শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২০

৯ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

আবদুর রহিম

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ২৩,২০২০, ১২:১১

সেপ্টেম্বর ২৩,২০২০, ১২:১১

খালেদার তিন বার্তা দলে

৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে সমাবেশ ডাকবে বিএনপি। চালু হয়েছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। রাজনীতির দৃশ্যমান মাঠে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া না থাকলেও অদৃশ্যভাবে দলকে নির্দেশনা দিচ্ছেন।

তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে আসছে দলীয় কার্যক্রমের সকল সিদ্ধান্ত। সেপ্টেম্বরের শেষ সময় থেকে ৭ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত কর্মসূচির পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। বার্তা দেয়া হচ্ছে সকল নেতাদের।

পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়া নীরবে বিএনপির নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি তৈরিতেও কাজ করছেন। ঘনিষ্ঠ নেতাদের সিদ্ধান্ত পৌঁছে দিচ্ছেন কৌশলে। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে দলটি।

এর মধ্যে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর হতভম্ব অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। শর্তে মুক্তির দ্বিতীয় দফা জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির পর এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে থাকছেন না।

তাই তিনি প্রজন্ম তৈরি করে যাচ্ছেন। তারেক জিয়ার হাতেই আগামী দিনের নেতৃত্ব চেরাগ দিয়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দলে দেয়া হয়েছে তিন বার্তা। দৃশ্যতভাবে খালেদা জিয়া আর রাজনীতিতে থাকছেন না। তারেক জিয়াই দলের প্রধান নেতা, দল চলবে সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের অতীত কৌশলে।

জানা গেছে, সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তারেক জিয়ার যে কিছুটা দূরত্ব ছিলো তা মিটে গেছে। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপিকে ভাঙার ষড়যন্ত্র শক্তহাতে নস্যাৎ করেছেন। দলকে রাখতে পেরেছেন ঐক্যবদ্ধ। নেতৃত্ব পাওয়ার পর দূরদর্শিতা দিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে সব ধরনের রাগ-ক্ষোভ দূর করে সিদ্ধান্ত মানার উপযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।

দলের শীর্ষপর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রতিদিনই তিনি যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। এমন কার্যক্রমে সন্তোষ তরুণ প্রজন্মও। বিগত কয়েক বছরের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ নিয়ে কেউ আর প্রশ্ন তুলছেন না। চলমান কার্যক্রমে ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আস্থা রেখে তাকেই ভবিষ্যৎ নেতা বানাচ্ছেন খালেদা জিয়া। এখন থেকেই কৌশলে দলের সব ধরনের সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের বর্তমান কমান্ডিং প্রক্রিয়া যেভাবে চলছে সেটাই বহাল থাকবে। বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে খালেদা জিয়া আমৃত্যু একই পদে থাকবেন।

তবে কমান্ডিং ক্ষমতা পুরোটাই থাকবে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে। তার নেতৃত্ব পর্যায়ক্রমে আরও শক্ত অবস্থানে নিতে বিভিন্ন মাধ্যমে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছেন দলের চেয়ারপারসন।

শীর্ষ নেতারাও মনে করছেন, গোটা উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবার প্রথার গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে জিয়া ও শেখ পরিবারের বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠার বাস্তবতা বহুলাংশে কম।

সেক্ষেত্রে বেগম জিয়া যতদিন আছেন, একই পদে থাকবেন। দলের সক্রিয় নেতৃত্ব থাকবে তারেক রহমানের কাছে। এখানে অন্য কেউ গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই জিয়া পরিবারই বিএনপির ঐক্যের প্রতীক।

জিয়া পরিবারের কেউ দায়িত্ব পালন করুক বা না করুক, তারা দলের নেতা এই কারণেই এত সংকটের মুখে ভাঙনের মুখে পড়ছে না। কিন্তু যখনই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সরে যাবেন তখনই দলের মধ্যে নানা রকম কোন্দল এবং বিভক্তি দানা বেঁধে উঠতে পারে। সেই শঙ্কা থেকে আগ থেকেই তারেক রহমানকে সব দিক থেকে প্রস্তুত করছেন খালেদা জিয়া।     

করোনা মহামারির কারণে পাঁচ মাস বন্ধ রাখার পর কমিটি গঠনসহ সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। শনিবার রাতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয় বলে জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি এখনো বিরাজমান। বাস্তবতার নিরিখে দলীয় কার্যক্রমের অগ্রগতির জন্য সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সাংগঠনিক কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

সারা দেশের নেতাকর্মীদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে যে, নেতাকর্মীদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

গত ২৫ মার্চ বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বিএনপি দলের সকল প্রকার সাংগঠনিক কার্যক্রম তথা কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের কাজ একমাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে। এরপর পর্যায়ক্রমে এই স্থগিতাদেশ বর্ধিত করা হয় দফায় দফায়। সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ ছিলো।

বিএনপির স্থগিতাদেশ থাকলেও ইতোমধ্যে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, ছাত্রদল প্রভৃতি অঙ্গসংগঠন গত আগস্ট মাস থেকে মাঠপর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ শুরু করে দিয়েছে।

এদিকে আসন্ন ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনের উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই বিএনপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করবে বলে স্থায়ী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়।

এছাড়া স্থানীয় সরকারের যেসব উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলোতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ও উপজেলা ইউনিটগুলোর সুপারিশ করা প্রার্থীদের মনোনয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। টানা পাঁচ মাস বন্ধের পর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হওয়াকে জাতীয় কাউন্সিলের অংশ হিসেবে দেখছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক কার্যক্রম কাউন্সিলের একটা অংশ। অর্থাৎ আমাদের দেশব্যাপী প্রতিটা জেলা-উপজেলা বা থানার যতটা ইউনিট আছে সেগুলো কাউন্সিলের আগেই সম্পন্ন করতে হয়। সে কাজটা আমাদের শুরু হয়েছে।’

গয়েশ্বর বলেন, আমি বলবো, বিশ্ব পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে আমাদের কখন কাউন্সিল করার সুযোগ সৃষ্টি হবে, সেজন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। একটা সময় কাউন্সিল হবে।

গয়েশ্বর বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। এর একটা কাউন্সিল ভার্চুয়াল বা অনলাইনে হয় না। কাউন্সিল মানে হলো ব্যাপক আয়োজন। প্রায় চার হাজারের মতো কাউন্সিলর আছে। তারপর ডেলিগেটস। আপনারা জানেন যে, আমাদের কাউন্সিলে লাখ লাখ লোক সমবেত হয়। সবকিছু আপনাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, আমরা মনে করি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের নেত্রী। যে গণতন্ত্র স্বাধীনতার মূল চেতনা। অর্থাৎ স্বাধীনতার চেতনা পুনরুদ্ধারকারী নেত্রী তিনি। এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিনা চিকিৎসায় অকালে দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করার অধিকার কারোর নেই।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাবস্থায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দক্ষভাবে দল পরিচালনা করেছেন। তার নেতৃত্ব সবাইকে আকৃষ্ট করেছে।

তিনি রাত-দিন সবসময় সঠিকভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। দলের সবাই সন্তুষ্ট। কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, এখনো নিয়মিত করে যাচ্ছেন। দলের দুর্দিনে তারেক রহমানের নেতৃত্ব দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করেছে। আমরা সবাই তার নেতৃত্বে খুশি।

আমারসংবাদ/এআই