শিরোনাম

পুরনো ঋণে বিপর্যস্ত পদ্মা ব্যাংক

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী  |  ০২:১৮, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

ঋণ কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বিতর্কিত ফারমার্স ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে ‘পদ্মা ব্যাংক’ করার পরও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

বরং ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের অর্থবছরের চেয়ে দুই হাজার কোটি টাকার ওপরে বেড়েছে। বেড়েছে আদায় অযোগ্য কুঋণের পরিমাণও।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের অভ্যাস এবং ঋণ অবলোপন করার প্রবণতা বেড়েছে। এতে ব্যাংক খাতে চাপ সৃষ্টি করছে। ঢালাওভাবে ঋণ পুনঃতফসিল করার কারণে সার্বিক ব্যাংক খাতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। যার প্রভাব থেকে বের হতে পারেনি পদ্মা ব্যাংকও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির শীর্ষে রয়েছে এবি ব্যাংক। এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক বছরে বেড়েছে পাঁচ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবির পরেই অর্থাৎ দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে পদ্মা (সাবেক ফারমার্স) ব্যাংক। ২০১৮ সালের জুন মাসে পদ্মা (ফারমার্স) ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিলো এক হাজার ৫২১ কোটি টাকা।

২০১৯ সালের জুন মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৬১১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক বছরে পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে দুই হাজার ৯০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহসান খসরু দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমরা নতুন করে কোনো ঋণ দেইনি। এটা আগে থেকেই ছিলো।

আমাদের ফাংশনাল অডিট যখন শেষ হলো, তখন অ্যাকচুয়াল হেলথ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা আমারা ফাইন্ডআউট করেছি। এখন এগুলো রিকভারি করার কাজ চলছে।

অনেক ঋণ রিসিডিউলিংয়ে আসছে দুই শতাংশ পেমেন্টে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে গত ৩০ জুনের ভিত্তিতে।

এ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক নাম ধারণকারী সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ১০০ টাকায় ৬৬ টাকা। এর মধ্যে সাড়ে ৫৩ টাকাই আদায় অযোগ্য, অর্থাৎ কুঋণ।

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মোট পাঁচ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে তিন হাজার ৬১১ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে তারা নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছেন উল্লেখ করে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহসান খসরু বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে থার্ড পার্টির মাধ্যমে কাজ চলছে।

সেই সঙ্গে লিগ্যালি আউটসোর্স করা হচ্ছে। এই আউটসোর্সের টিম ক্লায়েন্ট চিনে নয়, তারা ডকুমেন্টস নিয়ে কাজ করে। লিগ্যাল আর রিকভারি একসাথে পাশাপাশি এগোচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এ বছর আমরা প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো ঋণ রিসিডিউল করেছি। ক্যাশ রিকভারি আছে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা। আমাদের ডিপোজিটও বাড়ছে। আমরা কাস্টমার পেমেন্ট পেয়েছি প্রায় তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা।’

বেসরকারি খাতের এ ব্যাংকটি বাঁচাতে সরকারের উদ্যোগে মালিকানায় যুক্ত হয়েছে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।

তবে পরিস্থিতির এখনো তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে এহসান খসরু বলেন, ‘আমাদের সরকারি ডিপোজিট এসছে মাত্র ৭১৫ কোটি টাকা।

এখন আমাদের তিন-চারশ কোটি টাকা ব্যালেন্স থাকে। সিআরআর মেনটেইন করি, যেটা এখানে আগে ছিলো না। কোনো ক্লায়েন্ট ফেরত যাচ্ছে না। সবাইকেই শতভাগ পেমেন্ট করছি। ৩৪৫ কোটি টাকার মতো সরকারি সংস্থাগুলোকেও পেমেন্ট করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, খেলাপি ঋণের সর্বশেষ যে তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানা গেছে, এক কথায় তা ভয়াবহ। এতে সার্বিক ব্যাংক খাতের দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি এবারই প্রথম বেসরকারি ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর ফারমার্স (পদ্মা) ব্যাংকের বিরুদ্ধে তো অনেক আগে থেকেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিলো।

সেগুলো তারা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার সঙ্গে নতুন করে হয়তো আরও যুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে মূলধন যোগান দেয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়া তাদের জন্য অশনি সংকেত বলেই মনে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের ব্যাংকিং খাত যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে পুরো অর্থনীতিকে এর খেসারত দিতে হবে।’

চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি থেকে তফসিলি ব্যাংকগুলোর তালিকায় দি ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ বিষয়ে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে।

২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া নতুন ৯ ব্যাংকের একটি ফারমার্স (পদ্মা) ব্যাংক। কিন্তু চার বছর না পেরোতেই চরম সংকটে পড়ে ব্যাংকটি।

পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় একপর্যায়ে পদ ছাড়তে বাধ্য হন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংকটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীমকেও অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত