শিরোনাম

এক যুগেও পোকা ধরেনি ধানে!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |  ০৬:২৪, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। তবুও নেতাকর্মীরা দল ছেড়ে চলে যায়নি, খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে এই দুঃসময়ে দলে ভাঙন তৈরি হয়নি, সাময়িক দুঃসময়েও ধানে পোকা ধরেনি; যৌথভাবে বিএনপির নেতৃত্বে দল-জোটের সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন বলে দাবি করেছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।

আমার সংবাদের মুখোমুখি হয়ে দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপির মিটিং-মিছিলে এখন আর কাউকে ভাড়া করে আনতে হয় না, সবাই নিজ উদ্যোগে চলে আসে। কূটনীতিকরা জাতীয় স্বার্থে বিএনপির সঙ্গে এখন নিয়মিত বসছেন। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চাচ্ছেন। হরতাল-অবরোধের মতো জনদুর্ভোগের কর্মসূচি পালন না করায় বিএনপিকে শুভদিনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সমপ্রতি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র্যালিতে লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতির মাধ্যমে দলের ভেতরে থাকা ঘুমোট চিন্তা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে ধাক্কা দেয়ার মতো কর্মসূচি দিয়ে আগামী দিনের রাজক্ষমতায় যাওয়ার কথাও ভাবছেন তারা। তৃণমূলের বড় অংশ যেহেতু আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির চিন্তা করছেন, শেষ সময়ে এসে এই পথই এখন খোলা দলের হাতে।

তবে কূটনৈতিক সমঝোতায়, ড. কামালকে হাতে রেখেই সবকিছু করবে দলটি। নানা সমালোচনার মধ্যেও ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রবকে নিয়েই হাঁটবেন। আর কৌশলে দলের ভিত্তি মজবুত করবেন। সেই সঙ্গে সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনার পদ্ধতি এখনই নির্ধারণ করতে সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে পরামর্শ রয়েছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তিতে কর্মসূচি, দল পুনর্গঠন এবং সব নির্বাচনে অংশ নিয়েই নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রেখে রাজপথে টিকে থেকে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে গতকাল একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ও ১২ সেপ্টেম্বর সারা দেশে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে।

এছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর সিলেট, ২৬ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ ও ২৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে সমাবেশ করবে। বিএনপির ভাষ্য, মিথ্যা মামলা দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রেখে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। রাজনীতির প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতেই এটা করা হচ্ছে।

তাই বিএনপিও সরকারের হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করতে কার্যত পদক্ষেপ নিচ্ছে। রাজপথে সকল নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে প্রতি মাসেই ঘোষণা থাকবে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া। চলতি মাসেই নির্বাচনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হবে ছাত্রদলের কমিটি। খালেদা জিয়ার মুক্তিতে ছাত্রদলের ভূমিকা কী থাকবে তার একটা ছকও তৈরি করেছে দলীয় হাইকমান্ড।

সময়ের আলোকেই তা বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে কৌশলগতভাবে ক্ষমতাসীনদের অধীনে সকল নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করা হবে। আগামী ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য আটটি উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে।

সমপ্রতি ক্ষমতাসীন দলে বিভক্তির সুর ও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ভোটের ঘুঁটি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের মধ্যে দেবর-ভাবির যে অমিল প্রকাশ পেয়েছে তাতে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত বলেই মনে করছেন অনেকে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত ও দলীয় শৃঙ্খলা তৈরিতে হোঁচট খেতে হচ্ছে।

সে তুলনায় বিএনপি অসময় থেকেও ভালো রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে বিএনপির সূত্রগুলো থেকে। একদল ক্ষমতায় থেকেও নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলায় আনতে পারছে না, চলমান ছাত্রলীগের কমিটির কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ থেকে শুরু করে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের জবাবদিহিতাসহ সর্বস্তরে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।

আরেক দল এক নেতার মৃত্যুতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেই তুলনায় বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান নির্বাসিত থাকা অবস্থায়ও এ দল এখনো অনেক মজবুত আছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি নেতানেত্রীর দল নয়, সংকট সময়ে বিপ্লবের দল। সাময়িক সংকট মোকাবিলা করে ঘাড় উঁচু করতে পারলেই এ দলের জন্য সুসময় অপেক্ষা করছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমার সংবাদকে এ বিষয়ে বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি ক্ষমতায় নেই, তবুও এ দীর্ঘ সময়ে কেউ বিএনপিকে ছেড়ে চলে যায়নি, দলে কোনো ভাঙনও তৈরি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশনেত্রী, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন অন্যায়ভাবে কারাগারে রয়েছেন, তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমান এই সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দেশে আসতে পারছেন না।

দলের এই সংকট সময়েও সকল স্তরের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে ২০ দলের যে ঐক্য সেটিও মজবুত রয়েছে। সময়ের আলোকে বিএনপিসহ আরও কিছু দল নিয়ে যে ঐক্যফ্রন্ট তৈরি হয়েছে তাতেও কোনো সমস্যা নেই। এক সঙ্গে দলের, জোটের, ঐক্যফ্রন্টের সবাই এই সরকার থেকে জনগণকে মুক্তির জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছি।

অতীতে বিএনপির অনেক দুঃসময় গেছে, অনেক পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে কিন্তু দলের এই সংকট সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের যৌথ নেতৃত্বে সুশৃঙ্খল রয়েছে।

সংকট-দুঃসময় মোকাবিলায় বিএনপির সব নেতাকর্মী দলের অনুগত দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, বিএনপি অতীতের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে আছে।

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ওপর অন্যায়ভাবে আক্রোশ দৃশ্যমান হওয়ায় বিএনপিতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। দেশের জনগণ ও দলের নেতাকর্মীরা সবই বুঝেন। দলের দুঃসময়ে, সংকট মোকাবিলায় সব নেতাকর্মী বুদ্ধিদীপ্ত ও চৌকসের পরিচয় দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

আমির খসরু আরও বলেন, বিএনপি জনগণের রাজনীতি করে, জনগণের শক্তিতে বিএনপি বিশ্বাসী, তাই রাজনীতির এই দুঃসময়ে এই দলের প্রতি মানুষের আস্থাও অতীতের চেয়ে আরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি আরও দাবি করেন, বিএনপি অনেক শক্তিশালী দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার নানা ষড়যন্ত্র করে বিএনপির জনপ্রিয়তাকে মুছে ফেলতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। আশা করি পারবেও না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ বলেন, বিএনপি কোনো নেতানেত্রীর দল নয়, দেশের সংকট সময়ে বিপ্লবের দলের নামই হলো বিএনপি। সাধারণ মানুষের আস্থার দল, মানুষের অধিকার নিশ্চিতেই এ দলের প্রতিষ্ঠা।

দলটির সূচনা লগ্ন থেকে অনেক বড় বড় সংকট মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর এ সব কিছুই হয়েছে দলটির জনপ্রিয়তার কারণে। এ দেশের রাজনীতিতে কত দল কতভাবে ভেঙে শেষ হয়ে গেছে, এখনো আমরা দেখছি অনেক দল ভাঙছে কিন্তু দুঃসময়ে এই দলের (বিএনপি) যেমন সংকট হওয়ার কথা, বিভক্তি দেখা দেয়ার কথা, সেগুলোর কিছুই নেই। একটু দুঃসময় যাচ্ছে এই।

এখনো একটা মিটিং-মিছিলের ডাক দিলে হাজার হাজার, লাখ লাখ নেতাকর্মী রাস্তায় নেমে আসে। এ দলে খালেদা জিয়া যেমন অসম্ভব জনপ্রিয়, তেমনি নির্যাতিত নেতা তারেক রহমানও অসম্ভব জনপ্রিয়। দলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেন। দলের সাময়িক দুঃসময়ে যে সংকট যাচ্ছে সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চিন্তা করে তাহলে খুব শিগগিরই একটা বিপ্লব হয়ে যাবে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য।

বিএনপির দুঃসময় কাটতে পারে বলে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদকে বলেছেন, দলীয় প্রধানের মুক্তি দাবির পাশাপাশি সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে হবে বিএনপিকে। সে ক্ষেত্রে তারা অনেক পিছিয়ে। তাদের এটিও করা উচিত।

তাহলেই হয়তো বিএনপির দুঃসময় কাটতে পারে। বিএনপিকে জনগণের আস্থা অর্জনে বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন। তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে কারা দেশ পরিচালনা করবেন, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এ নেতৃত্বকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হতে হবে। একই সঙ্গে শ্যাডো ক্যাবিনেট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত