শিরোনাম

বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের ক্ষোভ

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ   |  ০৭:৫৬, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নীত করার দাবিতে গত দুই বছর আলাদাভাবে নানা কর্মসূচি পালন করেছেন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা। বিদ্যমান বেতন গ্রেড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ চলে আসছে তাদের মধ্যে।

শিক্ষকদের আন্দোলন এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম এবং সহকারীদের ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার আলোকে প্রস্তাব যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে।

কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় সে প্রস্তাব নাকচ করেছে। এতে আশাহত হয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাড়ে তিন লাখ শিক্ষক। অর্থমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মানতে পারছেন না তারা। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকেই।

তারা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড ও প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে বেতন দেয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। সরকার বারবার এ দাবি মেনে নেয়ারও আশ্বাস দিয়েছে। এখন এই দাবি নাকচ করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে অঙ্গীকার করেন।ক্ষমতা গ্রহণের পরও তিনি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন। সে ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের একটি সিদ্ধান্তে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একই সাথে শিক্ষকদের মানসিকভাবে কষ্ট দেয়া হচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে প্রাথমিক শিক্ষায়। তাই অতি দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

শিক্ষকরা বলছেন, দাবি আদায়ের জন্য বিভিন্ন সময় রাজপথে আন্দোলন করা হয়েছে। প্রয়োজনে আবারো মাঠে নেমে আন্দোলন করা হবে। এবার আন্দোলন শুরু হলে তা কঠোর কর্মসূচির মধ্য দিয়েই হবে বলে জানান শিক্ষকরা।

তবে মন্ত্রণালয় বলছে, প্রস্তাব নাকচ হওয়া মানেই বিষয়টি বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। এখনো আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

জানা যায়, প্রধান শিক্ষক পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির হলেও তারা বেতন পান ১১তম গ্রেডে। অথচ দ্বিতীয় শ্রেণির অন্য সব চাকরিজীবী দশম গ্রেডে বেতন পান। যে কারণে প্রধান শিক্ষকদের একাধিক সংগঠন দশম গ্রেডে বেতনের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৪তম গ্রেডে।

তবে প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৫তম গ্রেডে। বিদ্যমান ওই বেতম কাঠামো অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক বলে দাবি করে আসছিলেন শিক্ষকরা। এর জন্য অনশনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন তারা।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই আদেশ জারির পর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি।

সংগঠনটির মুখপাত্র এস এম ছাইদ উল্লাহ বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় আদালত অবমাননা করেছে। হাইকোর্টের রায়ের পরও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব নাকচ করা ঠিক হয়নি। আমরা আদালতের রায় হাতে পেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আদালতের রায় পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানাব।

এর আগে দাবি আদায়ে প্রধান শিক্ষকরা হাইকোর্টে একটি রিট করেন। ঢাকার সূত্রাপুরের গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি রিয়াজ পারভেজসহ ৪৫ জন প্রধান শিক্ষক হাইকোর্টে ওই রিট করেন।

ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল দশম গ্রেডসহ গেজেটেড পদমর্যাদা দেয়ার নির্দেশ দেন আদালত।

রায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন উভয় প্রধান শিক্ষকদের প্রবেশ পদে বেতন স্কেল দশম গ্রেডসহ গেজেটেড পদমর্যাদা ২০১৪ সালের ৯ মার্চ থেকে কার্যকর করতে এ নির্দেশ দেয়া হয়। আদালতের রায়ের আলোকে এবং শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুলাই বেতন বৈষম্য দূর করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কিন্তু গত রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় ওই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাদিয়া শারমিন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পদের বেতন গ্রেড যথাযথ ও সঠিক থাকায় প্রধান শিক্ষক পদের বেতন দশম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষক পদের বেতন ১২তম উন্নীত করার সুযোগ নেই।

তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. এ এফ এম মনজুর কাদির বলেন, ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেছেন। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। গত মঙ্গলবার এক জরুরি সভা শেষে বিবৃতির মাধ্যমে তারা ক্ষোভ জানায়।

সংগঠনটির সভাপতি মো. আতিকুর রহমান আতিক এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাসেম জানান, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে বেতন বৈষম্য নিরসনের কথা বলা হয়েছে।এখন এটি নাকচ করা মানে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা।

তারা জানান, দাবি আদায়ের জন্য কর্মসূচিও ঘোষণা করা হতে পারে।

শিক্ষক নেতারা বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের যৌক্তিক দাবির প্রতি ইতিবাচক ছিলো বলেই অর্থমন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখন সেটি নাকচ করলেই আমরা বিষয়টি ভুলে যাবো বা মেনে নেবো এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজনে ফের আন্দোলনে যাবো।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক ফ্রন্টের সভাপতি ইউ এস খালেদা আক্তার বলেন, ‘বেতন বৈষম্য নিরসনের বিষয়টি আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে ছিলো। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও সচিব মহোদয় বারবার এর যৌক্তিকতা মেনে নিয়ে বৈষম্য নিরসনের অঙ্গিকার করেছেন; এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ ছাড় নাও করতে পারে।

কিন্তু প্রেরিত সুপারিশ বা প্রস্তাব নাকচ করার সিদ্ধান্ত তারা কীভাবে নেয়? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সাথে আমরা আলোচনা করবো। আলোচনায় সুরাহা না হলে অন্যান্য সংগঠনগুলোকে সাথে নিয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’

বংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক অনলাইন মহাজোটের সভাপতি কাজী আবু নাসের আজাদ বলেন, ১১তম বেতন গ্রেডের জন আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনি ইশতেহারে বেতন বৈষম্য নিরসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম দ্রুত ১১তম বেতন গ্রেড ঘোষণা করা হবে।

কিন্তু সহকারী শিক্ষকদের আপত্তি থাকলেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সহকারীদের ১২তম গ্রেডের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় পাঠায় এবং তা নাকচ হয়। আমরা মনে করি, এগুলো করে প্রধানমন্ত্রীর বেতন বৈষম্য নিরসনের নির্বাচনি ইশতেহারকে অসম্মান করা হচ্ছে। বিষয়টি সুরাহার জন্য আমরা আন্দোলন করবো।’

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন পাওয়ার পর পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে আগামী শুক্রবার বৈঠক করবে বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক মহাজোট। চারটি সংগঠন নিয়ে গঠিত এই জোটের নেতারা আলোচনায় সমস্যার সমাধান না হলে কর্মসূচি ঘোষণার ইঙ্গিত দেন।

জোটভুক্ত সংগঠন জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহিনুর আক্তার বলেন, ইতোমধ্যে সাংগঠনিকভাবে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমরা ধরে নিয়েছি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক। ফলে প্রাথমিকভাবে আমরা কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করতে চাই। ইতিবাচক কিছু না হলে পরিস্থিতির আলোকে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণাও আসতে পারে।

জোটভুক্ত অন্য একটি সংগঠন বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের (রেজি: এস ২০৪৮) সভাপতি শাহিনুর আল আমিন বলেন, আগামী শুক্রবার মহাজোট বৈঠক করবে। ওই বৈঠক থেকেই পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে। এবার কর্মসূচি দিলে তা অন্যান্য সময়ের চেয়ে কঠোর হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত