শিরোনাম

ঈদযাত্রায় মৃত্যুফাঁদ অরক্ষিত রেলক্রসিং

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু   |  ০৭:২৭, আগস্ট ০৮, ২০১৯

আসন্ন ঈদুল আজহায় ঘরমুখী মানুষের যাতায়াতে অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলো হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। ঈদযাত্রায় ট্রেনের বাড়তি শিডিউল, কোচের সংখ্যা বাড়ায় রেলসড়ক এবং সড়ক-মহাসড়কেও যাত্রীবাহী পরিবহনের সংখ্যা বাড়ায় রেলের অরক্ষিত ক্রসিংগুলো আরও অধিক ভয়ানক হয়ে উঠেছে।

তথ্য মতে, ঈদুল আজহায় শুধু রেলেই যাতায়াত করবে প্রায় প্রায় ৬ লাখ ঘরমুখো মানুষ। যদিও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আমুিনল ইসলামের দেয়া তথ্যে এ সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। তবুও রেলে যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে অরক্ষিত সব রেলক্রসিং।

এছাড়াও নাট-বল্টুহীন ব্রিজ সঙ্গে বাঁশের ব্যবহারেও ঘটছে রেল দুর্ঘটনা। তবে ঈদুল আজহাকেন্দ্রিক রেল দুর্ঘটনা বাড়াবে অরক্ষিত রেলক্রসিং- এমনটাই আশঙ্কা করছেন অনেকে। এছাড়া দেশজুড়ে এ পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে তার ৮৯ শতাংশই অরক্ষিত ক্রসিংয়ের কারণে।

রেলওয়ের তথ্য মতে, সারা দেশে দুই হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং রয়েছে দুই হাজার ৫৪১টি। যার মধ্যে বৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা মাত্র ১৪শ। বাকি সব ক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে এসব লেভেল ক্রসিং।

ঝুঁকিপূর্ণ এ লেভেল ক্রসিংগুলোতে রেল কর্তৃপক্ষ শুধইু ‘সামনে রেলক্রসিং, ‘সাবধানে চলাচল করুন’ সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায় এড়িয়েই চলছে। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জে ট্রেনের সঙ্গে বর-কনেবাহী মাইক্রোবাসের দুর্ঘটনাসহ অসংখ্য দুর্ঘটনার নজির রয়েছে বাংলাদেশ রেলের ইতিহাসে, যার বেশিরভাগই অরক্ষিত ক্রসিংয়ে ঘটেছে।

এদিকে রেলওয়ে ইনফরমেশন বুকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১৪শ লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে গেটম্যান রয়েছে মাত্র ৪৬৬টিতে। বাকি ৯৪৬টি লেভেল ক্রসিংয়ের কোনো গেটম্যান নেই।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, রেলওয়ে ও রেল মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থানীয় জনগণ দিন দিন লেভেল ক্রসিং বৃদ্ধি করেই চলেছে, তাই সব লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে, সারা দেশে রেলের ১ হাজার ৪৩৫টি লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান বা কর্মী না থাকায় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে এসব স্থান। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

সরেজমিন দেখা গেছে, অনেক রেল ক্রসিংয়ে গাড়ির গতিরোধে ব্যবহার হচ্ছে বাঁশ। এসব গেটের সামনে নেই কোনো সিগন্যাল লাইট। রাজধানী ও আশপাশের ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং আছে ৫৮টি। যার ২৩টিই অনুমোদনবিহীন, নেই গেটম্যানও।

গত ৩ বছরে শুধু রাজধানীতেই ৯৫টি ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন দেড় শতাধিক ব্যক্তি। তবুও টনক নড়ছে না রেল কর্তৃপক্ষের। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বেতকান্দিতে অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে ঢাকাগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসে থাকা বর-কনেসহ ১১ জন নিহত হন। এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে রেল কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে সেখানে দুজন গেটম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার রেলপথ। খিলগাঁও, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, বনানী ও কুড়িল রেলক্রসিংয়ের মধ্যে কুড়িল ক্রসিংকে ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রেলওয়ে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এরই মধ্যে এসব ক্রসিংগুলোর ৯টিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে।

এসব ক্রসিংয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। নগরীতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে যে ৯টি রেলক্রসিং চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো- মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, সায়েদাবাদ, বিএফডিসি, বনানী, কুড়িল, মহাখালী ও খিলগাঁও রেল ক্রসিং। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, এই পথে গত পাঁচ বছরে আড়াই শতাধিক ব্যক্তি ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারা গেছেন।

এদিকে রেলওয়ে সূত্র জানায়, শুধু ঢাকার কুড়িল রেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০ বার ট্রেন চলাচল করে। নগরীতে শুধু রেল ক্রসিংই অরক্ষিত নয়, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে রেললাইনও। জানা গেছে, দীর্ঘ আট-দশ বছর ধরে রেলের গেটম্যান হিসেবে একই জায়গায় একই ব্যক্তি কাজ করছেন।

এর ফলে অন্যের কাছে দায়িত্ব দিয়ে অনেকে চলে যান। ওই ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলায় ঘটছে অনেক দুর্ঘটনা। তবে গেটম্যানদের অভিযোগ, বছরের পর বছর অস্থায়ী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও তাদের স্থায়ী করা হয় না। স্থায়ী করার কোনো খবর না থাকলেও নতুন নিয়োগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে রেল কর্তৃপক্ষ। এ কারণে অনেক সময় হতাশায় দায়িত্বে অবহেলা হয়ে যায়।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেনের দাবি সবগুলো ক্রসিংয়েই গেটম্যান রয়েছে। তবে ১৪০০ ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ৪৬৬টি গেটম্যান রয়েছে বলে জানালে তিনি বলেন, এরকম তথ্য তার জানা নেই, জেনে জানাতে হবে।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও না পেয়ে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা রেজাউল করিম রেজার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। যে কারণে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অরক্ষিত রেল ক্রসিং সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, কোনো লেভেল ক্রসিং অবৈধ বলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারে না। জনগণ বা এলজিইডি যদি কোনো লেভেল ক্রসিং তৈরি করেও থাকে সেটা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

সিরাজগঞ্জের দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, লোকবল বা প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না। এটি দেখার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। তবে এলাকাবাসী বা এলজিইডি যেই রেল ক্রসিং তৈরি করছে সেটা রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত