মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০

১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৪০

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৪০

অবিক্রিত সবজি নিয়ে বিপাকে কৃষক

দিশাহারা কৃষি খাত

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সব কিছুতে স্থবিরতা দেখা দেয়ায় বিপর্যস্ত দেশের কৃষি খাত। প্রতিদিনের উৎপাদিত অবিক্রিত সবজি নিয়ে বিপাকে দেশের কয়েক লাখ কৃষক।

হাটে সবজি বিক্রি করে উৎপাদন খরচতো দূরের কথা ভ্যানভাড়াই তুলতে পারছেন না কৃষক। সারা দেশের পাইকারি হাটে সব ধরনের সবজির দাম কম। ফলে কৃষক অল্পদামে সবজি বিক্রি করে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন।

এদিকে ঢাকাসহ সারা দেশের শহরাঞ্চলে ৬০ টাকার কেজি দরের নিচে কোনো সবজি নেই। খুচরাপর্যায়ে সবজির দাম বাড়লেও কৃষক তা পাচ্ছেন না। সবজির প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। মূলত লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন পাইকারি পর্যায়ের ক্রেতারা কিনছেন কম। এতে তারা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করছেন। হাটে পর্যাপ্ত সবজি থাকলেও পাইকারি ক্রেতারা কিনছেন একেবারেই কম।

সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম এলাকা বগুড়া। আর মহাস্থান হাট এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাইকারি সবজির হাট হিসেবে পরিচিত।

এখান থেকে পাইকাররা রাজধানীর কারওয়ানবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক সবজি নিয়ে আসেন। করোনা ভাইরাসের কারণে এখন দেশব্যাপী চলছে হোম কোয়ারেন্টাইন। এর প্রভাব পড়েছে সবজির এখানে বাজারগুলোতে।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মেঘাখর্দ গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম নিজের জমিতে চাষ করা পাঁচ মণ বেগুন বিক্রি করতে এসেছিলেন মহাস্থান হাটে। সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত রোদে দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্রেতার আশায়।

কিন্তু এই চার ঘণ্টায় বিক্রি করতে পারেননি এক কেজি বেগুনও। একই অবস্থা গাবতলী উপজেলার দাড়াইল গ্রামের কৃষক আব্দুল কাফীর। তিনি নিয়ে এসেছেন ৯ মণ টমেটো। ৫ টাকা কেজি দরেও বিক্রি করতে পারছেন না কষ্টে ফলানো টমেটো।

এখানে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মহাস্থান পাইকারি হাটে গতকাল কাঁচামরিচ কেজি ৬ টাকা, বেগুন ২-৪, পেঁয়াজ ২৫-৩০, মিষ্টি কুমড়া ১০-১৫ টাকা পিস, বাঁধাকপি ১ টাকা, করলা ২০, লাউ ১০-১৫ টাকা পিচ, গাজর ৮, টমেটো ৫, সজনা ডাটা ১০০, ঢেঁড়স ৩০, পটল ৩০, লালশাক ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার খামারপাড়া গ্রামের কৃষক আজাদুর রহমান বলেন, চৈত্র মাসে বগুড়া অঞ্চলের মানুষ মুলা খেতে চায় না। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে এ সময় মুলার ব্যাপক চাহিদা থাকে।

গতবছর চৈত্র মাসে ১১শ টাকা মণ দরে মুলা বিক্রি করেছিলেন। এ কারণে এবারও কয়েক বিঘা জমিতে মুলাচাষ করেছেন। কিন্তু, এবার করোনা ভাইরাসের প্রভাবে মুলা বিক্রি করতে পারছেন না।

এদিকে পাইকারি বাজারে সবজির দাম একেবারে কম হলে শহরের খুচরা বাজারগুলোতে ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি দামে সবজি বিক্রি হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে আমদানি কমের অজুহাতে তারা বেশি দামে সবজি বিক্রি করছেন।

গতকাল ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায় বাজারে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২৮-৩৫ টাকা, চিচিঙ্গা ১২০-১৪০, শিম ৫০-৬০, টমেটো ৪০-৬০, কাঁচামরিচ ১০০-১২০, করলা ১০০-১১০, বেগুন ৭০-১০০, গাজর ৫০-৮০, পেঁপে ৩০-৪০, শসা ৫০-৮০, শিমের বিচি ১৩০-১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অনেকেই ঘরে থাকার প্রস্তুতি হিসেবে গত কদিন ধরে বেশি করে পণ্য কিনছেন। যে কারণে ঢাকার বাজারগুলোতে এর প্রভাব এখনো রয়েছে। তবে করোনার প্রভাবে কৃষক প্রকৃত দাম পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ক্রেতা কম থাকলে সাধারণ জিনিসপত্রের দাম কমার কথা। কিন্তু কমছে না, কারণ চালসহ বেশকিছু পণ্য পচে না। বিক্রেতারা ভালো করেই জানেন, এই পণ্যগুলোর চাহিদা আগামীতে আরও বাড়বে, সে কারণে তারা কম দামে এসব পণ্য ছাড়ছেন না।

এছাড়া পণ্য আনা-নেয়া করা ড্রাইভারদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পুলিশি বাধার কারণে বর্তমানে পণ্য সরবরাহ কিছুটা কমে এসেছে বলেও মনে করেন তিনি। এতে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ছে।

এদিকে বিক্রেতারা জানান, ক্রেতার সংখ্যা কমলেও বেচা-বিক্রি ভালো। কারণ, যারা আসছেন তারা আট-দশ দিনের বাজার একসঙ্গে নিচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারগুলোতেও মানুষের আনাগোনা কম দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীর মানিকনগর বাজারের ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী জানান, খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাইরে বের হচ্ছে না। পুলিশও টহল দিচ্ছে। যে কারণে ক্রেতা কম। তবে গত দুই-তিন দিন ধরেই যারা বাজারে আসছেন তারা ১০-১৫ দিনের বাজার একসঙ্গে করছে। ফলে জিনিসপত্রের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ