শিরোনাম

মোবাইলেই লুকিয়ে আছে রহস্য!

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু   |  ০৬:২৪, জুলাই ১৮, ২০১৯

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড। যার প্রধান সাক্ষী নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি বর্তমানে হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নে স্বামী হত্যার বিচার চাওয়া সেই মিন্নিই অবশেষে দাঁড়ালেন আসামির কাঠগড়ায়।

যদিও আইনজীবীরা বলছেন, মামলার পলাতক এজাহারভুক্ত আসামিদের এখনো গ্রেপ্তারে প্রশাসন বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। প্রধান সাক্ষী মিন্নি স্বামী শোকে এ মুহূর্তে বিপর্যস্ত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে টর্চারিং করে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এরপর আবার রিমান্ডেও নেয়া হয়। এটা অমানবিক।

এ ঘটনার মূলহোতাদের আড়াল করতেই মামলার প্রধান সাক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করে হাইকোর্টের আইনজীবীরা আরও বলছেন, সাক্ষী মিন্নি সব সময় মামলার পাশে থাকবেন, তাকে পরেও গ্রেপ্তার করা যেত। কিন্তু পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ইতোমধ্যে মিন্নি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পুলিশের কাছে স্বীকারও করেছেন।

শুধু মিন্নিই নয়, এ মামলার ১২ নম্বর আসামি টিকটক হূদয়ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় মিন্নির সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

অন্যদিকে গত বুধবার আদালতে মিন্নির রিমান্ড শুনানির সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবিরও আদালতকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে এ মামলার একাধিক অভিযুক্তের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথনের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় সংগৃহীত সেসব তথ্য-প্রমাণ আদালতে তুলেও ধরেন তিনি।

বরগুনায় শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার পরিকল্পনাকারীদের একজন তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, মিন্নি হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে মিন্নির যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।

এদিকে আলোচিত এ হত্যামামলার তৃতীয় আসামি রিশান ফরাজীকে গতকাল সকাল ১০টার দিকে গ্রেপ্তার করলেও কোথা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তদন্তের স্বার্থে তা জানায়নি পুলিশ।

রিশান বরগুনা পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি রোডের দুলাল ফরাজীর ছেলে এবং ওই মামলার দ্বিতীয় আসামি রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই। সে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ডের অন্যতম সহযোগী।

গত সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘নয়ন বন্ড ও মিন্নি’ উল্লেখ করে একটি আপত্তিকর ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়। পরদিন সকাল ১০টার দিকে পুলিশ মিন্নির বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে পুলিশ লাইন্সে নিয়ে আসে। যদিও পরিবার বলছে, আসামি শনাক্ত করার কথা বলে মিন্নিকে নেয়া হয়েছিল।

অথচ পুলিশ লাইন্সে নেয়ার পর দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাত ৯টার দিকে পুলিশ মিন্নিকে গ্রেপ্তার দেখায়। জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় মিন্নিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করে পুলিশ।

যে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরদিনই মিন্নিকে গ্রেপ্তার করা হয় সে ভিডিও ফুটেজধারী মোবাইল ফোনটি নিয়েই হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে মিন্নিকে মারধর করেন রিফাত শরীফ।

এ ঘটনার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরগুনা জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে সেই মোবাইল ফোনটি। যে মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করেই রিফাত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

তার ভাষ্য, গত ২৬ জুন বুধবার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। কিন্তু ঘটনার দুদিন আগে সোমবার হেলাল নামে একজনের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় রিফাত শরীফ। হেলাল রিফাত শরীফের বন্ধু হলেও নয়ন বন্ডেরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল।

সেই মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য নয়ন বন্ড মিন্নির দারস্থ হয়। পরে রিফাত শরীফের কাছ থেকে ফোন উদ্ধার করে মিন্নি। কিন্তু ওই ফোন উদ্ধার করতে গিয়ে রিফাত শরীফের মারধরের শিকার হন মিন্নি।

পরে হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মঙ্গলবার নয়নের সঙ্গে দেখা করে মিন্নি সেই মোবাইল নয়নের হাতে তুলে দেন। তবে কি ছিল সেই মোবাইল ফোনে তা এখনো জানা যায়নি।

মিন্নি তার স্বামীর হাতে মারধরের শিকার হওয়ায় তার প্রতিশোধ নিতেই নয়নকে মারধর করতে বলেন। তবে মারধরের সময় নয়ন যাতে উপস্থিত না থাকেন, সেটাও মিন্নি নয়নকে বলেন।

এরপর ওইদিন সন্ধ্যায় বরগুনা কলেজ মাঠে মিটিং করে রিফাত শরীফকে মারধরের প্রস্তুতি গ্রহণ করে ০০৭ সংকেতধারী বন্ডবাহিনী।

রিফাত শরীফের ওপর হামলার আগ মুহূর্তে রিফাত শরীফের সঙ্গে মিন্নি কলেজ থেকে বের হলেও কলেজের সামনে রিফাতকে মারধরের পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনো প্রস্তুতি দেখতে না পেয়ে সময়ক্ষেপণের জন্য রিফাত শরীফকে নিয়ে আবার কলেজে প্রবেশ করেন।

এর কিছুক্ষণ পরই বন্ডবাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য একত্রিত হয়ে রিফাত শরীফকে আটক করে মারধর করতে করতে কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে পূর্ব দিকে নিয়ে যায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রিফাতকে মারধর করা হচ্ছে দেখে মিন্নি তখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিলেন। কিন্তু হঠাৎই পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে নয়ন বন্ড রিফাত শরীফকে মারধর শুরু করলে মিন্নি তখনই এগিয়ে আসেন।

মূলত মিন্নি রিফাত শরীফকে বাঁচাতে নয়, রিফাত শরীফকে মারধরের অভিযোগ থেকে নয়ন বন্ডকে বাঁচাতেই বারবার নয়ন বন্ডকে প্রতিহত করেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টায়ও ব্যর্থ হন মিন্নি।

যে মোবাইল ফোন নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সেই মোবাইল ফোন আপনারা পেয়েছেন কিনা কিংবা এ বিষয়টি নিয়ে মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বরগুনা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন মুঠোফোনে আমার সংবাদকে বলেন, আমরা অনেক কিছুই জানি। কিন্তু পার্ট বাই পার্ট সব কথা বলতে পারছি না। তদন্তের স্বার্থে আমরা এ বিষয়টি নিয়েও কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।

গত বুধবার মিন্নির রিমান্ড শুনানির সময় আদালতে রিফাত হত্যামামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য শেষে আদালত মিন্নির সঙ্গে কথা বলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সঞ্জীব দাস বলেন, আপনার পক্ষে কোনো আইনজীবী আছে কি না বা আপনার কোনো কিছু বলার আছে কিনা? আদালতের এমন প্রশ্নে মিন্নি বলেন, আমি নির্দোষ। আমি রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। আমি আমার স্বামী রিফাত শরীফ হত্যার বিচার চাই।

সঞ্জীব দাস আরও বলেন, আদালত রিফাত হত্যায় অভিযুক্তদের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে মোবাইল ফোনে কথোপকথনের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে মিন্নি চুপ হয়ে যান এবং আদালতের এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী তার পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে নিম্ন আদালতের রিমান্ড মঞ্জুরের পর গতকাল এ মামলার প্রধান সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির রিমান্ড বাতিলে আর্জি জানিয়ে কোনো রকমের সাড়া মেলেনি হাইকোর্টে।

তবে বিষয়টি নজরে আনা আইনজীবীকে উদ্দেশ করে হাইকোর্ট বলেছেন, এ মামলায় এ মুহূর্তে আমরা হস্তক্ষেপ করতে চাই না।

নিম্ন আদালতেই আবেদনের সুযোগ রয়েছে। আপনারা সেখানে যান। আদালত পরিবর্তনের আবেদনও করতে পারেন। এমনকি ফৌজদারি বিধিতে হাইকোর্টের ট্রায়াল করার আবেদনের সুযোগও রয়েছে।

আদালত বলেন, এখন মামলাটির তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে আমরা এই মুহূর্তে কোনো হস্তক্ষেপ করবো না।

গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘মিন্নির রিমান্ড, পাশে কেউ নেই’ শিরোনামে সংবাদ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারুক হোসেন আদালতের নজরে আনলে হাইকোর্টের বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান এবং বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

শুনানিকালে আইনজীবী ফারুক হোসেন হাইকোর্টকে বলেছেন, এ মামলার প্রধান সাক্ষী ছিলেন আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। মামলার পলাতক এজাহারভুক্ত আসামিদের এখনো গ্রেপ্তারে প্রশাসন বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

প্রধান সাক্ষী মিন্নি স্বামী শোকে এ মুহূর্তে বিপর্যস্ত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে টর্চারিং করে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর আবার রিমান্ডে নেয়া হয়। এটা অমানবিক।

আইনজীবী বলেন, এ ঘটনার মূলহোতাদের আড়াল করতে মামলার প্রধান সাক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ সাক্ষী মিন্নি তো সব সময় মামলার পাশে থাকবেন, তাকে পরেও গ্রেপ্তার করা যেত। আমরা আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির রিমান্ড বাতিল ও মামলা সঠিক পথে পরিচালনার নির্দেশনা চাই।

এ সময় আদালত বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে। এ মুহূর্তে আমরা হস্তক্ষেপ করবো না। তবে আপনারা চাইলে মামলাটি বিচারের জন্য এবং রিমান্ড বাতিলের জন্য লিখিতভাবে আবেদন করতে পারেন।

এ বিষয়ে আইনজীবী ফারুক হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি প্রধান সাক্ষী। অথচ আসামিদের গ্রেপ্তার না করে মিন্নিকে গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড নেয়া মামলার ন্যায় বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে। আদালত বলেছেন, এ মুহূর্তে আমরা হস্তক্ষেপ করবো না।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, আমি তিনজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তাদের দাঁড়ানোর কথা ছিল, আমার মনে হয় প্রতিপক্ষদের ভয়ে তারা আমার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াননি। তিনি আরও বলেন, আমার মেয়েকে বুধবার আদালতে হাজির করা হয়।

এসময় আদালতে আমার মেয়ের পক্ষে অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দিন, অ্যাডভোকেট গোলাম সরোয়ার নাসির ও অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদেরের দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু কী কারণে দাঁড়াননি আমি বলতে পারবো না।

এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দিন বলেন, মিন্নির বাবা মোজাম্মেল তার মেয়ের পক্ষে আমাকে দাঁড়ানোর কথা বলেছিল। কিন্তু আমি তার পক্ষে দাঁড়াইনি। তবে কী কারণে দাঁড়াইনি তা বলতে পারবো না।

এছাড়া অ্যাডভোকেট গোলাম সরোয়ার নাসির ও অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের কেন মিন্নির পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি তাও জানা যায়নি।

তবে বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কারো পক্ষে, বিশেষ করে কোনো আসামির পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া না থাকলে তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী।

বরগুনায় চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যামামলার প্রধান সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকাকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে নেয়া হলে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী লড়তে রাজি হননি।

প্রভাবশালীদের চাপে কোনো আইনজীবী মামলা লড়তে রাজি হননি— মিন্নির বাবার এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুর রহমান নান্টু। তিনি জানিয়েছেন, মিন্নির বাবা আইনজীবী পাওয়ার বিষয়ে তাদের সাথে কোনো যোগাযোগই করেননি।

এদিকে সালমা আলী শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, একজন ব্যক্তির পক্ষে আইনজীবী নিয়োজিত না থাকলে তার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে।

এরকম একটি মামলার ক্ষেত্রে আয়শা সিদ্দিকার পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা স্বচ্ছ বিচার হিসেবে গৃহীত হবে না বলে মন্তব্য করছেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত