শিরোনাম

গলাকাটা গুজবে কামারি ব্যবসা মন্দা

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ   |  ০৭:২৬, আগস্ট ০৮, ২০১৯

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। এই ঈদের অন্যতম কাজ হচ্ছে পশু কুরবানি করা। পশু কুরবানির জন্য চাই ধারালো ছুরি। সাথে সাথে মাংস কাটার জন্যও প্রয়োজন দা বা চাকু। পশু কাটার সরঞ্জাম প্রস্তুতে রাত-দিন কাজ করছেন ঢাকার কামাররা।

তবে ছেলেধরা গুজবে বেচাকেনা মন্দা বলে জানিয়েছেন তারা। কুরবানির সরঞ্জাম কিনে নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছেন সে কারণেই বিক্রি হচ্ছে না বলে তারা জানিয়েছেন। এদিকে কাজে কোনো রকম ফাঁকি দিচ্ছে না ব্যবসায়ীরা।

গত কয়েকদিন যাবতই তারা ২৪ ঘণ্টা কাজ করছেন। চলবে ঈদের রাত পর্যন্ত। কামারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সারা বছর তাদের তেমন কাজ থাকে না। কুরবানির ঈদ এলেই ব্যস্ততা বাড়ে। এই সময়ই তারা কিছু পুঁজি করে। এর ওপর ভর করেই পুরো বছর পার করে।

গতকাল ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও জিঞ্জিরার কামারদের সাথে কথা বললে তারা এসব জানান। দোকানিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এবছর নতুন ছুরি, চাকু কম বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ মানুষই বাসার পুরনো ছুরি নিয়ে আসছেন ধারালো করতে। সাথে কেউ কেউ একটা নতুন ছুরিও নিচ্ছেন।

পশু কুরবানির সার্বিক কার্য পালন করতে বিভিন্ন ধাপে ছুরি, দা, চাপাতি— এসব ব্যবহার করা হয়। ঈদের বাকি আর মাত্র ২ দিন। তাই পশু কুরবানিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার কামারপল্লীগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে।

দগদগে আগুনে গরম লোহায় ওস্তাদ-সাগরেদের পিটাপিটিতে মুখর হয়ে উঠেছে কামারশালাগুলো। আবার এসব ধাতব সরঞ্জামাদি শান দিতে শানের দোকানগুলোতেও ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। ভ্রাম্যমাণ শানদাদেরও ভালো সময় কাটে এই মৌসুমে। গতকাল ঢাকার মালিটোলা, ওয়ারীর বনগ্রাম, নবাবপুর, হাসনাবাদ, কামরাঙ্গীরচর, কসাইটুলি, কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়।

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজারের কামারশালাগুলোর ব্যস্ততা এখন সবচেয়ে বেশি। কারওয়ানবাজারের কামারপট্টিতে এসব জিনিস প্রস্তুতকারী ১২টি প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কেউ ক্রেতাদের কাছে পাইকারিভাবে বিক্রি করেন আবার কেউ কেউ নিজেদের দোকানে সাজিয়ে রেখে খুচরা বিক্রি করেন।

তবে কারো ব্যবসাই ভালো যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন বিক্রেতারা। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন— ছেলেধরে গলাকাটার মতো গুজব ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সেই গুজবের প্রভাব পড়েছে কামারপট্টিতেও। কামারপট্টি থেকে চাপাতি কিংবা রামদা কিনে রাস্তায় যেতে ভয় পাচ্ছেন ক্রেতারা। যদিও বিক্রেতারা পণ্যের ভাউচার ও দোকানের কার্ড দিয়ে ক্রেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন।

কামারপট্টির ‘মা-বাবার দোয়া হার্ডওয়ার’ নামের একটি দোকানের মালিক মো. বজলুর রহমান তকাল বলেন, আজ পর্যন্ত বিক্রি ভালো না। হয়তো আগামী শুক্রবার থেকে ক্রেতারা আসবে। গ্রামে গিয়ে কুরবানি করবে এমন লোকই এখনো পর্যন্ত কিনতে এসেছেন। তবে ঢাকার লোকজনও এসেছেন। আজ সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ১৭ হাজার টাকা।

অথচ কথা ছিল অন্তত ৪০ হাজার টাকা। এদিকে পুরান ঢাকার কর্মকাররাও ব্যস্ত সময় পার করছেন জবাই সামগ্রী প্রস্তুতে। ঈদে হাজার হাজার গরু, খাসি, ভেড়া, মহিষ, উট, দুম্বা ইত্যাদি পশু কুরবানি করা হয়ে থাকে। এসব পশু জবাই থেকে শুরু করে রান্নার চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্যন্ত দা-বঁটি, ছুরি-ছোরা, চাপাতি ইত্যাদি ধাতব হাতিয়ার আবশ্যকীয় হয়ে যায়।

ঈদের আগেই পশু জবাই করার ছুরি, চামড়া ছাড়ানোর ছুরি, চাপাতি, প্লাস্টিক ম্যাট, চাটাই, গাছের গুঁড়িসহ সবকিছু প্রস্তুত রাখতে হয়। গতকাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন দামে ছুরি, বঁটি, চাপাতি দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তবে এখনো বিক্রি ভালোভাবে শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে ক্রেতারা অভিযোগ করছেন বেশি দামে বিক্রি করছেন কামাররা।

সফিকুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা রামদা, চাপাতি কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘এরা অনেক বেশি দাম চাচ্ছে। ইস্পাতের রামদার কেজি ৪০০ টাকা হওয়ার কথা কিন্তু এরা রাখছে ৬০০ টাকা। একটা চাপাতির দাম বেশি হলে ৬০০ টাকা হওয়ার কথা কিন্তু রাখছে ৮০০-১০০০ টাকা। ছুরি থেকে শুরু করে সব জিনিসের দাম অনেক বেশি রাখছে।’

দাম বেশি রাখার কথা বলেছেন নিজাম উদ্দিন নামের আরও এক ক্রেতা। তিনি বলেছেন, ‘ঈদের এখনো অনেক বাকি থাকায় বেশি দাম চাচ্ছে। ঈদ যত কাছে আসবে তত দাম কমবে বলে আশা করছেন এই ক্রেতা। চাপাতি, রামদা, ছুরি ও বঁটি তৈরি করেন পুরান ঢাকার সজিব কর্মকার। তিনি বলেন, ‘দিনে খুব বেশি হলে একজনে ১০০ ছুরি বানাতে পারে।

পাইকারি বিক্রি করি ৬০ টাকা করে। অথচ দোকানদাররা সেই ছুরি কমপক্ষে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। বেশি দামের বিষয়ে পাইকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা কম রাখছেন কিন্তু খুচরা দোকানদাররা বেশি রাখছেন। বাজার ঘুরে দেখা যায়, বড় ছুরির দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছোট ছুরির দাম ২৫০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত।

বড় ছুরিগুলো ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছে দোকানিরা। দেশি চাপাতিগুলো কেজি হিসেবে বিক্রি হয়ে থাকে। প্রতি কেজি ওজনের চাপাতির দাম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত চাচ্ছে। এছাড়া বিদেশি চাপাতির দাম ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। বঁটি প্রতিটির দাম ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। হাড় কাটার ছোট চাইনিজ কুড়াল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।

কামাররা বলেন, এই সময়ের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকি। কুরবানির ঈদের আগে এক সপ্তাহ ভালো বেচাকেনা হয়। ওই সময় দামও ভালো পাওয়া যায়। তবে এবছর একটু ভিন্ন। এখনো বিক্রি শুরু হয়নি। তবে কবে থেকে শুরু হবে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা বলেন, ঈদের গরুর বাজার এখনো ভালোভাবে শুরু হয়নি। আগে মানুষ গরু কিনবে পরে ছুরি-চাপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কিনবে।

তবে কবে থেকে পুরোদমে বেচা কেনা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তারা জানান, ঈদের দুইদিন পূর্ব থেকে পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হবে। এ ব্যাপারে মালিটোলার কামার মনোজ রায় বলেন, এখন আমরা তৈরি করে রাখতেছি। বেচাকেনা শুরু হয়নি। আশা করতেছি আগামী সপ্তাহে পুরোদমে বেচাকেনা হবে।

ওয়ারী থেকে চাপাতি ও ছুরি কিনতে বনগ্রাম আ. মতিন কামারের দোকানে আসেন সুজন মিয়া, পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। জবাই করার ছুরি হাতাচ্ছে এবং দর দাম করছে। দোকানি একটি বড় ছুরির দাম চেয়েছে দুই হাজার টাকা। সুজন মিয়া দাম শুনে চিৎকার করে বললেন, ওই মিয়া এত দাম চান কেন?

জবাবে দোকানি বলেন, আমি চাইছি তাইকি আপনি দিয়ে দিছেন? আপনি কত দিবেন বলেন? পরে দর-দাম করে ১২শ টাকায় ওই ছুরি ক্রয় করে এবং এক হাজার টাকায় একটি চাপাতি কিনেন। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, পরে কিনলে দাম আরও বাড়তেও পারে তাই আগেই কিনে নিলাম। বনগ্রামের ব্যবসায়ী পরিতোষ বলেন, ঈদের বেচাকেনা এখনো শুরু হয়নি।

আরও পরে শুরু হবে। তবে আমরা এখন বানিয়ে রাখতেছি পরে শুধু বিক্রি করব। পুরান ঢাকার দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, তারা শুধু চাপাতি আর ছোট ছুরি বানাচ্ছে। লাইসেন্স না থাকায় তারা বড় ছুরি তৈরি করছে না। তবে কেউ কেউ অনেক লুকিয়ে কিছু তৈরি করছে এবং তা আড়াল করে রাখছে। ক্রেতারা এলে অন্যত্র নিয়ে তাদের দেখাচ্ছেন। দামে বনিবনা হলে গোপনে প্যাকেট করে দিয়ে দিচ্ছেন।

কামারের দোকান ছাড়াও বিভিন্ন হাড়িপাতিল দোকানেও দেখা গেছে কুরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার সরঞ্জাম। কাপ্তান বাজারের প্রায় অনেক দোকানেই এসব সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখতে দেখা গেছে। শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো এবং টাকাও যেন বেশি গুনতে না হয় সে কারণেই অনেকে আগেই সংগ্রহ করছেন তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী জবাই ও মাংস কাটার সরঞ্জাম।

শান দোকানগুলোতেও ছিল প্রচুর কাজ। কামরাঙ্গীরচরে ধীরেন্দ্র চন্দ্র দাশ শানের কাজ করছেন দীর্ঘ বিশ বছর যাবত, ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। তার কাছে কয়েকশ ছুরির স্তূপ দেখা যায়।

এতগুলো ছুরি কার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এগুলো একটি মাদরাসার ছুরি। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ঈদের দিন ছুরি নিয়ে মহল্লায় মহল্লায় মানুষের গরু, খাশি জবাই করে। সে কারণেই তাদের মাদরাসায় এসব ছুরি জমা থাকে। প্রতি বছর ঈদের পূর্বে তারা সব ছুরি শান দেয়ায়। অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ শানদাতারাও ঘুরে ঘুরে শানের কাজ করছেন।

জসিম মিয়া জানান, প্রতিদিনই ৩ থেকে ৫ হাজার টাকার কাজ করতেছে। তবে গতকাল বৃষ্টি হওয়াতে কাজ একদম কম হয়েছে। তবে আগামী শনিবার থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত