পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি

শিক্ষার্থীদের কাঠগড়ায় ঢাবি উপাচার্য-ডিন

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ  |  ০২:৫৩, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়াই শুধু উপাচার্য এবং ডিনের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি হয়েছেন ছাত্রলীগের ৩৪ সাবেক ও বর্তমান নেতা।

এমনকি তারা দ্বিতীয় সংসদখ্যাত ডাকসু এবং হল সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছেন। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সোচ্চার হয়ে উঠেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।

তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল দুজন কর্তাব্যক্তির এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড ঢাবিকে কলঙ্কিত করেছে। তাই উপাচার্যকে অপসারণ এবং অভিযুক্ত ডিনকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সাথে অনৈতিক কাজ করার জন্য তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

জানা যায়, গত মার্চে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কয়েকদিন পর ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের একটি বিভাগের সান্ধ্য প্রোগ্রামে ছাত্রলীগের ৩৪ সাবেক ও বর্তমান নেতাকে অবৈধভাবে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান চিরকুট লিখে এসব শিক্ষার্থীদের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ড. শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের কাছে পাঠান।

পরে কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই এসব শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান। এরপর ডাকসু ও হল সংসদে বেশ কয়েকজন নির্বাচন করেন। কেন্দ্রীয় সংসদে ৮ জন অংশ নিয়ে ৭ জন জয়ী হন এবং হল সংসদে দুইজন নির্বাচন করে একজন ভিপি পদে জয়ী হন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আরিফ ইবনে আলী, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী, ক্রীড়া সম্পাদক শাকিল আহমেদ তানভীর এবং সদস্য রাকিবুল হাসান, নজরুল ইসলাম, মুহা. মাহমুদুল হাসান ও নিপু ইসলাম নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনের চিরকুটে পরীক্ষা ছাড়াই ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের মাস্টার্স অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিলেন।

স্যার এএফ রহমান হল সংসদের ভিপি আবদুল আলিম খানও একইভাবে ওই প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিলেন। দীর্ঘ ২৮ বছর পর গত ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১১ ফেব্রুয়ারি ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ছাত্রলীগের ৩৪ জন সাবেক ও বর্তমান নেতা ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের মাস্টার্স অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে ভর্তি হন।

সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্স প্রোগ্রামের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথমে ভর্তির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে হবে। বিজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত আবেদনপত্রের মাধ্যমে ভর্তির জন্য আবেদন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে আবেদন করা যাবে। আবেদনকারীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। এসব পরীক্ষার ফল, আগের একাডেমিক ফল এবং কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে সমন্বিত ফল তৈরি করা হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে যৌথভাবে দুবছর মেয়াদি এই প্রোগ্রাম চালু হয় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি। ডাকসু নির্বাচনের আগে এই প্রোগ্রামের সর্বশেষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে। ৩

০ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ হয় জানুয়ারিতে। আর ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে এসব শিক্ষার্থী ভর্তি হন ১১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার পর। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ভর্তিপরীক্ষার সময় এই প্রোগ্রামের পরিচালক ছিলেন ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম।

তবে বিষয়টি নিয়ে এখনই কথা বলতে রাজি হননি ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম। গতকাল সোমবার আমার সংবাদকে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এ মুহূর্তে আমি কিছুই বলবো না। তবে আগামীকাল (আজ) সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবো।

এদিকে এ ঘটনায় উপাচার্যের অপসারণ এবং ডিনের পদত্যাগ দাবি করছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিলও করেছে তারা। গত রোববার ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে ‘চিরকুট ভিসি’ বলে অভিহিত করছে। ওই সমাবেশে দুটি বামপন্থি ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও অংশ নেন।

বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনের আগে একটি নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনের ৩৪ জনকে চিরকুটের মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ দিয়েছেন উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম।

এভাবে ভর্তির সুযোগ দিয়ে তারা নৈতিকভাবে স্খলিত হয়েছেন। আমরা উপাচার্যের পদত্যাগ ও ডিনের অপসারণ দাবি করছি। একইসঙ্গে অবৈধভাবে ভর্তি হয়ে ডাকসু ও হল সংসদে নির্বাচিতদের পদ শূন্য ঘোষণা করে পদগুলোতে পুননির্বাচনের দাবি করছি।

সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান বলেন, অবৈধভাবে যেসব অছাত্রকে ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থিতার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তাদের পদ শূন্য ঘোষণা করে পদগুলোতে উপনির্বাচন দিতে হবে। এছাড়া ডিনকে অপসারণ ও উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হবে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, গত মার্চে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগকে শুধু ভোটচুরির মাধ্যমে জেতানো হয়নি, কারচুপি করে তাদের ছাত্র করা হয়েছে। পরীক্ষা না নিয়েই তাদের ভর্তি করা হয়েছে।

চিরকুট নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয় পরীক্ষার মাধ্যমে। এ কারচুপির মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে, উপাচার্য ও ডিনের নৈতিক স্খলন ঘটছে। তাই অবিলম্বে উপাচার্য ও ডিনকে পদত্যাগ করতে হবে।

আহমেদ শরীফ নামের এক ছাত্র বলেন, শিক্ষিত মানুষ যে এমন অন্যায়ের সাথে জড়িত থাকতে পারে তা জানতে হলে এদের দেখতে হবে। শিক্ষকদের আমরা আদর্শ মানবো। অথচ তারা আমাদের চুরি শেখায়, অবৈধভাবে ছাত্র ভর্তি করা শেখায়। তারা শেখায় কীভাবে অনৈতিক কাজ করতে হয়।

ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এমন একজন ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। আর তদন্ত চলাকালীন তাদের অব্যাহতি দিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তি দিতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাবির একজন শিক্ষক বলেন, ডাকসু নির্বাচনের সময় প্রশাসনের অবস্থান ছিলো পক্ষপাতদুষ্ট। এমনকি ভোটের দিনও তাদের ভূমিকা ছিলো রহস্যাবৃত। এগুলো একরকম মেনেই নিয়েছে ছাত্ররা।

কিন্তু ঢাবির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে ছাত্র ভর্তি করা হবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো না। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার।

তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের সাথে। তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।