সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

এনায়েত উল্লাহ

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৯,২০২০, ১২:৫৭

এপ্রিল ০৯,২০২০, ১২:৫৭

করোনার আতঙ্ক তাবলিগ জামাত

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে সারা পৃথিবী এখন স্থবির। চীনের উহান থেকে এটা ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রথমদিকে বিদেশফেরতদের মাধ্যমেই এর সংক্রমণ ঘটেছে। তাই সারা দেশের মানুষই বিদেশফেরতদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে।

কিন্তু বর্তমানে সব ছাপিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তাবলিগ জামাতফেরতরা। রাজশাহীর বাঘায় তাবলিগ জামাতের চিল্লা ফেরৎ এক বৃদ্ধের (৬৫) মৃত্যু হয়েছে। এলাকাবাসীর সন্দেহ তিনি করোনা সংক্রমণে মারা গেছেন। এমন খবরে ৫ ঘণ্টা মরদেহের কাছে যায়নি কেউ।

গতকাল বুধবার সকাল ৬টার দিকে এলাকার একটি মাদ্রাসায় মারা যান ওই ব্যক্তি। তিনি উপজেলার উত্তর মিলিকবাঘা গ্রামের বাসিন্দা। স্বজনদের ভাষ্য, তিনি সমপ্রতি তাবলিগ জামাত দলের সঙ্গে চিল্লায় কুষ্টিয়া এলাকায় গিয়েছিলেন। চিল্লা শেষে গত ৫ এপ্রিল তিনি নিজ এলাকায় ফেরেন।

পরে বাড়িতে উঠতে না দিয়ে তাকে বাঘা উৎসব পার্কের পাশে এক মাদ্রাসায় রাখা হয়। অসুস্থ হয়ে গতকাল সেখানেই মারা যান ওই বৃদ্ধ।

এলাকাবাসী জানায়, তার মৃত্যু করোনায় হয়ে থাকতে পারে। এতে আতঙ্কে কেউ মরদেহের কাছে যাচ্ছেন না। প্রায় ৫ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মরদেহ মাদ্রাসার এক কক্ষে পড়ে আছে।

ওই বৃদ্ধের ছেলে জানান, তার বাবার মধ্যে কোনো করোনা উপসর্গ নেই। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আলাদাভাবে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও করোনা সন্দেহে বাবার কাছে কেউ যাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা জানান, খবর পেয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দায়িত্বরত চিকিৎসককে বলা হয়েছে।

এদিকে তাবলিগ জামাত থেকে ফিরে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকালে ঘাটাইল উপজেলার আনেহলা ইউনিয়নের পাটিতাকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মৃত বৃদ্ধের নাম কলেজ মিয়া। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা।

তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে আনেহলা ইউপি চেয়ারম্যান তালুকদার মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, ১০-১২ দিন আগে তাবলিগ জামাত থেকে উপজেলার পাটিতাকান্দি গ্রামের নিজ বাড়িতে ফেরেন কলেজ মিয়া। এরপরই তিনি জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবস্থা গুরুতর হলে মঙ্গলবার সকালে বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি দল মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করেছে। এ ঘটনার পর থেকে ওই বৃদ্ধের বাড়িটি লকডাউন করা হয়েছে।

এছাড়াও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাবলিগ জামাতের ৩২১ জন কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। করোনা সংক্রমণ রোধে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাবলিগ জামাতের ৩২১ জন বিদেশি মুসল্লিকে ঢাকায় এনে দুটি মসজিদে রাখা হয়েছে। মুসল্লিদের গত শুক্রবার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের রাজধানীতে আনা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, আপাতত মসজিদ দুটিতে বাইরে থেকে কাউকে প্রবেশ করতে কিংবা ভেতর থেকে কাউকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। দ্বীনের দাওয়াত দিতে বছরজুড়ে দেশব্যাপী ঘুরে বেড়ান তাবলিগ জামাতের সদস্যরা।

অন্য দেশে গিয়েও ইসলামের দাওয়াত দিয়ে থাকেন তারা। বাংলাদেশে থাকা ভারতসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৩২১ জন বিদেশি তাবলিগ জামাতের সদস্যকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় এনে দুটি মসজিদে রাখা হয়েছে। মূলত কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণ রোধেই এ ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

এছাড়াও মানিকগঞ্জের সিংগাইরে তাবলিগের আরও তিন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানে তাবলিগ জামাতের ১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে তিনজনের মধ্যে করোনা ভাইরাস রয়েছে বলে শনাক্ত হয়েছে।

সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সেকেন্দার আলী মোল্লা এ খবর নিশ্চিত করেছেন। তাদের প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশনে রাখা হয়।

এ বিষয়ে ডা. সেকেন্দার আলী বলেন, গত ২৪ মার্চ ফরিদপুর থেকে মানিকগঞ্জের সিংগাইরের বাইতুল মামুর ও মারকাযুল মা আরিফ ওয়াদ-দাওয়াহ মাদ্রাসায় তাবলিগ জামাতে এসেছিলেন ১২ সদস্যের একটি দল।

এদের মধ্যে গত শনিবার ৬০ বছরের এক বৃদ্ধের শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা দিলে তাকে ঢাকায় আইইডিসিআরে পরীক্ষা করালে তার শরীরে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে।

পরবর্তীতে গত রোববার ভোরে ওই মাদ্রাসাসহ সিংগাইর পৌরসভা লকডাউন করে দেয়া হয়। সেই সাথে তাবলিগ জামাতের ১১ সদস্যকে ওই মাদ্রাসায় হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়।

একইসাথে তাবলিগ জামাতের সংস্পর্শে আসা স্থানীয় ছয়জনকে এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রত্যেকেই ফরিদপুর জেলার আলফা ডাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনা লায়লা বলেন, তাবলিগ জামাতের মুসল্লি ও তাদের সংস্পর্শে আসা ২৬ জনের মধ্যে তিনজন নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

পরবর্তীতে আক্রান্ত তিন ব্যক্তিকে সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশন থেকে গতকাল ঢাকার কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ারুল আমিন আখন্দ বলেন, ‘ওই তিন ব্যক্তির শরীরে কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর তাদের প্রথমদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়।

কিন্তু এখানে কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় তাদের আজ দুপুরে (গতকাল) কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এদিকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় তাবলিগ জামায়াতের সাত ভারতীয় নাগরিককে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। গত মঙ্গলবার তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেয় রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রশাসন।

পরে তাবলিগ জামাতের উপজেলা শাখার মাকরাজে (খানকা) তাদের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইন করা হয়। বর্তমানে তারা সেখানে নিরাপদে রয়েছেন।

কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিরা হলেন- আব্দুল আজম, আব্দুল মানাব, আব্দুর রশিদ, আব্দুল্লাহ, মো. নিশাদ, আব্দুর রশিদ ও ইবরার হোসেন। তাদের সবার বাড়ি ভারতের বিহার প্রদেশে।

জানা গেছে, এ বছরের জানুয়ারিতে ভারতের বিহার থেকে টঙ্গীর ইজতেমায় এসে যোগ দেন তাবলিগের এই মুসল্লিরা। ইজতেমার আখেরি মুনাজাত শেষে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েন তারা। দেশের বিভিন্ন স্থান সফর করে গত মাসে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় আসেন।

এরপর থেকে রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন মসজিদে তারা অবস্থান করছিলেন। খবর পেয়ে গত মঙ্গলবার বিকালে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আলী আহম্মেদ সেখানে গিয়ে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেন। পরে তাবলিগ জামাতের স্থানীয় সাথীরা উপজেলা শাখার মাকরাজে হোম কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করেন।

তাবলিগ জামাতের রাঙ্গাবালী উপজেলা আমীর আহম্মেদ ফয়সাল জানান, তাবলিগের মুসল্লিরা টঙ্গী ইজতেমার মুনাজাত শেষে পটুয়াখালী জেলায় এসেছিলেন। এতদিন তারা রাঙ্গাবালী উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চরআন্ডার একটি মসজিদে ছিলেন।

গত মঙ্গলবার সেখান থেকে আমাদের মাকরাজে আসেন। পরে প্রশাসনের লোকেরা এসে এখানে হোম কোয়ারেন্টাইনের ঘোষণা দিয়ে যান এবং কোনোভাবেই ঘরের বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশ দেন। তারা বর্তমানে নিরাপদে ও সুন্দর পরিবেশে আছেন।

এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাবলীগ ফেরতদের খোঁজখবর নিচ্ছে প্রশাসন। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর পজেটিভ হলে আইসোলেশনে অন্যথায় হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে বলে জানা গেছে।

 

আমারসংবাদ/এসটিএমএ