শিরোনাম

হরিলুটের আখড়া লিবিয়া দূতাবাস

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম   |  ০৬:৪৮, জুন ১১, ২০১৯

অর্থ লোপাট আর অনিয়মে হরিলুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসটির রাষ্ট্রদূত, কাউন্সিলরসহ প্রায় সব কর্মকর্তাই অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

ভ্রমণভাতা, বাড়িভাড়া, বিমানভাড়া, গাড়ি সুবিধাসহ পরিবারের সদস্যদের নামে সরকারি সুবিধা নেয়ার নামে লোপাট করা হয়েছে সরকারের কয়েক কোটি টাকা। যার পেছনে মূল ক্রীড়নক ত্রিপোলি দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত সেখ সেকেন্দার আলী। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সব ধরনের নিয়মকে অনিয়মে পরিণত করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন দূতাবাসটির কর্মকর্তারা। সময়ে সময়ে জারিকৃত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়নি। রেজিষ্টার যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রতিপালন না করা; দৈনন্দিন প্রাপ্তি ও প্রদানসমূহ দৈনিক ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ করাসহ নগদান বহি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।

মিশনের প্রায় সব ব্যয় ব্যাংকের পরিবর্তে নগদে লেনদেন করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দের খাতওয়ারি এবং সার্বিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করে ব্যক্তিগত ব্যয় সরকারি অর্থে নেয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভ্রমণভাতা প্রদানকালে নির্ধারিত হারের মধ্যে ভাউচার ব্যবহার করা হয়নি। ওই সময়ে দূতাবাসের প্রায় ৭৫.৫০ লাখ টাকা (কূটনৈতিক উইং-এ প্রায় ৫০.০০ লাখ এবং শ্রম উইং-এ ২৫.৫০ লাখ) ভ্রমণভাতা বাবদ ব্যয় করা হয়েছে।

অথচ অধিকাংশ ভ্রমণভাতা বিলের সাথে ভাড়া উল্লেখসহ বিমান টিকিট পাওয়া যায়নি এবং এমনকি একটিও বোডিং পাস পাওয়া যায়নি। ফলে ভ্রমণের এবং বিমান ভাড়ার সঠিকতা নির্ধারণ করা অডিট টিমের পক্ষে সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রদূত একই বছরে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দুবার সন্তানদের জন্য শিক্ষাভাতা গ্রহণ করেছেন।

রাষ্ট্রদূত গৃহভৃত্যের জন্য যোগদানকালীন সময়ের অতিরিক্ত অর্থগ্রহণ করেছেন। ভ্রমণ না করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রদূত সন্তানের জন্য অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেছেন বলে অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে। তথ্য মতে, লিবিয়ার ত্রিপোলিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ওপর ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের হিসাবের ওপর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত নিরীক্ষা কার্যক্রম শেষে প্রতিবেদন দিয়েছে সরকারের অডিট বিভাগ।

হরিলুটের তথ্য : অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী দূতাবাসের কাউন্সিলর (রাজনৈতিক) মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রাপ্যতার অতিরিক্ত হারে অনিয়মিতভাবে প্রকৃত ভাড়ার চেয়ে অধিক হারে তিউনিশে নগদে বাড়ি ভাড়া বাবদ নিয়েছেন ৯ লাখ ৯০ হাজার ৯০০ টাকা।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা (হিসাব) নাছির উদ্দিন খান প্রাপ্যতার অতিরিক্ত হারে তিউনিশে বাড়িভাড়া বাবদ নিয়েছেন ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৪৬ টাকা। কর্মস্থল ত্রিপোলি হলেও কাউন্সিলর মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার জন্য ভ্রমণভাতা ও দৈনিকভাতা বাবদ গ্রহণ করেছেন ১৩ লাখ ৪১ হাজার ৪৯১ টাকা।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা (হিসাব) নাছির উদ্দিন খান কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার জন্য ভ্রমণভাতা ও দৈনিকভাতা বাবদ নিয়েছেন ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৭৪৩ টাকা। কাউন্সিলর মোহাম্মদ মোজাম্মেল হককে ত্রিপোলি থেকে বদলি করার পরও বাড়ি ভাড়ার চুক্তি বর্ধিত করে অগ্রিম বাড়িভাড়া বাবদ নিয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা।

রাষ্ট্রদূত সেখ সেকেন্দার আলী বাসাভাড়ার পরিবর্তে হোটেলভাড়া ও দৈনিকভাতা বাবদ নিয়েছেন ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৭ টাকা। রাষ্ট্রদূতের জন্য তিউনিশে বাসাভাড়া বাবদ অনিয়মিতভাবে প্রকৃত ভাড়ার চেয়ে অধিক হারে নগদে নিয়েছেন ৪৫ লাখ টাকা।

ত্রিপোলির তিউনিশে অবস্থিত ক্যাম্প অফিসের ভাড়া বাবদ প্রকৃত হারের চেয়ে নেয়া হয়েছে ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তিউনিশে বাসাভাড়ার জন্য ব্রোকারেজ এজেন্ট নিয়োগ দেখিয়ে ব্রোকারেজ ফি বাবদ নেয়া হয়েছে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৩৯৬ টাকা।

সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে তিউনিশিয়ায় ক্যাম্প অফিসে স্থানীয় ভিত্তিক জনবল নিয়োগ ও ফ্লাগকার বাবদ ২০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। নিরাপত্তা প্রহরীকে অতিরিক্ত এবং তার প্রায় ২৭ বছর বয়স্ক বিবাহিত পুত্র সন্তানের জন্য অনিয়মিতভাবে যোগদানকালীন সময়ের দৈনিকভাতা বাবদ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৫৭ টাকা নেয়া হয়েছে।

প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ২৭ বছর বয়স্ক বিবাহিত পুত্র সন্তানের জন্য অনিয়মিতভাবে বিমানভাড়া প্রদান করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯৬ হাজার ৩৭৫ টাকা। এছাড়া তার পুত্র সন্তানের জন্য দৈনিকভাতা হিসেবে নিয়েছেন আরও ৭২ হাজার ৭২০ টাকা। স্বদেশে বদলি হওয়া সত্ত্বেও সন্তানের শিক্ষাভাতা অনিয়মিতভাবে নগদে ডলার মুদ্রায় প্রদান করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪ লাখ ১২ হাজার ৮০ টাকা।

সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর মাধাই চন্দ্র কর্মকারকে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত হারে অনিয়মিতভাবে যোগদানকালীন সময়ের দৈনিকভাতা বাবদ দেয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ১৪৭ টাকা। পরিবার সাথে না থাকা সত্ত্বেও কাউন্সিলর (রাজনৈতিক) মোহাম্মদ মোজাম্মেল হককে বিধি বহির্ভূতভাবে সপরিবারে হোমলিভের বিমানভাড়া বাবদ ৩ লাখ ১২ হাজার ৫৮০ টাকা দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় দেশে হোমলিভ ভোগ করা সত্ত্বেও ওই কর্মকর্তা উৎসবভাতা হিসেবে নিয়েছেন ৯৩ হাজার ৯৪০ টাকা। মেক্সিকোতে বদলিজনিত যোগদানকালীন সময়ের দৈনিকভাতা ও বিমানভাড়া অতিরিক্ত ৪ লাখ ২৩ হাজার ৭৯ টাকা গ্রহণ করেছেন মোজাম্মেল হক। রাষ্ট্রদূত সেখ সেকান্দার আলীর স্ত্রীর জন্য ওমানে চিকিৎসা বীমার খাতে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম নিয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২৬ টাকা।

দূতাবাসের স্থানীয়ভিত্তিক নিয়োগকৃত কর্মচারীদের প্রাপ্যতার চেয়ে বহির্ভূতভাবে ভ্রমণভাতা ও দৈনিকভাতা প্রদান করা হয়েছে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৩ টাকা। রাষ্ট্রদূত সেকান্দার আলী যোগদানকালীন ৬ দিন সময়ে অতিরিক্ত হারে দৈনিকভাতা গ্রহণ করেছেন ২ লাখ ৫১ হাজার ২৪৮ টাকা।

আইওএম কর্তৃক ভ্রমণের সকল ব্যয় পরিশোধ করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রদূত বিমানভাড়া ও পূর্ণহারে দৈনিকভাতা বাবদ নিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৯৪৮ টাকা। তিউনিশে ‘ফ্ল্যাগ কার’-এর বীমা বাবদ অনিয়মিতভাবে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে নগদে পরিশোধ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭২ টাকা।

দূতাবাসের স্বদেশভিত্তিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য প্রাপ্য শিক্ষাভাতা ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ না করে ডলার মুদ্রায় নগদ প্রদান করায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৪২ লাখ ৮ হাজার ৪৮০ টাকা। দূতাবাসের কন্স্যুলার আয় ব্যাংকে জমা না করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ডলারে নগদ হাতে রাখা হয়েছে।

আইওএম কর্তৃক ভ্রমণের সকল ব্যয় পরিশোধ করা সত্ত্বেও শ্রম উইংয়ের কাউন্সিলর ও প্রথম সচিব বিমানভাড়া ও পূর্ণহারে দৈনিকভাতা হিসেবে নিয়েছেন ১ লাখ ৫১ হাজার ৩১ টাকা। প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও শ্রম উইংয়ের কাউন্সিলর পরিবারের সদস্যদের হোম লিভের বিমানভাড়া হিসেবে গ্রহণ করেছেন ২ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪৭ টাকা।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল বিধিমালা ভঙ্গ করে কল্যাণ তহবিলের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা না করে ডলার মুদ্রায় নগদ হাতে রাখার অনিয়ম পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের অর্থ বাংলাদেশে বোর্ডের তহবিলে প্রেরণ না করায় ক্ষতি হয়েছে ২৩ লাখ ৪৩ হাজার ১৫৪ টাকা।

রাষ্ট্রদূত একই বছরে দুই ভিন্ন কর্মস্থল (দূতাবাস) থেকে দুই বার প্রাপ্য বহির্ভূতভাবে সন্তানদের জন্য শিক্ষাভাতা গ্রহণ করেছেন ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯০২ টাকা। শিক্ষাভাতা বাবদ অতিরিক্ত প্রদান করা হয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৯৯ টাকা। রাষ্ট্রদূত গৃহভৃত্যের জন্য যোগদানকালীন সময়ের অতিরিক্ত ১৫ দিনের দৈনিকভাতা বাবদ অতিরিক্ত গ্রহণ করেছেন ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৭ টাকা।

ভ্রমণ না করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রদূত সন্তানের জন্য যোগদানকালীন সময় ও তৎপরবর্তী ১৫ দিনের দৈনিকভাতা, ট্রানজিট ও টার্মিনাল চার্জ এবং বিমানভাড়া বাবদ অতিরিক্ত নিয়েছেন ৭ লাখ ১৬ হাজার ৫৭৫ টাকা। নিরাপত্তা প্রহরী রবিউল ইসলাম প্রাপ্যতার অতিরিক্ত হারে অনিয়মিতভাবে যোগদানকালীন সময়ের দৈনিকভাতা গ্রহণ করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯০ হাজার ৯০০ টাকা। স্থানীয়ভিত্তিক নিয়োগকৃত কর্মচারীদের প্রাপ্যতার বাইরে নিয়ম বহির্ভূতভাবে চিকিৎসাভাতা প্রদানে আর্থিক ক্ষতি ২ লাখ ৪৭ হাজার।

এছাড়াও আর্থিক লেনদেনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে অডিট কর্মকর্তারা। অভিযুক্তদের অনিয়মের মাধ্যমে নেয়া আপত্তিকৃত সরকারি অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা করার জন্য বলা হয়েছে রিপোর্টে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, বিদেশের দূতাবাসে কর্মরত কূটনীতিকদের অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে সরকার। ইতোমধ্যে নৈতিক স্খলন ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ইরান ও লেবানন থেকে বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। নতুন করে লিবিয়ার ত্রিপোলি দূতাবাসের লুটপাটের তথ্যে রীতিমত হতবাক হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহান বলেন, আমরা বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখব। অর্থ জমা না দিয়ে কাছে রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হবে। তারপর বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। অডিট রিপোর্ট না দেখে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত