শিরোনাম

শেষপর্যায়ে ১০ পোল্ডারের কাজ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম   |  ০৬:৫২, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯

 

*বাঁধ সংস্কারে উপক‚লবাসির মুখে হাসি ফুটেছে
*১২৯টি বাঁধ সংস্কারে গবেষণা চলছে

জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন মানবসভ্যতার প্রতি বিশ্বের অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বাংলাদেশ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর একটি। এই হুমকি থেকে উপক‚লীয় অঞ্চলের মানুষদের রক্ষা করতে ষাট-সত্তর দশকে ১৩৯টি পোল্ডার নির্মাণ করে সরকার। ফলে এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবন-জীবিকা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৩-২০ সালের মেয়াদি ‘উপক‚লীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প, ফেজ-১ (সিইআইপি-১)’ হাতে নেয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার মোট ১৭টি পোল্ডার সংস্কারের কাজ করছে। ইতোমধ্যে ১০টি পোল্ডারের কাজ শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, তৎকালীন বাঁধ নির্মাণের মূল লক্ষ্য ছিল লোনা পানির অনুপ্রবেশ রোধ করা। যা ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস মোকাবেলা করার উপযোগী ছিল না। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার ও ঘুর্ণিঝড়ের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ সংস্কার/ উন্নয়নে ‘উপক‚লীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের ফলে পোল্ডারগুলো আইল অথবা বাঁধ দ্বারা ঘেরা যাতে করে প্রধান নদী থেকে জমি আলাদা রাখা যায় এবং সামুদ্রিক বন্যা, লবনাক্ততা অনুপ্রবেশ ও পলি জমা থেকে নিরাপদ রাখা যায়। পোল্ডার অন্তর্ভুক্ত এলাকা সমুদ্র স্তর থেকে সামান্য উঁচু ভূমিতে অবস্থিত। বাঁধ দ্বারা সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পানি অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে পোল্ডারগুলোর জন্য অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী স্লুইস গেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পোল্ডারের বর্তমান পরিস্থিতি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের দিক দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকি প্রবণ এবং পোল্ডারগুলো প্রয়োজনীয় সেবা বিশেষ করে জোয়ারের প্লাবনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা, সুষ্ঠু নিষ্কাশন, এবং সাইক্লোনের প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। পোল্ডার এলাকার একটা বড় অংশ লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ও জলাবদ্ধতা সমস্যায় জর্জরিত। পোল্ডারে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে আন্তর্জাতিক সমীক্ষার ভিত্তিতে ১৭টি পোল্ডার সংস্কারের কাজ শুরু করে পাউবো। বর্তমানে ১০টি’র কাজ শেষ পর্যায়ে। উপক’লীয় অঞ্চলে সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধি, ভুমি অবনমন, পলি ভরাট ও জলাবদ্ধতা নিরসনসহ জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত কারণে মডেলিং হতে পোল্ডার ডিজাইন প্যারামিটার নির্ধারণ এবং উপক’লীয় পোল্ডার পূনর্বাসনকল্পে বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি গবেষণা চালানো হচ্ছে। উক্ত গবেষণার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে অবশিষ্ট ১২৯টি পোল্ডারের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এতে কিছু প্রযুক্তিগত বিকল্পও বিবেচনা করা হবে। এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বাঁধ শক্তিশালীকরণ, নদীর কিনার সুরক্ষার কাজ, বাঁধের ঢালে সুরক্ষা, নিষ্কাশন গেইটের প্রতিস্থাপন, ফ্লাশিং সুইসের পুণর্গঠন এবং জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাশন জটিলতা নিরসন হবে।

তথ্যমতে, ২০০৯ সালের ২৫ মে উপক‚লীয় অঞ্চল ঘুর্ণিঝড় আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপক‚লের বিভিন্ন স্থানে ৫৯৭ কিলোমিটার বাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। আইলার পর উপক‚লের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু করে পাউবো। সেখানে বনায়ন হবে ৩৩০ হেক্টর, মোট এলাকা ১ লাখ ৭১৭ হেক্টর এবং সেচের আওতায় ৮৬ হাজার ৩৮২ হেক্টর। এছাড়া বাঁধ নির্মাণ/পুননির্মাণ ৬২৪.৮০ কিলোমিটার, নিষ্কাশন খাল খনন/পুনঃখনন ৪৮৫.২৯ কিলোমিটার, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ ১২৪টি, বাঁদের ঢাল প্রতিরক্ষা কাজ ৫২.৯০ কিলোমিটারসহ নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ হবে ২২.০৫ কিলোমিটার।

প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘উপক‚লীয় বাঁধ উন্নীতকরণ প্রকল্প-১ (সিইআইপি-১)’ এর আওতায় বনায়ন কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীর সকল নির্দেশনা পালন করা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে তার চেয়ে কয়েকগুণ ফলজ, বনজ ও ভেষজ গাছ লাগানো হচ্ছে। প্রকল্পে ২০০ হেক্টর বাঁধ বনায়ন ও ১৩০ হেক্টর ফোরশোর ম্যানগ্রোভ বনায়নসহ মোট ৩৩০ হেক্টর বনায়নের কর্মসূচি ছিল। তবে প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে ৬টি জেলার ১০টি বাঁধে ৭০০ হেক্টর এলাকায় বনায়ন করা যাবে- তার মধ্যে ৫৫৮ হেক্টর বাঁধ বনায়ন এবং ১৪২ হেক্টর ফোরশোর ম্যানগ্রোভ বনায়ন। ৫৫৮ হেক্টর এলাকায় প্রায় ১৪ লাখ এবং ১৪২ হেক্টর এলাকায় ৩ লাখের অধিক অর্থাৎ মোট সতের লাখেরও অধিক গাছ লাগানো হবে।

‘উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প, ফেজ-১ (সিইআইপি-১)’ এর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ২০০৭ সালের সিডরের পর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদন করে এবং এর সুপারিশের ভিত্তিতে ১৭টি পোল্ডার সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে জলবায়ূর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা হয়নি। জলবায়ূ পরিবর্তন ও ভূমি অবনমনের কারণে বাঁধের উচ্চতা ২৫, ৫০ ও ১০০ বছরের রিটার্ন পিরিয়ড ধরে বাঁধের উচ্চতা কোথায় কতটুকু বৃদ্ধি করতে হবে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এজন্য বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত এবং উম্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত কনসালটেন্সী প্রতিষ্ঠান জেভি অফ ডিএইচআই, ডেনমার্ক অ্যান্ড ডেল্টারেস, দ্যা নেদারল্যান্ড ইন অ্যাসোসিয়েশন অব ইউনিভাসির্টি অফ কলোরোডা ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ থেকে থাকবে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-কে জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে এর প্রভাব নির্ধারণের জন্য সরকার কর্তৃক নিয়োজিত করা হয়েছে। গাণিতিক মডেলিং এর মাধ্যমে উপক’লীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বাঁধের উচ্চতা কোন জায়গায় কত হবে তা নির্ধারণ করা হবে। উপকূলীয় পোল্ডার সমূহের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের এবং জলাবায়ুজনিত সমস্যাসহ উদ্ভুত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উপায় নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য উক্ত গবেষণামূল স্ট্যাডির কাজ বর্তমানে চলমান। এই গবেষনার পর বোঝা যাবে খুলনার দিকে ভূমি কতটুকু অবনমন হচ্ছে এবং চট্টগ্রাম ও সিলেটের দিকে মাটি কতটুকু ওপরের দিকে উঠছে।

তিনি বলেন, উপক‚লে ৬ হাজার কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। বিদ্যমান বাঁধের উচ্চতা ১ ফুট বাড়লে ৬ হাজার কিলোমিটারে ৬ হাজার কোটি টাকা লাগবে। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১ কোটি টাকার প্রয়োজন। বর্তমানে কোথাও কোথাও বিদ্যমান বাঁধের উচ্চতা ২-৫ ফুট বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তা যথেষ্ট কি না ইহাও প্রশ্নবিদ্ধ। ৫ ফুট বাঁধের উচ্চতা বাড়লে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। দেখা যাচ্ছে, বাঁধের কোথাও ৫ ফুট বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে কিন্তু সেখানে আরও ২ ফুট বাড়ানোর দরকার ছিল অথবা কোথাও ৩ ফুট বাড়ানো হয়েছে কিন্তু দরকার ছিল ৫ ফুটের। এসব দ্বন্দ্ব দূর করতে সুনির্দিষ্ট প্যারামিটার দরকার। সরকার শত বর্ষ মেয়াদী ডেল্টা প্ল্যান অনুমোদন করেছে। এর আলোকে ১০০ বছরে বাঁধের উচ্চতা কি পরিমাণ করলে পোল্ডারের লোকজন নিরাপদে থাকবে তাও জানা আবশ্যক।এজন্য বাংলাদেশেরউপক’লীয় অঞ্চল ভিত্তিক ৩০ মাসব্যাপী গবেষণার ফলাফলের আলোকেঅবশিষ্ট ১২৯টি পোল্ডারের বাঁধের উচ্চতা ও সংস্কার কাজ করা হবে। বর্তমানে যে প্রকল্প চলছে এর আওতায় ১০টি পোল্ডারের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ১০ পোল্ডারের বাঁধ ও ফোরশোরে ১৭ লাখ বিভিন্ন গাছপালা লাগানো হবে। গত বছর ৬০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। আমরা বনবিভাগকে টাকা দিচ্ছি তারা লাগাচ্ছে। প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সুবিধাভোগীদের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক বনায়ন কমিটি বনায়ন কাজ দেখভাল করবে। ১০ বছর পর পর গাছপালা কর্তন করা যাবে এবং পূনঃ বনায়নের খরচ বাদে প্রাপ্ত অবশিষ্ট অর্থ সুবিধাভোগীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে । সামাজিক বনায়ন কমিটি পাবে ৬০ ভাগ অর্থ। ইউনিয়ন পরিষদ, বনবিভাগ ও পাউবো চুক্তি অনুযায়ী তাদেও হিস্যা পাবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি বাপাউবো’র বিশ্ব ব্যাংক ঋণের সহায়তা ‘উপক‚লীয় বাঁধ উন্নীতকরণ প্রকল্প-১’ শীর্ষক একটি বৃহৎ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই প্রকল্পের আওতায় আপাততঃ উপক‚লীয় অঞ্চলের ৬টি (খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা এবং পটুয়াখালী) জেলায় মোট ১০টি পোল্ডারকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সৃষ্ট ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস মোকাবেলায় উপযোগী করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ উঁচুকরণ, লবণাক্ততা দূরীকরণ, পানি নিস্কাশন ও জলাবদ্ধতা হ্রাস, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি ইত্যাদি কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ স্থানান্তর, সামাজিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের সাথে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা সংগঠন সম্পৃক্ত করার কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত