শিরোনাম

ভূমি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের উদ্যোগ

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম   |  ০৭:১০, জুলাই ০৯, ২০১৯

বাংলাদেশে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মামলা ভূমিসংক্রান্ত হওয়ায় সরকার এবার সারা দেশে ভূমিব্যবস্থা অটোমেশন করার উদ্যোগ নিয়েছে।

জনগণের দুর্যোগ ও হয়রানি কমাতে এর ব্যবস্থাপনায় সব ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কমিশনার অফিস থেকে শুরু করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ভূমি সংস্কার বোর্ড, ভূমি আপিল বোর্ডও জড়িত থাকবে।

প্রকল্পটি ২০২৩ সালে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় সচিবের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় তদারকি কমিটি করা হয়েছে।

যুগ্ম বা অতিরিক্ত সচিব প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন। নির্ভুল কাজের জন্য ৬৪ জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ে তদারকি কমিটিও করা হয়েছে। তারা উপ-প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকবেন।

ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন’ নামে এ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা যাচাই-বাছাই করতে সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি-পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাকি কাজ শেষ করে শিগগিরই একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। ভূমি সংস্কার বোর্ড, ভূমি আপিল বোর্ড এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানায়।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে ভূমি সচিব মো. মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী গতকাল আমার সংবাদকে বলেন, টেকনিক্যাল এ প্রকল্পটি সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে ভূমি সচিব মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকবেন। মন্ত্রণালয় থেকে একজনকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে।

তবে এসিল্যান্ড, জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে কমিশনার পর্যন্ত এর সঙ্গে জড়িত থাকবেন। জনপ্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সাফ বলেন, প্রশাসনিকভাবে তারাই ভূমি ব্যবস্থাপনায় জড়িত।

তাই এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হবে না, জটিলতার সৃষ্টি হবে না। বরং এটি বাস্তবায়ন হলে অফিস আদালতে হয়রানি কমবে। জনগণের ভোগান্তিও কমবে। কাজের মধ্যে গতিশীলতা আসবে বলে অভিমত প্রকাশ করেন তিনি।

ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকল জনবলকে আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সুদক্ষ করা হবে।

এ জন্য সারা দেশে অর্থাৎ ৩ হাজার ৪৫৭টি ইউনিয়ন ও পৌর ভূমি অফিস, ৫০৭টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস, ৪৯২টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়, ৬৪ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ৮ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং এর ৪২০টি উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস, ভূমি সংস্কার বোর্ড, ভূমি আপিল বোর্ড এবং ভূমি মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে তা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। এ কাজে ব্যয় হবে ৯৯৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ হবে কম্পিউটার সফটওয়ার কেনা।

তাতে ব্যয় হবে ১২৫ কোটি টাকা। কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ কেনা হবে ১২৩ কোটি টাকার। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পণ্য ও সেবা খাতে ৩০৮ কোটি টাকা।

তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা ভালো উদ্যোগ। তবে কম্পিউটার সফটওয়ার ও যন্ত্রাংশ কেনায় আরও বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে এটা করা দরকার।

ভূমিসংক্রান্ত যেকোনো সেবা বিশেষ করে ভূমি নিবন্ধন, নামজারি, জমাভাগ ও রেকর্ড সংশোধন মৌজা ম্যাপ ও চিটা নকশা পাওয়া সহজ হবে।

এছাড়া খাসজমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়াও অনলাইনের মাধ্যমে হবে। এসব করা হলে ভূমির মালিকানা সহজ হবে। জনগণের দুুর্যোগ ও হয়রানি কমবে।

সূত্র আরও জানায়, ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ সব কাজ ড্যাস বোর্ডের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার, ভূমি সংস্কার বোর্ড, ভূমি আপিল বোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয় এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত বাস্তব সময়ভিত্তিক তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। আধুনিক ও তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা অফিস প্রতিষ্ঠিত হবে।

ফলে ভূমিসংক্রান্ত সব ধরনের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যাবে। সায়রাত মহালে ইজারা কার্যক্রমে ই-টেন্ডারব্যবস্থা চালু করা সহজ হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়বে।

ফলে ভূমি উন্নয়ন করসহ বিভিন্ন ফি বেশি করে জমা হবে। জনগণের কাছে সরকারের পজেটিভ ইমেজ সৃষ্টি হবে।

পাঁচ বছরের এ প্রকল্পে ভূমি মন্ত্রণালয় সচিবের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় তদারকি কমিটি করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ঢাকাতে একটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠন করা হবে।

নির্ভুল কাজের জন্য ৬৪ জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ে তদারকি কমিটিও করা হয়েছে। তারা উপ-প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকবেন। তারা দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে কাজ করবেন।

এ জন্য কোনো ভাতা পাবেন না। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ অনুমতি দিয়েছে। যুগ্ম বা অতিরিক্ত সচিব প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের তত্ত্বাবধানে প্রকল্প ইউনিট কাজ করবে। বিভাগীয় কমিশনাররা মাঠ প্রশাসন এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবেন।

এছাড়া সহকারী কমিশনাররা (ল্যান্ড) মাঠপর্যায়ের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জড়িত থাকায় তারাও সরকারি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে এ কাজে তারা অতিরিক্ত কোনো ভাতা পাবেন না। তারা সবাই আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনার জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে কাজ করে যাবেন।

এছাড়া প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং টিমও রাখা হয়েছে। এসব যাচাই-বাছাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে গত ২৬ জুন পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় কোনো ব্যাপারে ওজর-আপত্তি করা হয়নি। তাই বাকি কাজ শেষে শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি- একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

সূত্র জানায়, দক্ষ, আধুনিক ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ভূমিসংক্রান্ত জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

এটুআই প্রদত্ত ১ম সফটওয়ারের মাধ্যমে ৫২টি জেলায় ৪৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৮টি খতিয়ান এবং ইএলআরএস সফটওয়ারের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার ২৭ লাখ ৯৬ হাজার খতিয়ান এন্ট্রি করা হয়েছে।

একইসঙ্গে দেশের ৫৫ জেলায় নতুন সফটওয়ারের মাধ্যমে ৬৪ লাখ ৩ হাজার ৪৮০টিসহ ১ কোটি ৩৫ লাখ ২২ হাজার ৫১৮টি খতিয়ানের ডাটা এন্ট্রি করা হয়েছে। ইউনিয়ন ভূমি তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে সারা দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ৬৫ লাখ খতিয়ান স্ক্যানিং করা হয়েছে।

এছাড়া ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ৩১টি খতিয়ানের ইনকোডিং কাজ শেষ হয়েছে। ১৮ হাজার ৫০০ ম্যাপসিট স্ক্যানিং করার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১০ হাজার ৬টি ম্যাপসিট ভ্যাক্টরাইজ করা হয়েছে। এসবই ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত