আওয়ামী রাজনৈতিক জোটে হতাশা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০০:৪২, জুলাই ১২, ২০১৯

চলতি মেয়াদের সাত মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন করে সরকারে যোগ হচ্ছেন একজন প্রতিমন্ত্রী।

আর পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হচ্ছেন সরকারের আরেক প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদকে দেওয়া হচ্ছে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব।

আর আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সংসদ সদস্য ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরাকে প্রতিমন্ত্রী করা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের প্রশ্নে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, আমরা প্রস্তুত, আগামীকাল শনিবার সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে উনাদের শপথ হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সূত্র মতে, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে এতদিন কোনো মন্ত্রী ছিলেন না।

সিলেট-৪ আসনের এমপি ইমরান আহমদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে একাই দায়িত্বে ছিলেন। তবে মন্ত্রীর দায়িত্বে একই মন্ত্রণালয়ে থাকবেন, না প্রধানমন্ত্রী তার দপ্তর বদলে দেবেন, সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি।

আর সংরক্ষিত আসনের সাংসদ ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন। কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী না থাকায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।

এদিকে, মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের খবরে আবারো হতাশ হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকরা।

মন্ত্রিসভা গঠনের শুরুতে রাখা না হলেও সম্প্রসারণের সময় ১৪ দলের প্রতিনিধি রাখা হবে— এমন স্বপ্ন পোষণ করলেও তা হালে পানি পায়নি।

ফলে মন্ত্রিসভা গঠনে আবারো বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোট নেতারা।

গত দুই মেয়াদে সরকারে থাকলেও তৃতীয় মেয়াদে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি জোটের কোনো নেতার।

এটা নিয়ে মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন অনেকে। তবে সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভার সদস্য হবার আশায় অনেকেই ছিলেন নীরব।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সব সরকারই ছিল অংশগ্রহণমূলক। জোটের শরিক দল, এমনকি বিরোধী দলের প্রতিনিধিও ছিল সরকারে।

২০০৮ সালের গঠিত জোটভুক্তদলের মধ্যে মন্ত্রিসভায় ছিলেন— জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিএম কাদের, মুজিবুল হক চুন্নু, জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া।

২০১৪ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারেও হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, মশিউর রহমান রাঙ্গাকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়।

এছাড়া ২০১৪ সালের এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনকালীন সরকারের জোটের অংশগ্রহণ ছিল।

গত ৭ জানুয়ারি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে টানা তৃতীয়বারের মতো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু হয়।

মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও তিনজন উপমন্ত্রী রয়েছেন।

৪৭ জনের সবাই আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগের বাইরের কাউকে নেননি শেখ হাসিনা। ফলে সাধারণ মানুষের মতোই চমকে গেছেন ১৪ দলের নেতারা।

মন্ত্রিসভা ১৪ দলের কাউকে রাখা হবে না— এমন চিন্তা ছিল না কারোরই। মন্ত্রিসভায় অন্তত ৪ থেকে ৫ সদস্য ৪ দল থেকে আনা হবে— এমন গুঞ্জন ছিলো সর্বত্র।

এরপর নানা সময়ে মন্ত্রিসভা নিয়ে গণমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জোটের নেতারা। ৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পর জোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পলিসি পরিবর্তন হিসেবে আখ্যা দেন ১৪ দলের নেতারা।

ঐ সময়ে সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে কেউ অবগত নয়।

তবে সবার আশা ছিলো, মন্ত্রিসভায় শরিকদের থাকাটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই এর ব্যাখ্যা শরিকদের পরে জানানো হবে।

সূত্র মতে, কেন মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি, এর কোনো ব্যাখা এখনো পায়নি ১৪ দলের নেতার। প্রধানমন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতা জোটের নেতাদের এ বিষয়ে কিছু জানায়নি।

তবে মন্ত্রিসভা যাত্রা শুরু করলেও তখনই হতাশ হননি ১৪ দলের নেতারা। তারা মূল্যায়ন করে বলেছিলেন- মন্ত্রিসভায় অন্তুর্ভুক্তির সময় শেষ হয়নি।

আগামী ১ বছরের মধ্যেই মন্ত্রিসভায় সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের খবরে আশাবাদী ছিলেন জোটের কয়েকজন নেতা।

তবে তাদের আশার প্রতিফলন ঘটছে না সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায়। যে কারণে হতাশ হয়েছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, মন্ত্রিসভা নিয়ে জোটের অনেকের আগ্রহ আছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের নেই। প্রধানমন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তেই মন্ত্রিসভা হয়েছে। কেউ হতাশ হলেও কিছু যায়-আসে না।

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া জানান, আমরা হতাশ নই। প্রধানমন্ত্রী যা ভালো মনে করেছেন, তাই করেছেন। আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।

এ ব্যাপারে জোটের শীর্ষ দুই নেতা সাবেক মন্ত্রী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে বন্ধ পাওয়া যায়।

এর আগে মন্ত্রিসভা গঠনের পর পাঁচ মাসের মাথায় গত ১৯ মে প্রথম পরিবর্তন আনেন প্রধানমন্ত্রী।

পুনর্বিন্যাস করে তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এছাড়া মোস্তাফা জব্বারকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে এবং জুনাইদ আহমেদ পলককে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে তাজুল ইসলাম এবং পল্লি উন্নয়ন সমবায় বিভাগের প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্বপন ভট্টাচার্যকে।

এখন নতুন করে একজনের পদোন্নতি হওয়ায় মন্ত্রীর সংখ্যা বেড়ে হলো ২৫ জন। নতুন একজন প্রতিমন্ত্রী এলেও সংখ্যা আগের মতই ১৯ জন থাকবে।