শিরোনাম

ফের নৌকায় এমপিদের বাগড়া

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম   |  ০৬:১৩, জুন ১৫, ২০১৯

এমপিলীগ বনাম আ.লীগ। বিষয়টি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য শঙ্কার হলেও তৃণমূলে এখন তা বাস্তবতা। বিশেষ করে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম চার ধাপে ভোটের মাঠে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে ক্ষমতাসীন দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

স্থানীয় সরকারের ওই নির্বাচনের শেষ ধাপেও দেখা দিয়েছে একই অবস্থা। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পছন্দের প্রার্থী নৌকা না পাওয়ায় ফের আতঙ্কে তারা। ভোটের মাঠে তৃণমূলের মুখোমুখি এখন এমপিলীগ। আর ওইসব উপজেলায় কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে নৌকার মনোনীত প্রার্থীরা।

দীর্ঘ আড়াই মাসের বিরতি শেষে আগামী মঙ্গলবার (১৮ জুন) অনুষ্ঠিত হবে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের শেষ ধাপের ভোট গ্রহণ। শেষ ধাপের নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

এদিকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কিছুতেই বিতর্কমুক্ত রাখতে পারছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির স্থানীয় সাংসদ ও সাংসদপন্থী নেতাদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে প্রথম ধাপ থেকেই একক ক্ষমতা দেখিয়ে আসছেন তারা।

মূলত ক্ষমতাসীন দলটির এমপিদের কারণেই প্রথম চার ধাপে নির্বাচনে ১৩৫টি উপজেলায় নৌকার প্রার্থীরা বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে বিপুল ভোটে হেরে যায়। অথচ স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

উপজেলা নির্বাচনে কিছুতেই বিদ্রোহ থামাতে পারছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। উপজেলা নির্বাচনে দলের কোনো সিদ্ধান্ত মানছেন না স্থানীয় এমপিরা। তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যেই দলের প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন করছেন। দলীয় কোনো সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা করছেন না ওই সাংসদরা।

জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক পেয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে। ওই আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন অ্যাডভোকেট ওবায়দুর রহমান খান কালু। তিনি সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের আপন ছোট ভাই। দলীয় প্রার্থীর প্রতি নেতাকর্মীরা একাট্টা হলেও নৌকার বিরোধিতা শুরু করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শাজাহান খান।

এজন্য শেষ ধাপের এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি হতে পারে। একই অবস্থা বরগুনার তালতলী উপজেলায়। সেখানে দলটির দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করছেন স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুজ্জামান মিন্টুকে সমর্থন করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। গাজীপুর-২ এবং গাজীপুর-৩ আসন সদর উপজেলার আওতাধীন।

এই দুই আসনের এমপি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে এখনো সরব হননি। এ নিয়ে দলের ভেতরে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে বেশিরভাগ কর্মী দলের প্রার্থীর বিপক্ষে রয়েছেন বলে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শুধু এই আসনগুলোতেই নয়, পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের শেষ ধাপের প্রায় সব উপজেলায় একই অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

তথ্য মতে, স্থানীয় রাজনীতির ত্রাণকর্তা ওই আসনের সাংসদ। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড- সব কমিটিতে তার একক কর্তৃত্ব। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ সব নির্বাচনেই সাংসদপন্থিরাই মনোনয়ন ও নির্বাচিত হন।

কিন্তু কোনো কারণে সাংসদ পদে পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসে ওই এলাকার রাজনীতি। অতীতে যারা এমপির মনোনয়নের বা কর্মকাণ্ডে বিরোধিতা করেছিলেন অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় তাদের রাজনীতি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে ওই নেতাদের দল বা সরকারি কর্মকাণ্ডে খুঁজে পাওয়া যায় না। দলসহ সরকারের সুযোগ-সুবিধার সুফল পেয়ে থাকে এমপির পছন্দের লোকজন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে দলটির বর্তমান সংসদ সদস্য ও তৃণমূল নেতাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব কোনো কোনো স্থানে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সংঘর্ষ এড়াতে অনেকেই নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন।

দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নির্যাতিত তৃণমূল নেতাদের উপেক্ষা করে উড়ে এসে জুড়ে বসে সাংসদরাই ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন। একাদশ নির্বাচনে প্রথমবার নৌকা প্রতীকে এমপি হওয়া নেতারাও রাজনীতির মাঠে একক আধিপত্য ধরে রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ওই সংসদ সদস্যরা নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়েও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করছেন- এমন অভিযোগে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।

মাদারীপুর সদর উপজেলার নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কাজল কৃষ্ণ দে আমার সংবাদকে বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন। কিন্তু নিজের ভাইকে ভোটে জয়লাভ করানোর জন্য আমাদের সংসদ সদস্য নৌকার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন। নৌকার ব্যানার ফেস্টুনসহ কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা করতে দেয়া হচ্ছে না। কর্মীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভিতি দেখানো হচ্ছে।

তবে বিষয়টি মানতে নারাজ সাবেক নৌপরিবহণমন্ত্রী শাজাহান খান এমপি। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরাই নির্বাচনি এলাকায় ভাঙচুর করেছে। তারাই প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই দেশের জনগণের জন্য রাজনীতি করি। সেই জনগণ আমার ভাইকে চেয়ারম্যান পদে দাঁড় করিয়েছে। এতে আমার কিছু করার নেই। এসব অভিযোগ মিথ্যা এবং বানোয়াট।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, খুবই কষ্ট পাই, যখন দেখি নেত্রী মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছেন অথচ সেই প্রার্থীকে বাদ রেখে যারা অন্য প্রার্থীকে সাপোর্ট দেয়। এ বিষয়গুলো দলের অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। এটা দলের প্রতি অনুগত হতে পারে না।

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ হবে যে উপজেলাগুলোতে- শেরপুরের নকলা, নাটোরের নলডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী, বরগুনার তালতলী, নারায়ণগঞ্জের বন্দর, গাজীপুর সদর, রাজবাড়ীর কালুখালী, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, মাদারীপুর সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও বিজয়নগর, কুমিল্লার আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ এবং নোয়াখালী সদর উপজেলা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত