শিরোনাম

নেতৃত্ব নিয়ে জাপায় সমঝোতা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০১:৫২, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদের জাতীয় পার্টি বরাবরই স্বার্থ উদ্ধারের দল। দলটিতে যেমন সহজেই মেলে কাঙ্ক্ষিত পদ, তেমনি বিরাগভাজন হলে হারাতে হয় পদ। মূলত বহুবার দলটি স্বার্থ আদায়ের রাজনীতির বলি হয়েছে।

এবারো স্বার্থ পূরণ করে বড় ধরনের ধকল কাটিয়ে উঠতে যাচ্ছে। চেয়ার সমঝোতায় ‘ঐক্যে’ ফিরতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি।

সমঝোতা অনুযায়ী- দলের চেয়ারম্যানের পদ ধরে রাখতে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদ এবং রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে পুত্র রাহাগির আল মাহি সাদকে জাপার দলীয় প্রার্থী মানছেন জিএম কাদের ও অনুসারীরা।

জাপা মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা ও সরকারি দলের শীর্ষ দুই কর্তা-ব্যক্তির মধ্যস্থতায় এ সমঝোতার বীজ বপন হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তবে এ ঐক্য কতদিন স্থায়ী হবে- তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে শঙ্কা রয়েছে। এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টিতে রওশন এবং কাদের দুজনই শক্তিশালী। এরশাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে উত্থান-পতনে সবসময় পাশে ছিলেন তার স্ত্রী রওশন এরশাদ।

দলে এবং বাইরে রয়েছে তার শক্ত অবস্থান। বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও ভাইয়ের বদৌলতে দলে ও বাইরে শক্তিশালী।

বিগত সময়ে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এরশাদের জীবদ্দশায়ই জাতীয় পার্টিতে বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং এরশাদের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ দুটি বলয় সৃষ্টি হয়। এরশাদের মৃত্যুর পর দুটি বলয়ের দূরত্ব বাড়তে থাকে।

গত দুই সপ্তাহ ধরে সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেতা এবং রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে জাতীয় পার্টিজুড়ে দুটি বলয়ের প্রকাশ্যে বিরোধ চলে আসে। সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেতা ইস্যুতে মুখোমুখি হয়ে উঠেন জিএম কাদের এবং রওশন এরশাদ।

দুজনকেই সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে পেতে স্পিকারকে পৃথক দুটি চিঠি দিয়েছেন দলটির সংসদ সদস্যরা। বিরোধের জের ধরে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদের নাম ঘোষণা করে তার অনুসারীরা।

যার মধ্যে দিয়ে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত হয়। শেষ পর্যন্ত গত শনিবার তৃতীয় পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে আপাতত ঐক্যে ফিরেছে দলটি।

বিশ্লেষকরা বলছেন- জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভাগ-বাটোয়ারার দল হিসেবে পরিচিত। দলটিতে যারা আছেন- তারা সবাই ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে তৎপর থাকেন। আবার কেউ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেই দলের বিরুদ্ধে বিষোদগারসহ দলকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেন।

জাপা সূত্র মতে, দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতিতে বলির শিকার হয়েছে দলটি। দলটির ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে জিএম কাদের এবং রওশন এরশাদের দুটি বলয়েই ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন।

নিজেদের কাঙ্ক্ষিত চেয়ার পাওয়ার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে জিএম কাদেরকে সমঝোতায় আনতে তৃতীয় পক্ষের চাপ রয়েছে। যদিও তৃতীয় পক্ষের বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

গতকাল রোববার দুপুরে বনানী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা জানান, দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার নিয়ে তারা একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। এ কমিটি গঠনে জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ দুজনেরই সম্মতি ছিল।
কমিটি শনিবার রাতে একটি বৈঠক করে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করবেন রওশন এরশাদ। এছাড়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের দায়িত্ব পালন করবেন।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জাপা মহাসচিব বলেন, জাপার দুটি অংশই আমাকে মহাসচিব হিসেবে চেয়েছিল। আর দলের সংকটে আমি সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। আশা করছি দলের ভাঙন রক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের সমস্যাও মিটে যাবে। দল যে ভাঙনের দিকে যাচ্ছিল তা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে এটা বলতে পারি।

এদিকে, সমঝোতার পর গতকালই জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কার্যালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।

স্পিকারের কার্যালয় থেকে বিরোধী দলীয় নেতার স্বীকৃতি পাওয়ার পর রওশন এরশাদ নিজেই উপনেতা ঠিক করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে পার্লামেন্টারি বোর্ডের মিটিংয়ে।

এ বিষয়ে রাঙ্গা বলেন, সংসদীয় বোর্ডের ২৫ সদস্যের মধ্যে ২৪ জনই রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা মেনে সংশ্লিষ্ট নথিতে সই করেছেন। একজন সদস্য দেশের বাইরে থাকায় নথিতে সই করতে পারেননি।

তবে রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তিনিও মেনে নিয়েছেন। সে হিসেবে তিনি সর্বসম্মতিক্রমেই বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। প্রায় একই সময়ে জিএম কাদের ফের স্পিকারকে চিঠি দিয়ে, তার আগের চিঠি আমলে না নেয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন বলে জানা গেছে।

এছাড়া রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনেও সমঝোতায় পৌঁছেছে দুটি পক্ষ। ওই আসনে এরশাদপুত্র রাহগীর আল মাহী সাদ ওরফে সাদ এরশাদকেই জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

গতকাল বিকাল ৩টার দিকে জাতীয় পার্টির সংসদীয় বোর্ডের সভা শেষে মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, বৈঠকে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর-৩ উপনির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সাদ এরশাদের নাম ঘোষণা করেছেন। বাকিরা কেউ বিরোধিতা করেননি। ফলে সাদের মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে।

গত এক দশক ধরে এরশাদের জাতীয় পার্টিজুড়ে বিভেদ চলছে। গত ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর পর বিভক্ত আরও প্রকট আকার ধারণ করতে শুরু করে।

গত ৪ এপ্রিল সহোদর জিএম কাদেরকে জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান পুনর্বহাল করেন জাপার চেয়ারম্যান এরশাদ। শুরু থেকেই জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে মানতে অস্বীকার করে আসছেন রওশনপন্থিরা।

মৃত্যুর সময় দলের চেয়ারম্যান ইস্যুতে চরম অস্থিরতার মধ্যে রেখে যান এরশাদ। এরশাদ তার অবর্তমানে বিরোধী দলীয় নেতার পদে কারো নাম বলে যাননি।

ফলে এরশাদের মৃত্যুর পর কেবল দলের চেয়ারম্যান পদই নয়, বিরোধী দলীয় নেতার পদ নিয়েও রওশন ও কাদেরের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।

এরশাদ পত্নী ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ একদিকে নিজে বিরোধী দলীয় নেতা এবং অন্যদিকে, পুত্র রাহাগির আল মাহি সাদকে রংপুর-৩ আসনের জাপার দলীয় প্রার্থী হিসেবে চান।

অন্যদিকে, জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরও নিজে বিরোধী দলীয় নেতা এবং রংপুর-৩ আসনের জাপার দলীয় প্রার্থী হিসেবে চান বিশ্বস্ত এক স্থানীয় নেতাকে। দুটি গ্রুপই নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল। অবশেষে সমঝোতায় সেখান থেকে ঐক্যে এসেছে জাতীয় পার্টি।

জাতীয় পার্টির এক প্রেসিডিয়াম সদস্য আমার সংবাদকে বলেন, সমঝোতা হয়েছে, এটাই বড় কথা। কারা সমঝোতা করলো, সেটা সবাই জানেন। এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব না।

প্রসঙ্গত, সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তিসহ রাষ্ট্রের সব ধরনের ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পায় জাতীয় পার্টি। বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখলের পর ৮০’র দশকে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সদ্য প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

প্রতিষ্ঠালগ্নে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ আরও কয়েকটি দলে ভাঙন ধরান এরশাদ।

মন্ত্রিসভার সদস্য করাসহ নানা প্রভোলনে রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাগিয়ে নেন তিনি। তবে নিজ জাতীয় পার্টির ভাঙন ঠেকাতে পারেননি এরশাদ।

তবে খুব বেশি দিন জাতীয় পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেননি এরশাদ। এরশাদের জীবনদ্দশায় পাঁচবার ভাঙনের কবলে পড়ে দলটি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত