রাইড শেয়ারিংয়ে নৈরাজ্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু  |  ১০:৪৯, আগস্ট ২৩, ২০১৯

রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে রাজধানীবাসীর বহু বছরের স্বপ্ন মানসম্মত গণপরিবহন ব্যবস্থার বাস্তবায়নে কিছুটা স্বস্তি এলেও ফের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট সবকটি প্রতিষ্ঠান। ঠিক যেন গতানুগতিক গণপরিবহন ব্যবস্থায় ফিরেছে পুনরায়।

গণপরিবহন ব্যবস্থায় চলমান অব্যবস্থাপনা নিরসনে ২০১৬ সালে সর্বপ্রথম অ্যাপভিত্তিক গাড়ি ভাড়া সেবা পাঠাওয়ের যাত্রা শুরু হওয়ার পরই যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উবার প্রাইভেটকারে ভাড়ার সুবিধা। দুটি অ্যাপই মোটরসাইকেল ও গাড়িভাড়া সেবা নিয়ে যাত্রার শুরু করে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

এর কিছুদিন পরই একে একে চালু হয় ‘সহজ’, ‘ওভাই’, ‘ইজি অ্যাপ’সহ আরও ১৬টি কোম্পানি। এক লাখ ৪ হাজার ৩৮৯টি মোটরসাইকেল এবং ১৮ হাজার ২৫৩টি প্রাইভেটকার নিয়েও স্বস্তির বদলে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

শুরুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ) ব্যক্তিগত গাড়ির বাণিজ্যিক ব্যবহারে রাজি ছিল না। এই ধরনের সেবা চালু হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণাও দেয় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু জনচাপে বিআরটিএ আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বরং এই সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নীতিমালার অধীনে আনতে গত বছরের জুলাই মাসে রাইড শেয়ারিং নীতিমালাও চূড়ান্ত করে সরকার। অথচ এক বছর পার হলেও সেই নীতিমালার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বরং সেই নীতিমালাই এখন অমান্য হচ্ছে হামেশা।

সবচেয়ে বেশি অভিযোগ মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। তবে গাড়ির বিরুদ্ধেও রয়েছে ভুরি ভুরি আইন অমান্যের অভিযোগ।

বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব বিআরটিএর হলেও বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো এখনো তালিকাভুক্ত না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে পারছে না সংস্থাটি। সংস্থাটির প্রণীত নীতিমালা অনুসারে, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবেদন করে নিবন্ধিত হতে হবে।

এ পর্যন্ত বিআরটিএতে ১০টি প্রতিষ্ঠান আবেদনও করেছে। বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে দেখছে। এ জন্য গঠন করা হয়েছে ‘রাইড শেয়ারিং সেল’ নামের একটি বিশেষ সেলও।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, আবেদনপত্র জমা পড়ার পর বিআরটিএ থেকে প্রতিনিধিদল ১০টি প্রতিষ্ঠানের ৯টি পরিদর্শন করেছে। বিআরটিএর রাইড শেয়ারিং সেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উবার, পাঠাওসহ রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো মনিটরিংয়ের জন্য বিআরটিএর কাছে ‘অনলাইন অ্যাকসেস’ ও ‘পাসওয়ার্ড’ দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সেবাদানকারী এই ১০টি প্রতিষ্ঠান এখনো তা করেনি।

অ্যাপগুলোর সার্ভারসহ সব কার্যক্রম দেশে থাকতে হবে— এ শর্তও মানা হচ্ছে না। গাড়িচালকের তথ্যাদি ও যাত্রীর জিপিএস লোকেশন ন্যাশনাল হেল্প ডেস্ক (৯৯৯) যাতে দেখতে পারে তার ব্যবস্থা রাখার শর্ত দেওয়া হলেও মানা হচ্ছে না।

শুধু ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নীতিমালায় যেসব শর্ত রয়েছে তা না মানায় এসব প্রতিষ্ঠানকে পরিবহনসেবা দেওয়ার অনুমতি বা নিবন্ধন ও লাইসেন্স দেওয়া যাচ্ছে না।

স্বস্তির সম্ভাবনা দেখিয়ে যাত্রা শুরু করা এসব প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে যাত্রীর ইচ্ছামতো গন্তব্যে যেতে না চাওয়ায়, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি দাবি করায়, নানা কৌশলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করায় হয়ে উঠছে অস্বস্তির কারণও।

শুধু তাই নয়— এসব সেবার বিরুদ্ধে যাত্রী ভোগান্তির দায়ে ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণও নেই। যাত্রীরা ভুগলে অভিযোগ করার মতো জায়গাও নেই। আবার অ্যাপ চালানো প্রতিষ্ঠানগুলোও গণমাধ্যমকেও পাত্তা দিতে চায় না। কোনো অভিযোগের জবাব দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করে না তারা। ভালো সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়া মোবাইল অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা বাড়ছেই।

ব্যবহারকারীদের প্রধান কয়েকটি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে— বেপোরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, যাত্রীদের সাথে চালকের খারাপ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত টাকা চাওয়া, ব্যবহারকারীর চাওয়ামতো গন্তব্যস্থলে যেতে না চাওয়া, গন্তব্যস্থল জানার পর তা বাতিল করার অনুরোধ করা ইত্যাদি। অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি চালক ও অ্যাপ ব্যবহারকারীদের উদাসীনতাই এর জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরবাসীকে গুণগত সেবা নিশ্চিতে সরকারের শক্ত তদারকি ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোম্পানিগুলোকে নিয়ম-নীতি মানতে বাধ্য করতে হবে। তারা আরও বলছেন, অ্যাপভিত্তিক সেবা দেয়া বিভিন্ন কোম্পানির নিবন্ধনধারী চালকরা বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা অনেক সময় ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করে বেপরোয়াভাবে বাইক চালান।

নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, রাইডশেয়ারিং কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো সেবা দিচ্ছে, এতে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি বলেন, তারা সরকার থেকে লাইসেন্স ও তদারকি ছাড়াই অবৈধভাবে ব্যবসা করছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধন না থাকায় কোনো জবাবদিহিতাও নেই। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর জন্য সরকার গত বছরে নীতিমালা তৈরি করেছে কিন্তু তা এখনো কার্যকর করা হয়নি, যোগ করেন নগর বিশেষজ্ঞ হাবিব।

ওই নীতিমালায় বলা হয়, রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো এবং তাদের অধীনে ব্যবহার হওয়া বিভিন্ন যানবাহনের মালিকদের এ সেবা দেওয়ার জন্য বিআরটিএ থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এখন অ্যাপভিত্তিক সেবাগুলো নৈরাজ্য শুরু করেছে। এরা যখন এই সেবা চালু করে তখন আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু এখন সেই আশায় গুড়েবালি। এখনই যদি এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। গণমাধ্যমের কল্যাণে কিছু লেখালেখি হলেও সরকারের এসব বিষয় সয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে অ্যাপ ব্যবহারকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত খোরশেদ আলম বলেন, বেশিরভাগ চালক একইসঙ্গে বিভিন্ন কোম্পানির অ্যাপ ব্যবহার করেন এবং সবগুলোর মধ্য থেকে তাদের পছন্দের গন্তব্যস্থলের ট্রিপটি নেন।

পাভেল নামের এক যাত্রী বলেন, অনেক চালকের নেভিগেশন (ম্যাপ) সম্পর্কে ধারণা নেই। অনেকে গাড়িতে এসি চালাতে অনীহা দেখান। এছাড়া উবার ও পাঠাও চালকরা অ্যাপে দেখানো ভাড়ার চেয়েও প্রায়ই অতিরিক্ত টাকা দাবি করে, না দিতে চাইলে খারাপ ব্যবহার করে।

এছাড়া অনেক সময় অ্যাপে অস্বাভাবিক ভাড়া দেখায় জানিয়ে তিনি বলেন, একবার উবার অ্যাপ ব্যবহার করে প্রাইভেট কার নিয়ে মালিবাগ থেকে পুরান পল্টনে যাওয়ার পথে ১৫০ টাকা ভাড়া দেখালেও ওই একই পথে ফেরার পথে ২৬০ টাকা দেখিয়েছে।

অ্যাপে নিবন্ধন পাওয়া অনেক যানবাহনের ফিটনেস নেই— এমন অভিযোগও রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে দক্ষিণ বিভাগের ডিসি জয়দেব চৌধুরী বলেন, সবার জন্যই আইন সমান।

সেক্ষেত্রে অ্যাপে নিবন্ধন পাওয়া যানবাহনগুলোকে আলাদা করে দেখা হয় না। তবে নতুন জয়েন করায় এ মুহূর্তে তিনি অ্যাপভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিবন্ধনের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের বিষয়ে বলতে পারেননি।

তবে বিদ্যমান বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগের মধ্যেও অ্যাপ ব্যবহারীকারীদের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ মোটরসাইকেল চালকদের সরবরাহ করা হেলমেট নিয়ে। ব্যবহারকারীরা জানান, বেশিরভাগ হেলমেট শুধু নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্তই নয়, দুর্ঘটনাতেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। পুলিশি মামলা থেকে বাঁচতেই কেবল এগুলো দেওয়া হয়।