শিরোনাম

এলজিইডির অধিকাংশ প্রকল্পে কচ্ছপগতি

অভিজ্ঞতার নামে কোটি কোটি টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করলেও ফলাফল শূন্য
প্রিন্ট সংস্করণ॥ জাহাঙ্গীর আলম  |  ০০:৫৫, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯

  • উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়কে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে এক দশকেও নির্মাণ হয়নি ২৯ কিলোমিটার সেতু
  • সাত বছরেও হাওরে গড়ে ওঠেনি মডেল গ্রাম, অথচ কেনা হয়েছে ২০৭টি গাড়ি
  • ৯ বছরে উপজেলা কমপ্লেক্স প্রকল্পের অগ্রগতি ৪১ শতাংশ

গ্রামীণ যোগাযোগ ও কৃষি উৎপাদনে সহায়তা করতে এলজিইডি সারা দেশে প্রায় ২৯ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ করার প্রকল্প হাতে নেয়। এ জন্য ২০১০ সালে কাজও শুরু করে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬২৮ কোটি টাকা। এরপরে কাজ শুরু হলেও শেষই হচ্ছে না। সময় লাগবে এক দশক অর্থাৎ ২০২০ সালের জুনে শেষ হবে। বিভিন্ন সময়ে সংশোধন করে ব্যয় বাড়তে বাড়তে চারগুণ হয়েছে। একইভাবে হাওর অঞ্চলের অবকাঠমো উন্নয়নে গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট করার প্রকল্প নেয়া হলেও তিন শতাংশও অগ্রগতি হয়নি সাত বছরে। এখনো হয়নি দুটি মডেল গ্রাম। অথচ  গাড়ি কেনা হয়েছে ২০৭টি। একইভাবে উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘ ৯ বছরে আবাসিক ভবন হয়েছে মাত্র ৪১ শতাংশ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)শুধু এই তিনটি প্রকল্পেই ধীরগতি, তা নয়। চলমান ১৫২টি প্রকল্পের একই দশা, শোচনীয় অবস্থা। বিদেশে অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও সংশ্লিষ্টরা তার সুফল কাজে লাগাতে পারছে না। প্রতি বছর ইচ্ছামতো বেশি করে বরাদ্দ নিয়েও ব্যয় করতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মানে না। তাই কাজেরও গতি বাড়ে না। অথচ সারা দেশে এখনো দুই লাখ ৪০ হাজার কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। বাধ্য হয়ে জনগণকে কাঁচা রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগ সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, এলজিইডির অসংখ্য প্রকল্প চলমান। তাই এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। তার কথা মোতাবেক সার্বিক ব্যাপারে জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. খলিলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি বলেন, কোন প্রকল্প। বলা হয় এলজিইডির প্রায় প্রকল্পে গতি ঢিলেমি। কোনো কোনো প্রকল্প এক যুগেও শেষ হয় না কেন?

উত্তরে তিনি বলেন, মিটিংয়ে আছি। এরপর বলেন, বিস্তারিত জানতে হলে পিডিদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তার কথা মোতাবেক কয়েকজন পিডির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও ব্যস্ত বলে জানান। তাই সব ব্যাপারে মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় এলজিইডি সারা দেশে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যবস্থা করছে। আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন প্রকল্পও হাতে নিয়েছে। প্রতি অর্থবছরে চাহিদা মাফিক অর্থও বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। তারপরও গতি পাচ্ছে না বলে অভিযোগ। সরকার ‘উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় ২০১০ সালের ৯ মার্চ। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে ৬২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৩ সালে শেষ করার কথা। কাজও শুরু হয়। কিন্তু হচ্ছে না শেষ।

প্রথমে দুই বছর,দ্বিতীয়বারে তিন বছর,তৃতীয়বারে আরও দুই বছর সময় বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছে। তারপরও শেষ হচ্ছে না কাজ। অগ্রগতি হয়েছে ৮০ শতাংশ। আর ব্যয় বাড়তে বাড়তে দুই হাজার ২৮৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে। তবুও গত জুলাই পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র এক হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে প্রকল্পের প্রধান অঙ্গ ২৮ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ হয়েছে ২২ কিলোমিটার। অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ। অথচ প্রতি অর্থবছরে অনেক বেশি করে অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। চলতি অর্থবছরে সরকার বরাদ্দ দিয়েছে ২৫৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এ প্রকল্পে মোট বরাদ্দ দিয়েছিলো ২০০ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে ২৭০ কোটি টাকা। এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক কাজী গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুনে শেষ করার জন্য নির্ধারিত। কিন্তু সব কাজ শেষ করতে আরও সময় বৃদ্ধির প্রয়োজন।

একই দুরবস্থা ‘হাওড় অঞ্চলের অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়ন’প্রকল্পের। ২০১২ সালের ৫ জুন সরকার এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। হাওড় এলাকার জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষার জন্য ৯৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২০ সালে শেষ করার কথা। এরমধ্যে প্রকল্প সাহায্য হচ্ছে ৬৯০ কোটি টাকা।  প্রকল্পের প্রধান অঙ্গ গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণে থোক বরাদ্দ দেয়া হয় ৭৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ খাতে গত জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি মডেল গ্রাম করার কথা। কিন্তু এখনো ফলাফল শূন্য। ১০৫ কি.মি. উপজেলা সড়ক উন্নয়নে ৯৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় করা হয়েছে ৮৭ কোটি টাকা বা ৮৮ শতাংশ। ১২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫০ কি.মি. ইউনিয়ন সড়ক উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছে ১১৪ কোটি টাকা বা ৯০ শতাংশ।

অথচ জিপ, পিকআপ ভ্যানসহ পরিবহন কেনায় পাঁচ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও এর পুরোটাই অর্থাৎ শতভাগ ব্যয় করা হয়েছে। ভ্রমণ খাতে প্রায় আট কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় করা হয়েছে সাড়ে ছয় কোটি টাকা বা ৮৫ শতাংশ। পেট্রোলে সাত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় করা হয়েছে সাড়ে ছয় কোটি টাকা বা ৮৮ শতাংশ। পরামর্শক খাতে ১৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা বা ৫৭ শতাংশ।  এভাবে বিভিন্ন অঙ্গের কাজও শুরু হয়েছে। ইফাদের সঙ্গে ঋণচুক্তিও হয়েছে ২০১২ সালে। তারপরও গতি পায়নি। তাই প্রথমে ২০১৪ সালের ১০ জুলাই প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৬ কোটি টাকা। তারপর বিভিন্ন অজুহাতে দ্বিতীয়বার ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর সংশোধন করে এলজিইডি। তারপরও গতি নেই দীর্ঘ সাত বছরে। জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৮৯০ কোটি টাকা। তাই কাজের গতি বাড়াতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ছিলো ১৫০ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে ছিলো ১১০ কোটি টাকা।

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পাঁচপীর বাজার-চিলমারী উপজেলা সদর দপ্তরের সাথে সংযোগকারী সড়কে তিস্তা নদীর উপর ১৪৯০ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ প্রকল্পটিরও একই চিত্র। প্রায় চার বছরে অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে শুরুই হয়নি এর নির্মাণ কাজ। পরে প্রকল্পটির সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে দুই বছর। তারপরও জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের হার মাত্র ৬ শতাংশ।  

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতির নিয়ম রয়েছে। সে আলোকেই সব প্রকল্প অনুমোদন ও সংশোধন হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি-পিএসসির সভার পরে সিদ্ধান্ত হয় নতুন প্রকল্প প্রণয়ন বা সংশোধনের। অপরদিকে বিভিন্ন প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এজেন্সি বাস্তবায়ন করে পরিকল্পনা কমিশনের বেঁধে দেয়া নিয়মে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হলে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিআইসি) সভার মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা করে তা সমাধান করা হয়। পিআইসির কমিটিতে প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধিসহ ১২ জন সদস্য নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতি তিন মাসে একবার সভা করতে বলা হলেও এলজিইডি এতদিন কোনো পিআইসি সভা করেনি। অর্থাৎ সরকারের নিয়ম মানে না। তাই অধিকাংশ প্রকল্পই বারবার সংশোধন করতে হচ্ছে। বাড়ছে সময় ও অর্থ। বাধ্য হয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে সর্বশেষ ২৩ জানুয়ারি চিঠি দেয়। এ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা শুরু হলে এ মাসে প্রধান প্রকৌশলী পিআইসি সভার আয়োজন করে বলে সূত্র জানায়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়ে এলজিইডি এ পর্যন্ত উপজেলা সড়ক, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়ক এক লাখ ১৬ হাজার ৩১৯ কিলোমিটার পাকা সড়ক করতে পেরেছে। প্রতি বছর প্রায় ছয় হাজার কিমি সড়ক নির্মাণ করছে এ সংস্থাটি। তারপরও সারা দেশে দুই লাখ ৪০ হাজার কিমি কাঁচা সড়ক রয়েছে। একবারই সব গ্রামকে সুবিধায় আনা কখনো সম্ভব না। কারণ অর্থ হচ্ছে বড় ফ্যাক্টর। এমন পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনি ইশতেহার ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রতিশ্রুতি কল্পনার জালেই আবদ্ধ থাকবে বলে সুবিধাবঞ্চিতরা অভিযোগ করে জানান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত