শিরোনাম

সহিংস হচ্ছে রোহিঙ্গারা

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম ও নুর হাকিম আনোয়ার  |  ০৯:৫০, আগস্ট ২৪, ২০১৯

প্রায় দুই বছর পর গত বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সরকার ঘুুমধুম সীমান্ত কঠোরভাবে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাসহ উভয় দেশ যাবতীয় প্রস্তুতিও নিয়েছিল।

কিন্তু দিনের আলো নিভে গেলেও নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের কেউই ফেরত যায়নি। বরং রাতের অন্ধকারে রোহিঙ্গা ডাকাতসর্দার সেলিমের নেতৃত্বে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুককে গুলি করে হত্যা করে।

সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়। শুধু তাই নয়, গত বৃহস্পতিবার রাতে নাফ নদী দিয়ে ইয়াবা পাচারের সময় বিজিবির সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করলে সংঘর্ষে দুই ইয়াবা পাচারকারী নিহত হয়।

নিহতরা হলো— হ্নীলার মোছনি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা নুর আলম ও উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মোহাম্মদ সাকের। তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ বিভিন্ন অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে তারা আশ্রয় নিয়ে আরামে থেকে এভাবেই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

তাদের ব্যবহারে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বয়ং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও বলেছেন, রোহিঙ্গারা এখন খুব সুখে আছে, কিন্তু সুখে খুব বেশি দিন থাকবে না। কারণ তাদের নিয়ে বিভিন্ন এনজিও ষড়যন্ত্র করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রোহিঙ্গা দলনেতাদের কারণেই সন্ত্রাসীরা এভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কারণ, আরাকান সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহসহ কয়েকজন দলনেতা বলেছেন, নিরাপত্তাসহ চার কারণে তারা ফিরে যাবে না মিয়ানমারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) টেকনাফ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এ বি এম আবুল হোসেন রাজু বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে যেসব দেশি-বিদেশি এনজিও কাজ করছে। তাদের প্রতি সরকারের আরো বেশি নজরদারি রাখা উচিত। রোহিঙ্গাদের ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ডে স্থানীয় লোকজন সবসময় ভয়ে ও আতঙ্কে থাকে। এসব কারণে রোহিঙ্গারা কোথায় যাচ্ছে তা তদারকি করা দরকার।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মিয়ানমারে কোনো রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফেরত যায়নি। বরং রাত সাড়ে ১১টার দিকে রোহিঙ্গা ডাকাতসর্দার সেলিমের নেতৃত্বে টেকনাফের হ্নীলায় নিজ বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে ওমর ফারুককে (৩০) হত্যা করে।

নিহত ওমর ফারুক উপজেলার হ্নীলা ইউপির জাদিমোরা এলাকার মোনাফ কোম্পানির ছেলে। ওমর ফারুক হ্নীলা ৯ নং ওয়ার্ড যুবলীগ ও জাদিমোরা এম আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন।

নিহতের বাবা আবদুুল মোনাফ জানান, কোনো কারণ ছাড়াই রোহিঙ্গা ডাকাত নুর মোহাম্মদ ও সেলিমের নেতৃত্বে একদল অস্ত্রধারী তার ছেলেকে খুন করেছে। এ ব্যাপারে টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার

দাশ আমার সংবাদকে জানান, খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। এদিকে ওমর ফারুক হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার দাবি জানান।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে লাখো রোহিঙ্গার মধ্যে কিছু উশৃঙ্খলতা রয়েছে। শিবিরে সমপ্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খুবই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শিবিরগুলোতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা শিবিরে ৩৫টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দুই শতাধিকের বেশি মামলায় জড়িয়েছে রোহিঙ্গারা। তার মধ্যে অস্ত্র সংক্রান্ত ২৯টি, মাদক সংক্রান্ত ১৭০টি, চোরাচালানের ঘটনায় ৭৬টি, অপহরণ সংক্রান্ত ২৮টি, চুরির অভিযোগে ৯টি, ডাকাতির ঘটনায় ১৪টিসহ আরো ৩১টি বিভিন্ন অভিযোগের মামলা রয়েছে। এসব ঘটনায় ৫০০ রোহিঙ্গাকে মামলার আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বেশির ভাগকেই আটক করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

এদিকে ১৫ নভেম্বরের পর দ্বিতীয় দফা রোহিঙ্গারা ফেরত না যাওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হতাশ। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, তারা ফেরত যেতে না চাইলে ভবিষ্যতে তাদের প্রতি কঠোর হবে বাংলাদেশ। এখন তো তারা খুব সুখে আছে। কিন্তু সুখে খুব বেশি দিন থাকবে না।

এরই মধ্যে টাকা-পয়সা কমছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে যারা কাজ করছে তারাও কঠোর হবে। ১৯৮০ দশকের পর থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিরাপত্তার কথা বললেও আস্থার অভাবেই তারা যাচ্ছে না নিজ দেশে। বরং ঘটাচ্ছে অপরাধ। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঘটছে পাল্টাপাল্টি বন্ধুকযুদ্ধ।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফের ছোট-বড় প্রায় ৩২টি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। গত তিন দিনে ৯৩৩ পরিবারের মধ্যে ২৯৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার নেয়া হলেও বৃহস্পতিবার প্রায় সাড়ে তিন হাজার তালিকাভূক্তের মধ্যে শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরের ই-ব্লকের আরাকান সোসাইটি নামে কিছু রোহিঙ্গা নেতা চার দফা দাবি করে মিয়ানমারে ফেরত যায়নি।

আরাকান সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহ সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো— রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, জমিজমা ফেরত দিতে হবে এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা এক লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গাকে মুক্ত করে নিজ নিজ গ্রামে বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা দিতে হবে।

রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, উখিয়া-টেকনাফের সব রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে এটা ঠিক নয়। কয়েকটি শিবিরে কিছু ঘটনা ঘটাচ্ছে কিছু অসাধু রোহিঙ্গা চক্র। তাদের জন্য সব রোহিঙ্গার দুর্নাম হচ্ছে।

তাদের আইনের আওতায় আনলে সব রোহিঙ্গা দুর্নাম থেকে বেঁচে যাবে। সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবীর এক গণমাধ্যমে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বৃহস্পতিবার শুরুর কথা ছিলো, শুরু হয়নি। কারণ মিয়ানমারের প্রতি তাদের আস্থার অভাব।

এই আস্থাহীনতার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও আছে। রোহিঙ্গারা যে পরিবেশে রাখাইন ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, তা ছিলো বিভীষিকাময়। সেখানে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, ধর্ষণ করা হয়েছে।

তবে এ আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব মিয়ানমারের। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত করারও সুযোগ নেই। যত সময় যাবে, এ সংকট আরো জটিল হবে। তাই প্রত্যাবাসনের কাজটি দ্রুতই করতে হবে। বাংলাদেশকে আরো বেশি প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এবং প্রতিবেশীদের নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।

মানবিক আশ্রয়ে রোহিঙ্গারা ঘটাচ্ছে অপরাধ : সীমান্তে রোহিঙ্গাদের নৌকায় নজরদারি আরো কড়াকড়ির ফলে উল্লেখযোগ্য হারে নিষিদ্ধ মাদকের চালান ধরা পড়ছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তে রোহিঙ্গাদের নৌকায় নজরদারি আরো কড়াকড়ির ফলে উল্লেখযোগ্য নিষিদ্ধ মাদকের চালান ধরা পড়ছে।

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমার সীমান্তে শুধু চলতি বছর জানুয়ারি মাস থেকে প্রায় ৫১ লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এ যাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় চালানও আটক করা হয়েছে মার্চ মাসে।

টেকনাফ বিজিবির কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আসাদুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, যখন মিয়ানমার থেকে লোকজনের আসা-যাওয়া বেড়েছে, তখন থেকে মাদক পাচারও বেড়েছে। চেক (তল্লাশি) করতে গেলে এগুলো পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, অনেক জায়গায় রাতের আঁধারে হয়তো তারা সীমান্ত অতিক্রম করছে, তখন হয়তো তাদের আটকানো যাচ্ছে না।

হ্নীলা ইউপির সদস্য মর্জিনা আক্তার বলেন, রোহিঙ্গাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উখিয়া-টেকনাফের মানুষ ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকা রোহিঙ্গা শিবির রয়েছে, সেখানকার স্থানীয়রা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গারা আরো বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক চিন্তা থেকে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা এখন অপরাধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের দ্বন্দ্বের কারণে খুন, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত