বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০

৫ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ২০,২০২০, ১২:১৮

সেপ্টেম্বর ২০,২০২০, ১২:১৮

আটকে আছে সরকারি নিয়োগ

নিয়োগ জটিলতা বাড়ছেই। বাড়ছে সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের অপেক্ষার প্রহরও। পদশূন্য হচ্ছে প্রতি মাসেই। দেয়া হচ্ছে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও। আবেদনও জমা পড়ছে লাখ লাখ।

তবে আইনি জটিলতায় শূন্যপদ পূরণ করতে পারছে না সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থাগুলো। কিন্তু চাকরিপ্রার্থীদের পরীক্ষার ফি বাবদ আয় হচ্ছে বিপুল অর্থ।

তবে নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার নেই কোনো তোড়জোড়। মূলত নিয়োগ বিধি ও মামলা জটিলতার কারণেই হাজার হাজার শূন্য পদে নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারণ প্রতিনিয়তই কোথাও না কোথাও মামলা হচ্ছেই। মামলার ফলেই আটকে যাচ্ছে নিয়োগ। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি সংশোধন ও মামলা নিষ্পত্তির প্রাথমিক কাজ শেষ করতেই কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর।

তাই নিয়োগ দেয়াও আর সম্ভব হচ্ছে না। ফি দিয়ে আবেদন করেও পরীক্ষা দিতে না পেরে চাকরির বয়স হারাচ্ছে অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী। ফলে তাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।

এদিকে প্রশাসনিক মামলাজট দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ‘অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের উদ্যোগ’ নিয়েছিল সরকার। তবে ১১ বছর আগে অধ্যাদেশ জারি হলেও অনুমোদন না হওয়ায় এখনো আলোর মুখ দেখেনি অ্যাটর্নি সার্ভিস আইন।

তাই সংক্ষুব্ধদের করা মামলা নিষ্পত্তির শূন্য হারে নিয়োগে জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। সংকটও নিরসন হচ্ছে না। আবার এর সাথে যুক্ত হয়েছে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের অদক্ষতা। যার কারণে বেশির ভাগ মামলায় পরাজিত হচ্ছে সরকারপক্ষ।

আবার সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আইন অনুবিভাগে নেই কোনো স্থায়ী জনবল। ফলে বেশির ভাগ কর্মকর্তা স্বল্প সময়ের জন্য এসে কাজ করেন দায়সারাভাবে। এভাবে একদিকে যেমন মামলাজট বাড়ছে।

অন্যদিকে চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপযুক্তরা। মামলা যথাযথভাবে পরিচালনা ও সময়মতো পদক্ষেপ নিতে না পারায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রায়ও সরকারের বিপক্ষে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংক্ষুব্ধরা মামলা করবে এটা স্বাভাবিক কিন্তু মামলার আইনি প্রক্রিয়া চালাতে হবে, তা না হলে জট বাড়বে এবং সমস্যা তৈরি হবে। সময়মতো নজর দিলে এ পরিস্থিতি হতো না। মামলা হয় কিন্তু নিষ্পত্তির হার নেই বললেই চলে।

এতে মামলার স্তূপ বেড়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাষ্ট্রের আইনজীবী, আইন শাখার কর্মকর্তারা থাকার পরও এখন বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকে আসা এসব মামলার বিবাদি সচিবসহ বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তরের প্রধানরা।

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, চাকরি স্থায়ী ও একীভূতকরণ, পেনশন, অব্যাহতি, বেতন কাঠামো পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কাজে অসঙ্গতিতে মামলা ঠুকে দেন ভুক্তভোগীরা।

এক্ষেত্রে বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর মধ্যে রয়েছে বেতন স্কেল বাড়ানো, পদোন্নতি, প্রকল্পভুক্ত ও দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরতদের চাকরি স্থায়ীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়। বিভাগীয় পর্যায়েও অনেক মামলা রয়েছে। এসব মামলার কারণে প্রশাসনের শূন্য পদে জনবল নিয়োগ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, খাদ্য, কৃষি, ভূমি, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থার প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার ৭০৫টি মামলা রয়েছে। আর এসব মামলা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ, আপিল বিভাগ ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।

গত এক বছরে মামলা হয়েছে এক হাজার ১৫১টি। নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৩১৯টি মামলা। মামলা নিষ্পত্তির হারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ইউনিটের সুপ্রিম কোর্টে রিট মামলা চলমান আছে ২২৬টি।

এর মধ্যে ১৯৪টি মামলার ওকালতনামা ও দফাওয়ারি জবাব প্রেরণ করা হয়েছে। ৩০টি মামলার জবাব প্রক্রিয়াধীন আছে। লিভ টু আপিলসহ অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থার মোট রিট মামলার সংখ্যা পাঁচ হাজার ৩৮৩টি।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কাজের অসঙ্গতিতে উচ্চ আদালতে রিট করেন আইনজীবীরা। এতে রিট মামলার নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় দৌড়াতে হয় ওই দপ্তরকে।

সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, গত ২০১৮ সালের ১১ জুলাই এক হাজার ১৬৬টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল খাদ্য অধিদপ্তর। এসব পদে প্রায় ১৪ লাখ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। এ পরীক্ষার ফি বাবদ খাদ্য অধিদপ্তরের বিপুল অর্থ আয় হয়েছে।

কিন্তু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দেড় বছর পরও পরীক্ষার তারিখ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। একইভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তর ২০১৮ সালের ৯ জুলাই ৪৬৩টি সমাজকর্মী (ইউনিয়ন) পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এক বছর পর ২০১৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এসব পদে আবেদনকারী প্রায় আট লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু পরীক্ষার কয়েকদিন আগে অনিয়মের আশঙ্কায় তা স্থগিত করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ২০১৮ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪১টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। কিন্তু পরীক্ষা কবে হবে তা অনিশ্চিত। মূলত হাইকোর্টের মামলার কারণে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত আছে। মামলার শুনানি চলছে। রায় হলে পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানা যায়।

 ২০১৮ সালের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বিজ্ঞপ্তি দেয়া ১২টির মধ্যে ৯ ক্যাটাগরির সব পদে নিয়োগ হলেও বাকি তিনটির প্রায় ২৫টি পদে সব কাজ সম্পন্ন হলেও চলমান ভাইভা স্থগিত রাখা হয়েছে।

এছাড়া রেলপথ, ভূমি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তীব্র জনবল সংকট থাকলেও নানা কারণে ঝুলে আছে হাজার হাজার প্রার্থীর নিয়োগ প্রক্রিয়া।

প্রশাসনের ঘাড়ে অতিরিক্ত মামলার চাপ থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নিয়োগে কি ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আসলে মামলা থাকলে স্বাভাবিকভাবে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয় না।

তখন আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ওই নিয়োগ দিতে হয় আর আইনি প্রক্রিয়াটা সময়সাপেক্ষ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ বাদে সব রাষ্ট্রে আইন ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন। আর সরকারের আইন ক্যাডার না থাকায় অজান্তেই প্রতিনিয়ত অনেক আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে।

ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অগণিত মামলা হয়। তিনি বলেন, দেশে অস্থায়ী ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হয়। এ কারণে সরকার বেশির ভাগ মামলায় হেরে যায়। সার্বিকভাবে রাষ্ট্র ও বিচারপ্রার্থী জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর দেশে আইনের শাসন শুধু মুখের কথায়। আইন কর্মকর্তা ছাড়া আইনের শাসন সম্ভব নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকার আইন ক্যাডারের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনই করছে না।

আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, করোনায় অনেকটা স্থবির ছিলো, আশা করি এখন দ্রুত এসব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। আর সরকারি কৌঁসুলিদের মামলা পরিচালনার সুবিধার্থে অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে।

তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস সহায়তা করছে। এ জন্য আলাদা আইনজীবী শাখা আছে। তারাও কাজ করছেন।

আমারসংবাদ/এআই