হয়রানির আরেক নাম শাহজালাল বিমানবন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০০:১৭, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

রক্ষকই ভক্ষক— এমন উক্তি হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেখানে দেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনদের বহির্বিশ্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে আইনের যথার্থতার ভিত্তিতে সেবা প্রদান করার কথা, সেখানে উল্টো ঘাটে ঘাটে হয়রানি করা হচ্ছে যাত্রীদের।

বিমানবন্দরে সুন্দর ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা যাদের দায়িত্ব তারাই যাত্রী হয়রানির নায়কের ভূমিকায়। অসংখ্য অভিযোগ, মন্ত্রিপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিভিল এভিয়েশনের কড়া তদারকি, প্রশাসনিক নজরদারিসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নানামুখী তৎপরতায়ও রোধ করা যাচ্ছে না বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি।

শাহজালালে প্রবেশপথের মোড় থেকেই শুরু হয় যাত্রী হয়রানি, চলে বিমানবন্দরের কনকর্স হল, মূল ভবন, ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমস পোস্ট পর্যন্ত। বিমানবন্দরের ঘাটে ঘাটে যেন হয়রানির মহোৎসবে মেতেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ, বিমানবন্দর পুলিশ, কাস্টমস, এপিবিএন পুলিশ ও সিভিল টিমসহ বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অন্যসব সংস্থার সদস্যরা।

আন্তর্জাতিক এ বিমানবন্দরের ভেতরে-বাইরে একই চিত্র। এ বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে অন্তত ১০টি ধাপে যাত্রীদের কাছ থেকে চাহিদামাফিক টাকা হাতানোর ধান্দায় চলে যাত্রী হয়রানি। বাইরেও থেমে নেই হয়রানি-ভোগান্তির এ প্রক্রিয়া। যাত্রীসেবায় নিয়োজিত কাস্টমস, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, বিমানবন্দর অর্থাৎ পুলিশ ও বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরতদের একটা বড় অংশই নিয়মিত যাত্রী হয়রানি করছে। এরমাঝে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস নিয়েই ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। বিদেশফেরত যাত্রীরা ভেতরে-বাইরে দুই পর্বে ১২-১৩টি ধাপে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও জানা যায়।

এছাড়াও কাস্টমস হলরুম থেকে বের হওয়ার পর ট্যাক্সিচালক, দালাল, ভুয়া সাংবাদিক, ভুয়া গোয়েন্দা ও ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের খপ্পরে পড়েও নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে যাত্রীদের। তারা বিদেশ গমনের সময় বহির্গমন লাউঞ্জের প্রবেশমুখে কর্তব্যরত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর খপ্পরেও পড়েন।

সেখানে পাসপোর্ট, টিকিট ইত্যাদি চেক করার সময় জানানো হয়— যাত্রীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা রিপোর্ট। কাজেই তাকে দেশ ছেড়ে যেতে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। বিমানে ওঠার চূড়ান্ত মুহূর্তেই এমন অভিযোগের কথা শুনে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় যাত্রীদের।

দিশাহারা যাত্রীরা কাকুতি-মিনতি করেও তাদের মন জয় করতে পারেন না। এসব অভিযোগ নতুন কিছুই নয়। দীর্ঘদিন থেকে উঠে আসা এসব অভিযোগের মাত্রা দিনের পর দিন বাড়ছেই। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব নিয়ে ভ্রুক্ষেপই করছে না।

সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে আর্মড পুলিশের দায়িত্ব বহির্গমন, পার্কিং লট, ক্যানোপি, কনকর্স হল, আগমনী কনভেয়ার বেল্ট, টারমাক, রানওয়ে, ড্রাইওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ অধিকাংশ সময়ই তারা ব্যস্ত থাকছে আগমনী আর কার পার্কিং এলাকায় যাত্রীদের মালামাল তল্লাশির কাজে। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা বিমানবন্দরে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে গাড়িতে ওঠার পরই তাদের (আর্মড পুলিশ) তল্লাশির মুখোমুখি হন। নানা প্রশ্নে বিব্রত করেই ক্ষান্ত নয় তারা বরং টেনোহিঁচড়ে পুনরায় বিমানবন্দরের ভেতরে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এপিবিএন পুলিশ ও সিভিল টিম সদস্যরা শাহজালালে বহির্গমন যাত্রীদের ভিসা, পাসপোর্ট, টিকিট চেকিংয়ের নামে এসব হয়রানি করেই চলেছে বলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করছে ভুক্তভোগী যাত্রীরা। কার্যত এ দায়িত্ব ইমিগ্রেশন পুলিশের হলেও তাদের থোরাই কেয়ার করছে এপিবিএন পুলিশ। বরং পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট চেকিংয়ের নামে এয়ারলাইন্স কাউন্টারের লাইনে দাঁড়ানো যাত্রীদের ডেকে নিয়েও হয়রানি করছে তারা।

যাত্রীদের নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে অবৈধ ফায়দা চায়, না দিতে পারলে ফ্লাইট অফলোডের ধকলে ফেলছে। এতে নানা কাঠখড় পুড়িয়ে কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশগামী যাত্রীর ফ্লাইট অফলোডের ঘটনায় তাদের ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স থেকে তারা টিকিটের টাকাও রিটার্ন পাচ্ছেন না।

এদিকে যাত্রীদের লাগেজ প্রদানের ক্ষেত্রে সময় ক্ষেপণ, অসৌজন্যমূলক আচরণ, হুমকি-ধমকিতে যাত্রীদের আতঙ্কিত করে তোলাসহ নানারকম ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা-পয়সা, মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু বিমান কর্মচারীরা।

তবে শাহজালালে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ও নাজেহালের শিকার হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে কর্মরত বাংলাদেশিরা। ইমিগ্রেশন বিভাগে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা এসব প্রবাসী কর্মজীবীর সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক এ বিমানবন্দরে বাইরের তুলনায় ভেতরেই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের। যাত্রীসেবায় নিয়োজিত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, বিমানবন্দর পুলিশ, কাস্টমস ছাড়াও কেবিন ক্রুসহ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরতরা সংঘবদ্ধভাবে যাত্রীদের হয়রানি করছে।

বিমানবন্দরের ভেতর ব্যাংকের বুথে মুদ্রা সংগ্রহ করতে গিয়েও হয়রানির শিকার হন যাত্রীরা। মুদ্রা সংগ্রহে গেলে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রা নেই। বাধ্য হয়েই ব্যাংকের আশপাশে অবস্থানকারী অবৈধ মুদ্রা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দেশের মুদ্রা মাত্রাতিরিক্ত দামে সংগ্রহ করতে হয়।

এছাড়া বিমানবন্দরে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের দক্ষতার অভাবেও হয়রানি হতে হচ্ছে যাত্রীদের। এই বিমানবন্দরের সব বিভাগে আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হলেও কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নন। যথেষ্ট দক্ষও নন। ধীরগতিতে কোনোরকম কাজ চালিয়ে নেন মাত্র।

এতে যাত্রীদের প্রতিক্ষার প্রহর হয় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। মেশিন রিডেবল পাসপোর্টসহ অন্যসব কাগজপত্র পরীক্ষায়ও সময় ক্ষেপণ করা হয়। যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বিমানবন্দরে একেকজন যাত্রীর সব কাগজপত্র পরীক্ষা করতে সময় লাগে পাঁচ-সাত মিনিট।

সেখানে এ বন্দরে একেকজন যাত্রীকে অপেক্ষা করতে হয় ২০-২৫ মিনিট। অদক্ষকর্মী দিয়ে কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থাপনা চালাতে গিয়ে ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র শেষ করতে বেশিরভাগ সময়ই ফ্লাইট বিলম্বিত হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

হয়রানির সবচেয়ে অসহ্য ধাপ হচ্ছে লাগেজ সংগ্রহ। যাত্রীদের লাগেজ থেকে যেন মধু আহরণ করা হয়। বেল্টের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে মধু আহরণ শেষে লাগেজ ফেরত দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যাত্রীরাদের বেল্টের জন্য অপেক্ষা করিয়ে সেসময়ই সংঘবদ্ধ চক্র লাগেজ কেটে সরিয়ে নিচ্ছে ভেতরে থাকা মালামাল। অধিকাংশ সময় লাগেজই হাওয়া হয়ে যায়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে।

এছাড়া লাগেজ আসেনি, পরবর্তী ফ্লাইটে আসবে— এসব কথা বলে চিরকুটে দায়িত্বরত কর্মকর্তার মোবাইল ফোন নম্বর লিখে দিয়েই যাত্রীকে বিদায় করা হয়। মূলত এরপরই শুরু হয় হয়রানির নানা ধাপ। কয়েক দফা বিমানবন্দরে ঘোরাঘুরি করানোর একপর্যায় টাকা লেনদেনের বিনিময়ে লাগেজ ফেরত পেতে হচ্ছে।

সম্প্রতি দুবাই থেকে আগত সোহেল রানা নামের একযাত্রী বলেন, লাগেজ পাওয়ার পর দেখা যায় অনেক জিনিসপত্রই থাকে না। আবার যা থাকে তার বেশিরভাগই তাদের অযত্মের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া অনেকসময় যাত্রীর সামেনও লাগেজ ছুড়ে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায় ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও সাহস পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। কর্মকর্তাদের কাছে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো ভুক্তভোগীকেই ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। হাত তোলা হয় গায়েও।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মেহবুব বলেন, আমরা প্রতিমাসেই এসব অভিযোগগুলো কম্পাইল করে বিমানবন্দরে যাত্রীসেবায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিটিং করি। সেখানে তাদের কাছে এসব ঘটনার কারণ জানতে চাওয়া হয়।

লাগেজের বিষয়ে তিনি বলেন, এ অভিযোগ বর্তমান সময়ে অনেকটাই কমে এসেছে। তারপরও প্রতিদিন ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন তার মধ্যে দু-একটা এরকম ঘটনা ঘটতেও পারে। তবে আমাদের অনুরোধ থাকবে এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলে মোবাইলে ফোন করে, মেসেজের মাধ্যমে, সরাসরি লিখিত বা মৌখিকভাবে আমাদের জানান। তাহলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এছাড়া বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশে অভিযোগ বক্স রয়েছে, সেখানেও অভিযোগ লিখে জমা দিতে পারেন। আমরা এসব অভিযোগ সবসময়ই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করি।

ইমিগ্রেশন পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়গুলো শুনেছি, তবে কেউই অভিযোগ করছেন না। বিগত তিন মাস ধরে এসব অভিযোগের বিষয়ে শুনেই যাচ্ছি।

কোনো ভুক্তভোগী যদি এসব বিষয়ে অভিযোগ করেন তাহলে আমরা তা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে জানাবো এবং তাদের মাধ্যমে ব্যবস্থাও গ্রহণ করবো। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলেও আমরা তাদের কাছে কারণ জানতে চাইবো, যথাযথ উত্তর না পেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে জানাবো।