শিরোনাম

১০ বছরের শীর্ষ আমদানি সর্বোচ্চ ঘাটতি রাজস্ব

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম   |  ০৭:১০, আগস্ট ০৮, ২০১৯

গত ১০ বছরের সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি রেকর্ড হয়েছে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে। আশ্চর্যজনক হলো ১০ বছরের সর্বোচ্চ ঘাটতি রাজস্বও আদায় হয়েছে সদ্য সমাপ্ত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। এ ঘটনায় অনেকটা অবাক হয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষকর্তারা। তবে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি ভিন্ন।

এনবিআর সূত্র মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে বিভিন্ন পণ্যের মোট আমদানি হয়েছে প্রায় ২০ লাখ ১ হাজার ৪৬৩ টন। যা গত ১০ বছরের সর্বোচ্চ আমদানি রেকর্ড। আর আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৩ হাজার ৬৫ টন বেশি। অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পণ্যের মোট আমদানি ছিল ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯৭ টন।

এদিকে, ১০ বছরের আমদানিতে রেকর্ড হলেও রাজস্ব ঘাটতিও হয়েছে ১০ বছরের সর্বোচ্চ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৮৯২ কোটি টাকা, যা গত ১০ বছরের সর্বোচ্চ ঘাটতি রাজস্ব। গত অর্থবছর ৪ হাজার ৯৩১ কোটি ৯০ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২২.০৯ শতাংশ রাজস্ব কম হয়েছে। মোট ঘাটতি ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৮৯২ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ সালে রাজস্ব আদায় হয় ৪ হাজার ২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

অর্থাৎ আমদানি বৃদ্ধি পেলেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় করতে পারেনি বেনাপোল কাস্টমস হাউস। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেনাপোল স্থল বন্দরের শুল্ক স্টেশন ১০ অর্থবছরের মধ্যে চারবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে।

এসময় ১৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.০৯ শতাংশ। এরপর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪.০৬ প্রবৃদ্ধিতে ১০৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যদিকে চলতি অর্থবছর বাদ দিলে সবচেয়ে ঘাটতির বছর ছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছর। ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছিল।

আমদানি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বন্দরটি দিয়ে পণ্য আমদানি হয় ১২ লাখ ৭১ হাজার ২৪ টন। এরপর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৯৪২ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৫ টন, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ১৫ লাখ ১৯ হাজার ২২০ টন এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯৭ টন আমদানি হয়।

সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী। ওই চিঠিতে রাজস্ব ঘাটতির কারণ হিসেবে ভারতীয় অংশের সংস্থাগুলোগুলোকে দায়ী করেন।

তিনি দাবি করেন- শুল্কযুক্ত পণ্যের পরিবর্তে বাংলাদেশে তাদের চলমান রামপালসহ অন্যান্য প্রকল্পের পণ্য যেমন ব্রোকেন স্টোন, বোল্ডার, যন্ত্রপাতি ও লৌহ সামগ্রী ইত্যাদি বাংলাদেশে প্রেরণে বেশি আগ্রহী। এর ফলে বাণিজ্যিক ও শুল্কযুক্ত পণ্য প্রেরণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন- কম শুল্কহারের পণ্য ব্রোকেন স্টোন ও বোল্ডার গত অর্থবছরের তুলনায় ৪০০ শতাংশ আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি বেশি হলেও শুল্ক কম এসেছে।

এছাড়া শূন্য শুল্ক ও কম শুল্কহারের পণ্য যথা- তুলা, মসুর ডাল ইত্যাদির আমদানি বেড়েছে ৮.২৯ থেকে প্রায় ৩৯৬ শতাংশ। আর ৫ শতাংশের শুল্কহারের পণ্য আমদানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ পর্যন্ত। বিপরীতে আমদানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে প্রধান রাজস্ব সংশ্লিষ্ট পণ্য যেমন পাথর, সিমেন্ট, এসবেস্টসহ সমজাতীয় পণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক, ইলেক্ট্রিক্যাল মেশিনারি ও ইকুইপমেন্ট এবং লোহা ও স্টিলের তৈরি পণ্য। এসব পণ্য আমদানি হ্রাস পেয়েছে ৬ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত।

চিঠিতে আরও বলা হয়, চাল ব্যতীত ২৫ শতাংশ শুল্কহারের পণ্যের আমদানি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে ১৩.৫৩ শতাংশ। যা অব্যাহত থাকলে ২৮২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পণ্যের আমদানি হ্রাস পেয়েছে যেমন- ফুটওয়্যার, পারফিউম, কসমেটিক্স, শাড়ি, থ্রি-পিস ও মোটর সাইকেল।

এছাড়া ভারতীয় দিকে অত্যাধিক যানজট ও পর্যাপ্ত ট্রাক সরবরাহ না পাওয়া, স্থল বন্দরের সীমাবন্ধতা, ডিসেম্বরে নির্বাচনের প্রভাব, সাফটা কার্যকর থাকায় বাণিজ্যিক পণ্য চালানসমূহ রেয়াতি সুবিধার আওতায় শুল্ককর হ্রাস পাওয়া, বেনাপোলে বিএসটিআই ও বিসিএসআইএর শাখা অফিস না থাকায় পণ্যের মান নির্ধারণে কালক্ষেপণ ও নতুনভাবে ভারতীয় মুদ্রানীতির সংস্কার এবং ব্যাপকভাবে জিএসটি আরোপিত হওয়ার ফলে স্বাভাবিক আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে বলেও জানান কাস্টমস কমিশনার।

তবে এসব সমস্যা ও যৌক্তিক মানতে নারাজ বেনাপোল বন্দরের ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ এজেন্টরা। তারা দাবি করেন, বেনাপোল বন্দরে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন। অবৈধ সুবিধা নিতে পণ্য দীর্ঘদিন আটকে রেখে কাস্টমস হাউস ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করছে। যার কারণে ব্যবসায়ীরা বিকল্প বন্দর ব্যবহার শুরু করেছে। যা বিগত কয়েক বছরের চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের খোঁজ নিলে প্রমাণ পাওয়া যাবে।

জানতে চাইলে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী বলেন, আমরা এ বিষয়ে ইতোমধ্যে এনবিআরকে ব্যাখ্যা দিয়েছি। বেনাপোলে নিম্ন শুল্কহারের এবং কম মূল্যের পণ্য আমদানি বৃদ্ধি পেলেও শুল্কহার পণ্যের আমদানি হ্রাস পেয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্রোকেন স্টোন ও বেল্ডার ব্যতীত আমদানিকৃত অন্যান্য পণ্যে আমদানি বেড়েছে ৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। সার্বিক বিবেচনায় যে পরিমাণ পণ্য আমদানি পূর্বের তুলনায় রেকর্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। কম শুল্কের পণ্য আমদানিসহ বেশকিছু কারণে আমদানি বাড়লেও ঘাটতি হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত