শিরোনাম

শামীমের গডফাদার আব্বাস!

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০০:১২, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের হাত ধরে উত্থান জি কে শামীমকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মাফিয়া ঠিকাদার শামীমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এ নেতাও। রিমান্ডে নেয়ার পর থেকেই এরকম তথ্যের গুঞ্জন চলছে বিভিন্ন মহলে।

এছাড়াও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দু-একজন বড় নেতা ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সবার সঙ্গেই যোগাযোগ ছিলো শামীমের। তার মধ্যে ক্ষমতাসীন ছয় মন্ত্রীও রয়েছে তার কললিস্টে। নিকেতনে অভিযানের সময়ও শামীম সেসব মন্ত্রীদের ফোন করেছিলেন বলেও জানা যায়। যদিও র‍্যাব অভিযানে এসেছে শুনে সবাই ফোন কেটে এড়িয়ে গেছেন তাকে। বিভিন্ন টেন্ডার পেতে এসব মন্ত্রীরাই তাকে সহযোগিতা করেছেন। সহযোগিতায় জড়িত ছিলেন যুবলীগ নেতা খালেদ, সম্রাটও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে শামীম জানিয়েছে টেন্ডার পাওয়ার কাজে শীর্ষমহলেও ঘুষ দিতে হয়েছে তাকে। টাকা ছাড়া কেউই তাকে কাজ দেয়নি। এদিকে শামীমের ইস্যুতে বাদ যাচ্ছে না বিএনপির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাও। জানা গেছে, বিএনপির মাধ্যমে ওঠে আসা এ শামীম বিএনপির তিন শীর্ষস্থানীয় নেতাকেও মাসোয়ারা দিতেন। যার সংখ্যা কোটির ঘরে বলেও জানা গেছে। নিকেতনের অফিসে অভিযান চলাকালে অস্ত্র, মাদক ও টাকা ছাড়াও একটি খাতা পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই খাতায় সেসবের উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, মির্জা আব্বাসের তত্ত্বাবধানেই জি কে বিল্ডার্সসহ তার অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতো বলে জানিয়েছেন জি কে শামীম। মির্জা আব্বাস গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী থাকা অবস্থায় গণপূর্তে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন শামীম। তার গডফাদারও ছিলেন মির্জা আব্বাস। এখনো মির্জা আব্বাসই শামীমের প্রধান পরামর্শক। মির্জা আব্বাসের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক যোগসূত্র রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানায়।

এদিকে দেশে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি ছাড়াও ক্যাসিনো ব্যবসার টাকার ভাগ ওমানের মাসকাট ব্যাংক হয়ে যেত বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের কাছে। ওমানে থাকা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নাদিমের মাধ্যমেই এসব টাকা পাঠানো হতো জার্মানিতে থাকা জিসানের কাছে। ঢাকা থেকে এসবের আয়োজন করতো ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীমরা। কখনো কখনো এসব টাকা সিঙ্গাপুর হয়েও যেতো জিসানের কাছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, জি কে বিল্ডার্স নামের একটি কোম্পানি বর্তমানে শামীমের নামে থাকলেও তা একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ছিলো। জিসান দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কোম্পানিটির হাল ধরেন অপর সন্ত্রাসী নাদিম ওরফে টিএনটি নাদিম। এরপর নাদিমও দেশ ছাড়া হলে তা জি কে শামীমের হাতে চলে আসে। জিসান, নাদিম ও শামীম তিনজনই বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় যুবদলের রাজনীতি করতেন। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বেশকিছু বড় বড় টেন্ডারের কাজ পেয়েছে জি কে বিল্ডার্স। আর সেখানে সহায়তা করছেন যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অন্য কেউ টেন্ডার জমা দিলেও সম্রাট ও খালেদের হস্তক্ষেপে তা বাতিল হয়ে যেত। কাজ যেত জি কে বিল্ডার্সের হাতে। এর থেকে আয় করা টাকার মোটা অঙ্ক সম্রাট ও খালেদ পেতেন।

জি কে বিল্ডার্সের আরেকটি শাখা রয়েছে সিঙ্গাপুরে। যেখানে টিএনটি নাদিম বসেন। শামীম, সম্রাট, খালেদও মাঝে মধ্যে সেখানে যান। আর ওদিকে জার্মানি থেকে উড়ে আসেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানও। ওই অফিসে বসেই টেন্ডার বাগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনাগুলো হয়। তবে কেবল সিঙ্গাপুরই নয়, ওমানের রাজধানী মাসকটও এই সন্ত্রাসী চক্রের আরেকটি হাব বলেও জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে আসছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

সূত্র মতে, সন্ত্রাসী টিএনটি নাদিম মাঝে মধ্যে ওমান ও দুবাই গিয়েও থাকেন। সেখান থেকে ঢাকায় তার লোকজন দিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। জিসান ও নাদিমের হয়ে কাজ করছে মগবাজার টিএনটি কলোনির জাকির, নয়াটোলার সেন্টু ও শোভন, বাড্ডার নাসির ও খোকন। এখনো তারা জিসান ও নাদিমের হয়ে চাঁদাবাজি করছেন বলে জানা যায়। টেন্ডারবাজিতে সম্রাট-খালেদের সহায়তায় কাজ না হলে, সন্ত্রাসী এই চক্রটিকে কাজে লাগিয়ে হত্যা, অপহরণের হুমকি দিয়ে টেন্ডার বাগিয়ে নেয়া হতো। অধিকাংশ সময়ে সহায়তায় কাজ হতো। ফলে টেন্ডার বাগানোর পর নাদিম ও জিসান সিঙ্গাপুরে চলে যেতো আর শামীম, সম্রাট ও খালেদ উড়াল দিতেন ঢাকা থেকে। সেখানে চলতো তাদের নানারকম মৌজ-মাস্তি। এই টেন্ডার ও ক্যাসিনোর টাকার ভাগ সিঙ্গাপুর থেকে ওমানের মাসকট ব্যাংকে পাঠানো হতো। আর সেখান থেকেই টাকা যেতো জামার্নিতে।

ওমানের মাসকট ব্যাংকে যে অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হতো সেই অ্যাকাউন্ট নম্বরও গোয়েন্দাদের নজরে এসেছে বলে জানায় সূত্র। কখনো সম্রাট আবার কখনো খালেদ নিজেই এ টাকা পাঠাতেন। আবার মাঝেমধ্যে জাকির ও আরমানের মাধ্যমে মাসকট ব্যাংকে পাঠানো হতো।
এদিকে সাম্প্রতিককালে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে যুবলীগের খালেদের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যে দ্বন্দ্বে জিসান নাদিমকে দায়িত্ব দেয় খালেদকে শায়েস্তা করার জন্য। নাদিম ও জিসান দুবাইয়ের বুরুজ খলিফা টাওয়ারে বসে খালেদ, সম্রাট ও শামীমকে গুলি করে হত্যার পরিকল্পনাও করে। এ জন্য একে-২২ অস্ত্রও কেনা হয়। আর এ দায়িত্ব দেয়া হয় মগবাজারের শোভনকে। তবে ওই অস্ত্রটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জব্দ করে ফেলায় সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ ইতোমধ্যে নানা ধরনের তথ্য দিতে শুরু করেছে। সেসব তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাইও চলছে।

সূত্র মতে, খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে নানা ধরনের তথ্য এলেও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে এখনো কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। সিআইডির একটি সূত্র আমার সংবাদকে জানায়, খালেদের বিরুদ্ধে গুলশান ও মতিঝিল থানায় দুটি মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে। সেগুলোর কাগজপত্র সিআইডির কাছে পৌঁছায়নি। কাগজপত্র পেলেই তা পর্যালোচনা শেষে সিআইডির সংশ্লিষ্ট বিভাগ তদন্ত শুরু করবে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর মতিঝিলের ইয়ং মেন্স ক্লাব ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে অভিযান চালায় র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অন্যদিকে র‍্যাব-১ সদস্যরা গুলশান-২ এ খালেদের বাসায় অভিযান চালায়। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওই বাসা থেকে অস্ত্র, গুলি, নগদ টাকা ও মাদকসহ খালেদকে আটক করে র্যাব। পরদিন তাকে গুলশান থানায় দেয়া হয়। ওই থানায় অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনে তিনটি আলাদা মামলা দিয়ে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে তোলে পুলিশ। আদালত সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। খালেদ এখন রিমান্ডে ডিবির হেফাজতে রয়েছেন।

অন্যদিকে গত ২০ সেপ্টেম্বর র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায় আরেক মাফিয়া ডন সম্রাট-খালেদের ডান হাত খ্যাত জি কে শামীমের নিকেতনের অফিসে। সেখান থেকে নগদ ১০ কোটি টাকা ও ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরসহ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করে। একই সঙ্গে কলাবাগান ক্লাবেও অভিযান চালায় র্যাব-২। সেখান থেকে কৃষক লীগ নেতা ও কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি সফিকুল আলম ফিরোজকে অস্ত্র ও মাদকসহ আটক করা হয়।

সর্বশেষ গতকাল রোববার দুপুরে মতিঝিল-ফকিরাপুল ক্লাবপাড়ার চারটি ক্লাবে অভিযান চালায় মতিঝিল থানা পুলিশ ও জোনের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা। মোহামেডান ক্লাবে ১০টি চাকু, ১১টি ওয়াকিটকি, ভিক্টোরিয়া ক্লাবে নগদ এক লাখ টাকাসহ সবগুলো ক্লাবেই জব্দ করা হয়েছে ক্যাসিনো সরঞ্জাম।

অভিযান শেষে মতিঝিল জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, যখনই আমরা ইন্টিলিজেন্সের মাধ্যমে জেনেছি, তখনই অভিযান পরিচালনা করেছি। তবে পুলিশের নাকের ডগায় চলা এসব ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে আরও আগে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত