শিরোনাম

মায়ের কাছে গোশত রেখে বাসায় ফেরেনি লামিয়া

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ১০:০২, আগস্ট ২৪, ২০১৯

লামিয়ার বাবা চকবাজারের শত শত মানুষের দোকান পাহারা দিয়েছেন। অথচ তার মেয়ে লামিয়ার নিরাপত্তা কেউ দিতে পারলো না। কথাগুলো বলছিলেন, রাজধানীর চকবাজার থানার পশ্চিম ইসলামবাগে দুর্বৃত্ততের লালসার শিকার হয়ে নিহত লামিয়ার মা হালিমা বেগম।

তিনি বলেন, আমার এতিম মেয়ে না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে হাত পাততো না। বাড়িয়ালির পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে ঝিয়ের কাজ করে ১৩শ টাকা পেত। আর তা দিয়েই আমার সংসার চলতো। ঈদের দিন রাতে জমিদারের বউ এক কেজি গরুর গোশত দিয়েছিল।

সেই গোশতটুকু রেখেই রাত ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হয়ে যায় লামিয়া। এরপর আর ফিরে আসেনি। দুদিন পর আমার লামিয়ার ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখতে পেলাম। বাড়িয়ালির দেয়া গোশত আর খেতে পারলো না আমার মেয়ে।

তিনি আরও বললেন, আমার মেয়ে কারো সঙ্গে কোনো প্রকার প্রেমট্রেমও করতো না। যদি প্রেম করে কোনো ছেলেকে পচ্ছন্দ করে চলে যেত তাও আমি শান্তি পেতাম।

কিন্তু তার পরিবর্তে সন্ত্রাসীদের লালসার শিকার হয়ে মারা গেলো। বাড়ির মালিকের ফ্ল্যাটে ১৩শ টাকা বেতনে ঝিয়ের কাজ করতো। আর সেই টাকা দিয়েই কোনোরকম সংসার চলাতেন বলে জানিয়েছেন হালিমা। ঘ

টনার পর থেকে পুলিশ এসে জানতে চাইছেন, আমরা কাউকে সন্দেহ করি কি না। কিন্তু লামিয়ার সাথে তো কারো প্রেমের সম্পর্কও ছিলো না। তাই কাকে আমরা সন্দেহ করবো। শুনেছি, পুলিশ কয়েকজনকে আটক করেছিল। কিন্তু আমার মেয়র প্রকৃত খুনি গ্রেপ্তার হয়েছে কি না তা তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকবাজার থানার ৯১/১ পশ্চিম ইসলামবাগ সকিনা বিবির বাড়ির দ্বিতীয় তলায় পাঁচ হাজার টাকায় আট বছর ধরে ভাড়া থাকেন হালিমা বেগম। কয়েক বছর আগে তার স্বামী দুলাল মিয়া মারা যান।

তিনি চকবাজার এলাকায় নাইটগার্ডের চাকরি করতেন। মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টিতে তাদের গ্রামের বাড়ি। তিন মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে লামিয়া ছিল চতুর্থ। বড় মেয়ে লিজা আক্তার কারখানায় কাজ করেন। এরপরের মেয়ে আয়শা আক্তারের বিয়ে হয়েছে। তার ছোট রিয়াজ নামের ছেলে কলকারখানায় কাজ করেন। রিয়াজের ছোট লামিয়া (১৪) ও সোহাগ।

আর বাড়ির মালিকের মেয়ের সঙ্গেই ঘুমাতো। ঈদের দিন রাতে বাড়ির মালিকের বউ এক কেজি গরুর মাংস দেয়। সেই মাংস তার মায়ের কাছে দিয়েই ঘর থেকে বের হয়। এরপর সে আর জীবিত ঘরে ফেরেনি।

ইসলামবাগ এলাকার মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা প্রকাশ্যে হেরোইন, ইয়াবা বিক্রি ও সেবন করতো। চকবাজার থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে এসব মাদকসেবীর সখ্য ছিল। এজন্যই ইসলামবাগ এলাকায় প্রকাশ্যে চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে আসছিল।

ওইসব সন্ত্রাসী ঈদের দিন রাতে বাড়ির মালিকদের ব্যস্ততার সুযোগে লামিয়াকে কৌশলে ডেকে নিয়ে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করতে পারে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

লামিয়ার মা হালিমা বেগম জানান, তিনি ধারণা করছিলেন, তার মেয়ে ঘরে গোস্ত রেখে বাড়ির মালিকের মেয়ের সঙ্গে ঘুমাতে গেছেন। এজন্য তার খোঁজখবর দেয়নি। পরের দিন দুপুরে বাসায় খোঁজ করে তার সন্ধান পাননি তারা।

ঈদের একদিন পর চকবাজার থানা পুলিশ ১১৭/৩ পশ্চিম ইসলামবাগ দেলোয়ার হোসেনের বাড়ির ছাদ থেকে অজ্ঞাতনামা হিসাবে তার লাশ উদ্ধারের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। তার গলায় ওড়না পেঁচানো এবং পরণে সালোয়ার-কামিজ ছিল।

কিন্তু তাকে স্থানীয়রা কেউ সনাক্ত করতে পারিনি। অজ্ঞাতনামা তরুণী লাশ উদ্ধারের সংবাদ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে স্কল দেওয়া হয়। আর ওই স্কল দেখে লামিয়ার ভাই খোঁজ করে জানতে পারেন যে, কয়েক বাসার পাশে থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এর কিছুক্ষণ পরই চকবাজার থানার পুলিশ মোবাইল সেটে ওই তরুনীর ছবি নিয়ে এলাকার লোকজনকে দেখায়। তখনই লামিয়ার ভাই রিয়াজ ছবিটি দেখে তার বোন লামিয়ার লাশ বলে সনাক্ত করে।

ঘটনাস্থল দেয়োয়ারের বাড়িতে যাওয়ার পর তার ছেলে জানান, ঈদের পরদিন সকালে আমার মা প্রথমে মেয়েটির লাশ দেখে আমাকে জানান। পরে আমি ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় পুলিশ আমাকে ডেকে নিয়ে ৫ দিন থানায় রেখেছিল। নিহত মেয়েটির লাশ পাশের ভবনের ছাদে নির্যাতন করে হত্যার পর আমাদের ছাদে ফেলা হতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, পাশের ভবনের ছাদের দেওয়ালে মেয়েটির ওড়না পেঁচানো ছিল।

এ ঘটনায় চকবাজার থানায় লামিয়ার মা বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্ত করছে সহকারী পরিদর্শক (এসআই) লোকমান হোসেন।

পুলিশ স্থানীয় একটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ছবি দেখে বেশ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আর এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।

ঢামেক মর্গ সূত্র জানায়, নিহতের লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ডিএনএ স্যাম্পল রাখা হয়েছিল।

এ ব্যাপারে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহরাব হোসেন জানান, এ ঘটনায় শহিদুল নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আর মামলাটির তদন্ত এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত