শিরোনাম

চট্টগ্রামে ধান-চাল ক্রয়ে খাদ্য কর্মকর্তাদের কারসাজি

প্রিন্ট সংস্করণ॥জুবায়ের সিদ্দিকী   |  ০৬:৫১, জুন ১১, ২০১৯

চট্টগ্রামে ধান বিক্রি করে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চাল নিয়ে লাভে রয়েছেন মিল মালিকরা। কিন্তু তাদের লাভের ওপর অর্ধেক ভাগ বসাচ্ছে খাদ্য বিভাগ। খাদ্য বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজিতে কপাল পুড়ছে কৃষকের। ইতোমধ্যে অনিয়মের কারণে রাঙ্গুনিয়ার গুদাম কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

নাজিরহাট গুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও রয়েছে একই অভিযোগ। ঈদের আগের সপ্তাহে নাজিরহাট খাদ্য গুদামে তিন ট্রাক (প্রতি ট্রাকে ১৩ টন) চাল পাঠায় খাদ্য বিভাগের চুক্তিধারী মিলাররা। কিন্তু নাজিরহাট ওসিএলএসডি (গুদাম কর্মকর্তা) খোরশেদ আলম সেই চাল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

অভিযোগ রয়েছে— গুদাম কর্মকর্তার দাবি করা অতিরিক্ত টাকা না দেয়ায় সেই চাল গ্রহণ করতে চাননি তিনি। চারদিন ধরে তিনটি ট্রাক খাদ্য গুদামে অপেক্ষায় ছিল। এ জন্য প্রতি ট্রাকে দৈনিক দুই হাজার টাকা করে অভিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে মিলারদের।

চারদিনে ২৮ হাজার টাকা গচ্চা যায় তাদের। কিন্তু জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ও খাদ্য পরিদর্শক দাবি করেছেন, চালের মান সঠিক না থাকায় তিন ট্রাক চাল ফেরত পাঠানো হয়েছে। অথচ ৮ থেকে ১০টি চালবাহী ট্রাক আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন একাধিক মিল মালিক। তাদের দাবি— গুদাম কর্মকর্তার চাহিদামত উৎকোচ না দেওয়ায় ট্রাকগুলো
আটকে রাখা হয়েছে।

কিন্তু নাজিরহাট গুদাম কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, তিন ট্রাকের মধ্যে এক ট্রাক চালের মান ভালো ছিল না। দুই ট্রাক চাল গ্রহণ করা হয়েছে। তিন দিন ধরে গুদামে অপেক্ষমান থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, একসঙ্গে বেশ কয়েক ট্রাক চাল গুদামে চলে আসায় চাল নামাতে সময় লেগেছে।

রোজার কারণে শ্রমিকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে একটু দেরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। কিন্তু জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা আবু নঈম শফিউল আলমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চালের মান ভালো না থাকায় তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে মানসম্পন্ন চাল আসায় তা গ্রহণ করা হয়’।

বড় ধরনের অভিযোগ ছিল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান ভুইয়ার বিরুদ্ধে। ধান বিক্রি করতে আসা অনেক কৃষককে ফেরত পাঠানো, দালাল ও ফড়িয়াদের কাছ থেকে কমিশনের ভিত্তিতে ধান কেনা এবং মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল কেনায়ও কমিশন নেন আসাদুজ্জামান।

গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে— টাকার বিনিময়ে নিম্নমানের ধান চাল কিনে সরকারের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়। এদিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার জন্য জেলার সকল নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছেন।

তবে জেলা প্রশাসকের জরুরি বার্তার আগেই এ উদ্যোগটি নিয়েছিলেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এরপর আনোয়ারা ও মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধানা কেনা শুরু করেন। বর্তমানে অন্যান্য উপজেলায়ও এই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেন, গ্রামে গ্রামে কৃষকের ঘরে ঘরে গিয়ে ধান কিনেছি। কৃষকরা যাতে বিভ্রান্ত না হয় সেজন্য চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গণ্যমান্যদের নিয়ে সমন্বয় সভা করেছি’।

অভিযোগও রয়েছে, কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হলেও চাল নিয়ে চলছে অন্যরকম চালবাজি। ধান কেনায় কড়াকড়ি শর্ত আরোপ ও প্রতিকেজিতে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ মিল মালিকদের। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে চাল কেনায় লাভের ওপর অর্ধেক ভাগ দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম শফিউল আলম বলেন, সরকার নির্দেশিত মান বজায় রেখে চাল কেনায় মিল মালিকরা অহেতুক অভিযোগ করছেন। চট্টগ্রামের পাইকারী বাজারে আতপ চাল বিক্রি হচ্ছে ২৮ টাকা ও সিদ্ধ চাল বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়।

সরকার মিলারদের কাছ থেকে আতপ চাল ৩৫ টাকা ও সিদ্ধ চাল কিনছে ৩৬ টাকা দরে। চালের বাজার মূল্য ও সরকারি ক্রয়মূল্যের মধ্যে প্রতিকেজি ৭ থেকে ৬ টাকা তফাৎ রয়েছে। চালে লাভ বেশি থাকায় এবার মহানগর ও জেলার ১৪৭ মিল মালিক খাদ্য বিভাগের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।খাদ্য বিভাগ জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার ১৪ হাজার ৬৩৮ টন চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এর মধ্যে আতপ চাল হচ্ছে ১০ হাজার ৭১১ টন।

চট্টগ্রাম রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি শান্ত দাশগুপ্ত বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে প্রকৃতি ও পরিবেশ ভালো থাকায় ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষককে বাঁচাতে হলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা আরও দুই-তিনগুণ বাড়িয়ে ধান-চাল কিনতে হবে। তাহলে কৃষকের হতাশা দূর হবে এবং কৃষিতে উৎসাহ ফিরে আসবে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত