ্ট করতে না হয়। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে। কৃষকপর্যায়ে মিশ্র সার ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ভেজাল সার প্রতিরোধে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো গাফিলতি মেনে নেয়া হবে না।

বিএডিসি সূত্র জানায়, দেশের মোট চাহিদার সার সরকারি-বেসরকারিভাবে উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। যশোরসহ সারা দেশে ৮৫টি স্থানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ১১৩টি গুদামে সার মজুদ করে ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকের কাছে বিক্রি করা হয়। গত অর্থবছরে ১১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানি করে বিতরণ করেছে ১১ লাখ টনের বেশি।

এছাড়া বিসিআইসিও সার উৎপাদন করে কৃষকের কাছে সরবরাহ করছে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে তাতে সারের জন্য কোনো রকম সমস্যা হবে না। ইউরিয়া সার ব্যবহারের প্রভাবে সবুজ উদ্ভিদ আরও সবুজ হয়।

অন্যদিকে ডিএপি ফসফেট ও নাইট্রোজেনসহযোগে একটি মিশ্র সার হওয়ায় এর ব্যবহারে গাছ শক্তিশালী হয়, ফসলের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ও ফসল পুষ্ট হয়।

ডিএপি সার ব্যবহারের ফলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি কমে যাবে। টিএসপি সার মাটির ফসফরাসের ঘাটতি পূরণ করে। ফসফরাস গাছের শিকড় মজবুত করে, সময়মতো ফুল ফোটায়, ফসল পাকায় এবং গুণগত মান বাড়ায়।

আমারসংবাদ/এমএআই