শিরোনাম

কারসাজিতে মুখথুবড়ে পড়েছে চামড়াশিল্প

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম   |  ০৯:১৬, আগস্ট ১৪, ২০১৯

কাঁচামালের সহজলভ্যতার পাশাপাশি মূল্য সংযোজন হিসাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাত থেকে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয়ের অন্যতম বড় উৎস দেশের চামড়াশিল্প। কিন্তু এ সত্য শুধু কাগজে-কলমেই।

বাস্তবতা হলো, নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রতি মাসে আমদানি করছে প্রায় ৫০ লাখ বর্গফুট চামড়া। অথচ প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত ২২ কোটি ঘনফুট চামড়ার প্রায় অর্ধেকই ব্যবহূত হচ্ছে না রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে।

বিদেশে এক সময় বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিলো। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়হীনতার কারণে এ শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এ দেশের কৃষি খাত বিশেষ করে ধান ব্যবসা সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে।

ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না কৃষক, সৃষ্টি হয়েছে বহু সংকট। প্রায় একইভাবে চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শিল্পটি বিপন্ন হতে চলেছে।

তৃণমূল পর্যায়ে বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও রয়েছে। এ দুইয়ের কারসাজিতে চামড়া শিল্প আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এক লাখ টাকার একটি গরুর চামড়া প্রায় ২২ বর্গফুট। সরকারের সর্বনিম্ন প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ৪৫ টাকা হলে এক লাখ টাকার গরুর চামড়ার দাম ৯৯০ টাকা।

সারা দেশে প্রায় এক লাখ টাকা দামের ২০ লাখ গরুর চামড়া চার কোটি ৪০ লাখ বর্গফুট। যা সরকারি হিসাবে ১৯৮ কোটি টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা, কিন্তু সিন্ডিকেট করে সারা দেশে ২২ বর্গফুটের চামড়া ৩০০ টাকায় কিনছে। এতে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩৮ কোটি টাকা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঈদুল আজহায় ৪২ লাখ গরুসহ প্রায় এক কোটি ১০ লাখ কুরবানির পশুর চাহিদা পূরণের জন্য সারা দেশে প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩টি পশু প্রস্তুত ছিলো।

এই হিসাবে প্রায় এক লাখ টাকার গরুর চামড়া ২২ বর্গফুট এবং ৫০ হাজার টাকা এবং এর নিচের দামে কেনা গরুর চামড়া ২০ বর্গফুট ধরা হলে এবার শুধু ৪২ লাখ গরুর চামড়ার দাম দাঁড়ায় ৩৯৬ কোটি টাকা।

কিন্তু সরকারি হিসাবে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম সর্বনিম্ন ৪৫ টাকা ধরা হলেও বাজারে ১৩ টাকা কেনায় এবার শুধু গরুর চামড়ায় প্রায় ২৭৬ কোটি টাকা লোকসান দাঁড়াবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুরবানির পশুর চামড়া বরাবরই গরিব-মিসকিন ও এতিমের হক। গরিবের হকে বিত্তবানরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দামের দরপতন ঘটানো হয়েছে। এতে সারা দেশে কুরবানির কাঁচা চামড়া কেনার লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বাধ্য হয়ে রাস্তায়, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সামনে কাঁচা চামড়া স্তূপ করে রাখা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বাইরে সবচেয়ে ভালো মানের কাঁচা চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়।

আর মাঝারি মানের চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। যা গত বছরও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। গত ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কমদামে বিক্রি হচ্ছে পশুর চামড়া। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৮০ হাজার টাকার গরুর চামড়ার দাম দিচ্ছেন ২০০ টাকারও কম। এক লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা।

সরকার নির্ধারণ দাম অনুযায়ী, ঢাকায় কুরবানির গরুর প্রতিটি ২০ থেকে ৩৫ বর্গফুট চামড়া লবণ দেয়ার পর ৯০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকায় কেনার কথা ট্যানারি মালিকদের।

কিন্তু, রাজধানী ঘুরে জানা গেছে, এবার ফঁড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের দেখা মিলছে না। কোথাও কোথাও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় চামড়া কিনেছেন। আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য স্থানে চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে আরও কম দামে।

ঢাকরা রায়েরবাগ এলাকার বাসিন্দা ইকরামুল কবির বলেন, গরুর চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছিলাম। এক লাখ টাকায় কেনা গরুর চামড়ার দাম এক ব্যবসায়ী বলছেন ৩০০ টাকা। পরে তিনি সেই চামড়া স্থানীয় এতিমখানায় দান করেন। একই অবস্থা ঢাকার বাইরেও।

পশুর চামড়ার দাম না পাওয়ায় চট্টগ্রামে কয়েক লাখ অবিক্রিত চামড়া ভাগাড়ে পুঁতে ফেলছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। সরকার নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেকেও চামড়া বিক্রি করতে না পেরে লাখ লাখ টাকার চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়েলেন চট্টগ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

পরে চামড়াগুলো তুলে নেন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজি আছে এমন মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। গতকাল বুধবার রংপুরে সাংবাদিকদের বলেন, এবারের ঈদুল আজহায় কুরবানি হওয়া পশুর চামড়ার দাম অনেক কম। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।


চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, এবার চামড়ার দাম স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। দাম না পেয়ে অনেকেই চামড়া ফেলে দিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, চামড়া নিয়ে যখনই ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করি, তখনই তার বিরুদ্ধাচারণ করা হচ্ছে। চামড়ার দাম কমানো এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে গতকাল সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, চামড়া শিল্পের সঙ্গে কোনো সিন্ডিকেট জড়িত থাকলে আমরা তা খতিয়ে দেখবো। সিন্ডিকেটের কারণে চামড়া শিল্পের কোনো সমস্যা হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) নেতারা দাবি করছেন, সিন্ডিকেট করে একটি চক্র চামড়ার দাম কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে চামড়ার এই অবস্থার জন্য ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন জড়িত নয়।

কারণ আমরা কখনো কাঁচা চামড়া ক্রয় করি না। পাঁচ থেকে ছয় জনের হাতবদল হয়ে তারপর আমাদের কাছে চামড়া আসে। সুতরাং কাঁচা চামড়ার এই দরপতনের সঙ্গে কোনোভাবেই বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন জড়িত নয়।

একই সঙ্গে সরকার যে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেম সেটি প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদকে বলেছেন, চামড়ার দাম কমানোর পেছনে কেউ না কেউ রয়েছেন।

গরিব মানুষরা যেন পশুর চামড়ার নির্ধারিত দাম পায় সেটি সরকারের নিশ্চিত করা দরকার। সরকার কেন এসব সিন্ডিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না? এটি অন্যায় ও বেআইনি।

সর্বশেষ তথ্যমতে গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে অবিলম্বে নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ক্রয় শুরু করবে। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের অনুরোধ জানিয়েছে।

প্রসঙ্গত, এবার গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত