সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৩ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ১৫,২০২০, ০১:৩৩

সেপ্টেম্বর ১৫,২০২০, ০১:৩৩

‘ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক’ সাড়ে ৬ বছরেও হলো না শেষ

ঝুঁকিতেই হাওরের বিনোদন

জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সাড়ে পাঁচ বছরে অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের দেয়া হবে প্রায় ২৩ কোটি টাকা। একই সাথে দেলদুয়ার সেতুর তলদেশে স্কাউটিং মেরামতের জন্য অতিরিক্ত কাজের জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

এসব কাজ করতে এবার দ্বিতীয় সংশোধন করে ‘ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সময় এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে।

 কিন্তু হাওরে বছরব্যাপী আন্তঃউপজেলায় যাতায়াতে নির্মাণাধীন ২৯ কিলোমিটারেরও বেশি সড়কের দুই পাশে গার্ডরেল (বেরিয়ার) হিসেবে কোনো অঙ্গ রাখা হয়নি। কোনো বৃক্ষরোপণেরও ব্যবস্থা করা হয়নি।

প্রকল্পটির কাজ শেষ না হলেও একটু বিনোদনের জন্য বর্ষাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক যাচ্ছেন হাওরে। ব্যাপকভাবে পর্যটকদের ভিড় শুরু হয়েছে।

তারা বলছেন, সড়কের দুই ধারে শুধু পানি থইথই করছে। কোন কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে সবই একবারে তলিয়ে যাবে। বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে কাঁদাবে দেশের মানুষকে বলে তারা অভিযোগ করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।

জানতে চাইলে প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, সবকিছু বিবেচনা করে সড়কের পাশে গার্ডরেল রাখা হয়নি। কারণ হার্ড সোল্ডারে নৌকা বেঁধে তা নষ্ট করে দেবে।

তবে প্রয়োজন মনে করলে মেইনটেইনেন্স থেকে সড়কের দুইপাশে রেলিং করা যাবে। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি শেষ হয়েছে। তাহলে কেন সংশোধন করে এক বছর সময় বাড়ানো হচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু কাজ বাকি রয়েছে।

অধিগ্রহণকৃত সাড়ে ৯১ হেক্টর ভূমির ক্ষতিপূরণে অতিরিক্ত দেড়গুণ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। একই সাথে দেলদুয়ার সেতুর তলদেশে স্কাউটিং মেরামত করা হবে। এছাড়া আরও কিছু কাজ রয়েছে। সেগুলো করতে সময় লাগবে।

এ জন্য আগামী জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্প্রতি পিইসি সভাও হয়েছে। সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। খুব শিগগিরই একনেক সভায় অনুমোদন পাবে বলে জানান তিনি।   

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাজিবুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থেকে অষ্টগ্রাম হাওরে ঘুরতে গিয়েছিলাম। খুবই মজা ও আনন্দ  হয়েছে। কিন্তু মহাবিপদ মনে হয়েছে সড়কের দুই পাশে কোনো রেলিং নেই।

ইজিবাইক, নসিমনই একমাত্র ভরসা পানির উপরে দীর্ঘ এই সড়ক পথে। সাথে ব্যক্তিগত বাইক চলছে বেপরোয়াভাবে। পানিপথে রয়েছে শ্যালো ইঞ্জিনের ছোট ছোট ট্রলার। এসব পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ নেই। যেকোনো সময় সড়ক থেকে ছিটকে পড়ে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। অথৈ পানিতে চলিয়ে যাবে ভ্রমণপিপাসুদের জীবন। পর্যটক পরিবারে নেমে আসবে সারা জীবনের কান্না।

মাত্র ১০ মিনিটে ৫০০ টাকা আয় করছেন অটোরিকশা চালিয়ে। এ সড়কের বড় সেতুর কাছে যেতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। শুধু ওই রাজিবুলই নয়, আসাদুজ্জামান আজমসহ অসংখ্য পর্যটক জানান দারুণ মজা পানির বুকে সড়কে ঘুরা। কিন্তু ভয়ের শেষ নেই। কারণ সড়কের দুই পাশে নেই রেলিং।

তারা জানান, আমাদের মতো প্রতিদিন ঢাকা থেকে শতশত পর্যটক একটু স্বস্তির জন্য ছুটে যাচ্ছেন থইথই পানির উপরে দাঁড়ানো দীর্ঘ সড়কে ভ্রমণ করতে। কিন্তু সবার একই শঙ্কা ও ভীতি সড়কের দুই পাশে নেই রেলিং। কাজেই একটু আনন্দের জন্য হাওরে এলেও শঙ্কা ও ভয়— কখনো কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রক্ষা পাওয়া যাবে না। একেবারে পানিতে তলিয়ে যেতে হবে।

অটো ও ট্রলার ভাড়া খুবই বেশি। এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু দেখার কেউ নেই বলে ভুক্তভোগীরা জানান। তারা আরও জানান, ব্যাপকভাবে মানুষের আয়ের পথ তৈরি করেছে এই সড়ক। প্রতিদিন এই সড়কে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল নামছে। সবাই ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক দেখতে আসছেন।

একটিমাত্র রাস্তা  হাওরের অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে দিচ্ছে। তা চোখে না দেখলে বুঝা যাবে না। সীমাহীন জলরাশি, নয়নাভিরাম সড়ক ও হাওরের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকরা আসছেন এ সড়কে। তাদের জন্য এলাকায় ক্ষুদ্র দোকানি, রেস্তোরাঁ মালিক, নৌকার মাঝি, নসিমন-করিমন-লেগুনা-অটোরিকশার ড্রাইভার মিলিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য মানুষের।

হাওর অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার মধ্যে বছরব্যাপী সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। প্রথমে সাড়ে তিন বছর সময় ধরা হয়।

এতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয়-১৩১ দশমিক ২১ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ, সাড়ে পাঁচ ফুট প্রস্থের প্রায় ২৮ কিলোমিটার পেভমেন্ট ও হার্ড শোল্ডার নির্মাণ, ১৯০ মিটারের ৬২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট ও ২৭০ মিটারের ১১টি আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ।

৫৯০ মিটারের তিনটি পিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, সাত লাখ ৬০ হাজার ৮০৭ বর্গমিটারের সিসি ব্লকসহ স্লোপ প্রটেকশন, আট লাখ তিন হাজার ৮৯৮ বর্গমিটারের জিও টেক্সটাইল ১৪৪টি ট্রাফিক সাইন ও ১৪৪টি সাইন পোস্ট নির্মাণ। এছাড়া পরিবহন, বেতন-ভাতার ব্যয়ও ধরা হয়। তাতে হয়নি পুরো কাজ।

২০১৮ সালের ২১ জুন প্রথমবার সংশোধন করে একলাফে ব্যয় দ্বিগুণ ৮৭৪ কোটি টাকা করা হয়। একই সাথে সময় বাড়ানো হয় দুই বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু সেই সময়েও হলো না শেষ।

তাই আবারো সময় বাড়ানো হচ্ছে এক বছর। অর্থাৎ পুরো প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালের জুনে শেষ হবে। তাতে রাখা হয়নি গার্ডরেল। অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো সব প্রক্রিয়া শেষে একনেক সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সূত্র জানায়।

আমারসংবাদ/এআই