শিরোনাম

মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন বাংলাদেশে অধ্যয়নরত কাশ্মীরী শিক্ষার্থীরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০৯:২৭, আগস্ট ২৫, ২০১৯

‘‘চোখের সামনেই নিজের মা-বাবা, ভাই-বোনের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে তাও কিছু বলতে পারিনি। বেশ কিছুদিন বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করার পরও নিজের বাড়িতে পৌঁছতে পারিনি।

আত্মীয় স্বজনরা বারবার বলছিল বাড়ি গেলেই আটক হবি। তুই বাংলাদেশে চলে যা। তোর মা-বাবাকে দেখতে পারবি না। দেখতে গেলেই বিপদে পড়বি। তুই পড়া-লেখা করতে যা। এভাবেই আত্মীয়দের চাপে আবারো চলে আসতে বাধ্য হয়েছি।

এদের কথা শুনে সেটা আমার দেশ বলে মনে হচ্ছিল না। মজলুম মা-বোনদের আর্তচিৎকারে কাশ্মীরের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। প্রতি মিনিটে মিনিটে কোথাও না কোথাও থেকে মৃত্যু বা কাশ্মীরী মা-বোনদের ওপর নির্যাতনের খবর পেয়েছি। পুলিশের ছররা গুলিতে অনেকেই অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। অথচ তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। আমায় ক্ষমা করে দিও প্রিয় কাশ্মীরী মা-বোন, বাবারা’’।

একথা বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন বাংলাদেশের একটি কলেজে অধ্যয়নরত সদ্য কাশ্মীর ফেরত এক শিক্ষার্থী। অ্যাম্বেসি থেকে নিষেধাজ্ঞা ও আত্মীয় স্বজনের চাপ এবং চতুর্মুখী সমস্যায় মিডিয়ায় কথা বলতে পারছেনা কাশ্মীরী শিক্ষার্থীরা।

তিনি আরও বলেন, নিজের মা-বোনদের জন্য কিছু করার যেমন সুযোগ নেই তেমনি তাদের জন্য একটু আন্দোলন করে বা কথা বলে নিজেকে বুঝাব সে সুযোগও নেই। তাদের ভারতের সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা বাতিলের পরপরই অ্যাম্বেসি থেকে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করা হয়েছে যে, কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে মিডিয়া বা কারো সাথে কথা বললে সমস্যা হবে।

যে কারণে এর পর থেকে তারা নিজের বাসস্থান আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোথাও চলাফেরা করেন না। তারা প্রচণ্ড চাপ এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত আছেন জানিয়ে বলেন, আমাদের জন্য আপনারা কিছু করতে পারবেন না জানি। তবে আপনাদের কাছে আমার মা-বাবা, ভাই-বোনদের জন্য দোয়া চাই।

এইটুকু করেন। আমরা এইটুকুই আপনাদের কাছে চাই। তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করার পর গত দুসপ্তাহে শত শত যুবককে আটক করা হয়েছে। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা রাতে বাড়িতে বাড়িতে হানা দিয়ে তরুণ যুবকদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর করছে, খাবার ফেলে দিচ্ছে বা চালের বস্তায় তেল ঢেলে দিচ্ছে এবং শেষে বাড়ির যুবকদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। যুবকদের তুলে নিয়ে গিয়েই শান্ত হচ্ছে না।

একের পর এক মা-বোনদের ইজ্জতের ওপর হামলা করছে। সোপিয়ানের একটি আর্মি ক্যাম্পের বর্ণনা দিয়ে বলেন, সেখানে কয়েকজন যুবককে ধরে নিয়ে গিয়ে জেরা ও নির্যাতন করার সময় তাদের সামনে মাইক্রোফোন ধরে রাখা হয়েছিল।

যাতে তাদের চিৎকারের আওয়াজ শুনে গোটা এলাকা ভয় পায়। এমনকি এই রেকর্ড এলাকায় এলাকায় শোনানো হচ্ছিল যাতে অন্য কেউ কথা না বলে বা আন্দোলন না করে। এমনি করুণ কাহিনীর বর্ণনা দিচ্ছিলেন কাশ্মীর ফেরত এই শিক্ষার্থী।

ঘটনাটি বিবিসিতে প্রকাশ হয়েছে বলেও জানিয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকার বেসরকারি একটি মেডিকেলে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থী জানান, গত ২০ দিন যাবত তার পরিবারের কারও সাথে কথা হয়নি।

তারা বেঁচে আছেন না মরে গেছেন কিছুই জানেন না। সর্বশেষ চলতি মাসের ৩ তারিখ সকালে কথা হয়েছিল। তার মার শেষ কথা— ‘বেটা হামারে হালত বহুত খারাপ হায়, হামারে লিয়ে দোয়া করো আওয়ার নরমি এখতিয়ার কারো’। এর পর আর কথা হয়নি। সেদিনের পর থেকেই তিনি জানেন না, তার বাবা-মা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন।

জানা যায়, ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ার এক সপ্তাহ পূর্ব থেকেই অতিরিক্ত আর্মি এবং পুলিশ সেখানে মোতায়ন করতে থাকে। চলতি মাসের ৪ তারিখ রাত ১১টায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। পরদিন সকালে অর্থাৎ ৫ আগস্ট সমস্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়া হয়।

পরবর্তীতে সমস্ত লেন ফোনও বন্ধ করে দেয়া হয়। কাশ্মীরের সাথে যোগাযোগ করা যায় এমন কোনো মাধ্যম খোলা নেই। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন সপ্তাহে প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় আর্মি ও পুলিশ সেখানে পাঠানো হয়েছে। পৃথিবীকে দেখানোর জন্য স্কুলগুলো খোলা হলেও সেখানে মৃত্যু ভয়ে কেউ যায় না। আবার যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশও নাই।

আরেক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তার বাবা ডাক্তার হওয়ার সুবাদে কয়েকদিন পর পর বিমানবন্দরে গিয়ে বা হসপিটাল থেকে গোপনে কথা বলেন। তার মাও হাসপাতালে চাকরি করার সুবাদে হাসপাতাল থেকে কথা বলেন। এভাবেই প্রতিটি মুহূর্ত তাদের আতঙ্কের মধ্য দিয়ে কাটছে বলে জানিয়েছেন।

তবে, তাদের নাম প্রকাশ না করার জন্য তারা সার্বক্ষণিক অনুরোধ করছিলেন। তারা বলেন, আমাদের নাম প্রকাশ করা হলে অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে। তখন না আমরা বাংলাদেশে থাকতে পারবো, না নিজের বাবা-মার কাছে যেতে পারবো।

তবে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার জন্য এখন পাগলপারা বলেও তারা জানান। প্রতিনিয়তই যে যেভাবে পারে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পরও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের সৌরা এলাকায় একটি বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভটি হঠাৎই হিংসাত্মক হয়ে ওঠে।

বিক্ষোভকারীদের তরফ থেকে পাথর ছোড়া শুরু হলে নিরাপত্তা বাহিনী জবাবে ছররা গুলি আর কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়েছে বলেও জানা গেছে। নামাজের পর স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান তোলে মুসল্লিরা। তারপর বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখানে প্রায় কয়েক হাজার মানুষ হাজির ছিলেন বলে জানা গেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত