কর্তৃত্ব কমছে শোভন-রাব্বানীর

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম  |  ০২:২৮, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

আপাতত ভাঙছে না ছাত্রলীগের কেন্দ্র্রীয় কমিটি। সরকারের ইমেজ রক্ষায় কমিটি না ভাঙার পক্ষে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। যে কারণে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও আপাতত পার পেয়ে যাচ্ছেন ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী।

তবে আগের মতো তাদের কর্তৃত্ব থাকছে না ছাত্রলীগে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মতো নিজস্ব একটি সেল ও কয়েকজন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড সর্বক্ষণিক মনিটরিং করবেন। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র আমার সংবাদকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেন।

গত কয়েক মাস ধরে ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীর উদ্ধত আচরণ নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন সিনিয়র নেতারা।

সর্বশেষ দলের স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডেও এক সভায় তাদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধান, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার একপর্যায়ে বিরক্তি প্রকাশ করে ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার জন্য সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ দেন তিনি।

যদিও বৈঠকের পর একাধিক সদস্য নিশ্চিত করেন- ক্ষোভ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিষয়টি বাস্তবে কার্যকর না-ও হতে পারে। সভা শেষ না হতেই এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও গণমাধ্যমে। মুহূর্তের মধ্যে খবরটি সারা দেশের ছড়িয়ে পড়ে।

সূত্র মতে, ঐ বৈঠকে ছাত্রলীগের বিষয়টি ওঠার পর উপস্থিত অধিকাংশ নেতাই শোভন-রাব্বানীর কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ তোলেন। বিশেষ করে- সিনিয়র নেতাদের অবজ্ঞা করা, নির্দেশনা না মানা। বিভিন্ন ইস্যুতে অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ তোলা হয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে বলেন, মনোনয়নে বোর্ডের মিটিংয়ে এ ধরনের (ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার) কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ওখানে ইনসাইডে আমরা অনেক কথাই বলতে পারি, অনেক আলোচনাই করতে পারি। তিনি বলেন, এখানে কোনো কোনো প্রসঙ্গে ক্ষোভের প্রকাশও হতে পারে বা কারো কারো রিঅ্যাকশনও আসতে পারে।

কিন্তু অ্যাজ এ জেনারেল সেক্রেটারি অব দ্য পার্টি আমার এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা এ মুহূর্তে ঠিক হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না এটা ইমপ্লিমেন্টশন প্রসেসে যায়। এখানে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে পারে, প্রতিক্রিয়া হতে পারে কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত আকারে কিছু হয়নি।

ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ কিনা— এমন প্রশ্নে কাদের বলেন, কিছু কিছু ব্যাপারে তো থাকতেই পারে। যেমন- আমাদের ইলেকশনে যারা বিদ্রোহী ছিল, আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে, নেতাদের মধ্যে- এসব ব্যাপারে তো ক্ষোভ প্রকাশ হয়।

কাজেই ছাত্রলীগেরও বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু কিছু ব্যাপার আছে, সেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কনসার্ন থাকতেই পারেন, এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে কোনো স্পেসিফিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমি জানি না, কারণ ওই ফোরামে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার বিষয় আসেনি।

শোভন-রাব্বানীকে ঘিরে যত অভিযোগ
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময় শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। যা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নিয়ে অনেক সময় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তাদের দুপুরের আগে ঘুম থেকে না ওঠা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে পৌঁছার পর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের অনুষ্ঠানে যাওয়া এবং সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদকে প্রধান অতিথি করে আয়োজন করা ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে একই ধরনের অপর একটি ঘটনা।

এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের সম্মেলনের দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও কমিটি দিতে না পারা, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি করার বিষয়ে অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ আসা, কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনেক বিতর্কিত, বিবাহিত ও জামায়াত-বিএনপি সংশ্লিষ্টদের পদায়নসহ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর বিতর্কিত নেতাদের সংখ্যা উল্লেখ করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পরও তারা কারা সেটা স্পষ্ট না করা ও পরে বাদ দেওয়ার ঘোষণা কার্যকর না করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।

শুধু তাই নয়, সভাপতি-সম্পাদক আত্মীকরণ রাজনীতি, নেতাকর্মীদের ফোন রিসিভ না করা।

এছাড়াও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাকর্মীদের ফোন রিসিভ না করাসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের অধিকাংশ গত শনিবার রাতে বৈঠকে উঠে আসে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এছাড়া ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নিজস্ব সিন্ডিকেট ম্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রায় ৬৭ হাজার সদস্যের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারও তার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।

যেখানে নেই সভাপতি শোভনের কোনো রকম সরব উপস্থিতি। ওই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের এডমিন প্যানেলের সবাই আবার রাব্বানির ম্যান। যে এডমিন প্যানেলে শোভনের কেউ নেই। যা স্পষ্ট ইংগিত দিচ্ছে কতটা শক্তিশালী গোলাম রাব্বানীর সিন্ডিকেট।

তার সিন্ডিকেট এখন এতটাই শক্তিশালী যে, বিতর্কিতদেরও কমিটিতে রাখতে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যে কারণে বিবাহিত হয়েও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন অনেকে।

ছাত্রলীগের নেতৃত্বের ?বিরুদ্ধে পোস্টার ছাপানোর ধরন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। গত আগস্টে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে কুরআন খতম ও দোয়া মাহফিলের আয়োজনের পোস্টারটিতে কোথাও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ব্যবহার করা হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক সমালোচিত হয়। অনেকে সেজন্য ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনকে ‘ইসলামী ছাত্রলীগ’ বলে আখ্যায়িত করেন। এ ঘটনার পর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কিছুই জানেন না বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।

দুই সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণার প্রায় ১০ মাস পর গত ১৩ মে ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যসের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক। ঘোষিত ওই কমিটিতে স্থান পান বেশকিছু বিতর্কিত নেতা।

এরপর ঘোষিত কমিটির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে ছাত্রলীগের ত্যাগী ও পদবঞ্চিতরা। কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন পদবঞ্চিতরা।

সেসময় তারা অভিযোগ তোলেন— মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের ছেলে, সাবেক চাকরিজীবী, বিবাহিত, অছাত্র, গঠনতন্ত্রের অধিক বয়স্ক, বিভিন্ন মামলার আসামি, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে আজীবন ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃতসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছে। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে মারপিটের শিকার হন পদবঞ্চিতরা।

যদিও আওয়ামী লীগের হাই-কমান্ডের চাপে তারা তাদের আন্দোলন স্থগিত করেছিলেন। ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ডে তখনো ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকে ডেকে নিয়ে কমিটি থেকে ‘বিতর্কিতদের’ বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

দলীয় সভানেত্রীর এমন নির্দেশ পাওয়ার পর সেদিন মধ্যরাতে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ‘বিতর্কিতদের’ বহিষ্কারে ২৪ ঘণ্টা সময় নেন ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক। বেধে দেওয়া ওই সময় নিয়েও ব্যর্থ হয় সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতা। যদিও তারা দুজনে বিতর্কিত ১৭ নেতা চিহ্নিত করেছিলো।

আজো সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ছাত্রলীগের কেদ্রীয় কমিটিতে স্থান না পেয়ে এক ছাত্রলীগের নেত্রী ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন— শোভন ভাইকে ফোন দিলাম।

ভাইকে বললাম, ভাই আমাকে কেনো কমিটিতে রাখা হলো না? ভাই আমাকে বললেন, তোকে অনেক রাখার চেষ্টা করেছি।

কিন্তু রাব্বানীর জন্য তোকে রাখতে পারিনি। রাব্বানী তোর ওপর ব্যক্তিগত ক্ষোভ আছে। সেসময় স্ট্যাটাসটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাত্রলীগের নেতৃত্বকে বিতর্কের দিকে ঠেলে দেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম আমার সংবাদকে বলেন, ছাত্রলীগ নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। দলীয় সভানেত্রী হিসাবে তিনি তো সব সময়ই সংগঠনের নেতাকর্মীদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

কীভাবে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা যাবে, কীভাবে নেতাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করবে, কীভাবে তৃণমূলকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে পারবে। ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন সে কথাটা ঠিক নয়।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মে সম্মেলনের এক বছরের মাথায় ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর সংগঠনটির ভেতর থেকেই নানা সমালোচনা চলছিল। ২০১৮ সালের ১২ ও ১৩ মে সম্মেলনে কমিটি করতে ব্যর্থ হয় ছাত্রলীগ।

পরে একই বছরের ৩১ জুলাই সম্মেলনের দুমাস পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম আওয়ামী লীগ সভাপতি চূড়ান্ত করার পর তার ঘোষণা দেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।