শুক্রবার ০৭ আগস্ট ২০২০

২২ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই ১২,২০২০, ১২:২৮

জুলাই ১২,২০২০, ১০:১৮

করোনা মহামারিতে সম্মুখযোদ্ধা পুলিশ (পর্ব-২)

করোনার বিস্তার রোধে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্ভীকভাবে নাগরিকদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা। সরকারি নির্দেশনার সাথে সমন্বয় রেখে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স প্রণীত সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবিলায় পুলিশের নানাবিধ উদ্যোগ দেশের মানুষকে আশান্বিত করছে।

করোনায় মৃতদের স্বজনরা ছেড়ে গেলেও দাফন করছে পুলিশ। বাহিনীটির নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে গরিব ও অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ। বিলিয়ে দেয়া হচ্ছে রেশনে পাওয়া পণ্যও।

সংকট শুরুর পর থেকেই নিজেদের সুরক্ষিত রেখে করোনা মোকাবিলা, জনগণকে সচেতন করা, দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ জেলা ও থানা পুলিশের যাবতীয় কার্যক্রম কিভাবে চলছে, করোনাকালে কেমন আছেন; তার সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নিতে দেশের প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলেছে দৈনিক আমার সংবাদ।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক বশির হোসেন খানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব তৈরি করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক নূর মোহাম্মদ মিঠু

শেখ রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার (পাবনা) : করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের অগ্রণী ভূমিকা ইতোমধ্যে সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চপর্যায়ে মানবিক পুলিশিংয়ের গল্প সবার মুখে মুখে।

পুলিশের গাড়ির জন্য অপেক্ষা অভুক্তদের, করোনায় কর্মহীন চালক-হেলপারদের পুলিশের মানবিক সহায়তা, পরিবহনচালক ও শ্রমিকদের পাশে পুলিশ, করোনা আক্রান্তদের খুঁজে প্রযুক্তির ব্যবহার পুলিশের, কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করছে পুলিশ, করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর পাশে দাঁড়াচ্ছে পুলিশ, করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফন করছে পুলিশ, করোনাযুদ্ধে জয়ী হয়ে আবারো জনসেবায় যোগদান করছে পুলিশ, জ্বর নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা যুবককে হাসপাতালে নিচ্ছে পুলিশ, ধান কাটতে সহযোগিতা করছে পুলিশ— এমন হাজারো ইতিবাচক সংবাদে বাংলাদেশ পুলিশের করোনার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এসব সেবামূলক কাজ করতে গিয়ে যাতে পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই ব্যাপকভাবে আক্রান্ত না হয়ে পড়েন সেই লক্ষ্যে পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম, বিপিএম, পিপিএম নেতৃত্বে পাবনা জেলা পুলিশের মানবিক পুলিশ হিসেবে সবার আস্থা কুড়িয়েছেন। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ও ডিউটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সকল ইউনিটে নিয়মিত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অফিস ব্যারাক ও বাসস্থান দিনে ২ বার জীবাণুনাশক দ্বারা পরিষ্কার করা হচ্ছে। সকল অফিসার ও ফোর্সের জন্য মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তার ও পরিবহনকালে মাস্ক ও গ্লাভস পরিধানসহ পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ডিউটিতে প্রেরণের পূর্বে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের পিপিই, ফেস মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভস সরবরাহ করা হচ্ছে। জ্বর, কাশি অথবা শ্বাসকষ্ট যেকোনো একটি উপসর্গ দেখা গেলেই তাৎক্ষণিকভাবে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আক্রান্ত সদস্যের আইসলেশন নিশ্চিত করে কোভিড-১৯ পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

জেলা পুলিশ হাসপাতালে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং জরুরি প্রয়োজনে নেবুলাইজার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ রাখা হয়েছে। ২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার সংগ্রহ করে আইসোলেশনে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত সম্মানিত পুলিশ সুপারসহ পাবনা জেলা পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৭ জন সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত সদস্যগণ সম্মানিত পুলিশ সুপার মহোদয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নিজ বাসভবন এবং আইসলেশন সেন্টারে অবস্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মানবিক পুলিশের অনন্য উদাহরণ হিসেবে করোনা সংকট মোকাবিলায় পাবনা জেলা পুলিশের বৈচিত্র্যময় ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে যখন পুলিশবাহিনীর সদস্যরা জনগণবান্ধব জনমুখী দায়িত্ব পালনে ব্রতী হয়েছেন।

পাবনা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তিন সহস্রাধিক দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে নগদ অর্থ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ও ত্রাণ সহায়তা  প্রদান করা হয়েছে যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছানো এবং মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনের কাজে জেলা পুলিশ সহায়তা করে যাচ্ছে।

সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই পাবনা জেলা পুলিশের সদস্যরা এসব সেবামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন এবং তা করতে গিয়ে নিজেরাই সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হওয়ার পর তারা আবার জনসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করছেন। করোনাসংক্রান্ত যেকোনো সহযোগিতায় পাবনা জেলা পুলিশ সর্বদা জনগণের পাশে আছে।

মো. হাসানুজ্জামান, পুলিশ সুপার (ঝিনাইদহ) : করোনা সংকটের শুরুতেই আরও জনগণকে সচেতন করার কাজটি শুরু করি। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের অধীনে ছয়টি থানা, ৩০টি ক্যাম্প, ৩টি ফাঁড়ি ও একটি তদন্তকেন্দ্র রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ক্যাম্প রয়েছে।

এসব থানা, ফাঁড়ি, ক্যাম্প ও তদন্তকেন্দ্রের সমন্বয়ে ঝিনাইদহের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আরও সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়েছি। বাজার-ঘাট, বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে সব স্থানেই ব্যাপকভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়েছি। ২০ হাজার লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করেছি বলে আমার সংবাদকে গতকাল শনিবার মুঠোফোনে জানিয়েছেন ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান।  

তিনি বলেন, খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে রিক্সাচালক পর্যন্ত জেলার সকল স্তরের মানুষের মাঝেই সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করি। পাশপাশি সচেতনতামূলক ব্রিফ করে সচেতন করার চেষ্টা করেছি। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ ৪ হাজার মানুষের মাঝে এসব সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করে।

পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বলেন, ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ নিজস্ব অর্থায়নে করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্টির মাঝ্যে খাদ্যসামগ্রী (চাল, ডাল, তেল, আলু ইত্যাদি) এবং এসবের সঙ্গেও সুরক্ষাসামগ্রী দিয়ে পাশের দাড়ানোর চেষ্টা করে।

গোয়েন্দা শাখার মাধ্যমে পঙ্গুসহ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, পুরোহিতসহ যারা করোনাকালীন সহায়তা পায়নি তাদের তালিকা করে তাদেরও খাদ্য সহায়তা করা হয়। এভাবে ৩ হাজার ৫০০ লোককে সহায়তা করে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার বলেন, আমাদের ৪০টি ইউনিট দায়িত্ব পালনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদের মাধ্যমে এবং ইমিগ্রেশন থেকে ৪ হাজার ২০০ লোকের সন্ধান পাই, যারা ইমিগ্রেশন ও স্থলবন্দর হয়ে বাড়িতে আসেন।

তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছি। ছুটি ঘোষণার পর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে যারা এসেছেন তাদের তথ্য সংগ্রহ করে বাড়ি চিহ্নিত করি এবং লাল পতাকা টাঙিয়ে তাদেরও কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করি। পাশাপাশি বাজার-ঘাটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বিশেষ করে পৗর এলাকার বাজারগুলোতে সময় বেঁধে দেই।

পরিবহন, বাইকে যাতে বেশি লোক না ওঠে সেজন্য আরও ট্রাফিক আইন ও সড়ক আইন প্রয়োগ করেছি। কাউকে কাউকে জরিমানার আওতায় নিয়ে এসেছি। এছাড়া চায়ের দোকানে ক্যাম্প ও টহল পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে উৎসাহী করেছি।

তিনি বলেন, মার্চ মাস থেকে জুন মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের একজনও আক্রান্ত ছিলো না। তবে সার্বিক কাজগুলো করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ১০ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে দুইজন সুস্থ হয়েছেন, বাকিরা কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া অন্য সদস্যদের কেউ যাতে এক জায়গায় থাকার কারণে সংক্রমণ না বাড়ে সেজন্য জেলা পুলিশকে তিনভাগে ভাগ করে ডিউটি করাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।   

পংকজ চন্দ্র রায়, পুলিশ সুপার (বাগেরহাট) : করোনায় মানবিক ভূমিকায় ছিলো পুলিশ। করোনাকালে পুলিশ তার দায়িত্বের বাইরে সব কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে। এটা করতে গিয়ে এ বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা যেমন করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছেন, তেমনি পুলিশি সেবায় নতুন মাত্রায় যুক্ত হয়েছেন।

শুধু করোনাকালে নয়, পুলিশ মানবিক আচরণের যে নতুন ইতিহাসের সূচনা করেছে তা আগামীতেও ধরে রাখতে পুলিশ প্রধানের নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাগরহাট পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায়।

সুন্দরবনের বনদস্যুদের দমনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে বাগেরহাট জেলা পুলিশ। অভিযানের নেতৃত্বে দেন বাগেরহাট জেলা পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় পিপিএম। সুন্দরবনে অপরাধকে ঘিরে বিশেষ এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

বাগেরহাট পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় বলেন, সুন্দরবনকে আরও সেই রকম একটি সুন্দরবনে রূপান্তর করবো, যেটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে সমস্ত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হবে। সেটি করতে গেলে শুধু সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে নয়, যারা বনদস্যুতা করে, বাঘ-হরিণ শিকার করে তাদের প্রতিও আমাদের কঠিন নিষ্ঠুরতা থাকবে।

তাদের সবার প্রতি আমাদের একটাই কথা— তোমরা ভালোর পথে ফিরে আসো, নয়তো তোমাদের কষ্ট ভোগ করতে হবে। আইজিপি ও ডিআইজি মহোদয়ও চাইছেন সুন্দরবনকে আরও বসবাস উপযোগী ও ট্যুরিস্ট উপযোগী করে তুলি।

এছাড়া সিডর, আইলা, ফনি ও আম্ফানসহ সকল দুর্যোগ থেকেই সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো আগলে রাখে। তাই এ বনটাকে সুরক্ষা দেয়াই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। সকল ধরনের অপরাধ দমনে সাগর-সুন্দরবনে অভিযানের ক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতার বিষয়েও তিনি বলেন, বর্তমান সক্ষমতা যা আছে, আরও তা নিয়ে শুরু করছি।

করোনার এই সময় কর্মহীন ও অসহায় দুস্থদের খাদ্যসামগ্রী দেয়া হয়। ফোন করলে খাবার পৌঁছে দিয়েছে বাগেরহাট পুলিশ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের নিরাপত্তা রয়েছে পুলিশ। করোনায় পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হলেও পিছু হটেনি। মানুষের জন্য কাজ করছে পুলিশ।

মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ, পুলিশ সুপার (কিশোরগঞ্জ) : করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি ইউনিটের তুলনায় গতিশীল ইউনিটের আরেক নাম কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ। এ ইউনিটের প্রধান পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ।

যিনি চীনে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কায় নিজ দায়িত্বে কিশোরগঞ্জ জেলায় দায়িত্বরত প্রতিটি পুলিশ সদস্য ও জনগণের নিরাপত্তার বিষয়ে নড়েচড়ে বসেন।

করোনা যদিও বাংলাদেশে আসে এমন (কারণ চীনের সাথে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে) ভাবনায় গ্রহণ করেন নানাবিধ পরিকল্পনা। মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হলে আমার সংবাদকে এমনটিই জানান তিনি।

তিনি জানান, দেশে মার্চ মাস থেকে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও কার্যত জানুয়ারির শেষের দিক থেকেই তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীলসমাজ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ধর্মীয় নেতাসহ সবাইকে নিয়ে একাধিক মিটিংসহ সচেতনতার বিষয়ে কাজ শুরু করেন। সার্বিক পরিকল্পনার বিষয়ে বাস্তবায়ন শুরুর পূর্বেই তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সেও লিখিত প্রতিবেদন পাঠান।

করোনা মোকাবিলার সকল প্রস্তুতি আগাম নিয়ে রাখলেও ভাষানটেক থেকে যাওয়া এক নাগরিকের মাধ্যমে করোনা আতঙ্ক, করিমগঞ্জের একজনের করোনা শনাক্ত ও ভৈরব থানায় কর্মরত একজন সিভিল স্টাফের আক্রান্তের মধ্য দিয়ে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব ছড়িয়ে পড়ে কিশোরগঞ্জে।

তারপরও যেটুকু সংক্রমণ হয়েছে, তার মধ্যেই যাতে সীমাবদ্ধ থাকে, করোনা পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন এবং প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে করোনার থাবা থেকে সুরক্ষিত রেখে দৈনন্দিন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে জনগণকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে করোনা মোকাবিলায় যাবতীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

করোনাকালীন সময়ে কৃষকের ধান কেটে দিতে শ্রমিক সরবরাহ করার কাজটি যথাসময়ে করতে পেরেছে কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার। আগাম বন্যার আভাস থাকলেও বন্যা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি কিশোরগঞ্জের কৃষকদের। যে কারণে পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তারা।

তার দায়িত্বাধীন ১৩টি থানা, সংশ্লিষ্ট সবকটি উপজেলার সাংসদসহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয়, কমিটি করা এবং নিজেই ১৩টি থানা এলাকায় ঘুরে মানুষকে সচেতন করার কাজটি করেছেন।

করোনা মোকাবিলায় তিনি যে উদ্যম দেখিয়েছেন, তাতে পুলিশের প্রতিটি সদস্য করোনাভীতিকে জয় করে পূর্ণাঙ্গ মনোবল নিয়ে নিজেদের আইন প্রয়োগে কাজ করে যাচ্ছেন এবং মানুষকে সচেতন করার কাজটিও করে যাচ্ছেন নির্বিঘ্নে। কিশোরগঞ্জের জনগণও পুলিশের সাথে থেকে করোনা জয়ের লক্ষে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার কাজ করে যাচ্ছেন।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় মাশরুকুর রহমান খালেদ ব্যতিক্রমধর্মী আরও বেশকিছু কাজ করেছেন যা প্রশংসার দাবিদার বলে বলছেন খোদ কিশোরগঞ্জের জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষরা। এমনটাই জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি শাহজাহান সাজু।

পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, সার্বিক কর্ম পরিকল্পনা আগে থেকেই এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এসওপিতে থাকা আইজিপি স্যারের নির্দেশনার সমন্বয় করে কিশোরগঞ্জে করোনা মোকাবিলায় সুফল লাভের আশা করছি। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে যেভাবে হানাদার বাহিনীর বুলেট বুকে ধারণ করেছি, ঠিক সেভাবেই করোনা মোকাবিলায় সফলতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশকে গর্বের জায়গায় নিয়ে দাঁড় করাতে চাই।

শামসুন্নাহার, পুলিশ সুপার (গাজীপুর) : করোনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা এবং প্রবাসীরা দেশে আসতে শুরু করেছে— এমন খবরেই সতর্ক অবস্থানে যায় গাজীপুর জেলা পুলিশ। জনগণকে সচেতন করতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, মাস্ক পড়তে উদ্বুদ্ধকরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, পুলিশের গাড়িতে পোস্টার লাগিয়ে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ, রাস্তায়-রাস্তায়, মোড়ে-মোড়ে গান গেয়ে জনগণকে সচেতন করার কাজ করছে।

পাশাপাশি দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যা যা করণীয় সেসব কাজও চলছে আগের মতোই। করোনা মোকাবিলা ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ— একইসাথে সব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে গাজীপুর জেলা পুলিশ— মুঠোফোনে আমার সংবাদকে এমনটাই জানিয়েছেন গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার।

তিনি বলেন, গাজীপুর শ্রম অধ্যুষিত এলাকা। এখানে কল-কারখানা, মিল-ফ্যাক্টরির সংখ্যা বেশি। শ্রমিক সংখ্যাও অনেক বেশি। যখন লকডাউন ছিলো, তখন আরও ভালোভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করেছি। এখন জীবন-জীবিকার তাগিদে সরকার লকডাউন উঠিয়ে নিয়েছে, কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। তার মানে এই নয় যে, যে যার মতো অবাধে চলাফেরা করবে। সামাজিক দূরত্ব ও করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজে যোগদান করার কথা বলেছে সরকার।

শ্রমিকরা যাতে সে নির্দেশনা মানে আমরা গাজীপুর জেলা পুলিশ সার্বক্ষণিক সে কাজটি করছি। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ সীমান্তবর্তী আমাদের কালীগঞ্জ থানায় প্রথম দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন প্রবেশ শুরু করায় সে সময় ১৬ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন।

এরপর থেকে আমরা থানাগুলোতে তিন-চার ভাগে ভাগ করে পাশ্ববর্তী ডাক বাংলো, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্থাপনায় রাখার ব্যবস্থা করেছি। যাতে আক্রান্ত কোনো সদস্যের কারণে অন্য কোনো সদস্যকে আক্রান্ত হতে না হয়।

এখন পর্যন্ত গাজীপুর জেলা পুলিশের ৬৩ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছে ৩৫ জন।

মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান, পুলিশ সুপার (গোপালগঞ্জ) : সংকট শুরুর আগেই দেশজুড়ে করোনাকেন্দ্রিক আলোচনায় নড়েচড়ে বসে গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ। জনগণকে সচেতন করা এবং পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষিত রাখার মধ্য দিয়ে করোনা মোকাবিলা এবং পুলিশি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সকল প্রস্তুতি নিতে শুরু করে গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ।

আমার সংবাদকে এমনটাই জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান। এরই মধ্যে মার্চ মাসে দেশে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেই গোপালগঞ্জের যারা প্রবাসফেরত রয়েছেন তাদের তথ্য সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করে জেলা পুলিশ।

পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করা এবং তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও পুলিশের পাশে থেকে করোনা মোকাবিলায় সহায়তা চায় পুলিশ। জনগণ পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে, পুলিশের নির্দেশনাও মেনেছে বলে জানান তিনি।

জনগণকে সচেতন করার বিষয়ে তিনি বলেন, কমিউনিটি পুলিশের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে মাইকিং করেছি, লিফলেট বিতরণ করেছি, যারা সম্ভাব্য করোনা আক্রান্ত তাদের বাড়ি লকডাউন করেছি। তারা কিংবা যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তারা যাদের সাথে মেলামেশা করেছেন— তাদের বাড়িও লকডাউন করেছি।

তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছি। বাড়িগুলোতে স্টিকার ঝুলিয়ে দিয়েছি। তাদের সাথে প্রতিবেশীরা যাতে দুর্ব্যবহার না করে সেজন্য মানুষকে সচেতন করেছি।

তাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে সচেতন করেছি। প্রধানমন্ত্রী, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবীবুর রহমান স্যার ও বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের সকল নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত আমরা গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, নিয়মিত অপরাধ দমন কার্যক্রম আগে যেমন ছিলো এখনো তেমনই আছে। পেট্রলিং থেকে শুরু করে স্থানীয় মারামারিসহ সকল ধরনের অপরাধ বর্তমান সময়ে নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা আগে যেভাবে দিয়েছি এখনো ঠিক সেভাবেই দিচ্ছি।

এর পাশপাশি কোভিড-১৯-এর সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছি আমরা। আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাবার সহায়তাসহ সার্বিক বিষয়ে সহায়তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা আমাদের রয়েছে।

আমি আপনাদের (গণমাধ্যম) মাধ্যমে জনগণের উদ্দেশ্যে বলতে চাই— তারা যেন করোনাকে হালকাভাবে না নেয়। তারা যেন নিজেকে সুরক্ষিত রাখার কাজগুলো করে, মাস্ক পরে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে যেন বৈরী আচরণ না করে। বরং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে যেন তার প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।

গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশে এখন পর্যন্ত ৫০ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার মধ্যে ১৯ জন সুস্থ হয়েছেন। বাকিরাও সুস্থতার পথে বলে জানিয়েছেন তিনি।   

সঞ্জিত কুমার রায়, পুলিশ সুপার (টাঙ্গাইল) : প্রথমত আরও থানা-জেলার প্রত্যেকটি এলাকায় জনগণকে সচেতন করতে লিফলেট বিতরণ করেছি, মাইকিং করেছি। যখন লকডাউন শুরু হলো তখন গোটা জেলায় ৫৪টি চেকপোস্ট বসিয়ে টাঙ্গাইল থেকে বাইরে যাওয়া এবং বাইরের কোথাও থেকে টাঙ্গাইল প্রবেশ করা নিয়ন্ত্রণ করেছি।

৭ হাজার প্রবাসী বিদেশ থেকে টাঙ্গাইল আসে, তাদের সবার তথ্য সংগ্রহপূর্বক হোম  কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছি। সরকারি বিধি মানতে জনগণের দৌর গোড়ায় পৌঁছে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করেছি। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে এবং ত্রাণ ক্রার্যক্রমেও ম্যাজিস্ট্রেটকে সহযোগিতা করেছে আমার জেলা পুলিশ। যারা ত্রাণ সহায়তা নিতে লজ্জাবোধ করেন তাদের জন্য জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজে ফোন নম্বর দিয়ে দিয়েছি, যাতে ফোন করে গোপনে সাহায্য নিতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় সেসব ব্যক্তিদের আরও সহায়তা করেছি।

আমার সদস্যদের সুরক্ষাসামগ্রী দিয়েছি, ডিউটিতে যাওয়ার পর কতটুকু দূরত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করবে, কীভাবে অন্যান্য কার্যক্রমগুলো চালাবে— সে ব্যাপারে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। ঈদের সময় পরিবহন শ্রমিকদের খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছি।

মানুষকে সচেতন করার জন্য অডিও ভিজ্যুয়াল গান প্রচার করেছি, যা এখনো প্রচার হচ্ছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আমার জেলা পুলিশের ১০ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তার মধ্যে ১০ জন বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন।

মো. মারুফ হোসেন সরদার, পুলিশ সুপার (ঢাকা) : করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই জনগণকে সচেতন করতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, এছাড়া বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা জেলা পুলিশ। বিভিন্ন স্থানে উঠান বৈঠক করেও সচেতন করা হচ্ছে মানুষকে।

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে আরও পিপিই দিয়েছি। প্রতি মাসে পাঁচটি মাস্ক, পাঁচটি হ্যান্ডগ্লাভস, একটি করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, এক কৌটা জিংক ট্যাবলেট, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ডি ট্যাবলেট দিয়ে যাচ্ছি। তাছাড়া প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে চশমা, ফেসশিল্ড দিয়েছি।

আমাদের প্রতিটি স্থাপনায় প্রবেশের সময় গেটে হ্যান্ডস্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করেছি, গাড়িগুলোতে স্প্রের ব্যবস্থা করেছি, থানাগুলোতে প্রবেশের সময় বডি স্প্রে করার জন্য টানেল ফিট করেছি।

পুলিশ সদস্যদের আলাদা থাকা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। মেসগুলোতে পুলিশ সদস্যরা যাতে একসাথে খাবার না খায় সেজন্য ওয়ান টাইম বক্স ব্যবহার করছি। প্রত্যেকটা ব্যারাকের বাথরুমে লিকুইড সোপ ছাড়াও হ্যান্ডস্যানিটাইজার দিয়েছি।

আমরা ঢাকা জেলা পুলিশ লাইন্সে কোয়ারেন্টাইন করার জন্য ছোট ছোট ৫৯টি কক্ষ করেছি। প্রত্যেকটা রুমে একটা করে বেড, ফ্যান ও বাথরুম আছে। কারো উপসর্গ দেখা দিলে তাদের সেখানে রাখছি।

এছাড়া যারা ছুটি থেকে আসে তাদের সেখানে ১৫ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখি। সবগুলো কক্ষে হাইস্পিড ইন্টারনেট ব্যবস্থা করা আছে। এ ব্যবস্থা আমাদের প্রত্যেক থানা ফাঁড়িতেও করা হয়েছে। যারা ডিউটিতে যায়, যাওয়ার আগে তাদের ব্রিফ করি, যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকে। ওয়ারেন্ট তামিল করার ক্ষেত্রে আসামি ধরতে গেলে সেসব সদস্যদের মাস্ক পরিয়ে দেই।

দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমাদের সকল কার্যক্রম করোনার আগে যেমন ছিলো এখনো সেরকমই স্বাভাবিক আছে। আমাদের পেট্রল, টহল, চেকপোস্ট, মামলা তদন্ত, ওয়ারেন্ট তামিল সব কার্যক্রমণ স্বাভাবিকভাবে চলছে। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে আবার বর্ষার সময় অপরাধ একটু বেড়ে যায়— এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টহল জোরদার আছে।

এককথায় আমাদের পুলিশিংয়ের যতো কার্যক্রম আছে, তা কোনোদিন বন্ধ হয়নি। বরং আগের চেয়ে বেশি জোরদার আছে। ঢাকা জেলা পুলিশ এ পর্যন্ত ৩১২ জন সদস্য করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, সুস্থ হয়েছেন ২৯৫ জন বলে জানান তিনি।

প্রলয় কুমার জোয়ারদার, পুলিশ সুপার (নরসিংদী) : বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ অগ্রণী সেনানীর ভূমিকা পালন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় নরসিংদী জেলা পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদারের দিকনির্দেশনায় জেলা পুলিশ করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। চলছে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ ক্যাম্পেইন। নির্ভীক পুলিশ সদস্যরা মাথায় গামছা বেঁধে কেটেছেন অসহায় কৃষকের জমির পাকা ধান।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিতরণ করছে ত্রাণসামগ্রী। এখনো ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। হটলাইনে ফোন দিলেই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত অভূক্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। রমজান মাসে এতিম, প্রতিবন্ধী, ভাসমান ও ছিন্নমূল অনাহারী মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছেন ইফতারসামগ্রী।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পুলিশের ভ্রাম্যমাণ ফ্রি মেডিকেল টিম চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ডাক্তারদের সাথে নিয়ে তৈরি ভ্রাম্যমাণ টিম অ্যাম্বুলেন্সসহ গাড়িবহর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এলাকা থেকে এলাকায় এবং ফ্রি ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।

সমপ্রতি মানুষকে ঘরে রাখতে জেলা পুলিশের উদ্যোগে সুলভমূল্যে ভ্রাম্যমাণ বাজারব্যবস্থা চালু করা হয়। করোনার ছোবল থেকে পুলিশবাহিনীর সদস্যদের রক্ষা করতে পুলিশ লাইন্স, নরসিংদী ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ে জীবাণুনাশক টানেল বসানো হয় এবং পর্যায়ক্রমে জেলার ৭টি থানায় জীবাণুনাশক টানেল বসানো হয়।

সর্বশেষ লকডাউন নিশ্চিতে জেলা পুলিশের কর্মকাণ্ড ও ধান ঘরে তোলার সময় কৃষকের ধান কেটে দিয়ে আলোচনার সম্মুখভাগে চলে আসে পুলিশের এ ইউনিটের সদস্যরা।

ভাইরাসের সংক্রমণ সকলকে ঘরে অবস্থানের জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এর বাইরেও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, এতিম, পথশিশু, রিক্সাচালক, ভিক্ষুক, দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধীদের মাঝে জেলার ৬টি উপজেলার ৭টি থানায় ইফতারসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদার বলেন, পুলিশের প্রধান কাজ হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ দুটি কাজের পাশাপাশি এখন কোভিড-১৯ মোকাবিলায় দিন-রাত কাজ করে চলেছি। লকডাউন নিশ্চিত ও মানুষকে ঘরে রাখতে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জেলা থেকে মানুষের প্রবেশ ও প্রস্থান রোধে সীমান্তবর্তী এলাকায় ৭২টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃতদের দাফন-কাফন করছে পুলিশ সদস্যরা। এক কথায় বলতে গেলে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক অবস্থার প্রেক্ষিতে সকল কর্মকাণ্ডে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

পুলিশতো সব সময়ই মাঠপর্যায়ে অনেক কাজ করে থাকে। সরকারের ঘোষণা অনুসারে লকডাউনের পর বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে গণপরিবহনে যাত্রীসেবা তদারকি অব্যাহত রেখেছি। করোনাকালে আমাদের উল্লিখিত কাজসমূহ অব্যাহত থাকবে শেষ পর্যন্ত।

জেলা পুলিশ নরসিংদীর মিডিয়া সমন্বয়কারী ও জেলা গোয়েন্দা শাখা নরসিংদীর পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) রুপণ কুমার সরকার জানিয়েছেন, নরসিংদী জেলা পুলিশের সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদার আমাদের হিরো।

স্যারের সুদক্ষ দিকনির্দেশনায় নরসিংদী জেলার ৬টি উপজেলার ৭টি থানার সকল পুলিশ সদস্যরা করোনা সংকট মোকাবিলায় ও লকডাউন নিশ্চিতে দিবানিশি কাজ করে যাচ্ছে। অসহায়দের খাদ্য সহায়তা থেকে শুরু করে হ্যান্ডস্যানিটাইজার, মাস্ক বিতরণসহ সকল ধরনের কাজ করা হচ্ছে।

মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, পুলিশ সুপার (নারায়ণগঞ্জ) : প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম হাব নারায়ণগঞ্জ শুরু থেকেই করোনা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত। সমপ্রতি নারায়ণগঞ্জের বেশকিছু এলাকা রেড জোন হিসেবে লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৯ জুন ২০২০ পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত ৫ হাজারের বেশি এবং মোট মৃত্যু ১১৫ জন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের দুই শতাধিক সদস্য আক্রান্ত। মোট সুস্থ ১৭৫ জন এবং ১ জন মৃত্যুবরণ করেন যার পূর্ব থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা ছিলো।

নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম পিপিএম (বার) বলেন, পেশাদারিত্ব ও মানবিক পুলিশিংয়ের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কল্যাণ ও আক্রান্ত সদস্যদের সুরক্ষায় করোনাকে মোকাবিলা করে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ।

সময়ে সময়ে আইজিপি স্যার, ডিআইজি স্যার, পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্দেশনা ও পরামর্শ যথাযথভাবেই পালিত ও বাস্তবায়িত হয়ে আসছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশে। ইতোমধ্যেই করোনা মোকাবিলার রোল মডেল হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ।

করোনার শুরু থেকেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, জরুরি পরিসেবা ও ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখা ছিলো নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

জনগণকে সচেতন করে তুলতে প্রতিনিয়ত মাইকিং করা হয়েছিন, ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদি প্রচারণা করা হয়েছিলো। চেকপোস্ট বাড়িয়ে লকডাউন কার্যকর ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

মানবিক পুলিশিং নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের ভূমিকা ছিলো উজ্জ্বল। অসহায় মানুষের নিকট ত্রাণ পৌঁছে দেয়া, হাসপাতালে রোগী পাঠানো, আক্রান্ত মানুষের কবর বা শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা— সবই করেছে জেলা পুলিশ যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত জেলা পুলিশের সুস্থ হয়ে ফেরা সদস্যদের মাধ্যমে প্লাজমা ব্যাংক গঠন ছিলো মানবিক পুলিশিংয়ের আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা ইতোমধ্যেই রোল মডেলে রূপ নিয়েছে।

ইতোমধ্যেই অন্য ইউনিটের আক্রান্ত সদস্যদের এবং কয়েকজন সংকটাপন্ন রোগীর জন্য প্লাজমা প্রদান করেছেন জেলা পুলিশের সুস্থ হয়ে ফেরা সদস্যদের কয়েকজন। বাকিরাও প্লাজমা দেয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল সুস্থ সদস্যদের রক্তের গ্রুপের ডাটাবেজ প্রস্তুত করে সকলকে প্লাজমা ম্যানেজমেন্ট নামে আরেকটি আলাদা হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে সংযুক্ত করা হয়েছে যাতে যুক্ত আছেন ঢাকা রেঞ্জ ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাগণও। এটি প্লাজমা ব্যবস্থাপনাকে অন্যরকম গতি ও সাফল্য এনে দিয়েছে।

মো. আলিমুজ্জামান পুলিশ সুপার (ফরিদপুর) : করোনা নিয়ে দেশে আলোচনা শুরুর পর ফরিদপুর জেলা পুলিশ প্রত্যেকটি থানাতে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ব্রিফ করা হয়েছে, সচেতন করা হয়েছে। বড় বড় প্যানা করে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রেও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে শুরু থেকে লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সবখানেই মানুষকে সচেতন করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, আমাদের ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ শুরু থেকেই জনসাধারণের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে তৎপর ছিলো। যখন লকডাউন কার্যকর ছিলো তখন মানুষকে ঘরে রাখতে সক্ষম হয়েছি, দোকান পাট বন্ধ রেখেছি।

বাজার-ঘাটে যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকে সেজন্য বাজারগুলোকে বড় স্থানে স্থানান্তর করেছি। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এসব কাজগুলো করেছি, সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছি। বিশেষ করে মানুষকে সচেতনতায় উদ্ধুদ্ধ করতে কিছু গান তৈরি করেছিলাম। এ গানগুলো ফরিদপুরের প্রত্যেক থানার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রচার করেছি।

কীভাবে করোনার বিস্তার রোধ করা যায়— এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে পুলিশ নারীকল্যাণ সমিতির শিল্পীগোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রচার করেছি। করোনার শুরুতেই শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে আলপনা এঁকে মানুষকে সচেতনতায় উদ্বুদ্ধ করেছি। পুরো রমজান মানুষ হামদ, নাত ও কুরআন তিলাওয়াত করে মানুষকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি।

মহামারির সময়ে মানুষের করনীয় কী— কুরআন-সুন্নায় কি বলা আছে- সে বিষয়ে মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে নামাজের আগে পরে মানুষকে বুঝিয়েছি। মুঠোফোনে আমার সংবাদের কথা হলে এসব তথ্য জানান ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান।

তিনি বলেন, এ কাজগুলোর সবই এখনো অব্যাহত আছে। বিশেষ যারা গাড়িচালক আছেন (মাহেন্দ্রচালক, অটো) তারা যাতে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে সতর্ক হয় এক্ষেত্রে আমাদের তাদের গাড়িতে সচেতনতামূলক স্টিকার লাগিয়েছি।

বাসে স্টিকার লাগিয়েছি। টার্মিনালগুলোতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি চালকের করনীয় কি, যাত্রীর করনীয় কি? বারবার হাত ধুতে হবে, মাস্ক পরতে হবে— সে কাজগুলোর জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছি।

মানুষের মধ্যে মাস্ক বিতরণ করেছি, সাবান বিতরণ করেছি। লকডাউনের সময় কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষদের আমরা সহায়তা করেছি। খাবার, ওষুধ ও শিশুখাদ্যসহ যখন যা প্রয়োজন তা দিয়েই সহায়তা করেছি।

পুলিশ সদস্যদের রক্ষার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, যেহেতু পুলিশ সদস্যরা একবারেই ফ্রন্ট ফাইটার, মানুষের সাথে থেকে করোনা মোকাবিলায় কাজ করছে যেমন— পেট্রল, নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট, বাজার-ঘাটকেন্দ্রিক সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মানুষকে ঘরে রাখতে উদ্বুদ্ধ করা— এক্ষেত্রে যাতে পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত কম হয় সে প্রেক্ষিতে তাদের সচেতন করার পাশাপাশি তাদের ইমিউনো সিস্টেম বাড়ানোর জন্য যেসব ওষুধ প্রয়োজন (ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-সি ও জিংক ট্যাবলেট) সরবরাহ করেছি। পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী দিয়েছি। উন্নত খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি।

পাশাপাশি পিপিইসহ তাদের সকল ধরনের প্রোটেকটিভ গিয়ারের যা যা প্রয়োজন (মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, হ্যান্ডস্যানিটাইজার) সবই দিয়েছি। যেসব সদস্য আক্রান্ত হয়েছে তাদের মনিটরিং করার জন্য একটি টিম করা আছে, সেই টিম সকাল-বিকাল প্রতিনিয়ই তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি যাতে না ঘটে সেজন্য প্রয়োজবোধে তাৎক্ষণিক ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ এবং রাজারবাগ হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করছি।

মোহাম্মদ মাহবুব হাসান, পুলিশ সুপার (মাদারীপুর) : দেশের প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা মাদারীপুর। এ জেলার শিবচর, কালকিনি, রাজৈর উপজেলাসহ গোটা জেলায় বহু প্রবাসী প্রবাসে আছেন। দেশে প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীও ছিলেন মাদারীপুরের। যিনি ছিলেন ইতালিফেরত।

এ প্রসঙ্গে মাদারীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলেন, প্রথমদিকে করোনা মোকাবিলা করার কাজটি মাদারীপুর জেলা পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিলো। প্রাথমিকপর্যায়ে শিবচর উপজেলার তিনটা এলাকাকে নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করি এবং ১৭টি পয়েন্টকে চেকপোস্টের মাধ্যমে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত করে ফেলি। নিয়ন্ত্রিত এলাকার জনগণকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করি, এক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অসম্ভব সহযোগিতা পেয়েছি।

তিনি বলেন, এর আগে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা রেঞ্জ অফিস থেকে নির্দেশনা পেয়েছিলাম করোনা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সে থেকেই আমরা জনগণকে সচেতন করতে লিফলেট তৈরি করেছিলাম। লিফলেটগুলোর মধ্যেই করোনার বিস্তার রোধ, কীভাবে মুক্ত থাকা যাবে, আর যদি হয়েই যায় তার লক্ষণগুলো কি হবে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো বিস্তারিত বর্ণনা তো করাই ছিলো, একই সাথে কার্টুন এঁকে দিয়েছিলাম যাতে জনগণ সহজে বুজতে পারে।

প্রথম থেকে থানা, তদন্তকেন্দ্র, ফাঁড়িগুলোর মধ্যে এগুলো বিতরণ করেছি। সাথে সাথে জনপ্রতিনিধির সহযোগিতা নিয়েছি। মাইকিং করেছি, আমাদের থানাগুলোতে থাকা নিজস্ব গাড়িতে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছি। ধর্মীয় উপাসনালয় যেমন— মসজিদ মক্তব মন্দির গির্জা প্রায় সবখানে এমনকি জুমার নামাজেও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়েছি।

আমাদের গৃহীত পদক্ষেপের কারণে (মার্চ-এপ্রিল-মে ) প্রায় তিন মাস নিয়ন্ত্রণ ছিলো, ৫০-৬০ সংখ্যাটা মোটামুটি এরকম ছিলো। কিন্তু রমজানের ঈদের পর করোনা প্রকোপ একটু বেশি ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে মাদারীপুরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯৭। কিন্তু প্রথম যে এলাকাটি আমরা লকডাউন করেছিলাম (শিবচর) সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা একেবারে সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে।

সদর, কালকিনি, রাজৈর— এ এলাকাগুলোতে বেড়ে গেছে। বলতে গেলে একদম তৃণমূলপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপরও আমরা থেমে নেই, কাজ করছি নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছি।

এরমধ্যে মাদারীপুর জেলা পুলিশের ৪৬ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে একজন সার্কেল এসপি আছেন। ৩৬ জনই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।

বাকি ১০ জন আইসোলেশনে আছেন। তারাও স্বল্প সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন বলে আশা করছি। 

রিফাত রহমান শামীম, পুলিশ সুপার (মানিকগঞ্জ) : প্রকৃতপক্ষে আমাদের রুটিন ওয়ার্কই হচ্ছে নিয়মিত অপরাধ দমন। এটা নিয়মিতই করে যাচ্ছি। যেহেতু করোনা মহামারি রূপ ধারণ করেছে সেহেতু বাংলাদেশ পুলিশ এগিয়ে এসেছে এবং মোকাবিলায় কাজ করছে যাতে জনগণ সচেতন হয় এবং কম সময়ের মধ্যে দেশ যেন করোনার মহামারি থেকে মুক্তিলাভ করে। সে লক্ষে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশও কাজ করছে। এখানে করোনা মোকাবিলায় কমিটিও করা আছে।

আমরা সেই মার্চ মাস থেকেই যেখানেই প্রবাসী এসেছে সেখানেই গিয়েছিলাম, তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছি। আবার যাতে কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে জনগণের কাছে হেয় হতে না হয়- সেজন্য প্রচারণা চালিয়েছি। প্রতিটি থানা এলাকায় মাইক ব্যবহার করেছি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের, সুধী সমাজের, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় নেতাদের সহায়াতা নিয়েছি।

আমাদের পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার জন্য প্রটেক্টিভ গিয়ার যা যা আছে (হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ডস্যানিটাইজার) সবই পর্যাপ্ত সরবরাহ করেছি। ব্যারাক থেকে বাইরে থাকার ব্যবস্থা করেছি, যাতে ব্যারাকে ঘনত্ব কমে আসে। আমাদের সর্ব প্রথম একজন সদস্য করোনা আক্রান্ত হন গত জুন মাসে। এর আগে আমরা আক্রান্ত ছাড়াই কাজ করেছি।

দুঃখজনক বিষয় হলো— আমাদের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তার পরিবারকে পেনশনও তুলে দিয়েছি। সব মিলিয়ে করোনার কারণে আইনি কার্যক্রমে কিছুটা ধরন পরিবর্তন করে কার্যক্রম চালাচ্ছেন জানিয়ে মানকিগঞ্জ জেলা পুলিশ আমার সংবাদকে মুঠোফোনে বলেন, মানিকগঞ্জে করোনাকালীন সময়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণেই আছে।

ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার যখন ছুটি ঘোষণা করলো তখন কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে গেলো সে সময়ে যারাই আমাদের কাছে এসেছে তাদেরই মানবিক সহায়তা করেছি। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে ভাসমান লোকজনদের রমজান মাসে খাবার দিয়েছি। মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশে এ পর্যন্ত ৮ পুলিশ ও একজন সিভিল স্টাফ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে সুস্থ হয়েছে ৫ জন— এমনটাই জানিয়েছেন পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম।

তিনি বলেন, মানিকগঞ্জ একটি হাইওয়ে অধ্যুষিত জেলা। ঢাকার সাথে ১৯টি জেলার যোগাযোগ এ জেলার ওপর দিয়ে। পাশাপাশি ফেরিঘাট যাতে চালু থাকে, আমাদের পুলিশ সদস্যরা যাতে আক্রান্ত না হয়, মানিকগঞ্জ জেলাবাসী যাতে আক্রান্ত না হন- সেজন্য সড়ক ও জনপথের সহযোগিতায় হাইওয়েতে বাঁশকল স্থাপন করেছি। চলতি মাসের ৪ তারিখে মানিকগঞ্জের সাতটি অঞ্চল রেডজোন থেকে ইউলো জোনে প্রবেশ করেছে।

আব্দুল মোমেন, পুলিশ সুপার (মুন্সীগঞ্জ) : গতকাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় সোয়া কোটি লোক করোনায় আক্রান্ত, ইতোমধ্যে মারা গেছে সাড়ে পাঁচ লক্ষাধিক লোক। সুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের বাদ দিলেও এখনো প্রায় ৪৭ লক্ষাধিক লোক আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। এ মহামারি যেমন কিছু মানুষের কদাকার রূপ দেখিয়েছে তেমনি মানবিকতার গল্পও রচিত হয়েছে অনেক। বাংলাদেশ পুলিশ হয়েছে তেমনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অতীতের ক্রান্তিলগ্নের মতোই বাংলাদেশ পুলিশ তার সর্বোচ্চ সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে এই করোনা দুর্যোগে। মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশও তার ব্যতিক্রম নয়। একেবারে শুরু থেকেই মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের সদস্যরা জেলায় লকডাউন বাস্তবায়নে এবং প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে।

প্রবাসীদের নিয়মিত খোঁজখবর নেয়া থেকে শুরু করে তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা পুলিশ। এরপর যখন লকডাউন কার্যকর করা হয় এবং আক্রান্তের সংখ্যাও দেশের অন্যান্য এলাকার মতো বাড়তে থাকে তখন জেলা পুলিশ তাদের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে যাদের সাহায্য সহায়তা প্রয়োজন তাদের নাম ঠিকানা আহ্বান করে।

এতে প্রচুর সাড়া পাওয়া যায়। যারা লোক-লজ্জার ভয়ে কারো কাছে চাইতে পারেনা কিন্তু চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে তারা ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন করলে জেলা পুলিশ রাতের আঁধারে লোকচক্ষুর আড়ালে তাদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। প্রচার করা ফোন নাম্বারে কল এলেই পুলিশ ঘরের বাজার করে দিয়ে এসেছে।

এ মানবিক সহায়তা করেছে পুলিশ সদস্যরা মাসিক বেতনের একটি অংশ দিয়ে। করোনা পজেটিভ মৃতের লাশ সৎকার, নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তাও করেছে জেলা পুলিশ।

সমপ্রতি সদরঘাটে লঞ্চডুবির ঘটনায় লাশ শনাক্ত থেকে শুরু করে দাফন পর্যন্ত সকল প্রকার লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছে করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে। মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া ফেরিঘাট দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার লোকজন যাতায়াত করে। গত রোজার ঈদ ও এর পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০০০ মানুষ পদ্মা নদী পার হয়েছে।

কেউ ঢাকা শহরে থাকার মতো জায়গা হারিয়েছে, কারো ৩ মাস চাকরি নেই কিংবা কেউ স্বজনের লাশ নিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে। এক মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে ঘাটে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা নির্বিঘ্নে এসব মানুষ পারাপার করেছেন কোনপ্রকার দুর্ঘটনা এড়িয়ে।

পেশাদারিত্ব বজায় রেখে মানবিক কার্যক্রম করতে গিয়ে সহকারী পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত জেলা পুলিশের ১৩৯ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছে এবং একজন সিভিল স্টাফ মৃত্যুবরণ করেছে। পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন পিপিএম মহোদয় প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের জন্য ওষুধ, রকমারি মৌসুমি ফল পাঠানো থেকে শুরু করে তাদের জন্য রোগপ্রতিরোধী খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং নিয়মিত সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন।

এরমধ্যেও জেলা পুলিশ, মুন্সীগঞ্জ বিন্দুমাত্র মনোবল না হারিয়েও হাট-বাজারগুলো দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি রোধে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নিয়মিত টহল দিয়ে যাচ্ছে। এই করোনাকালে আরও দেখেছি মানুষ করোনায় নিজের অসুস্থ মাকে জঙ্গলে ফেলে চলে যাচ্ছে, মৃতদেহের সৎকারে আপনজনরাও অংশ নিচ্ছে না।

 সেখানে পুলিশ প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে বীরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে এসব মানুষের জন্য। এই পুলিশ সদস্যদেরও পরিবার আছে, আপনজন আছে, আছে সন্তান, ভাই, বোন, মা, বাবা। মানুষের জীবন বাঁচাতে পুলিশের জীবন আজ সংকটে, তবু তৃপ্তি এখানেই যে মানুষের জন্য পুলিশ তার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করে যাচ্ছে। মানবিকতার এক অনন্য উচ্চতায় আজ বাংলাদেশ পুলিশ।

মিজানুর রহমান পিপিএম (বার), পুলিশ সুপার (রাজবাড়ী) : সর্বপ্রথমে আমরা যে কাজটি করলাম সেটি- রাজবাড়ী জেলার যারা প্রবাসে আছেন, (চীন, ইন্ডিয়া, ইতালি) তাদের তালিকা জেলা প্রশাসক এবং সিভিল সার্জনদের কাছে দিলাম। তালিকাগুলো আবার ভাগ ভাগ করে থানার ওসিদেরও দিলাম।

দেখা গেলো— ওই তালিকাগুলো তাদের কাছেই পড়ে থাকলো। কাউকে তারা শনাক্ত কিংবা কোয়ারেন্টাইন করতে পারেনি। ওয়ার্ড কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি করার কথা থাকলেও কিছুই করতে পারেনি। পরবর্তীতে মিটিং করে তথ্য সংগ্রহ করা, কোয়ারেন্টাইন করা- এসব বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না দেখে এক রাতের মধ্যেই আমি দুই হাজার স্টিকার বানিয়েছি- মুঠোফোনে আমার সংবাদকে এসব কথা বলেন রাজবাড়ী জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।

এছাড়া তিনি দশটি তথ্যসম্বলিত একটি ফরম তৈরি করে সকল থানার ওসিদের মাঝে বণ্টন করে দেন। এরপরই মাত্র দুদিনের মধ্যে যারা বিদেশ থেকে এসেছেন তাদের তথ্য সংগ্রহপূর্বক সকলকে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে সক্ষম হন তিনি। তার এ কার্যক্রম কতটা বাস্তবায়ন করছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ- সেটাও মনিটরিং করার জন্য একটি টিম গঠন করেছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, এরপর আমরা লঞ্চঘাটসহ জেলার ৯৮টি জায়গায় হাত ধোয়ার জন্য পানির ট্যাংকি, মেশিন বসিয়ে দিলাম। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে লিফলেট করেছি, মাইকিং করেছি, লকডাউন কার্যকর করেছি। মানুষকে মানবিক সহায়তা করেছি। পুরো রমজান মাসজুড়েই ৫ টাকার বিনিময়ে ইফতার সরবরাহ করেছি। রাজবাড়ী জেলা পুলিশ খিচুড়ি বানিয়ে লকডাউনকালীন দুমাস পর্যন্ত কুকুরকে খাওয়ার দিয়েছি।

রাজবাড়ী পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান তার বন্ধু, সহকর্মীদের কাছ থেকে ৩-৪ লাখ টাকা নিয়ে এবং নিজ থেকেও টাকা দিয়ে ৫০ হাজার হ্যান্ডস্যানিটাইজার উৎপাদন করেন। বানান বিশ হাজার মাস্কও।

স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে জনপ্রতি ৫০০ করে বণ্টন করে দিয়ে সেগুলো আমার সাধারণ মানুষসহ সবার মাঝে বিতরণ করিয়েছেন। পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান এবং জেলার সকল থানার ওসিরা মিলে দুই হাজার মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী রাজবাড়ীতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৬২৩ জন। গত ২০ জুন নাগাদ যেখানে মোট আক্রান্ত ছিলো ৬১ জন, সেখানে গত ২০ দিনেই আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২৩ জনে। সুস্থ হয়েছেন ২৮৪ জন।

মারা গেছেন তিনজন। ২৫০ জনের মতো রাজবাড়ীতে চিকিৎসাধীন আছেন। বাকিদের বেশিরভাগই ঢাকায়। এ পর্যন্ত রাজবাড়ী জেলা পুলিশের আক্রান্তের সংখ্যা ১২ জন। তার মধ্যে একজন ওসি— যিনি এখন সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরেছেন। তিনিসহ সুস্থ হয়েছেন ৫ জন।

এদিকে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান পুলিশ লাইন্সের ব্যারাকে পুলিশ সদস্যদের করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ক্লাস্টারের নির্দেশনা দেন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানকে।

ডিআইজির স্যারের নির্দেশনায় তিনি থানা ও পুলিশ লাইন্সে ক্লাস্টার করেছেন বলে জানিয়েছেন। আইসোলেশন সেন্টার করেছেন, যেখানে পুলিশের কোনো সদস্য ছুটি শেষে ফিরলে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়।

এসএম আশরাফুজ্জামান, পুলিশ সুপার (শরীয়তপুর) : করোনা মহামারির শুরু থেকেই বাংলাদেশের এক নম্বর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে গণ্য ছিলো শরীয়তপুর জেলা। যখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলা কেউই শুরু করেনি ঠিক তখন থেকেই ঝুঁকির দিক থেকে এক নম্বরে থাকা এ জেলার পুলিশ সুপার এসএম আশরাফুজ্জামান করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল বেনজীর আহম্মেদ ও ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবীবুর রহমানের নির্দেশে জেলা পুলিশের গোটা ফোর্স নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই।

পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান জানান, তিনি প্রথমেই জনসচেতনতা এবং জনসম্পৃক্ততার কাজটি করেন, পরবর্তীতে ইউরোপ-ইতালি থেকে আসা প্রবাসীদের বিষয়ে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে তথ্য নেন- কে আসলো এবং কোথায় গেল? একইসাথে ওয়ার্ড-ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত কমিটি গঠন করেন।

কমিটি এবং তার পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে প্রবাসফেরত ব্যক্তির বাড়ি শনাক্ত এবং কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেন। ৫ জন পুরুষ পুলিশ সদস্য, ৫ জন নারী পুলিশ সদস্য- একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে কমিটিতে ইমাম, মুয়াজ্জিন, রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষক, চৌকিদার-দফাদারসহ সুশীলসমাজের লোকজন ছিলেন।

এ কাজগুলো করে তিনি শতভাগ সফলতা পান বলেও জানান। এ সফলতা ধরে রাখতে তিনি নিজেই গান লিখে স্থানীয় বাউলদের মাধ্যমে ক্যাবল টিভিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গোটা শরীয়তপুরব্যাপী প্রচার করেন, যা এখনো প্রচার হচ্ছে।

পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষিত রেখে দৈনন্দিন আইন প্রয়োগের কাজ সচল রাখতে প্রথম দিকে সংকট থাকলেও একজন ইতালি প্রবাসী, স্থানীয় এমপি ও পুলিশ সদরদপ্তর থেকে পাওয়া পিপিইর পাশাপাশি মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন-সিসহ চাহিদা অনুযায়ী জিংক ট্যাবলেট সরবরাহ করছেন।

শরীয়তপুর জেলা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো শরীয়তপুরের কাজীর হাট কাঁচাবাজার। বিভিন্ন জেলা থেকে এ হাটে লোকজন আসে। হাট কমিটিকে নিয়ে সেটিও তিনি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন বলে জানান।

ফরিদ উদ্দিন, পুলিশ সুপার (সিলেট) : করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পরপরই সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মো. ফরিদ উদ্দিনের পরিকল্পনায় সংক্রমণ ঠেকাতে প্রতিটি থানায় জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে শুরু থেকেই মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হয়।

পুলিশ লাইন্স, থানা ও ফাঁড়িসহ পুলিশের প্রতিটি স্থাপনা, যানবাহন জীবাণুমুক্ত করতে জীবাণুনাশক স্প্রে ছিটানো হয়। পুলিশের কাছে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষিত রাখতে পুলিশ সুপার কার্যালয় ও সকল থানা, ফাঁড়িতে সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

জনগণকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে সুরক্ষিত রাখতে জেলা পুলিশের উদ্যোগে এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সহযোগিতায় সুরক্ষাসামগ্রী প্রদান করা হয়। পুলিশ সদস্যদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় ফলমূলসহ ভিটামিন সি ও জিংক ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়।  

পুলিশ সুপার (এসপি) ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘ফোন কলের মাধ্যমে আমরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। প্রায় ছয় হাজার পরিবারকে ফোন কলের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা করেছি, এছাড়াও আরও ৯ হাজার পরিবার পেয়েছে পুলিশের নিজস্ব তহবিল থেকে খাদ্য সহায়তা। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ।’

তিনি আরও বলেন, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ রোধ করতে তাদের শারীরিক সক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পহেলা জুন থেকে ১০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পুলিশ সদস্যদের মাঝে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ও আইবারমেট্টিন জাতীয় ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিটি ইউনিটে শরীর চর্চার পাশাপাশি পুষ্টিকর ফলমূল বিতরণ করা হয়।

থানার অফিসার্স ইনচার্জদের তত্ত্বাবধানে চলা এই কর্মসূচির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপাররা নিয়মিত তদারকিও করছেন। এছাড়াও সংক্রমণ বাড়তে থাকায় পুলিশ লাইন্স ও থানাগুলোতে পুলিশ সদস্যদের আলাদাভাবে রাখা ও পৃথক দল গঠনের নির্দেশ দেন এসপি ফরিদ।

তিনি বলেন, সংক্রমণ ঠেকাতে আমরা পুলিশ সদস্যদের আলাদা রাখতে গিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয় ও উপজেলা প্রশসনের ভবন ব্যবহার করছি। পৃথক পৃথক দলে রাখা হচ্ছে যাতে সবাই একসাথে না হন। এছাড়াও প্রতিটি থানার প্রবেশমুখে বসানো হয়েছে জীবাণুনাশক টানেল।

মো. ফারুক আহমেদ, পুলিশ সুপার (মৌলভীবাজার) : মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ। নিজস্ব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার মধ্যে শুরু থেকেই পুলিশ সদস্যদের রেইনকোটকে পিপিই হিসেবে ব্যবহার করে কার্যক্রম শুরু করে।

জেলা পুলিশে কর্মরত সব সদস্যদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেদের উদ্যোগে মাক্স-হেডক্যাপ, হ্যান্ডগ্লাভস তৈরি করে তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। পুলিশের সকল স্থাপনায় জীবাণুনাশক সলিউশন তৈরির মাধ্যমে স্থাপনা কম্পাউন্ড জীবাণুনাশক স্প্রে করা, সকল স্থাপনায় তাঁবু/অস্থায়ী কক্ষ নির্মাণ, যাতে সবাই ডিউটি শেষে পোশাক পরিবর্তন করে ঝুঁকিমুক্ত হয়ে ব্যারাকে প্রবেশ করতে পারে।

থানা, ফাঁড়িসহ সকল স্থাপনায় থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহার, থানায় বা ফাঁড়িতে আগত সকল সেবাপ্রার্থীদের যথাযথভাবে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, সকল সদস্যকে মিনি সাবান এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করা, নিজেদের মাধ্যমে ‘সোপি ওয়াটার’ তৈরি করে পুলিশ ইউনিট সমুহে হাত ধোয়ার কাজে ব্যবহার করা, সকল ইউনিটে পান করার জন্য গরম পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রত্যেক থানায় নিকটবর্তী হোটেল/কমিউনিটি সেন্টারে অফিসার/ফোর্সের আবাসন ব্যবস্থা করা, করোনাযোদ্ধা প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে সকল সদস্যকে প্রতিদিনের খাবার মেনুতে ডিম, দুধ, ভিটামিন সিভিট ট্যাবলেট, ফলমূল বাড়তি সরবরাহ, ডিউটিতে যাওয়ার আগে এবং ডিউটি থেকে আসার পর ব্যবহূত প্রতিটি যানবাহন জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা করা, প্রত্যেক স্থাপনার প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবস্থা, জেলার প্রতিটি ইউনিটে সচেতনতামূলক লিফলেট বিলিকরণ। করোনা সচেতনতায় ব্যানার টানানো।

মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের জন্য করোনা মোকাবিলায় এসওপি প্রণয়ন, সকল স্থাপনায় জীবাণুনাশক টানেল স্থাপনসহ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অক্সিমিটার এবং অক্সিজেন সিলিন্ডার সংগ্রহ করার কাজটি করেন পুলিশ সুপার।

এছাড়াও সকল মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনাসমূহ রেকর্ড আকারে প্রচার করার, জেলার সকল প্রবেশপথে থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে আগতদের তাপমাত্রা পরীক্ষা, হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্লিষ্ট বাড়িতে সাইনবোর্ড, লাল পতাকা উত্তোলন, স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্তকরণ, সকল ইউনিটের কুইক রেসপন্স টিম গঠন। করোনা আক্রান্ত রোগীর দাফনে সংশ্লিষ্টদের সহায়তা প্রদান।

প্রতিটি ইউনিয়নের বিট অফিসার হিসেবে একজন সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগ করা, তার মাধ্যমে কোনো প্রকার সাহায্য পায়নি এ ধরনের লোকদের তালিকা সংগ্রহ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনা, সম্ভব হলে নিজেদের পক্ষ থেকে সাহায্য করা। মানবতার আধার নামে সংগ্রহশালা চালু করা। বিভিন্ন সোর্স থেকে প্রাপ্ত ফোন কলের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভাবী লোকজনের নিকট খাবার পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, উপরোল্লিখিত কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে জেলার সংস্লিষ্ট সকল সরকারি/বেসরকারি দপ্তর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে করোনা মোকাবিলায় জেলা পুলিশ মৌলভীবাজার দিন রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, সবার সম্মিলিত চেষ্টায় করোনাকে জয় করবো ইনশাআল্লাহ।

মিজানুর রহমান, পুলিশ সুপার (সুনামগঞ্জ) : বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব যখন আলোচনায় আসে এবং ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর আমি প্রথমে পুলিশ লাইনে একটি সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করি, সে সময় তাদের আমি বলে দেই কিভাবে এটা মোকাবিলা করতে হবে।

শুরুতেই আমরা আমাদের পুলিশের লোকজনকে সচেতন করি, পরে সাধারণ জনগণকে বিভিন্নভাবে (মাইকিং, লিফলেট বিতরণসহ) সচেতন করি। যখন লকডাউন শুরু হলো তখন লকডাউন বাস্তবায়ন করলাম। এরপর কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন এগুলো বাস্তবায়ন করলাম। সে সময় সুনামগঞ্জে বড় ধরনের একটা কাজ ছিল বোরো ধানকাটা। ধানকাটাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকরা এখানে আসবে এটা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় আমরা সে বিষয়ে তখন কাজ শুরু করলাম।

সবাই মিলেই আমরা বাইরে থেকে শ্রমিক এনে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ধানকাটা নিশ্চিত করলাম। আগাম বন্যায় ধান ডুবে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকলে আমাদের পদক্ষেপের কারণে সেটা আর হয়নি। এর মধ্যেও আমাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হলো।

আক্রান্ত হলেও আমাদের পুলিশ লাইনে নিজস্ব হাসপাতালে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাম। প্রতিটা থানায় প্রবেশের পথে হাত ধোয়া, স্প্রে, মাস্ক পরা— এগুলো না করলে থানায় প্রবেশ করতে পারবে না এগুলো নিশ্চিত করলাম। এরপর আসামি ধরা, আসামি কোর্টে নেয়া, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আনা-নেয়া করা এগুলো নিজস্ব গাড়ি দিয়ে করা সম্ভব হতো না।

গাড়ির চাহিদা কিভাবে পূরণ করবে, আসামি কিভাবে ধরবে, ধরে কিভাবে নিয়ে আসবে, শারীরিকভাবে আসামির কাছাকাছি যাওয়া— এগুলো কিভাবে করতে হবে সে বিষয়ে পুলিশ সদস্যের আমরা শুরু থেকে সচেতনতামূলক ব্রিফ করছি। কারণ আসামি ধরতে গেলে নিজেকে খুব বেশি দূরে রাখা সম্ভব হয় না।

যে কারণে আমাদের বেশ কিছু সদস্য আক্রান্ত হয়। কেউ আক্রান্ত হলে, মারা গেলে, বিদেশ থেকে এলে প্রতিবেশীদের আতঙ্কিত হতে দেখা গেছে। তাদের বুঝিয়েছি যে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেউ অসুস্থ হলে বাড়িওয়ালারা বের করে দিচ্ছেন, পাশের মানুষ জনের অস্থির আচরণ করা এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশে এ পর্যন্ত ৫৫ জন সদস্য আক্রান্ত, তার মধ্যে ৩৮ জনের মতো সুস্থ হয়ে গেছে। আমাদের কেউ এখন পর্যন্ত মারা যায়নি, যারা অসুস্থ আছে তাদের শারীরিক অবস্থা ও খারাপ না, ভালো।

মোহাম্মদ উল্লা, পুলিশ সুপার (হবিগঞ্জ) : পুলিশ সুপার জানান, চীনে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশেও এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। জানুয়ারি মাসে আমরা জেলা প্রশাসকসহ মিটিংয়ে এ নিয়ে আলোচনা করি।

ফেব্রুয়ারিতে আমাদের জেলা পুলিশের মাসিক অপরাধ সভা, কল্যাণ সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করি। দেশে করোনা সংকট শুরু হলে কীভাবে কি করা যায় এসব বিষয়ে। এরপর মার্চ থেকে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব দেশে পাওয়া যায়।

তখন আমরা সিলেট বিভাগের প্রবেশদ্বার হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে হবিগঞ্জ তথা সিলেট বিভাগে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করি। এরপরও মানুষ যখন ঢাকা, নারায়গঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসতে শুরু করে এবং চেকপোস্টের কারণে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সীমান্তে নেমে পায়ে হেঁটে প্রবেশ করতো। যে কারণে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

এরপরও আমরা কমিউনিটি পুলিশ, চৌকিদার দিয়ে যারা গোপনে বাইরে থেকে এসে বাসা বাড়িতে অবস্থান করছে তাদের তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা করে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছি। আক্রান্তের সংখ্যা শুরুতে বেশি থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভালো রয়েছে।

এখন পর্যন্ত হবিগঞ্জে ৮৯৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই আক্রান্ত হন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যেমন কাজ করতে হবে জেলা পুলিশ করোনা মোকাবিলায়ও ঠিক সেভাবেই কাজ করছে।

হবিগঞ্জ জেলা পুলিশের ১৪৫০ জন সদস্যকে সুরক্ষিত রাখা এবং তাদের ইমিউনিটি বৃদ্ধির জন্য দুধ, ডিমসহ উন্নতমানের খাবার, প্রচুর পরিমাণে ভিটামনি সি, ভিটামিন ডি, জিংক ট্যাবলেট ও সিভিট দেয়া হয়েছে।

পুুলিশ সুপর আরও বলেন. স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখার জন্য হ্যান্ড গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ফেইস শিল্ডসহ যা যা প্রয়োজন পিপিইর পাশাপাশি তার সবই দিয়েছি। পুলিশ সদস্যসহ সেবাপ্রার্থীদের থানায় প্রবেশের সময় স্প্রে করছি, জনগণকে সচেতন করতে মাইকিং, ব্যানার, লিফলেট করছি।

সেসব লিফলেট আবার মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে মুসল্লিদের দিচ্ছি, ইমামদের দিয়ে মুসল্লিদের ব্রিফ করাচ্ছি। কমিউনিটি পুলিশের সভাপতিসহ সচেতন নাগরিকদের মাধ্যমে লিফলেট বিতরণ করে জনগণকে সচেতন করার কাজটি করছি।

মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার (কুড়িগ্রাম) : করোনা প্রতিরোধে কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলে সরকার সামাজিক দূরত্ব বা গণজমায়েত প্রতিরোধে সকল সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (জরুরি সেবা ব্যতীত) ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে। ছুটি ঘোষণার পর থেকেই কুড়িগ্রাম জেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান হতে অনেক লোকের আগমন হয়।

পরবর্তীতে গত ৪ এপ্রিলের পরিবর্তে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হলে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও কুড়িগ্রাম জেলার খেটে খাওয়া মানুষসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের আগমন ঘটতে থাকে। কুড়িগ্রাম জেলার প্রবেশদ্বারে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় ১৯টি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার জন্য তালিকা থানার অফিসার ইনচার্জের নিকট প্রেরণ করা হয়।

পুুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান বলেন, জেলা পুলিশ করোনা মোকাবিলায় প্রথম থেকেই ফ্রন্টলাইনে কাজ করে আসছে। জেলার থানাসমূহে ১৩টি মোবাইল টিম ও ৭৩টি ইউনিয়নে অফিসারদের নিয়োগ করে ৭৩টি মোটরসাইকেল টহল ডিউটি পরিচালনা করা হয় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

হাট-বাজারগুলোতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সেগুলো মাঠে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং প্রতিটি বাজারে এবং জনসমাগম হয় এমন স্থানে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে জনসমাগম ও জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে প্রায় দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে এবং গ্রামের মসজিদের মাইকে প্রচারণা চালানো হয়।

তিনি আরও বলেন, জেলার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি জেলা পুলিশে কর্মরত অফিসার ও ফোর্সদের সার্বিক নিরাপত্তায় এ পর্যন্ত ২০০০টি সাবান, ৬৪৪০টি মাস্ক হ্যান্ড স্যানিটাইজার ১২১৪২ জোড়া হ্যান্ড গ্লোভস, ৪১৯টি পিপিই, ৩৭০টি গোগলস বিতরণ করা হয়েছে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শুরু থেকেই পুলিশ সুপার, কুড়িগ্রামের সকল অফিসার ও ফোর্সদের মাঝে ভিটামিন-সি, ডি ও জিংক ট্যাবলেট সরবরাহ করেন এবং মেসে নিয়মিত দুধ ও কলা সরবরাহ করা হচ্ছে।

জেলা পুলিশের অফিসার ও ফোর্সদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় পুলিশ সুপার নিজ উদ্যোগে মেসে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন এবং অফিসার ও ফোর্সদের মাঝে হটপট বিতরণ করেছেন। প্রতিটি ইউনিটে থার্মাল থার্মোমিটার প্রদান করেছেন এবং সকলের স্ক্রিনিং নিশ্চিত করাসহ সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছেন।

কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় ৭০ ভাগ মানুষই দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। করোনা পরিস্থিতির ফলে লকডাউনকালীন সময়ে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে খাদ্য সংকটে পড়ে যায়। খাদ্য সংকটে থাকা প্রায় ২৫০০ অসহায় মানুষের বাড়ি বাড়ি ত্রাণ (চাল ১০ কেজি, ডাল এক কেজি, আটা পাঁচ কেজি, তেল এক লিটার, আলু তিন কেজি, লবণ পাঁচ কেজি) পৌঁছে দিয়ে খাদ্য সংকট নিরসনে সহায়তা করার পাশাপাশি দুর্ভোগে থাকা মানুষগুলোর মুখে হাসিও ফোটাচ্ছে জেলা পুলিশ।

জেলার বিভিন্ন স্থান হতে যখনই কোনো পরিবারের খাদ্য সংকটের মেসেজ পাচ্ছেন তখনই সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে দিয়ে সেই পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন পুলিশ সুপার, কুড়িগ্রাম।

প্রতি রাতে ৪০-৫০টি পরিবারের কাছে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশ সুপার, কুড়িগ্রামের ফেসবুক পেজে যে যখন যেকোনো স্থান থেকে সাহায্যের জন্য মেসেজ দিলে সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়।

বাজারের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসরাম খান, বিপিএম প্রতিনিয়ত বাজার মনিটরিং করছেন এবং তার অধিনস্থদের নিয়মিত তদারকি করার নির্দেশ প্রদান করেন।

যার ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও, পুলিশ সুপার কুড়িগ্রাম জেলায় এখনো যারা ত্রাণ সহায়তা পাননি তাদের তালিকা অনুযায়ী নিজেও ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

পুলিশ সুপার করোনার বিরুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত ১৪৯ জন ডাক্তার ও ৯ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট শুভেচ্ছা উপহার দেন। যার মাধ্যমে জেলা পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে কাজের গতি বৃদ্ধি পাবে।

মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার (গাইবান্ধা) : করোনার প্রাদুর্ভাব যখন দেখা দেয় ঠিক তখনই গাইবান্ধা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম করোনা ভাইরাস সম্পর্কে ধারণা নিয়ে এবং পুলিশ সদস্যসহ গাইবান্ধার জনগণকে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করে যাচ্ছেন।

পুলিশ সুপার বলেন, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার আগে থেকেই আমরা এই কাজটি শুরু করি। বিভিন্ন জনসমাগমে আমরা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন যানবাহনে লিফলেট প্রদান এমনকি এ বিষয় সম্বলিত লিফলেট বিভিন্ন জায়গায় পোস্টারিং করা হয়েছে।

গাইবান্ধা জেলায় গত ২২ মার্চ দুজন আমেরিকা প্রবাসীর মধ্যে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হলে এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়। এই দুজন ব্যক্তি একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই বিয়েতে প্রায় সহস্রাধিক লোক উপস্থিত ছিলো। সঙ্গে সঙ্গেই ওই দুই ব্যক্তিকে আইসোলেশন রাখা হয়। এরা কোথায় কার সঙ্গে মেলামেশা করেছে এসব বিষয়ে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছে বলে মনে হয়েছে এরকম প্রায় এক হাজার জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন করা হয়। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন জায়গা বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর ফেরত গামের্ন্ট শ্রমিকরা গাইবান্ধায় এলে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা হয়।

যাদের মধ্যে কোনো ধরনের লক্ষণ দেখা গেছে তাদের সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের থেকে আইসোলেট করা হয়েছে। তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত গাইবান্ধা জেলায় ২৭ হাজার ২৩ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন করেছি।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার লাশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা এমনকি যখন কেউ লাশ দাফন কিংবা সৎকার করতে আসেনি এ রকম পরিস্থিতিতে পুলিশই সেই লাশের দাফন কিংবা সৎকার করেছে। নিঃস্বার্থভাবে এই কাজগুলো করে যাচ্ছে পুলিশ ।

মো. মনিরুজ্জামান, পুলিশ সুপার (ঠাকুরগাঁও) : দেশে চলমান করোনা ভাইরাস মোকাবিলা ও হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে ইমার্জেন্সি কল সার্ভিস চালুর মাধ্যমে এক মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ। কর্মহীন হতদরিদ্ররা ফোন করলেই রান্না করা খাবার আর খাদ্যদ্রব্য নিয়ে তাদের বাড়িতে হাজির হচ্ছে পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশের এই মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সবাই। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ ও হতদরিদ্ররা। এ মানুষদের সহায়তায় পুলিশের উদ্যোগে নিয়মিত খাদ্যসামগ্রী দেয়া হয়।

ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার মোহা. মনিরুজ্জামান বলেন, কর্মহীন হতদরিদ্রদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে একটি হটলাইন চালু রাখা ছিলো। হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে রান্না করা খাবার ও খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয় পুলিশ সদস্যরা।

প্রতি রাতে ও দুপুরে এই খাদ্য সামগ্রী নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ায় পুলিশ। শুধু মানবিকতার জায়গা থেকে জেলা পুলিশের সদস্যদের নিজেদের বেতনের টাকা থেকে এই উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় পুলিশ।

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, পুলিশ সুপার (দিনাজপুর) : দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বিপিএম পিপিএম (বার)-এর নিজ উদ্যোগে পুলিশের সব সদস্যদের মাঝে মহামারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ক্ষমতাবৃদ্ধিকারক বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে পুলিশের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কেএন-৯৫ মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ডগ্লোভসসহ ফেইস শিল্ড পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষকে দেয়া হয়।

পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে মহামারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে পুলিশের ভূমিকা কি সেটা সবাই দেখছে। এই দেশ আপনাদের তাই দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে আপনারা আপনাদের কাজ করে যাবেন যেনো আমরা দেশের মানুষের সামনে মাথা হেট না করতে হয়।

তাই সাধারণ মানুষকে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলে সচেতন করা থেকে শুরু করে মহামারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যা যা করনীয় সকল কিছু নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছে পুলিশ।

মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান, পুলিশ সুপার (নীলফামারী) : করোনা ভাইরাসে মানুষের বিপদের বন্ধু হিসেবে পাশে ছিলো নীলফামারী জেলা পুলিশ। নিজেদের সুরক্ষার পাশাপাশি করোনা আক্রান্তদের সেবায় কাজ করছে এই জেলার পুলিশ। আক্রান্তদের হাসপাতালে পাঠানো, হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা এবং অসহায় কর্মহীন মানুষের খাদ্য সহায়তা দেয়াসহ নানা মানবিক কাজে এগিয়ে এসেছে নীলফামারী জেলা পুলিশ।

এসব কাজ করতে তারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে লাঠির বদলে মানবিক হাত বাড়িয়ে রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই জেলাবাসী অন্যরকম এক মানবিক পুলিশকে দেখছে। আর এসব কাজে দিকনির্দেশনা, পরামর্শ ও তত্ত্বাবধান করছেন নীলফামারী জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান। যার নেতৃত্বে পুরো জেলা পুলিশ করোনাকালে মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

পুলিশ সুপার মোখলেছুর রহমান জানান, জেলার মানুষের পাশে থেকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করছি, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, জেলা পুলিশের সেবার মান পরিবর্তনসহ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা তার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ পর্যন্ত ৯৩৫টি অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে বিভিন্ন খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছে পুলিশ। রাতের আঁধারে অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষ খুঁজে খুঁজে তাদের মাঝে বিতরণ করছে খাদ্যসামগ্রী।

এছাড়া করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির দাফন-কাফনেও কাজ করছে। এ জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভসসহ অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ ও পুলিশ সদস্যদের জন্য হাসপাতালে আটটি আইসোলেশন বেড রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আসা ১২৯০ ব্যক্তিকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ প্রদান করে জেলা পুলিশ। করোনা মোকাবিলায় জেলার প্রতিটি এলাকায় সচেতনতার জন্য মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বাজারের দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো, জীবাণুনাশক স্প্রে করা, হাটবাজারে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতেও কাজ করছেন। করোনা ভাইরাস উপসর্গ নিয়ে মৃত ২০ জন ব্যক্তির মরদেহ দাফন কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে জেলা পুলিশ।

পুলিশের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সব ইউনিটে টেলিমেডিসিন সেবাও চালু করা হয়েছে। লকডাউনে জেলায় বিভিন্ন স্থানে ২২টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। ওএমএস, টিসিবি পণ্য সঠিকভাবে বিতরণে প্রশাসনকে পুলিশ সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। করোনা প্রতিরোধে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য প্রতিটি এলাকায় উঠান বৈঠক পরিচালনা করা হচ্ছে ও পুলিশদের ডিউটি ১, ২, ৩ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান নীলফামারীতে যোগদান করেন গত ১০ জানুয়ারি। তিনি যোগদানের পর নীলফামারী জেলার চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ এই স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছে পুলিশ।

মোহাম্মদ ইউসুফ আলী, পুলিশ সুপার (পঞ্চগড়) : করোনা পরিস্থিতিতে গৃহীত বহুমুখী মানবিক উদ্যোগ মানবতার সেবায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রথম থেকেই মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি যেখানে প্রত্যেককে ঘরে অবস্থানের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে সেখানে পঞ্চগড় জেলা পুলিশ কাজ করেছে বাইরে থেকে, একেবারে সামনের সারিতে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রথমদিকে গত ৩০ মার্চ করোনা ভাইরাসের লক্ষণ জ্বর, সর্দি ও কাশি নিয়ে এক নারীকে পঞ্চগড় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসা করানোর পর সুস্থ অবস্থায় স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই পুলিশ সুপার।

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া, দেবীগঞ্জ, বোদা, আটোয়ারী ও সদর থানা এলাকায় ৬০০ কর্মহীন হয়ে পড়া ভ্যান, রিকশা, অটোবাইক, সিএনজিচালক এবং মোটর পরিবহন শ্রমিকদের মাঝে ঈদ উপহার সামগ্রী ও ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।

এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে জেলার অগণিত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভ্যান, রিকশা, অটোবাইক, সিএনজিচালক, পরিবহন শ্রমিক লকডাউন সময়ে উপার্জন অক্ষম হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে অনেকে মোবাইল ফোনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এসএমএস করে কিংবা স্থানীয় প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা চেয়েছে।

এ রকম ৬৫০ জন অসহায়, দুস্থ, কর্মহীন, হতদরিদ্র, গরিব, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের জনগোষ্ঠী, এমনকি কর্মহীন হয়ে পড়া মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মাঝে রাতের অন্ধকারে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়।

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অফিসার ইনর্চাজসহ পঞ্চগড় জেলা পুলিশের মোট সাতজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের আইসোলেশনে রেখে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

বিপ্লব কুমার সরকার, পুলিশ সুপার (রংপুর) : করোনা মহামারিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্বপালনে কৃতিত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ সদস্যরা জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। জনগণের পুলিশ হিসেবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন রংপুর জেলার পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার।

তিনি এই মানবতার জন্য রংপুর রেঞ্জ পুলিশের শ্রেষ্ঠ পুলিশ সুপার হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। কৃতিত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে চতুর্থবারের মতো শ্রেষ্ঠ পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

করোনার কারণে এর আগে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ রাখতে মাদক উদ্ধার, মামলার রহস্য উদঘাটন, ওয়ারেন্ট তামিল, সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বসম্মতিক্রমে মানবিক পুলিশ বিপ্লব কুমার সরকার।

বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেয়া মরণঘাতী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রংপুর জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যন্ত চষে বেড়াচ্ছিলেন করোনাযুদ্ধের এক অদম্য যোদ্ধা পুলিশ বাহিনীর আইকন, রংপুর জেলা পুলিশের অভিভাবক মানবিক পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার।

কাজের ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জেলার প্রতিটি উপজেলার প্রধান প্রধান হাটবাজার ও বিভিন্ন দোকানপাট, বিপণী বিতানগুলোতে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে করোনা সংক্রমণের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে চলছে রংপুর জেলা পুলিশ।

গত ৮ মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাসে রংপুরের বিভিন্ন স্থানে অবিরাম ছুটে চলেছেন রংপুরের এই পুলিশ সুপার। করোনার শুরুতেই লকডাউনে প্রবাসীসহ সাধারণ জনগণকে ঘরে রাখা, ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা, কোয়ারেন্টাইন ও লকডাউন অমান্যকারীদের ঘরে ফেরানোর কাজসহ জনসচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশ সদস্য এবং তাদের পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হসপিটালে পাঠাচ্ছেন; সাহস জোগাচ্ছেন; বাসায় কিভাবে চিকিৎসা নিতে হয় তার পরামর্শ দিচ্ছেন। এমনকি প্রয়োজনীয় ওষুধও পাঠাচ্ছেন মানবিক পুলিশ রংপুর সুপার।

আবিদা সুলতানা, পুলিশ সুপার (লালমনিরহাট) : ‘পাশে আছি মানবিকতায়, রয়েছি সেবা ও সুরক্ষায়, জেগে থাকি পাহারায়’— এই মূলমন্ত্র হূদয়ে ধারণ করে লালমনিরহাট জেলার পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে রাতদিন বিপন্ন জনসাধারণের সেবা করে যাচ্ছে জেলা পুলিশ।

পুলিশ সুপার নিজেই প্রতিনিয়ত ছুটছেন জেলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। এতে জেলার বাসিন্দাদের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে পুলিশ সুপারের মানবিকতা। জেলা পুলিশের মানবিক সহায়তার আওতায় লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া প্রায় ১৫শর বেশি পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত অভুক্তদের ফোনকল বা অন্য কোনো উপায়ে যোগাযোগের ভিত্তিতে রাতের আঁধারে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। পাশাপাশি হিজড়া সম্প্রদায়, নরসুন্দর, নাইটগার্ড এবং পরিবহন শ্রমিকদের মাঝেও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

এতিম, প্রতিবন্ধী ও ছিন্নমূল অনাহারি মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে ইফতার সামগ্রী। এছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিপদগ্রস্তদের গোপনে অর্থ সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছেন লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার।

কোভিড-১৯ এর প্রার্দুভাবের শুরু থেকেই লকডাউন নিশ্চিত করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা পুলিশ। জেলার প্রবেশ মুখের পাঁচটি এবং এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় প্রবেশের ছয়টি মোট ১১টি স্থানে নিয়মিতভাবে চেকপোস্ট স্থাপন করে জনসাধারণের ও গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।

জেলায় বিদেশ ফেরত এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আগতদের বাড়িতে লাল পতাকা টানিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জনসাধারণের নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাস্তব ও কার্যকরী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

জেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড এবং সকল পুলিশ ইউনিটের সামনে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন, পানি ও সাবান, লিকুইড সোপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রাঙ্গণ ও পুলিশ স্থাপনাসমূহে নিয়মিতভাবে জীবাণুনাশক ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করা মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে এলাকাবাসীর ভীতি ও বাধার মুখে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেছেন লালমনিরহাটে পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায়ও নেয়া হয়েছে বিভিন্ন কার্যক্রম। ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে পুলিশ সদস্যদের ডিউটিতে নিয়োজিত করা হচ্ছে। যাতে করে কেউ আক্রান্ত হলে সবাইকে আইসোলেশনে না পাঠাতে বা পুরো থানাকে লকডাউন না করতে হয়।

পুলিশ সদস্যদের মাঝে কয়েক দফায় পিপিই, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লোভস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ভিটামিন জাতীয় ওষুধ এবং হোমিও ওষুধসহ অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী বিরতণ করা হয়েছে। নিয়মিত গরম পানি পান করার জন্য প্রতিটি থানায় অত্যন্ত উন্নতমানের গরম পানির ফিল্টার স্থাপন করা হয়েছে।

ডিউটিকালীন সময়ে তারা যাতে গরম পানি পান করতে পারে সেজন্যও ফ্লাক্স বিতরণ করা হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় জেলা পুলিশের এই সুব্যবস্থাপনার কারণে এ যাবত অর্থাৎ ৯ জুলাই পর্যন্ত জেলা পুলিশের মোট ৯৪৯ জন সদস্যের মধ্যে মোট আক্রান্ত পুলিশের সংখ্যা ১১ জন যাদের মধ্যে ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৯ জন পুলিশ সদস্য।

মো. আহমার উজ্জামান, পুলিশ সুপার (ময়মনসিংহ) : করোনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ। আক্রান্তদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা, লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ, নিজস্ব অর্থায়নে অসহায়, অসচ্ছল, দিন এনে দিন খাওয়া ও ভাসমানদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রিসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এ বাহিনীর সদস্যরা।

এ কর্মকাণ্ড সরাসরি মনিটরিং করছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আহমার উজ্জামান। এ জন্য তিনি জেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। করোনার এই দুর্যোগময় মুহূর্তে পুলিশের মানবিক এ কর্মকাণ্ড জেলার সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। করোনা শুরুর থেকেই জেলা পুলিশের সদস্যরা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে জনসাধারণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

নিজেদের বেতনের টাকা, বৈশাখী ভাতা এবং পুলিশের আভ্যন্তরীণ কেনাকাটার অর্থ বাঁচিয়ে জেলার কর্মহীন অসহায় হতদরিদ্র প্রায় ছয় হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে ময়মনসিংহ পুলিশ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করছেন পুলিশ সদস্যরা। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে পুলিশের নিজস্ব শিল্পীদের মাধ্যমে করে বাসিন্দাদের সচেতন করা হয়।

এছাড়া পুলিশ সুপার আহমার উজ্জামানের নির্দেশে জেলা পুলিশ বস্তিবাসী, অসহায়, অসচ্ছল, দিন এনে দিন খাওয়া, কর্মহীন, শ্রমিক, বেদে পরিবার, কুলি, নৌকা মাঝি, এতিমদের খুঁজে খুঁজে তালিকা করে তাদের ঘরে ঘরে খাদ্য সহায়তা করে ময়মনসিংহ পুলিশ মানবিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

এছাড়াও লকডাউনে বিভাগীয় নগরীতে না খেয়ে ফুটপাতে পড়ে থাকা ভাসমানদের আহার জুগিয়েছেন পুলিশ সুপার। রান্না করা খাবারের প্যাকেট নিয়ে শহরে ঘুরে ঘুরে ভাসমান না খাওয়া মানুষের পেটে নিয়মিত আহার তুলে দেয়া হয়।

এতিমদের বাড়ি বাড়ি খাদ্য পৌঁছে দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন মানবিক এসপি। এছাড়া করোনায় যারা মারা যাচ্ছেন তাদের দাফনের দায়িত্ব পড়েছে পুলিশের ওপর। করোনা প্রতিরোধে নানা ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে সব সময় তৎপর পুলিশ।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আহমার উজ্জামানের মানবিক ও দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ড এখন জেলাবাসীর মুখে মুখে। করোনার চরম ঝুঁকি নিয়ে তিনি প্রতিদিনই ছুটছেন জেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। জেলা পুলিশের সব ইউনিটকে সদা জাগ্রত রাখছেন মানবসেবায়।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আহমার উজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজিপি মহোদয়ের মানবিক নির্দেশনা মেনে আমরা সর্বদা জনসাধারণের পাশে রয়েছি। এই দুর্যোগময় মুহূর্তে দায়িত্ববোধই আমাকে নীরবে বসে থাকতে দেয়নি। মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, মানব প্রেম সার্বক্ষণিকভাবে আমাকে তাড়া করেছে।

তাই আমি অবিরাম ছুটে চলছি মানব সেবার আগ্রহ নিয়ে। করোনায় সেবা দিতে গিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হলেও আমরা থেমে নেই। জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু থাকা পর্যন্ত দেশ ও জাতির সেবায় নিজেদের বিলিয়ে দেবো।

মো. দেলোয়ার হোসেন, পুলিশ সুপার (জামালপুর) : জামালপুর পুলিশ সুপার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত, করোনা আক্রান্ত প্রতিরোধ ও সর্বস্তরের জনগণের জীবন-জীবিকা নির্বাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে সরকার কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? বর্তমান সরকার করোনা আক্রান্ত প্রতিরোধ ও সর্বস্তরের জনগণের জীবন-জীবিকা নির্বাহ স্বাভাবিক রাখতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

করোনা ভাইরাস বিস্তৃতি রোধের জন্য জনগণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ক্রয় ও চিকিৎসা গ্রহণ ইত্যাদি) কোনোভাবেই ঘরের বাইরে না আসার জন্য সবাইকে সচেতন করা হয়। বহিরাগত জনগণকে প্রশাসনিকভাবে কোয়ারেন্টাইনের মাধ্যমে সামাজিকভাবে অবস্থানের ব্যবস্থা নেয়া হয়।

অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং অনেক ক্ষেত্রে নগদ অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এছাড়া চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স, চিকিৎসা কর্মীদের এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পিপিসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হয়।

কর্মহীন ৬২২৭ জন মানুষকে ৬২২৭০ কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত পুলিশ সদস্য ও সাধারণ জনগণকে দাফন-কাফনের সকল ব্যবস্থা করেছে এ জেলার পুলিশ।

মো. আকবর আলী মুনসী, পুলিশ সুপার (নেত্রকোনা) : করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় নেত্রকোনা জেলা পুলিশ মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকল্পে হাটবাজার থেকে শুরু করে গ্রাম-পাড়া-মহল্লায় সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাজার সরবরাহের সুব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী যথাযথ প্রক্রিয়ায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলা পুলিশের নিজস্ব অর্থায়নে কর্মহীন ৬০০ শ্রমজীবী পরিবারের খাবার পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় জীবাণুনাশক ছিটানো, অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার জন্য পরিবহন সুবিধা দেয়াসহ মানবিক কাজও পরিচালনা করা হচ্ছে।

সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি বাজার মনিটরিংয়ে সহযোগিতা ও জনবহুল জায়গায় তিন ফিট দূরত্বে বৃত্ত এঁকে দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে নেত্রকোনা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করা হচ্ছে।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে। এদিকে আগাম বন্যার আশঙ্কায় হাওরে ধানকাটা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।

থাকা-খাওয়াসহ ন্যায্যমূল্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুলিশের নিজস্ব পরিবহনে শ্রমিকদের পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুরীতে পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে কমিটি করে দিয়েছেন পুলিশ সুপার আকবর আলী মুন্সী।

নেত্রকোনা পুলিশ সুপার আকবর আলী মুন্সী বলেন, বিদেশ ফেরতদের ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দেয় পুলিশ। হাওরে ধানকাটা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। অসহায়দের মাঝে ঈদ উপহার সামগ্রীসহ মাস্ক বিতরণের উদ্যোগ হাতে নেয়া হচ্ছে।

কাজী আশরাফুল আজীম, পুলিশ সুপার (শেরপুর) : আমরা আছি অসহায় দুস্থদের পাশে। মানবিক পুলিশের চোখে জনতার আকাঙ্ক্ষা লেখা থাকে। করোনা প্রতিরোধে এমন সব স্লোগান-সংবলিত সাড়ে পাঁচ শতাধিক বিলবোর্ড গত কয়েকদিনে জেলায় স্থাপন করেছে শেরপুর জেলা পুলিশ ও কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম। মানুষের জন্য রাস্তার পাশে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেছে পুলিশ। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে শেরপুর জেলা পুলিশের নানা উদ্যোগে মানুষ দারুণ উজ্জীবিত।

এছাড়াও মসজিদ-মাদ্রাসাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণের মধ্যে করোনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক পাঁচ লাখ লিফলেট বিতরণের কাজ চলছে পুরোদমে। প্রায় দেড় লাখ লিফলেট বিতরণ হয়েছে।

পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন মসজিদ ও জনসম্পৃক্ত এলাকায় গিয়ে এসব লিফলেট নিজ হাতে বিতরণ করছেন।

সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে ৫ উপজেলা শহরে চলছে ব্যাপক মাইকিং। মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বানসহ অযথা শহরে আড্ডা না দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। জেলা শহরের পুলিশের দুই-তিন সদস্যের বেশ কয়েকটি টিম তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে করোনা নিয়ে কথা বলছেন। তারা অযথা শহরের রেস্টুরেন্টে আড্ডা ও ঘুরাঘুরি না করার জন্য তাদের অনুরোধ করা হয়।

শুধু তাই নয়, অটোরিকশা ও সিএনজিতে চলাচলরত যাত্রীদের তারা গণপরিবহন ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধ করা জেলা ও উপজেলা শহরে পুলিশের শতাধিক টিম। এতে গত দুদিনে জেলা সদরসহ উপজেলা শহরে রাস্তায় জনাসাধারণের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে।

এদিকে স্কুল-কলেজ বন্ধ হওয়ার পর খেলার মাঠগুলোতে গত কয়েকদিন ছিলো তরুণদের ব্যাপক সমাগম। পুলিশ খেলার মাঠে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিভাবকদের ডেকে, বোঝানোর ফলে খেলার মাঠে এখন যাচ্ছে না তরুণরা।  করোনা প্রতিরোধে পুলিশের এসব উদ্যোগ দারুণ প্রশংসা পাচ্ছে জনসাধারণের মধ্যে। চরম মানবিক সংকটে পুলিশ মানুষের পাশে আছে। পুলিশ মানুষের পাশে আছে বলেই মনে সাহস পায়।

পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, মানুষের সেবার জন্য জেলা পুলিশের সহস্রাধিক সদস্য তৈরি রয়েছে। তাদের মাস্ক-গ্লাভস দেয়া হয়েছে। মানুষের জন্য তারা নিজেদের সুখ ত্যাগ করতে প্রস্তুত। ঝুঁকি থাকলেও পুলিশ সদস্যরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। করোনাকে প্রতিরোধ করতে যা যা দরকার সবকিছুই আমরা করবো।

আরও পড়ুন: করোনা মহামারিতে সম্মুখযোদ্ধা পুলিশ (প্রথম পর্ব)

আমারসংবাদ/এসটিএম